‘বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব নয়’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০১৯, ১২:৫২

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সাবেক সচিব। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বাজেট প্রণয়ন এবং শুল্ক ও কর ব্যবস্থা সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক ফিন্যান্স বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিন বছর। ২০০৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর প্রায় পাঁচ বছর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বাণিজ্য অনুষদে অর্থনীতি ও ফিন্যান্সের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বই ফিন্যান্সিং লার্জ প্রজেক্টসের সহলেখক। বর্তমানে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেন জনপ্রিয় একটি দৈনিকের সঙ্গে। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

বাজেট নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

এবারের বাজেট বক্তৃতাটি আগের তুলনায় অধিকতর পাঠযোগ্য। কারণ গত বছরের বাজেট বক্তৃতা ছিল ১৫৩ পৃষ্ঠার, এবার তা কমে ১২৮ পৃষ্ঠায় নেমে এসেছে। তবে এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। কেননা ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতা মাত্র ২২ পৃষ্ঠার। বাজেট বক্তৃতা বড় হলে তা অসংলগ্ন বিবৃতিতে পরিণত হওয়ার একটা শঙ্কা থেকেই যায়। অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট পেশ করার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক ও আলোচনা হচ্ছে। এবারের বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হচ্ছে রাজস্ব অর্জনের নতুন লক্ষ্যমাত্রা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব, ব্যবসায়ীদের খুশি রাখতে করছাড়, কৃষি ও কৃষকের সমস্যাগুলো অনুল্লেখিত ইত্যাদি।

এ ধরনের বাজেট দিয়ে কি লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ৮ দশমিক ২ শতাংশ বা টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে?

এবারের বাজেটে কতগুলো ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এটাকে ডিজিটালাইজ করার কথা বলা হয়েছে। আগে যেটা হতো, একজন ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খুলে টাকাটা রাখতে পারতেন; যা  চিহ্নিত করার কোনো উপায় ছিল না। এখন একজন ব্যক্তি একাধিক হিসাব খুলে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ রাখতে পারবেন না, যা কিনা একটি ভালো উদ্যোগ। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা পরিধি বা সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আবার স্কুল ও হাসপাতালে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চলাচলে সুবিধার জন্য ব্যবস্থা না নিলে তাদের বাড়তি কর দিতে হবে। বেসরকারি ব্যক্তিদের জন্য পেনশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা কিনা গুরুত্বপূর্ণ। 

কিন্তু আমাদের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে বাজেটে খুব একটা দিকনির্দেশনা নেই। যেমন নব্বইয়ের দশকের পর আমাদের দেশে কোনো মৌলিক অর্থনৈতিক সংস্কার হয়নি। নতুন করে অর্থনৈতিক সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা যাবে না। আমরা যদি অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করি, যেমন ভিয়েতনাম, তবে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। একটা সময় আমাদের তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। ১৯৯০ সালে ডলার মূল্যে ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ছিল বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ, ২০১৭ সালে তা আমাদের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তাছাড়া বাংলাদেশের অনেক পরে ভিয়েতনাম তার অর্থনীতির সংস্কার শুরু করলেও বিভিন্ন সূচকে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। যেমন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সূচক ২০১৮-তে ১৩৭টি দেশের মধ্যে ভিয়েতনামের অবস্থান ছিল ৫৫তম, বাংলাদেশ সেখানে ৯৯তম। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসার সহজ পরিবেশ সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে ভিয়েতনামের অবস্থান ৬৬তম ও বাংলাদেশের ১৭৭তম। তাই আমাদের অর্জনগুলো উল্লেখযোগ্য হলেও যথেষ্ট নয়।

কী কী বিষয়ে অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে?

আর্থিক ব্যয় ও রাজস্ব আহরণ উভয় ক্ষেত্রেই সংস্কার করতে হবে। আর্থিক ব্যয়কে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আমাদের দেশে ফেডারেল ব্যবস্থা নেই, তাই প্রশাসনিক বিভাগভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের কথা ভাবা যেতে পারে। উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়কে একীভূত করার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এসব ব্যবস্থা নিলে স্থানীয় অংশগ্রহণ ও তদারকির ফলে আমাদের আর্থিক ব্যয়ের প্রধান সমস্যা—অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্লথগতি—দূর হবে, জাতীয় ব্যয়ের গুণগত মান বাড়বে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে।

রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে শুল্ক ও করহার কমিয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের সঠিক শুল্ক ও কর প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে। শুল্ক ও কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমাতে হবে, যাতে তারা বিদ্যমান করদাতাদের হয়রানির পরিবর্তে নতুন করদাতা শনাক্তকরণ এবং সঠিক পরিমাণ শুল্ক ও কর আহরণে মনোযোগী হতে পারেন। এছাড়া আর্থিক খাতের সংস্কার করে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রানীতির সংস্কার করে অর্থনীতিকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সুদের হার নির্ধারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রভাব কমাতে হবে। আমি বলছি না যে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ থাকবে না, কিন্তু তারা এককভাবে সরকারকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। ব্যবসায়ীরা তাদের সমস্যা, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলবেন, পাশাপাশি সরকার শ্রমিক, কৃষক, বিভিন্ন পেশাজীবী, ভোক্তা সবার কথা শুনবে। এরপর সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

পোশাক শিল্পের প্রণোদনা নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।

নিম্ন করপোরেট ট্যাক্স হার ছাড়াও নতুন বাজেটে গার্মেন্টের জন্য ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। এখন আবার তারা ডলারের ৫ টাকা অবমূল্যায়ন চান। তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের কারণ ছিল এর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান। কেবল ভর্তুকি দিয়ে এটাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প পাট শিল্পের মতো হয়ে যেতে পারে!

তাছাড়া বাজেট হতে হয় ব্যবসাবান্ধব, ব্যবসায়ীবান্ধব নয়। অথচ আমাদের বাজেট হচ্ছে ব্যবসায়ীবান্ধব। মুদ্রানীতি কী হবে, সুদের হার কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, ব্যবসায়ীরা এ বিষয়গুলোয় অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। এটি প্রত্যাশিত নয়। ব্যবসায়ীবান্ধব বাজেট হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের ইজঅব ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। ব্যবসাবান্ধব বাজেট হলে এমনটা হতো না।

বাজেটে খেলাপি ঋণের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পেয়েছে? ভারতে যেভাবে আইন করে খেলাপি ঋণ আদায় করা হলো, আমরা কেন তা পারছি না?

আমাদের ঋণখেলাপির সংখ্যা ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অথচ এ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাজেটে তেমন কোনো সমাধান নেই। খেলাপি ঋণের বিষয়টি মাত্র একবার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে। দায়সারাভাবে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনার জন্য সবার সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যাংক কমিশন গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলা হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থার কার্যকরী সদস্য পদে রক্ত সম্পর্কিত একই পরিবারের দুজন সদস্যের বেশি কার্যনির্বাহী হিসেবে থাকতে পারবেন না এমন বিধিবিধান থাকলে ব্যাংকের ক্ষেত্রে কেন এ নিয়ম জারি হবে না? ভারতে ২০০৮-১৪ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১৮ লাখ কোটি থেকে ৫২ লাখ কোটি রুপি হয়। বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে এ ঋণ গ্রহণ করা হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৪ সালে ভারতের নন-পারফর্মিং লোনের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৪ লাখ কোটি রুপি, যার মধ্যে প্রায় ৩ লাখ কোটি রুপি আদায় করা হয়েছে। কতগুলো ব্যাংককে একীভূত ও দেউলিয়া আইন সংস্কার করা হয়েছে। যদিও এশিয়ার বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে ভারতে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছিল। ২০১৮ সালে দেশটির ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নানা উদ্যোগে তা কমে এসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশটির ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের চিত্র হতাশাজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ শেষে এ হার ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশে ঠেকেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের গড় হারের চেয়ে বাংলাদেশে এ হার প্রায় চার গুণ বেশি। এবিবি প্রধান ঠিকই বলেছেন, একটি অকার্যকর ব্যাংককে দেউলিয়া হতে দিতে অসুবিধা কোথায়? হরহামেশা তো কত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হচ্ছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠান তাদের স্থান নিচ্ছে।

তেমনিভাবে দুর্নীতি মোকাবেলা আমাদের আরেকটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বাজেটে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। তবে সেখানে কেবল অফিস সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। যেখানে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনেরই সমস্যা রয়েছে, সেখানে অফিসের সংখ্যা বাড়লে দুর্নীতি আরো বাড়বে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী আমলাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। উপরের দিকের দুর্নীতির বিষয়ে উদাসীন থেকে নিচের স্তরগুলোয় শাস্তি আরোপ করলে কিন্তু কোনো কাজ হবে না। উদাহরণ তৈরির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে সশস্ত্র পুলিশের পাশাপাশি উন্নত সফটওয়্যার প্রদানের কথা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে মৌলিক নীতি পরিবর্তন না করে এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে কোনো সমাধান আসবে বলে মনে হয় না।

বাজেটে কৃষক ও কৃষি খাতের বিষয়টি অনুপস্থিত রয়ে গেছে, বিষয়টির সঙ্গে আপনি কতটা একমত?

