‘বিদ্যমান মজুরি শ্রমিকদের পারিবারিক চাহিদা বিবেচনায় অপ্রতুল’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:৪৩

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। পেশাগতভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিস্ট। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ সম্পন্ন করে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। তার গবেষণা ও লেখালেখির মূল বিষয় বাণিজ্য ও শিল্পনীতি, বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল উন্নয়ন, শ্রম ও শিল্প সম্পর্ক, এসএমই উন্নয়ন, ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিদেশী বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সংযোগ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ হয়েছে তার অনেক গবেষণা প্রবন্ধ। এছাড়া সিপিডি থেকে প্রকাশিত কয়েকটি বইয়ের তিনি সহ-লেখক। সম্প্রতি পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ, সমস্যা, মজুরি কাঠামো, উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, শ্রমিকের উৎপাদনশীলতাসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জনপ্রিয় একটি দৈনিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

রানা প্লাজা ধসের পাঁচ বছর পার হলো। এর মধ্যে অনেক সংস্কার হলো, অনেক কারখানা বন্ধ হলো, মজুরিও বাড়ানো হলো। সব মিলিয়ে আমাদের পোশাক খাত কী অবস্থায় আছে বলে মনে করেন?

রানা প্লাজা ধসের পরবর্তী সময়কালে তৈরি পোশাক খাতের পরিবর্তনগুলো বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। এসব পরিবর্তনের সামাজিক দিক যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিক দিক। তবে এ সময়কালের সামাজিক দিকগুলোর পরিবর্তন যতটা দৃশ্যমান, অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলো ততটা দৃশ্যমান নয়। গত পাঁচ বছরে কারখানায় কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়; পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক সূচক যেমন শ্রমিকদের মজুরি ও তাদের কর্মসংস্থান, শ্রম আইন সংশোধন ও বিধিমালা প্রণয়ন, শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, শ্রম খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি উদ্যোগে কারখানা পরিদর্শন ও সংস্কার ইত্যাদি সম্পন্ন হয়েছে। আবার শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন বিশেষত কারখানায় শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শ্রমিক পার্টিসিপেশন কমিটি করে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে কমিটি পরিচালনায় অগ্রগতি হলেও ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। সিপিডি গবেষণায় পাওয়া গেছে, মাত্র ৩ শতাংশ কারখানায় বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সিপিডি পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে কারখানায় সামাজিক সূচকের মূল্যায়ন মানদণ্ডে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার মান গড়পড়তা পাওয়া গেল ১০০-এর মধ্যে ৮৮, যা খুবই ইতিবাচক। অথচ শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে কারখানার নম্বর পাওয়া গেল গড়ে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৯। এ দুইয়ের পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, সামাজিক সূচকের সব পর্যায়ে উন্নতি সমভাবে হয়নি এবং এসব ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

অর্থনৈতিক দিকের অগ্রগতি বলতে প্রযুক্তিগত, পণ্যগত ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়নের বিষয়গুলো বোঝানো হয়। গত পাঁচ বছরে কারখানা পর্যায়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, পণ্যমান উন্নয়ন, পণ্য বহুমুখীকরণ, কারখানার উদ্ভাবন ও গবেষণা এবং সম্মুখ ও পশ্চাৎ পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি তেমন একটা হতে দেখা যায়নি। সামগ্রিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে গড়ে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২১। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোয় ব্যাপকভিত্তিক কাজের সুযোগ রয়েছে, যা বিগত বছরগুলোয় তেমন হয়নি।

আগামী দিনের চাহিদা বিবেচনা করে সিপিডি জেন্ডারবিষয়ক ইস্যুগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। জেন্ডার বিষয়গুলোর মধ্যে কর্মসংস্থানে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ এবং উদ্যোগ, মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি, কর্মপরিবেশে নারীবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকা ও শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সিপিডির গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে জেন্ডার বিষয়ে মাঝারি মানের অগ্রগতি হয়েছে। সার্বিকভাবে জেন্ডার সূচকে অগ্রগতি হয়েছে গড়ে প্রায় ৫১।

মোট কথা, সামাজিক ও জেন্ডার অগ্রগতির কোনো কোনো দিকে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব দিকেই উন্নতি সাধনের জন্য ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

কর্মপরিবেশের সূচকগুলোয় আরো উন্নতি করতে করণীয় কী?

