‘বিজিএমইএ নিয়ে অনেক দূর যেতে চাই’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:১১

জীবন তার দেখতে যত নির্মল, সুন্দর, সফল, সাজানো, পেছনের লড়াইটা তার চেয়েও কঠিন। তবে শৈশব থেকেই ছিলেন ভালো ছাত্রী। দেশসেরা মেধাবীদের একজন। টিউশনি করে লেখাপড়া করেছেন স্কুলজীবন থেকেই। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী, অদম্য সাহসী, দৃঢ় প্রত্যয়ী আজকের সফল ব্যবসায়ী আইকন ও বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট রুবানা হকের কথা বলছি। তিনি হতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক। সাদা-কালো যুগের সফল টিভি উপস্থাপিকা থেকে হয়েছেন নাগরিক টিভির মালিক ও শিল্পপতি। ফ্যাশনে, রুচিতে, ব্যক্তিত্বে, রূপে-গুণে দ্যুতি ছড়ানো এই বিদুষী রমণী একজন মানবিক মানুষও। কবির হৃদয়, শিল্পীর হৃদয় দিয়ে তার ঘর সাজিয়েছেন দেশে দেশে ঘুরে সংগ্রহ করা অ্যান্টিক সামগ্রীতে। দুস্থ, অসহায়দের যেমন সাহায্য করেন তেমনি অনাথ শিশুদেরও লেখাপড়ার খরচ জোগান নীরবে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় ছেদ পড়েছিল সেই এক কঠিন সময় রাজনীতির। কিন্তু দমেননি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন রুবানা হক।  তার সঙ্গে কথা বলেছেন - রুহুল আমিন রাসেল

‘নয় নয় এ মধু খেলা’ কিংবা ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে’ নিজের খুব প্রিয় এই গান গুনগুনিয়ে গাইতে ভালোবাসেন ড. রুবানা হক। শৈশব শুরু করেছিলেন টিউশনিতে। হতে চেয়েছেন সাংবাদিক। এখন তিনি কেবল ব্যবসাই করছেন না। দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতি হিসেবেও।

আগামীতে পোশাকশিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে চান মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রুবানা হক। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন- ডিএনসিসির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী। আনিসুল হকও ছিলেন বিজিএমইএর সভাপতি। পরবর্তীতে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন-এফবিসিসিআই এবং দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন সার্ক চেম্বারেরও সভাপতি ছিলেন আনিসুল হক। 

ড. রুবানা হক বললেন, বিজিএমইএ নিয়ে অনেক দূর যেতে চাই। আগামীতে আরও পড়তে চাই। পড়াতে চাই। মানুষের উপকার করতে চাই। রাজনীতি কখনো চিন্তা করিনি। তবে আমাদের সবারই রাজনৈতিক দর্শন আছে। মানুষের কল্যাণ আমাকে টানছে। এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। মানুষকে ভালো রাখতে চাই। আমি স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু আশা করি। তরুণদের বলব- সাহসটা রাখেন। মানুষের কাজ বড়। ভয় পাবেন না। ভালো মেনটর খুঁজে দেখুন। আমরা কেউ সাদা না। সাদাকালোর মাঝে ধূসর।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসি জরিপে শত নারী উদ্যোক্তার তালিকায় স্থান পাওয়া রুবানা হকের কবি হিসেবেও খ্যাতি আছে। তার ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘টাইম অব মাই লাইফ’র জন্য ২০০৬ সালে পেয়েছেন সার্ক সাহিত্য পুরস্কার। শৈশব থেকেই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে জড়িত রুবানা হক দেশসেরা বিতার্কিকও ছিলেন। দেশের অন্যতম পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান মোহাম্মাদী গ্রুপের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক তথ্য-প্রযুক্তি, আবাসন, গণমাধ্যম ও জ্বালানি খাতের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