এটা ঠিক, এবারের বাজেটে কৃষক ও কৃষি খাত অনুপস্থিত। ভারতের বাজেটে কৃষকদের বিভিন্ন সহায়তার কথা উল্লেখ রয়েছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের জন্য সরকার থেকে ন্যূনতম সহযোগী মূল্য (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) নির্ধারণ করা হয়, যার পরিমাণ কৃষকের উৎপাদন খরচের চেয়ে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ বেশি। এভাবে ভারতে কৃষককে ২২টি পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদিত মূল্যের ৫০ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দেয়া হয়। আমাদের কৃষকদের সাম্প্রতিক দুরবস্থার কথা সবারই জানা। বিক্রয়মূল্য কম হওয়ার কারণে কৃষক ক্ষেতে ফসল রেখে দিয়েছেন, এমনকি ফসলে আগুন দিয়েছেন বলে শোনা যায়। অথচ আমাদের বাজেটে এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উদ্যোগ নেই। এদিকে তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থানের কথা বলে হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আগের পরিসংখ্যান অনুসারেই বলা হচ্ছে যে এখানে ৪০ লাখ লোক কাজ করে। অথচ কৃষির সঙ্গে কয়েক কোটি লোক জড়িত। দেশের ৬০-৭০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে যে খাতে, তা নিয়ে বাজেটে কেন কোনো উল্লেখ নেই? ব্যাপারটা এমন যেন বাংলাদেশে কৃষকের কোনো অস্তিত্ব নেই। কৃষি ও পোশাক শিল্পের সঙ্গে কতজন লোক সম্পৃক্ত, আমরা যদি এর তুলনা করি তাহলে ওই সিদ্ধান্তটি কতটা অবিবেচনাপ্রসূত, তা বুঝতে বাকি থাকে না।

অর্থবিল ২০১৯-এ সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর কর্তন ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের স্বার্থ ব্যাহত হবে। মনে রাখতে হবে, বিত্তশালীদের হাতে টাকা দিলে তার একটি অংশ লিকেজ হয়, বিদেশে চলে যায়। কিন্তু কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিলে, মধ্যবিত্তদের হাতে টাকা রাখলে তা দেশেই থাকবে এবং সার্বিক চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।  

এছাড়া ভারতে স্বল্প জমি আছে এমন কৃষক পরিবারের জন্য কাঠামোগত উপার্জনের সমর্থন হিসেবে বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতি, মজুর ইত্যাদি সরবরাহের কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় বৃদ্ধির নিশ্চয়তা হিসেবে ভারত সরকার ‘পিএম-কৃষাণ’ নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে; যার আওতায় অরক্ষিত কোনো কৃষক পরিবারের যদি দুই একর পর্যন্ত চাষাবাদযোগ্য জমি থাকে, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর তাদের ৬ হাজার রুপি অর্থ সাহায্য দেয়া হচ্ছে। গোটা প্রক্রিয়ার মাঝে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই। ২ হাজার রুপি করে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে তিনটি ধাপে অর্থ পাঠানো হয়। ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর শুরু হওয়া গোটা কর্মসূচির খরচ বহন করছে ভারত সরকার। ভারতের বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য পিএম-কৃষাণ কর্মসূচি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫ কোটি রুপি। দেশের কৃষকদের দুরবস্থা বিবেচনায় আমরাও কিন্তু ভারতের মডেলগুলোর মতো কিছু করতে পারি।

রাজস্ব আহরণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

বাজেটে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কীভাবে বাড়ানো হবে তা বলা হয়নি। এদিকে যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদেরই হয়রানি করা হচ্ছে। অফিসে বসে আয়কর কর্মকর্তারা করদাতার সংখ্যা বাড়াতে পারবেন না। সংস্থাগুলোকে বাইরে যেতে হবে এবং নতুন করদাতাকে খুঁজে বের করতে হবে। অর্থবিল ২০১৯-এ রিটেইনড আর্নিংসের ওপর কর দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটা কিন্তু বেসিক পাবলিক ফিন্যান্স প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধ। উল্লেখ্য, রিটেইনড আর্নিংস হিসাব করা হয় কোম্পানির আয়, কোম্পানির খরচ, করযোগ্য আয় থেকে কর বাদ দিয়ে। এক্ষেত্রে তো একবার কর নেয়া হয়েছে, আবার কেন একই আয়ের ওপর করারোপ করা হবে? করের ওপর কর নেয়া তো নিয়মবহির্ভূত।