উত্তরটি উল্টো করে দিলে ভালো হয়। রানা প্লাজা ধসের আগে পোশাক খাতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোর অবস্থান খুব কাছাকাছি ছিল। অর্থাৎ দুটোরই অবস্থা ছিল দুর্বলতর। রানা প্লাজা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভিত্তিক ‘সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্ট’, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক উদ্যোগ এবং দেশীয় ‘ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় সামাজিক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়ার কারণে অগ্রগতি হয়েছে। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কারণে উদ্যোক্তারা যেমন বাধ্য হয়েছেন প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে, সরকারও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে উদ্যোক্তা, বায়ার, ব্র্যান্ড ও সরকারের আলাদা উদ্যোগের অভাবে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলো আগের মতো শ্লথগতিতে এগিয়েছে, কিন্তু সামাজিক উদ্যোগগুলোর দ্রুত অগ্রগতির কারণে উভয় ধরনের সূচকের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এর অর্থ হলো, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পর আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে অর্থনৈতিক সূচকগুলোয় অগ্রগতি লাভে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা।

সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নেয়া দরকার কারখানায় প্রযুক্তিগত মানোন্নয়নের জন্য। সিপিডি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ কারখানা উন্নত মানসম্পন্ন মেশিনারি ব্যবহার করে; অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানায় উন্নত মেশিনারি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট ছোট কারখানাগুলোয়। দুর্বল ও পুরনো মেশিনারি ব্যবহারের কারণে উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে ব্র্যান্ড/বায়াররা ভালো দামে ভালো মানের পণ্য বড় আকারে অর্ডার দিতে অনাগ্রহ দেখায়। অনেক কারখানারই একটির বেশি পণ্য তৈরির সামর্থ্য নেই। প্রায় ১৯ শতাংশ কারখানা রয়েছে, যারা সারা বছর মাত্র একটি পণ্য তৈরি করে। ফলে কারখানাগুলোর একাধিক পণ্য উৎপাদনের সামর্থ্য ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণে উদ্যোগী হতে হবে। কারখানাগুলোর নিজস্ব ফ্যাশন ডিজাইনিং সামর্থ্য, গবেষণা ও পণ্য উন্নয়ন সামর্থ্য এবং কাঁচামাল ব্যবহারের ভিন্নতার সামর্থ্য অর্জনে বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশ কারখানার এ ধরনের প্রক্রিয়াগত উন্নয়নের সামর্থ্য রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সামর্থ্য বাড়ানো গেলে উদ্যোক্তাদের পণ্য মার্জিন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন বাড়াতে সহায়ক হবে।

এটা সত্য, এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য সব কারখানার সমান সামর্থ্য নেই। নিজস্ব পুঁজি ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যাংকঋণ গ্রহণ না করে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা কষ্টকর। এক্ষেত্রে বড় কারখানাগুলো বৃহৎ গ্রাহক, ব্যাংক সম্পর্কের সুবাদে স্বল্প সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারে। কিন্তু ছোট কারখানাগুলোকে দুই অংকের ঘরে সুদ গুনতে হয়; আবার কখনো কখনো ঋণ পেতে সমস্যা হয়। এসব বিবেচনায় নিয়ে সরকার একটি ‘প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিলে’র আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংকের সহযোগিতায় স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে। ভারতে এ ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ ব্যবহার করে কারখানাগুলো প্রযুক্তিগত ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন ঘটাচ্ছে।

ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো পোশাকের মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ঝুঁকিতে থাকেন বিনিয়োগ করে পণ্যের দাম না পেলে ঋণ শোধ করতে পারবেন না। এ সংকট কীভাবে সমাধান করা যায়?

