‘মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০১৮, ১১:৪৫

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেছেন। এর পর যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে অর্থনীতির ওপর পিএইচডি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতি বিজ্ঞানেও পিএইচডি শেষ করেন। দীর্ঘ চার দশক ধরে উন্নয়ন চিন্তাবিদ ও উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও অনারারি রেক্টর। এ ছাড়া পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত। তিনি বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি। কাজ করেছেন বিআইডিএসের রিসার্চ ডিরেক্টর হিসেবে। ২০০৯ সালে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য তিনি একুশে পদক পেয়েছেন। তিনি একটি জনপ্রিয় দৈনিককে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

আপনার কাছ থেকে দরিদ্র ও বৈষম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে জানতে চাই-

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের অনুপাত অনেক কমেছে, তবে সংখ্যার হিসাবে দেখা যায় এখনো প্রায় চার কোটি মানুষ দরিদ্র। এর মধ্যে দুই কোটি অতিদরিদ্র। পৃথিবীতে অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে মোট জনসংখ্যাই দুই কোটি না। তাই আমাদের সার্বিক প্রচুর অর্জন সত্ত্বেও অনেক কাজ এখনো বাকি। দারিদ্র্য নির্মূল করতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কারণ এটাই বলে আমি মনে করি।

অতিদরিদ্রদের মধ্যে এমন অনেক জনগোষ্ঠী আছে, যাদের কাছে উন্নয়ন পৌঁছায়নি বললেই চলে। এদের মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধী, দলিত শ্রেণী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী, রয়েছে হাওড়-বাঁওড় ও চরাঞ্চলের মানুষ, উপকূল ও দীপাঞ্চলের দরিদ্র বাসিন্দা, নারী কৃষি শ্রমিক, চা শ্রমিক, ভিক্ষুক ও হিজড়া। এ ধরনের ১৬টি গোষ্ঠী আমরা চিহ্নিত করেছি। এ গোষ্ঠীগুলোর কাছে উন্নয়ন তেমন না পৌঁছানোর ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের হারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খানিকটা কমে গেছে। তবে আমি মনে করি, এটা এ পর্যায়ে অস্বাভাবিক নয়। কারণ যেসব দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্যের বাস্তবতা অপেক্ষাকৃত সম্ভাবনাময়, তাদের দারিদ্র্য অপেক্ষাকৃত দ্রুত হ্রাস করা সম্ভব। আর যারা দারিদ্র্যের কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ, তাদের দারিদ্র্য হ্রাস অনেক কঠিন কাজ; কেননা এক্ষেত্রে গোষ্ঠীভিত্তিক বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এ বিষয়ে সরকারের সচেতনতা আছে, আছে কিছু পদক্ষেপও। বিদ্যমান এমন একটি পদক্ষেপ হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। এর আওতায় অনেক প্রকল্প রয়েছে। এ বছর বাজেটে হিজড়া ও অন্যান্য অতিদরিদ্র গোষ্ঠীর ছেলেমেয়ের জন্য উপবৃত্তি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সন্তানরা স্কুলে ধারাবাহিক হতে পারবে। সাধারণ নিরাপত্তাবেষ্টনী সাময়িক ব্যবস্থা। যে সময় দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে যায়, তখন কিছু কাজের কিছু সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের সুরক্ষা দেয়া হয়। আবার অনেকগুলো ভাতা সারা বছর ধরে দেয়া হয়। কিন্তু এসব কার্যক্রমের ফলে অধিকাংশ সংশ্লিষ্ট দরিদ্র মানুষের অবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন হয় না, হওয়ার কথাও নয়। যদি দারিদ্র্য নির্মূলের দিকে অগ্রসর হতে হয়, তাহলে ওই গোষ্ঠীগুলোর দারিদ্র্যের বেড়াজালের বাস্তবতা ভাঙার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব গোষ্ঠীর সব বাস্তবতা এক নয়। বাস্তবতা ভিন্ন থাকায়, সমস্যায় ভিন্নতা রয়েছে। যেমন— চা শ্রমিকদের এক রকম সমস্যা, প্রতিবন্ধীদের অন্য রকম এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আরেক রকম। অন্যান্য গোষ্ঠীর প্রত্যেকের ভিন্নতর বাস্তবতা। পাহাড়বাসী দরিদ্র মানুষের সমস্যায় ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণভাবে এসব গোষ্ঠীর মানুষ দরিদ্র বা অতিদরিদ্র, কিন্তু তাদের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা থাকায়, প্রত্যেক গোষ্ঠীর জন্য দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচিতে সেই ভিন্ন বাস্তবতা প্রতিফলিত হতে হবে। উদাহরণ ‘দলিতদের’ ছেলেমেয়েদের ‘ভদ্রলোকদের’ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মূলস্রোতের স্কুলে পড়ার সুযোগ সাধারণত দেয়া হয় না। আবার প্রতিবন্ধীদের দক্ষতা থাকলেও তাদের সাধারণত চাকরি দেয়া হয় না। এ রকম সামাজিক সমস্যা দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির মধ্যে ধারণ করতে হবে। আবার উপকূল ও দ্বীপে মিঠাপানির তীব্র সংকট সমাধান না করে দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। এভাবেই টেকসই দারিদ্র্য নিরসন ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে উল্লিখিত ও অন্যান্য গোষ্ঠীর বিশেষ বিশেষ সমস্যা সমাধানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে বিশেষ বিশেষ সমস্যায় আক্রান্ত বিভিন্ন অতিদারিদ্র্য গোষ্ঠীর জন্য তাদের নিজস্ব বাস্তবতাকে ধারণ করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পিকেএসএফ এক্ষেত্রে ১৬টি গোষ্ঠী চিহ্নিত করে কাজ করছে।

বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০২১ তৈরি করা হয়েছে মানুষকে কেন্দ্র করে। বৈষম্য দূরীকরণ এর অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা যায়, বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বেড়েছে। ২০১০ সালে বৈষম্য পরিমাপক গিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৪৫, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৮-এ। এই বৈষম্য বৃদ্ধির মূল কারণ বাংলাদেশসহ প্রায় সারা বিশ্বে প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আর এ ব্যবস্থা হলো, লাগামহীন বাজার অর্থনীতি বা নব্য উদারতাবাদ। এর মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, বাজারই মানুষের অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারকে খুবই সংকুচিত করা হয় এবং বেসরকারি খাতের ওপর সরকারি নজরদারির প্রক্রিয়াগুলো একেবারেই শিথিল করা হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে থাকেই না। ফলে যাদের সম্পদ আছে, অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে, তারাই আরো বেশি ধনী ও ক্ষমতাবান হতে থাকে। তাই আজ পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি সম্পদ বিশ্বের সর্বোচ্চ ধনী ১ শতাংশের মালিকানায়, আর বাকি অর্ধেক ৯৯ শতাংশের হাতে। নব্য উদারতাবাদের কী ভয়াবহ ফল! বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আয়বৈষম্য প্রকট এবং তা বাড়ছে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাস এবং দুর্বল গোষ্ঠীগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি (যেমন কৃষিতে) ব্যবস্থা থাকার পরও এ বৈষম্য; অর্থাৎ নব্য উদারতাবাদ পুঁজিবাদ ও ক্ষমতার পক্ষে এ এক খুবই শক্তিশালী ব্যবস্থা।

দারিদ্র্য নির্মূল করার লক্ষ্যে জনকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলো বর্তমানে আমাদের উন্নয়ন দর্শনে অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে শক্তিশালী বাজার অর্থনীতি চলমান। প্রতিযোগিতা করে সবাইকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে যাদের সক্ষমতা থাকে না, তারা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণই করতে পারে না। তারা পিছিয়ে থাকে, তারা পিছিয়ে পড়ে। সারা বিশ্বে চলমান ব্যবস্থায় তা-ই হচ্ছে, বাংলাদেশেও। যুক্তরাষ্ট্রের ১ শতাংশ মানুষের হাতে ৪০ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থা এ রকম না হলেও, যেমন আগে উল্লেখ করা হয়েছে, এখানেও বৈষম্য প্রকট এবং বাড়ছে। লক্ষণীয় বাংলাদেশে জাতীয় আয়ের ৩৮ শতাংশ রয়েছে সর্বোচ্চ ধনী ১০ শতাংশের হাতে এবং নিচের ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। চিত্রটি নিশ্চয়ই উদ্বেগজনক। আরো বেশি উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, আয়বৈষম্যের পাশাপাশি বাংলাদেশেও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। শুধু বৈধ অর্জন নয়, অবৈধভাবে হাতিয়ে নেয়া ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে অনেকে অনেক সম্পদ কুক্ষিগত করে নিচ্ছেন।