এক্ষেত্রে আরো কিছু সমস্যা হবে। রিটেইনড আর্নিংস মূলত ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য রাখা হয়। কিন্তু রিটেইনড আর্নিংসের ওপর করারোপ করা হলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে। তাছাড়া পদক্ষেপটি ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ব্যাংক যখন রিজার্ভ হিসাব করে তখন স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ এবং ওদের রিটেইনড আর্নিংস মিলে এটির হিসাব করে। কিন্তু সেখানে যদি করারোপ করা হয়, তাহলে হিসাবে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বলা হয়েছে, এটা পুঁজিবাজারকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।

তবে পুঁজিবাজারের জন্য আরেকটা প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের বঞ্চিত করার জন্য নগদ ডিভিডেন্ড না দিয়ে স্টক ডিভিডেন্ড দেয়। তাই এক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপ ঠিক আছে। কিন্তু রিটেইনড আর্নিংসের ওপর ট্যাক্স আরোপ কোনো সুবিবেচেবনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নয়।

কাস্টম ডিউটি সংস্কার কতটা জরুরি?

শুল্ক ও কর বিভাগের কর্মকর্তারা আমাদের রাজনীতিবিদদের সবসময় বোঝান যে করের হার কমালে ট্যাক্স কমে। এটা কিন্তু ঠিক না। নব্বইয়ের দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শুল্ক ও করহার এবং এর সংখ্যা হ্রাসের ফলে রাজস্ব আহরণ কমে না, বরং বাড়ে। অমূলকভাবে রেট বাড়ালে-কমালে এটা যুক্তিসংগত থাকে না। আমাদের কাস্টম ডিউটি মূলত সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। অথচ ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণই হচ্ছে কাস্টম ডিউটি সংস্কার। তাই আমাদের এক্ষেত্রে নতুন করে সংস্কারের কথা ভাবতে হবে।

নতুন ভ্যাট আইন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

১৯৯১ সালে যখন ভ্যাট আইন করা হয়, আমি তখন এনবিআরে কর্মরত। তখন ভ্যাটের হার কত হবে, তা নিয়ে একটা বিতর্ক হয়েছিল। এনবিআর থেকে আমরা এটা ১০ শতাংশ করার কথা বলেছিলাম, কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপে ১৫ শতাংশ ধার্য করতে সরকার বাধ্য হয়েছিল। আমরা তখনই বলেছিলাম যে উচ্চহার হলে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ বেশি হবে। আমরা কিন্তু দেখিয়েছিলাম ভ্যাটের হার ১০ শতাংশ হলেই যথেষ্ট। কিন্তু উচ্চ ভ্যাট হারের কারণে আমরা যেমনটা অনুমান করেছিলাম তা-ই হয়েছে, ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ট্রাংকেটেড বেস, ট্যারিফ মূল্য নির্ধারণ হলো। এর মাধ্যমে ভ্যাট ব্যবস্থায় বিচ্যুতি আনা হলো।

আমরা আশা করেছিলাম ভ্যাটের উচ্চহার কমানো হবে। অর্থবিল ২০১৯-এ বহু ভ্যাটের হার যেমন ১৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কিংবা ৫ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ভ্যাটের মৌলিক নীতি হলো ট্যাক্স অন আউটপুট বিয়োগ ট্যাক্স অন ইনপুট। একটি পণ্যের মূল্য যদি ১০০ টাকা ও করের হার ১৫ শতাংশ হয়, তাহলে ভ্যাট বাবদ ১৫ টাকা দিতে হবে। কেউ যদি ইনপুটের ওপর ১০ টাকা কর দিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি পরবর্তী সময়ে ৫ টাকা কর দেবেন। এটা হলো ভ্যাটের সহজ নিয়ম। কিন্তু অর্থবিল ২০১৯-এ বলা হয়েছে, কেবল ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী স্তরে প্রদত্ত কর রেয়াত পাওয়া যাবে। এছাড়া ওষুধ শিল্প ও পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৪ ও ২ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কথা বলা হয়েছে। যা সংস্কারের নামে গোঁজামিল ছাড়া কিছু নয়। এটা না করে যা করে উচ্চহারটাকেই কমানো উচিত ছিল। এটা মূলত ব্যবসায়ীদের প্রভাবের কারণে হয়েছে।

কিন্তু ভ্যাটের টাকা তো ভোক্তাই দিচ্ছেন? 