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজার সেভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছে না, বরং সংকুচিত হচ্ছে। এর বড় কারণ বৃহৎ বাজারের উন্নত দেশগুলোয় জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি এবং এ কারণে কর্মসংস্থানে শ্লথ প্রবৃদ্ধি। ভোক্তা হিসেবে এসব দেশের নাগরিকদের ব্যয় কমে আসাকে চলতি ভাষায় ভোক্তার ‘মানিব্যাগ কম খোলা’ বোঝায়। এ কারণে পণ্যের রিটেইলার বা বায়ারদের মূল্য কমিয়ে পণ্য বিক্রির চেষ্টা করতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রকারান্তরে উৎপাদক পর্যায়ে কম মূল্যে ও স্বল্প পরিমাণে অর্ডার দেয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়া এসবের লক্ষণ। প্রকৃতপক্ষে পণ্যের দাম কমে যাওয়ার এ প্রবণতা বাংলাদেশকেন্দ্রিক নয়, বরং অন্যান্য রফতানিকারক দেশেও কমবেশি এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এর সঙ্গে অন্যান্য ঝুঁকিও যুক্ত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি ও বাজার সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি চীন থেকে পণ্যের অর্ডার অন্যান্য দেশে সরে যাচ্ছে। অবশ্য চীন তার ‘নতুন বাস্তবতা’ নীতির আওতায় স্বল্প মূল্যের ও পরিবেশ দূষণক্ষম পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহ করছে এবং এসব পণ্যের উৎপাদন অন্যান্য দেশে সরিয়ে নিতে পরামর্শ দিচ্ছে। এর সুবিধা নিয়ে ভিয়েতনাম পণ্যের অর্ডার ও চীনের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশে বিনিয়োগ অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকার জন্য এসব পণ্যের প্রস্তুতকারক চীনা বিনিয়োগকারীরা হতাশ হচ্ছেন এবং উৎপাদন সেভাবে বাড়ছে না।

দেশীয় উদ্যোক্তারা কম মুনাফা করছেন। তবে উচ্চমুনাফা লাভকারী থেকে মধ্যম মানের মুনাফা লাভকারী উদ্যোক্তাও কম নন, যারা নতুন বিনিয়োগ করে তাদের ব্যবসা বাড়াচ্ছেন। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৬ শতাংশ কারখানা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে। এসব কারখানা আকারে বড় এবং উন্নত উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করছে। এর অর্থ হলো, ব্যবসায়ীদের সবার পরিস্থিতি এক রকম না হলেও অধিকাংশ উদ্যোক্তা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমানে মুনাফা ও অর্ডার কমে যাওয়ার অর্থ হলো, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের রিটার্নের সময়কাল কিছুটা বেড়ে যাওয়া। পণ্যমূল্য কমে যাওয়া, সামাজিক খাতে বাড়তি বিনিয়োগ, শ্রমিকদের মজুরিজনিত ব্যয় বৃদ্ধি, বিভিন্ন অবকাঠামো সুবিধার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ ব্যাংক সুদের হার, জমির উচ্চমূল্য ইত্যাদি কারণে রিটার্নের সময়কাল বেড়েছে। তবে এসব ব্যয় ও বিনিয়োগ সঠিকভাবে করলে ক্রেতার ক্রয়াদেশ নিয়ে দুর্ভাবনা থাকার কথা নয়; বরং ধীরে ধীরে উদ্যোক্তার পক্ষে এসব বিনিয়োগকে ভিত্তি করে মধ্যম মূল্যের পণ্যের অর্ডার বাড়ানো সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের বিনিয়োগের ঝুঁকি কম।

পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। কারখানায় ফ্লোরপর্যায়, মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ে ব্যবস্থাপনায় যথাযথভাবে শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যবস্থাপক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, ন্যূনতম প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যবস্থাপনা সূচক বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলার নিয়ম চালু করা যেতে পারে।

শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একাধিক নতুন মেশিন চালানোর জন্য শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। বিশেষত নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের গুণমান বাড়ানো দরকার। শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ মানদণ্ড নির্ধারণ করে তা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা চালু করা যেতে পারে।

উচ্চমূল্যের পণ্যে কীভাবে যাওয়া যায়?