এ অবস্থার সমাধান কীভাবে সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

আগেই যেমনটা উল্লেখ করেছি— সমাধানের একটা পথ হচ্ছে, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তাদের দারিদ্র্য নিরসন ও উন্নয়নে কর্মসূচি গ্রহণ এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। তবে সত্যিকারভাবে সমস্যার সমাধান হবে, যদি অবাধ বাজার অর্থনীতির বদলে সবার ন্যায্যতা ও অধিকারভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে মানবকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায়। তা বর্তমানে সম্ভব হবে না। এ বাজার অর্থনীতিই চলবে। তবে অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে আইনের প্রয়োগ কার্যকর এবং তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেমন— ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি, সরকারি জমি দখল, নদী দখল, বনাঞ্চল উজাড় করে অবৈধভাবে সেই জমির অন্য কাজে ব্যবহার ইত্যাদি কাজে যারা লিপ্ত হয় বা হচ্ছে, তাদের দমন এবং বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। দেশজুড়ে নদী, জমি, ভূমি ও বনাঞ্চল দখলের ঘটনা ঘটছে। এদিকে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ফেরত দেয়া হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোদ ব্যাংক মালিক আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। ব্যাংকের পরিচালকও তা-ই করছেন। এদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। ছোট ছোট অপরাধীদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধরা হচ্ছে। কিন্তু রাঘববোয়ালদের ছোঁয়া যাচ্ছে না। এ অপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে যথাযথ শাস্তি বিধান করলে অন্যরা এ পথে যেতে নিরুৎসাহিত হবে। এটা গেল একটা দিক। অন্যদিকে করণীয়গুলোর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো, সাধারণ মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে তিনটি কাজ প্রয়োজন। যথা— শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা। আমরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অনেক অগ্রসর হয়েছি। তবে উভয় ক্ষেত্রেই মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে উপযুক্ত বয়সী ছেলেমেয়েদের ৯৮ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হচ্ছে এবং স্কুল থেকে তাদের ঝরে পড়ার হারও কমেছে। বর্তমানে এ হার নেমে এসেছে ১৯ শতাংশে। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে মানসম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও ঘাটতি রয়েছে অনেক, বিশেষ করে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ক্ষেত্রে। তাছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। যেসব মানুষের অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতা রয়েছে, তাদের সন্তানদের সঙ্গে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তানদের শিক্ষাক্ষেত্রে পার্থক্য বিরাজমান। দরিদ্রদের ক্ষেত্রে এ ব্যবধান বিস্তর। অগ্রসর পরিবারদের ছেলেমেয়েরা শহরে ভালো স্কুল-কলেজে পড়ে। সাধারণ ও পিছিয়ে পড়া পরিবারদের সন্তানরা যেসব স্কুল-কলেজে পড়ে, সেগুলোয় ভালো শিক্ষকের অভাব, শিক্ষা উপকরণের সংকট এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রতিকূলতা বিদ্যমান। তদুপরি অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানে অসুস্থ রাজনীতিও ঢুকে গেছে। তাই শিক্ষার মাধ্যমে আর্থসামাজিক বিভাজন আরো বেশি পাকাপোক্ত হচ্ছে।