ব্যবসায়িক জীবনটা কীভাবে শুরু করলেন- জানতে চাইলে স্মৃতিরোমন্থন করতে গিয়ে ড. রুবানা হক বলেন, আমি শুরুতে ব্যবসায় আসি ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে। তখন কাপড় কাটতাম। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায় যোগ দিই ১৯৯৫ সালে। ’৯৭ সাল থেকে পুরোপুরি ব্যবসা করছি। তখনো আমার কোনো পদ ছিল না। কিন্তু পার্টনারদের সঙ্গে আলাদা হওয়ার পরে আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছি মোহাম্মদী গ্রুপের। আনিস (আনিসুল হক) ’৯৬ সাল থেকে বিজিএমইএ নিয়ে আস্তে আস্তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমার ওপর হাল ছেড়ে দেয়। তখন আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করি। টেকনো ভিস্তা নামে তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়েছি। ক্যাবল ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি যাদু কলাম। রিয়েল এস্টেট ছোট ছোট প্রকল্প করেছি। এখন আমরা বড় প্রকল্প করছি। ১৯৯৮ সালে ছোট সন্তান অসুস্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে থাকতাম। তখন অনেক ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছি। ২০০২ সালে ছেলেটা চলে যাওয়ার ১৫ দিনের মাথায় আমি হংকংয়ে গিয়ে পূর্ণ মিটিং করেছি। সকালে নাস্তার টেবিলে চোখ মুছতাম। দুপুরে মিটিং করতাম।

কীভাবে দিন চলে যায়, বলতে এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তিনি বলেন, খুব চাপে আছি। এত কাজের চাপ কীভাবে সামলাচ্ছি জানি না। তবে চাচ্ছি না আমার অবস্থা আনিসের মতো হোক। সাহস কীভাবে পাচ্ছি জানি না। আমার মা বলতেন ঝড় যখন আসবে, তখন ঝড় সামলাও। পড়ে কেঁদো। মায়ের এই থিউরি প্রয়োগের চেষ্টা করছি। তাই এখন প্রতিদিন চেষ্টা করছি, নিজের পোশাকশিল্প খাতটাকে সামলাই। পড়ে দেখা যাবে কী হয়।

ব্যবসায় আত্মবিশ্বাস জন্মানোর গল্প বলতে গিয়ে ড. রুবানা হক বলেন, আমি সব সময় আত্মবিশ্বাসী। যোগাযোগে ভালো ছিলাম। এখন অতটা নেই। আমি শুটকেসে স্যাম্পল নিয়ে ব্যবসা করতাম। নিজেই স্যাম্পল দেখাতাম। হক সাহেবকে দেখতাম শার্টও আয়রণ করে ক্রেতাদের সামনে দেয়। আসলে এই জিনিসটা সব সময় মনে পড়েছে যে-  নিজে না করলে হয় না। কারও ওপর নির্ভর করতাম না। পোশাকশিল্পে কোটা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। তবে মূল্য সংযোজন নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। এখনো আছি। এই সংকটটা রয়েই গেছে।

সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে ব্যবসায় আসা প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. রুবানা হক বলেন, আমি পারদর্শী ব্যবসায়ী নই। সাধারণ মানুষের মতো চিন্তাভাবনা করি। মানুষের কল্যাণ করাটা জরুরি। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে আনিসের শরীর খারাপ হয়। তখন চিকিৎসক বললেন আপনি কেন হাল ধরছেন না। তখন হক সাহেব বললেন চলে আসো ব্যবসায়। আনিসের সঙ্গে ব্যবসার অনেক পার্টনার ছিল। ব্যবসায় এসে আমি শুরুতে মাটিতে বসে কাপড় কাটতাম। দুই বছরের মধ্যে আস্তে আস্তে পার্টনারদের সঙ্গে আমরা আলাদা হলাম। তখন চার লাইনের পোশাক কারখানা ছিল। সেটাই কেমন করে যেন বড় হয়ে গেল। মাত্র ৪০০ শ্রমিক নিয়ে কাজ করতাম। এখন ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছি। সংসার, ব্যবসায় জড়িত মানুষজন নিয়েই বেশি ভেবেছি। সংসার নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে এত মার খেয়েছি জীবনে। যার জন্য সমাজ নিয়ে চিন্তা করাটা আমার দায়িত্ব। আমি খুব মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। ওই সংগ্রামটা আমার জন্য জরুরি। আমার বাবা বলতেন কষ্টে কেষ্ট মেলে। আমার মনে হয় অনেক কিছু হারালে, অনেক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে গেলে আসলে মানুষ বোধ হয় অন্যকে ভাবতে পারে। আমি ভালো মানুষ নই, কিন্তু আমি ভালো হতে চাই। আমি ভালো হওয়ার যাত্রাটাকে বিশ্বাস করি।