স্বল্পমূল্য থেকে মধ্যম বা উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে উত্তরণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে যেমন প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি দরকার, তেমনি যথাযথ বিনিয়োগ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড/বায়ারদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক স্থাপন, কারখানার কমপ্লায়েন্স উন্নত করা এবং তা বজায় রাখা, ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমিকদের সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদনের দক্ষতা অর্জন ও শ্রমিকসংক্রান্ত সুবিধা সৃষ্টি এসবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কারখানাগুলোকে কৌশলগতভাবে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বল্প, মাঝারি ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের মধ্যে এমনভাবে ভারসাম্য করতে হবে, যাতে সারা বছর কাজ অব্যাহত রাখা যায়।

বাংলাদেশে উচ্চমূল্যের পণ্য কাঠামোয় উত্তরণের ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা দরকার। আশার কথা, তৈরি পোশাক খাতে বিদেশী বিনিয়োগ ইপিজেডের বাইরে করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ ধরনের বিদেশী বিনিয়োগকে বিশেষভাবে উৎসাহ দেয়া যেতে পারে, তুলা ছাড়া অন্যান্য কাঁচামালে উৎপাদিত পোশাক তৈরিতে  (যেমন সিনথেটিক, পলিয়েস্টার ইত্যাদি কাপড়ের পোশাক) যেখানে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও দক্ষতার সামর্থ্য সীমিত। এ ধরনের বিদেশী বিনিয়োগ নতুন পণ্য, বায়ার, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের আরো বেশি পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। ভবিষ্যতে যা দেশীয় উদ্যোক্তাদের সেসব পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করবে।

দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিদেশী উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটা ভয় কাজ করে— তাদের উৎপাদিত পণ্যবাজারে বিদেশীদের বিনিয়োগ করা, কমপ্লায়েন্স উন্নত করার বাড়তি চাপ, মজুরি সমন্বয়ের চাপ ইত্যাদি। তবে উদ্যোক্তাদের ভয় কাটিয়ে তাদের পণ্য সুবিধা অব্যাহত রেখেও বিদেশীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যায়। মোট কথা, বাংলাদেশে দ্রুততর সময়ে তৈরি পোশাক খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের আরো বেশি সংমিশ্রণ দরকার উচ্চ ও মধ্যম মানের পণ্যবাজারে অংশ বাড়ানোর জন্য।

ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক খাতে এত দ্রুত কীভাবে এগিয়ে গেল? দেশটির ভালো করার কারণগুলো কী?

বাংলাদেশ তার প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে সবসময়ই বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এটা একদিকে যেমন তার জন্য সুবিধার, অন্যদিকে তা সীমাবদ্ধতাও সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে পোশাক খাত দেশীয় উদ্যোক্তানির্ভর। এ দেশে মাত্র ৫ শতাংশের নিচে বিদেশী বিনিয়োগ রয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা মিয়ানমার বিদেশী উদ্যোক্তানির্ভর, মূলত চীন ও হংকংয়ের বিনিয়োগকারীরা এসব দেশে বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগকারী বহুজাতিক বিনিয়োগ উদ্যোগের অংশ হওয়ার কারণে তাদের বাজার নেটওয়ার্ক ভালো; অর্ডার ও বহুমুখী পণ্যের উৎপাদনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন। সাম্প্রতিককালে চীন থেকে অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার সুবিধাও এসব দেশ পাচ্ছে। আবার বাংলাদেশের চেয়ে কমপ্লায়েন্সের ব্র্যান্ডিংয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার কারণে এসব দেশ পণ্যমূল্যও বেশি পেত। অবশ্য রানা প্লাজা পরবর্তীকালে কমপ্লায়েন্সের উন্নতি করার মাধ্যমে এসব দেশের সঙ্গে কর্মপরিবেশের পার্থক্য ঘোচাতে পারলেও পণ্যমূল্যের পার্থক্য বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা সেভাবে কমাতে পারেননি।

