‘ব্যাংকিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গভর্ন্যান্স’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:৫৫

ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পিএইচডি অর্জন করেছেন হিমাচল প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়, সিমলা, ভারত থেকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) একটি গবেষণা প্রকল্পে জুনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৮১ সালে বিআইবিএমে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯৭ সালে অধ্যাপক হন। আইএমএফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, টরন্টো সেন্টার কানাডা; কলেজ অব এগ্রিকালচার ব্যাংকিং অব আরবিআই; স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, থাইল্যান্ড থেকে বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। দেশী-বিদেশী জার্নালে তার ৫০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং পরিস্থিতি, ঋণখেলাপি, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ, বৈষম্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন একটি জনপ্রিয় দৈনিকের সঙ্গে। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

নিয়মিতভাবে ব্যাংকিং সম্মেলন আয়োজনের উদ্দেশ্য কী?

আমরা একাডেমিশিয়ান বা গবেষকরা কাজ করে যাচ্ছি, কিন্তু প্রচার নেই। আবার যারা এ কাজগুলো ব্যবহার করবেন, তারাও এগুলো সম্পর্কে জানতে পারছেন না, এটা তো হয় না। আমাদের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা বৃহত্তর প্লাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে আমরা যা যা কাজকর্ম করলাম তা উপস্থাপন করা, প্র্যাকটিশনারদের জানানো। এছাড়া অন্যান্য একাডেমিশিয়ান বা গবেষক, যাদের এ ধরনের কাজ করার সুযোগ কম, তাদের সুযোগ দেয়া। গবেষণা সবার সঙ্গে শেয়ার করা, অন্যদের মতামত জানা, বিভিন্ন কারেন্ট ইস্যু নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা— এটাই আমাদের সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। প্রতি বছরই এ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

সম্মেলনের কী ধরনের প্রভাব পড়ে?

একাডেমিশিয়ান ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে বিরাট একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। আমাদের সিস্টেমে একাডেমিশিয়ান ও ইন্ডাস্ট্রি সবসময় বিচ্ছিন্ন থাকে। এ সম্মেলনের মাধ্যমে ইন্টিগ্রেশন ঘটছে। এটির প্রতি সবার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন কবে হবে তা জানতে সারা বছরই প্রশ্ন পেয়ে থাকি। সবাই জানতে চান, সম্মেলন কবে আয়োজন করবেন? যাতে তারা আসতে পারেন। যেহেতু নীতিনির্ধারকরা এ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হন, বিভিন্ন সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে তারা উপস্থিত থাকেন, আমাদের ডকুমেন্টগুলো পান, আমাদের মতামত জানতে পারেন। এগুলো তাদের নীতি তৈরিতে সচেতন করে এবং সঠিক নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাহায্য করে। অবশ্য এবারের সম্মেলনের জন্য কোনো স্লোগান বা থিম রাখা হয়নি। তবে এবার সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হবে।

বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা নিয়ে আপনার মত...