বিবিসি জরিপে শত নারী উদ্যোক্তার তালিকায় স্থান পাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ১০০ জন নারীর মধ্যে ১০ জনকে ওরা বিশেষ মেনটর হিসেবে বিবেচনা করল। কম্বোডিয়ার এক মেয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে। ওর খুব শখ ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার। আমি তখন মেয়েটির সঙ্গে কম্বোডিয়াতে দেখা করলাম। ওর ডিজাইন দেখলাম। গিয়ে দেখলাম মেয়েটি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে খেত। তার ডিজাইন একটি এনজিওর নজরে আসে। মেয়ে তখন এনজিওর বাচ্চাদের সঙ্গে থাকত। কিন্তু মেয়েটি সব সময় স্বপ্ন দেখত সে বড় ডিজাইনার হবে। সেই মেয়েটিকে ঢাকায় এনে আমার কারখানায় নিয়ে যাই। মেয়েটির তৈরি ডিজাইন আমি প্রাইমার্কের কাছে বিক্রিও করেছি। পড়ে মেয়েটিকে উপহার হিসেবে ৫ হাজার ডলারও দিয়েছিলাম। সেই মেয়েটি কিন্তু এখন কম্বোডিয়াতে কাজ করে। ওর জীবন ঘুরে যাওয়াটা আমার জীবনে অনেক আনন্দ দিয়েছে।

আরেকটা তৃপ্তি হলো- আমার কারখানার শ্রমিক সাথী এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে অর্থনীতিতে পড়ছে। সেই সাথী আগামী বছর গ্রাজুয়েশন করবে। কী সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলছে সাথী। তার কী দাপট। কী সুন্দর কথা বলে। আমার কারখানায় ইন্টার্নি করে গেল। আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আসলে আগামী বছর সাথী যখন গ্রাজুয়েট হবে, সেই মুহূর্তটা হবে আমার জন্য আনন্দের। আমি সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছি। আসলে এই কয়েকটি ঘটনা আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। এমন ১০ জন শ্রমিক পড়ছে। এটা ভালো লাগছে।

শৈশবের এলোমেলো ভাবনাগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, ছোট বেলায় সবসময় ভাবতাম সাংবাদিক হব। জানি না কেন চেয়েছিলাম। তখন দেয়াল পত্রিকা করতাম। একবার ঠিক করেছিলাম দেয়াল পত্রিকা করব। শিশুদের জন্য ম্যাগাজিন করব। স্কুলের দেয়াল পত্রিকা খুব মিস করছি। দেয়াল পত্রিকায় মজার মজার গল্প লিখতাম। আমরা অনেক বড় বড় দেয়াল পত্রিকা করতাম। যদিও ৬ ফুটের বেশি করতে বারণ ছিল। তারপরও মনে হতো ক্যানভাসটা বিশাল বড় করব। দেয়াল পত্রিকার ভিতর টুমোরো পিপল নামে একটা ম্যাগাজিন করার স্বপ্ন দেখতাম। আগামীর বাচ্চাদের নিয়ে পত্রিকা করার স্বপ্নটা পূরণ হয়নি। তবে কেন জানি আগামীকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। আগামীর দিকে তাকিয়ে আজকের যত ঝড়ঝন্ডা চলছে, এগুলোকে আমরা মোটামুটি অতিক্রম করব। এগিয়ে যাব। আসলে ঝামেলা সামলাতে সাহস লাগে।

আমি চাই ঢাকা শহরের প্রতিটি দেয়াল যেন জ্বলে ওঠে। এমনকি আমাদের কারখানা প্রাঙ্গণে দেয়াল পত্রিকা হোক। আমার শ্রমিকরা সেখানে ছবি আঁকুক। দুই লাইনের কবিতা লিখুক। কিছু তুলি রাখলাম। যে যার মতো আঁকুক। ওরাও স্বাধীন। ওরাও আঁকতে পারে আমাদের অনেক মজার সময় গেছে। সবই তো ফোনে। কারও মনে নেই কিছু।

বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে সংগৃহিত

এই বিভাগের আরো সংবাদ