ভিয়েতনাম সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা করছে। এটা বাস্তবায়ন হলে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য, বিশেষত তৈরি পোশাকের মতো পণ্য রফতানির সুযোগ পাবে; যা বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের পণ্যকে বাড়তি চাপে পড়তে হবে। পাশাপাশি ভিয়েতনাম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্য ১০টি দেশের সঙ্গে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিটিপি) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তির অংশ না হলেও অন্যান্য সদস্য দেশের বড় বাজারে বাংলাদেশকে বাড়তি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে। সেদিক থেকে আগামীতে এ খাতে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়বে বৈ কমবে না।

চীন বা ভিয়েতনামের শ্রমিকদের উচ্চ উৎপাদনশীলতা তাদের জন্য বড় সহায়ক শক্তি। বাংলাদেশ উৎপাদনশীলতার বিচারে ভিয়েতনাম বা চীনের চেয়ে বেশ পিছিয়ে। উচ্চ উৎপাদনশীলতার কারণে ভিয়েতনাম বা চীন তাদের শ্রমিকদের উচ্চমজুরি দিতে পারে সহজভাবে। তবে উৎপাদনশীলতা ও মজুরি পার্থক্য বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে শ্রমিকদের চীন বা ভিয়েতনামের শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম মজুরি দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভিয়েতনামের দক্ষ শ্রমশক্তি, বিদেশী উদ্যোক্তা, ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার জন্য পণ্য কাঠামো অনেক বহুমুখী; যা তাদের স্বল্প, মধ্য ও উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা দিয়েছে।

আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী আছে?

২০১৩ সালের শেষে উদ্যোক্তা ও সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা হয়েছিল, ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার পোশাক রফতানি করা হবে। তখন তা লক্ষ্য হিসেবে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ছিল। সরকার অনেকটা বিক্ষিপ্তভাবে উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে প্রতি বছর বাজেটে রাজস্ব ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে গেছে। কিন্তু কৌশলগতভাবে এ খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে উদ্যোগ নেয়া দরকার, তার সুস্পষ্ট ঘাটতি ছিল। তবে বিগত বছরগুলোর কমপ্লায়েন্সকেন্দ্রিক কাজ এগিয়ে গেলেও এসব কাজকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগে ঘাটতি ছিল। বস্তুত এখনো তা রয়েছে।

বাংলাদেশে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম বলে অভিযোগ করেন উদ্যোক্তারা। এ উৎপাদনশীলতায় সর্বাধুনিক মেশিনারিজ আনা হলে সুফল মিলবে বলে আশা করা যায়?