ব্যাংকিং খাতে শুধু নেতিবাচক দিক আছে এমন নয়, এ খাতের অনেকগুলো অর্জনও রয়েছে। গ্লোবাল টার্গেট থেকে যদি শুরু করা যায় যেমন— এসডিজি; এখন প্রশ্ন, এসডিজির কনটেক্সটে আমাদের ব্যাংকিং খাত কতটুকু প্রস্তুত? এসডিজির কোন কোন লক্ষ্যের সঙ্গে ব্যাংকিং খাত যুক্ত? দেখতে হবে আমাদের অর্জন কতটুকু? আমরা আরো কী করতে পারি? এগুলো নিয়ে ব্যাংকিং খাতের যেমন অর্জন রয়েছে, একই সঙ্গে এ খাতের বিস্তৃতি ঘটেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো অর্জন রয়েছে। আমরা আসলে সব তুলে ধরতে চাই। নেতিবাচক দিকগুলো তো আমরা বহুদিন ধরে তুলে ধরেছি, কারণ ইতিবাচক দিকগুলো ধরে রাখা যাবে না যদি নেতিবাচক দিকগুলো আয়ত্তে আনার চেষ্টা না করি। সেগুলো নিয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা করেছি, করব। ভারতে ব্যাংকিং খাতে যে সমস্যা চলছে, সেখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে তাহলে একটি দেশের ব্যাংকিং খাতের কী দুরবস্থা হয়, সেখান থেকেও শিক্ষা নেয়ার মতো যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। বহুদিন ধরে আমরা বলে আসছি বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে শাসন পদ্ধতি বা গভর্ন্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপর যদি ব্যাংক মালিকরা হস্তক্ষেপ করেন, সরকার যদি হস্তক্ষেপ করে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, যারা মাঠে নামতে পারে। তারা তো তাদের ঘরে বসেই কাজকর্ম করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাইরে থেকে অন্য স্টেকহোল্ডারদের সাপোর্ট দেয়া উচিত। ব্যাংকিং সিস্টেম চালাতে গেলে খুব শক্তিশালী একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দরকার হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে প্রিন্সিপালের ওপর পরিচালিত হয়, তাকে আমরা বলি বিআইএস প্রিন্সিপাল। প্রায় ২৭টি প্রিন্সিপাল রয়েছে। প্রতিটি প্রিন্সিপালের কনটেক্সটে আমাদের অর্জন ভালো। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাঠামোগতভাবে খুব দুর্বল নয় বা লিগ্যাল সিস্টেমও দুর্বল নয়। আমাদের যেখানে দুর্বলতা তা হলো, আমরা আইন ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারি না। সেজন্য বাইরে থেকে মানুষের মনে হয় যে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল বা তাদের যে শক্তিশালী ভিত্তি থাকার কথা, তা হয়তো নেই। এগুলোকে ঠিকমতো কাজ করতে দেয়া উচিত কিংবা এগুলোর ঠিক বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।

ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ঋণখেলাপি। খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংক আজ পর্যুদস্ত...

আমাদের দেশে ঋণখেলাপি সমস্যা বলেন কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের সমস্যা, এগুলোর সবকিছুর গোড়ায় রয়েছে সুশাসনের সমস্যা। ভারতের অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণখেলাপি পরিস্থিতি খুব খারাপ। তবে সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে তো পিএনবির মতো ঘটনা ঘটেনি। সেক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী করছে? প্রতিটা ব্যাংককে তাদের সঙ্গে নতুন করে এমইউ করতে হচ্ছে, ব্যাংকগুলোকে ঋণের টার্গেট দিয়ে দেয়া হচ্ছে, নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে তারা কতটুকু ঋণ দিতে পারবে। তবে ঋণখেলাপি ব্যাংকের একটি সাধারণ সমস্যা। এ সমস্যা ট্যাকেল করাটাই বড় কথা। ট্যাকেল করার জন্য প্রয়োজন পড়বে শক্তিশালী একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এখন কোনো ব্যাংক যদি ঋণখেলাপির সুযোগ করে দেয় কিংবা কোনো ব্যাংকে যদি স্ক্যাম হয়, সেটা যদি উদ্ঘাটন ও সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহত করা যায় এবং এজন্য দায়ীদের যথাযথ শাস্তি দেয়া যায়, তবে এটি ট্যাকেল করা যায়। কিন্তু এসব পদক্ষেপ না নিতে পারলে ঋণখেলাপির ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে। সেজন্য বলি, আমাদের দেশে সব সমস্যার মূলে হচ্ছে সুশাসনের সমস্যা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভিশন যতই শক্তিশালী করুন না কেন, এটা কোনো দিনই কাজে আসবে না, যদি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থা উন্নত না করা হয়। ব্যাংকগুলোর এখন ব্রাঞ্চের সংখ্যা কত? প্রায় ১০ হাজার। ১০ হাজার ব্রাঞ্চে কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোক বসিয়ে রাখা যাবে? এটা কি সম্ভব? সুতরাং অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থা যদি শক্তিশালী না করা হয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভিশন যতই শক্তিশালী করা হোক না কেন, এটি কার্যকর হবে না। সুতরাং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভিশন শক্তিশালী করতে হবে, তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থা তার থেকেও বেশি শক্তিশালী করতে হবে। এটা ছাড়া শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা পাওয়া যাবে না।

নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিতে হচ্ছে। এত বেশি ব্যাংক কি আমাদের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন রয়েছে? 

বিষয়টি নিয়ে আগেও বহুবার কথা হয়েছে। সবচেয়ে উপরে রাজনীতি। অর্থনীতি রাজনীতির উপরে নয়। তবে রাজনৈতিক চাপ থাকবেই। কিন্তু সেটাকে অর্থনৈতিকভাবেও মোকাবেলা করার ব্যবস্থা রয়েছে। আসলে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিরোধী নই। আমাদের দেশে যেটি নেই তা হলো, ব্যাংকগুলোর জন্য একটি ‘এক্সিট পলিসি’। এটা ঠিকমতো করা হয়নি। ব্যাংকের লাইসেন্স চাইছে, দেয়া হলো, তবে সঙ্গে এও জানিয়ে দেয়া হলো যে ওই ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের নয়। ব্যাংক যদি বেঁচে থাকতে না পারে, তবে অবশ্যই মাঠ ত্যাগ করতে হবে। এক্সিট পলিসি থাকলে দেখা যেত কয়টা নতুন ব্যাংক আসে। আসত না। এভাবে আসা বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা শুধু রাজনীতিকেই দোষারোপ করি। কিন্তু রাজনীতিবিদরা তো চাপ দেবেনই, তারা তো আমাদের বিষয় বুঝবেন না। আমরাও একটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ইনস্টিটিউশনগুলোর উন্নতি করতে পারি, নিয়মকানুনগুলো যথাযথ করতে পারি। আরো ব্যাংক আসুক, তাতে কোনো সমস্যা নেই, আমাদের যদি এক্সিট পলিসি থাকে। ছোট অর্থনীতি হোক কিংবা বড়, রাজনীতিবিদরা রাজনীতির খেলা খেলবেনই। কিন্তু আমাদের পলিসি মেকার, অর্থনীতিবিদদের হাতেও এ ধরনের খেলাকে ফেস করার মতো টুলস থাকতে হবে। একের পর এক নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে কিন্তু নতুন সোর্স অব ফান্ড তৈরি করা হচ্ছে কি? হচ্ছে না। নতুন ব্যাংকগুলো তো পুরনো ডিপোজিটরদেরই টানাটানি করবে। যদি নতুন ডিপোজিটর, নতুন প্রডাক্ট দিতে না পারে, মার্কেটকে নতুন করে সম্প্রসারণ করতে না পারে, তাহলে কেন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে? নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার আগে এসব শর্ত থাকতে হবে। নতুন ব্যাংক আসতে পারে, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ফ্রি মার্কেট ইকোনমিতে আপনি যদি টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনে কোয়ালিফাই করেন, আমি আপনাকে অবশ্যই লাইসেন্স দেব। কিন্তু আপনাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার নয়। এজন্য আমাদের দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি মনে হয়। আমাদের ‘এন্ট্রি পলিসি’ রয়েছে। এর সঙ্গে যদি ‘এক্সিট পলিসিও’ থাকত তাহলে বাজারই ঠিক করে দিত এতগুলো ব্যাংকের মধ্যে কয়টা টিকে থাকবে। অর্থমন্ত্রী এও বলছেন, আগামী কয়েক বছরে ব্যাংকের মধ্যে মার্জার শুরু হয়ে যাবে। হ্যাঁ, মার্জার একটি অন্যতম এক্সিট পলিসি। এ ধরনের পিস পলিসি নয়, ‘কমপ্লিট এক্সিট পলিসি’ থাকতে হবে। মার্জার হবে কিন্তু দুটো অলাভজনক ব্যাংকের মার্জার করে কি কোনো লাভ হবে? বা একটি মুনাফাকারী ব্যাংক কি ইচ্ছা করলেই মার্জারে যাবে? মুনাফাকারী ব্যাংক কেন অলাভজনক ব্যাংকের সঙ্গে মার্জার করবে? সুতরাং শুধু মার্জারের কথা কেন বলা হচ্ছে? ব্যাংককে চলেও যেতে হতে পারে। আর এমনটা হলে ডিপোজিটররা যাতে ভয় না পান, সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। এজন্য আমাদের একটি ‘কম্প্রেহেনসিভ এক্সিট পলিসির’ ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবেই দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।

সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর কথা থাকলেও কিছু ব্যাংক ছাড়া বেশির ভাগ ব্যাংকই তা বাস্তবায়ন করেনি...

বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক চাপিয়ে দেয়নি, ব্যাংক মালিকরাই চাপিয়ে দিয়েছেন। যারা ব্যাংকিং নিয়ে কাজকর্ম করেন না, তারাও স্বীকার করবেন যে নয়ছয়ের ব্যবধানের মধ্যে কাজ করা সম্ভব নয়। ৬ শতাংশ সুদে আপনি ডিপোজিট নেবেন, এ হারে নিলে কি ডিপোজিটররা আকর্ষিত হবেন? যেখানে মূল্যস্ফীতিই হচ্ছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ৯ শতাংশ হারে আপনি ল্যান্ডিং করবেন, এ ৩ পারসেন্টের স্প্রেডে কি আপনি ল্যান্ডিং করতে পারেন? কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাইপাস করে চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি কিন্তু অনৈতিক। ব্যাংকগুলো যে অনুসরণ করতে পারছে না, সেটাকে আমি অনৈতিক বলছি না; বরং যেভাবে ব্যাপারটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, সেটা অনৈতিক। এ ধরনের অনৈতিক কাজ করা ঠিক নয়। এটিই আসলে আমাদের ইনস্টিটিউশনকে নষ্ট করে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাইপাস করে এটি চাপিয়ে দেয়া হলো, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দরকার কী?

অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কী পড়ে?

অবশ্যই অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ে। অনেক ডিপোজিটর ডিপোজিট তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করছেন। কেউ রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করছেন, কেউবা অন্যখানে। ব্যাংকাররাও এখন নতুন করে ঋণ দেয়ার মতো টাকা পাচ্ছেন না। কারণ ব্যাংকাররা জানেন, তারা যদি ৯ শতাংশ হারে ঋণ দেন তাহলে কস্টটাই কাভার করবে না। সেজন্য ঋণ দেয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আবার ডিপোজিটররাও আসছেন না। ডিপোজিটররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে?

একটা সুযোগ এখন মিস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের যে ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি ছিল, এটার সঙ্গে যদি ব্যাংকিং সিস্টেমকে কাজে লাগানো যেত ঠিকমতো, তাহলে কিন্তু ২০৩১ বা ২০৪১ বা এসডিজির যে টার্গেট, তা সহজেই পূরণ করা যেত। সুতরাং এই যে ভুলটা আমরা করছি, তা ঠিক হচ্ছে না। ঐতিহাসিকভাবে এজন্য সবাইকে দায়ী থাকতে হবে। এখনই তো সময় আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত করার। কারণ আমাদের বিনিয়োগ এখন বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে যেমন ডিপোজিট বাড়াতে হবে, তেমনি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইনস্টিটিউশনগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে, যা চাইবে তাকে তা দিতে হবে। বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থনীতির অবস্থা খারাপ বলব না। এটাই আমাদের কাছে আশ্চর্যের বিষয়। এখন পর্যন্ত শুধু পাবলিক সেক্টরের কন্ট্রিবিউশনের জন্য আমাদের ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি বজায় রয়েছে। ব্যাংকিং সিস্টেম যদি এর সঙ্গে একটু হাত মেলাতে পারে তাহলে নিশ্চিতভাবে আমাদের উন্নতি অনেক অনেক বেশি হবে।

মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে চ্যালেঞ্জ?

আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, দেশের মধ্যে ইনসেনটিভ সিস্টেমগুলোকে ডেভেলপ করতে হবে, ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটির জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমরা যে লোয়ার মিডল ইনকাম দেশ হয়েছি, এখন কিন্তু এ চ্যালেঞ্জগুলো আসবে। চ্যালেঞ্জ থাকবেই। সবসময় চ্যালেঞ্জ থাকে। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার মতো যথাযথ নীতি ও মানসিকতা সবার থাকতে হবে। তবেই এ চ্যালেঞ্জকে চ্যালেঞ্জ বলে মনে হবে না আমাদের কাছে।

বিশ্বব্যাংক পরিচালিত ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ বা সহজে ব্যবসা করার সূচকে আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের চেয়েও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ...

এটি খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়। এর ফলে প্রভাব পড়বে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগে। ওরা তো এ কয়েকটা ইন্ডিকেটরই খোঁজে। বিদেশীদের যে ধরনের সুবিধা দেয়ার কথা, আমাদের দেশে তা কিন্তু খারাপ নয়। কিন্তু বিনিয়োগ করার পরিবেশটাই যদি না থাকে, তবে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবেন না। আমাদের বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়াতে হবে। এজন্য কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমাতে হবে। বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন আমাদের জন্য খুব একটা ভালো বার্তা নিয়ে আসেনি।

দেশে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে কোন দিকগুলোয় লক্ষ রাখতে হবে?

বৈষম্যহীন অবস্থা তো আনা যাবে না, চাওয়া হলো বৈষম্য কমিয়ে আনা। বৈষম্য কমাতে হলে ‘গ্রোথ উইথ ইকুইটি’ পলিসি হওয়া উচিত। যাতে প্রবৃদ্ধির বেনিফিট সবাই ঠিকমতো পায়। বিনিয়োগ আপনাকে এমনভাবে করতে হবে, যাতে তার সুবিধার বণ্টন ভালোমতো হয়। সরকারের যেসব স্কিম রয়েছে, তার মধ্যমে সুবিধার বণ্টন হচ্ছে। বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হবে ট্যাক্স আইন ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। ধনী লোকেরা তো আসলে ঠিকমতো কর দেয় না। তারা সাংঘাতিকভাবে কর ফাঁকি দেয়। এদের কাছ থেকে যদি ঠিকমতো কর আদায় করা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে এটা বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য বড় একটি হাতিয়ার হবে। ধনীদের যেসব ইনসেনটিভ দেয়া হয়, তা কমাতে হবে। তবে ইনসেনটিভ কমাতে গিয়ে আবার প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব যেন না পড়ে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ট্যাক্স, ইনসেনটিভ এগুলোয় আপনাকে হাত দিতে হবে। এনবিআরকে আরো সক্রিয় হতে হবে। ধনীদের কাছ থেকে আমরা প্রচুর করবঞ্চিত হচ্ছি। আয় বাড়লে কর বাড়বে, যেটাকে আমরা বলি ‘প্রগ্রেসিভ ট্যাক্স’, তা বাস্তবায়ন করা উচিত। সঙ্গে ওয়েলথ ট্যাক্স, ডিরেক্ট ট্যাক্সও বাড়ানো উচিত। প্রায়ই এগুলো নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হয়। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। (দৈনিক বণিক বার্তা থেকে সংগৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