আমাদের দেশে ভ্যাটের অর্থটা ব্যবসায়ীদের মুনাফার অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীই ভ্যাট আদায় করেন, কিন্তু এটা সরকারের ঘরে জমা দেন না। কেউ যদি ব্যবসায়ীদের কাছে ভ্যাট জমা দেয়ার রসিদ দেখতে চান, তাহলে আমার মনে হয় না অধিকাংশ ব্যবসায়ী এটি দেখাতে পারবেন। তাই ভ্যাটের হার কমালে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যবসায়ীদের অত্যাচারও কমবে।

সম্পূরক শুল্কারোপের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

সম্পূরক শুল্কারোপের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিলাসবহুল পণ্য ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর এমন পণ্য ক্রয়কে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু আমরা যেকোনো জিনিসের ওপরই এটি প্রয়োগ করছি।

সরকার বছরের পর বছর যে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে, তাতে কি আদৌ কোনো লাভ হচ্ছে?

কালো টাকা কখনো সাদা হয় না। নৈতিকভাবেও এটা ঠিক নয়। যারা নিয়ম মেনে নির্ধারিত হারে আয়কর দিয়ে আসছেন, আপনি তাদের কী জবাব দেবেন? আমাদের বরং প্রশ্ন করতে হবে যে লোকেরা টাকা কালো করে কেন? একটা কারণ হলো, করহার বেশি হওয়ার কারণে তারা কর দিতে চান না। দ্বিতীয়ত, কর অফিসের হয়রানি এড়াতে অনেকেই কর দিতে অনাগ্রহী হয়ে থাকেন। তৃতীয়ত, আয়টা যদি বৈধ না হয়। এ তিনটি ছাড়া কিন্তু অন্য কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রথমে অবৈধ আয়ের রাস্তা বন্ধ করতে হবে। এরপর উচ্চহারের কারণে যদি লোকেরা কর দিতে অনাগ্রহী থাকে, তাহলে তা কমাতে হবে। শুল্ক ও কর কর্মকর্তারা যদি হয়রানি করেন, সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি আমাদের করদাতাবান্ধব কর ব্যবস্থা করা জরুরি।

আয়করসীমা এবারো আড়াই লাখ টাকা রাখা হয়েছে। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

ঢাকায় কেউ যদি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন, তাকেও ট্যাক্স দিতে হয়। কারণ তিনি আড়াই লাখ টাকা করসীমার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। ভারতের প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৯-২০-তে করসীমা ৫ লাখ রুপির প্রস্তাব করা হয়েছিল। বার্ষিক আয় ৫ লাখ রুপি হলে করছাড়ের পাশাপাশি ব্যক্তিকে আয়কর দিতে হবে না। সেক্ষেত্রে গ্রস ইনকাম সাড়ে ৬ লাখ হলেও অনেককেই আয়কর দিতে হবে না। প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ইন্স্যুরেন্সে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে তিনি করছাড় পাবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের করসীমা মাত্র আড়াই লাখ টাকা, যা কয়েক বছর ধরে একই রয়েছে। মূল্যস্ফীতির এ বাজারে যা কিনা গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের অনুকরণে বাংলাদেশেরও আয়করসীমা বাড়ানো উচিত। এক্ষেত্রে ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে। আমাদের অর্থনীতি, মানুষ, চরিত্রের সঙ্গে ওদের মিল রয়েছে।

সর্বশেষ কোনো মন্তব্য?

আমাদের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক হচ্ছে অপেক্ষাকৃত তরুণ জনবল। আমাদের সব অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে এদের নিয়ে আসতে হবে। যাতে ভূমধ্যসাগরে এদের আর কারো সলিলসমাধি না ঘটে। পাশাপাশি আমাদের দেশে বয়স্ক লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই বিপন্ন, বিশেষত বিধবা নারীরা। তাদের বাসস্থান, আহার, বস্ত্র ও চিকিৎসার জন্য বিশেষ করে ভাবতে হবে। অন্যথায় জনমিতি বোনাস (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) আমাদের জন্য জনমিতি অভিশাপ (ডেমোগ্রাফিক বেইন) হয়ে দাঁড়াতে পারে।  (দৈনিক বণিক বার্তা থেকে সংগৃৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