বাংলাদেশী শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাকে অনেক খাটো করে দেখা হয়। প্রায়ই বলতে শোনা যায়, এখানে শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা ভিয়েতনাম বা চীনের শ্রমিকদের চেয়ে অর্ধেক। কথাটা সঠিক নয়। সিপিডির গবেষণায় শ্রমিকদের এককপ্রতি দক্ষতা পাওয়া গেছে ৫৮ শতাংশ। তবে উৎপাদনশীলতায় ভিয়েতনাম বা চীনে এ হার ৭০-৮০ শতাংশের মতো। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতায় ঘাটতি রয়েছে। তবে ঘাটতি এত প্রকট নয়। অব্যাহতভাবে শ্রমিকদের জন্য কারখানা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, উন্নত মেশিন ব্যবহার, শ্রমিকদের গড়পড়তা শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি, অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ শ্রমিকদের দীর্ঘকালীন কর্মযোগ ইত্যাদি উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তাদের কারখানায় প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই মেশিনের ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যের মেশিন থেকে উচ্চমূল্যের মেশিনে দক্ষতার পার্থক্য থাকে। পুরনো মেশিনের সঙ্গে নতুন মেশিনের পার্থক্য হয় এর নতুন আধুনিক ফিচারের কারণে, যা দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন ট্রাফিক লাইট সিস্টেম, এসএমভি, স্বয়ংক্রিয় লকস্টিচ মেশিন ব্যবহার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শ্রমিকদের নতুন নতুন মেশিন ব্যবহারে প্রশিক্ষিত করা গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত বিভাগ যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, অনলাইন মার্কেটিং বিভাগ খোলা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দক্ষ লোকবল নিয়োগ ফ্লোর লেভেল থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পশিক্ষিত, বিশেষ জ্ঞানের অভাবসম্পন্ন ও স্বল্প প্রশিক্ষিত জ্ঞানসম্পন্ন লোকবল বাদ দিয়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনার লোকবল নিয়োগে গুরুত্ব দেয়া দরকার। পণ্য কাঠামোয় পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে উচ্চ ও মধ্যম মানের পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, যেহেতু শ্রমিকদের দক্ষতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এতে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। মনে রাখা দরকার, কারখানা পর্যায়ের নিম্ন দক্ষতার জন্য অনেক কারণ দায়ী। এজন্য শুধু শ্রমিককে দায়ী করা যথাযথ নয়।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিদ্যমান মজুরিকে কীভাবে দেখেন?

বাংলাদেশে শ্রমিকদের বিদ্যমান মজুরি তাদের পারিবারিক চাহিদা বিবেচনায় নিলে এখনো অপ্রতুল। তবে ইতিবাচক যে, গত এক দশকে মজুরির ঊর্ধ্ব সমন্বয়ের ফলে চাহিদা ও প্রাপ্তির পার্থক্য কিছুটা কমে এসেছে। সিপিডির গবেষণায় পাওয়া গেছে, ১২ শতাংশ শ্রমিক ফ্লোরে ঘুমান, ১৭ শতাংশ শ্রমিকের ঘরে রাতে ঘুমানোর জন্য সিলিং ফ্যান নেই, ৮৩ শতাংশ শ্রমিক অন্যদের সঙ্গে টয়লেট শেয়ার করেন এবং ৮৪ শতাংশ শ্রমিক অন্যদের সঙ্গে রান্নার জায়গা শেয়ার করেন। এ থেকে বোঝা যায়, মজুরি সমন্বয়ের পরও শ্রমিকের জন্য যা দরকার, তার ন্যূনতমটুকু এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে মজুরিসংক্রান্ত আলোচনায় যেসব সূচক বিবেচনা করার কথা, তার ভিত্তিতে আলোচনা খুব সীমিতভাবেই হয়ে থাকে। প্রযোজ্য ১০টি সূচকের মধ্যে মাত্র তিনটি সূচকের তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত হয়। বাকি সূচকগুলোর তথ্য সম্পর্কে একেক পক্ষ একেকভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে এবং এগুলোর সত্যাসত্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে সূচক নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত থাকা দরকার, যা পাওয়া যায় না। উপরন্তু, ত্রিপক্ষীয় মজুরি নির্ধারণ কাঠামো এখনো বহুলাংশে কার্যকর নয়। ফলে ন্যূনতম মজুরির আলোচনা অনেকটাই সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আশার কথা, রাজনৈতিকভাবে শ্রমিকদের ব্যাপারে সংবেদনশীলতা থাকার কারণে আগের দশকগুলোর তুলনায় বর্তমান দশকে মজুরি সমন্বয় থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। যদিও তা কাঠামোগতভাবে সুসংঘবদ্ধ নয়।  (দৈনিক বণিক বার্তা সংগৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