তবে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্য কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ রয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ। কিছু কাজও হচ্ছে। গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ঘটানোরও চেষ্টা করা হচ্ছে। খুব ভালো প্রয়াস। তাছাড়া বৈষম্য দূর করার জন্য ওই শিক্ষানীতিতে পিছিয়ে পড়া এবং পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোয় স্কুল ও কলেজগুলোকে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলা হলেও এটি তেমন ঘটছে না। অবশ্য স্কুল-কলেজে বিল্ডিং ব্যাপকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বছরের শুরুতেই দেশের সর্বত্র বই পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। তবে সার্বিক অবস্থার উন্নতির জন্য আরো জোরদার কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দরকার। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সবকিছুই কেন্দ্রীভূত। এটিও একটি বড় সমস্যা। একজন প্রাথমিক শিক্ষকের বদলির সিদ্ধান্ত ঢাকায় নেয়া হয়। কাজেই পরিকল্পনা ও কার্যক্রম, এমনকি অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও অপচয় ব্যাপকভাবে ঘটে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল অনেক সময় পাওয়া যায় না, যাচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। বলা বাহুল্য, বৈষম্য নিয়ন্ত্রণে আনা এবং রাখার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় উল্লিখিত দিকনির্দেশনাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কার খুবই জরুরি।

সবাইকে ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতের লক্ষ্যে এ পর্যায়ে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। এক. দখলদার ধান্দাবাজদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দুই. মানুষের মধ্যে সক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে। যেমন আগে উল্লেখ করা হয়েছে, এজন্য তাদের মানসম্পন্ন শিক্ষা-প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রায় সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক ভালো সেবা দিচ্ছে আবার কিছু দিচ্ছে না। দেখা যায়, অনেক অঞ্চলে এখনো মানুষ ঝাড়ফুঁক ও পানিপড়াসহ মান্ধাতার আমলের চিকিৎসা নিচ্ছে বা কোনো চিকিৎসা নিতে পারছে না। পিকেএসএফের সমৃদ্ধি (জনকেন্দ্রিক, বহুমাত্রিক, সমন্বিত দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই উন্নয়ন) এলাকাগুলোর সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় যে ঘাটতি রয়েছে, সেটা সমৃদ্ধির আওতায় পূরণের চেষ্টা করছে। তাছাড়া পিকেএসএফ শিক্ষা নিয়েও কাজ করছে। অতিদরিদ্র ও দরিদ্রদের মধ্যে অনেকেই রয়েছে, যাদের বাড়িতে পড়ার জায়গা বা সুযোগ কোনোটাই নেই। দেশের ২০০ সমৃদ্ধি ইউনিয়নে পিকেএসএফ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ঝরে পড়া রোধ করার লক্ষ্যে প্রত্যেক গ্রামে শিক্ষাসহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। স্থানীয় এলাকা থেকে একজন নারী শিক্ষকও নিয়োগ করা হয়েছে প্রত্যেক কেন্দ্রের জন্য। ফলাফল খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ঝরে পড়ার হার সারা দেশে ৪ শতাংশের মতো হলেও, পিকেএসএফ-সমৃদ্ধি ইউনিয়নগুলোতে তা ১ শতাংশের অর্ধেকেরও কম। ছেলেমেয়েরা তাদের প্রাথমিক স্কুলে শুধু পড়াশোনা অব্যাহত রাখছে তা-ই নয়, ভালো ফলাফল করছে।

দেখা যাচ্ছে, ঋণ নিয়ে যে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী তৈরি হচ্ছে, উৎপাদনশীল খাতে তাদের অংশগ্রহণ কম—

আমরা এখানে ছোট বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির কথা বলছি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। কারো ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়া যাবে না। যে ব্যক্তি আগ্রহ নিয়ে যে কাজ করতে চায়, তাকে সে কাজ করার জন্য সহায়তা দিতে হবে। সবাই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন না। আগ্রহ থাকতে হবে। উদ্যোক্তা হতে গেলে একজনকে জানতে হবে তার চিহ্নিত ক্ষেত্রে কোন ধরনের পণ্য বা সেবার চাহিদা রয়েছে, যা অনেক বিক্রয় করা যাবে এবং যা থেকে লাভ করা যাবে। উদ্যোগ গ্রহণে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য প্রথমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনমতো তাদের দক্ষতামান বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রশিক্ষণ ছাড়াও বাজারতথ্য ও প্রযুক্তির প্রাপ্যতা এবং উপযুক্ত অর্থায়ন ছাড়াও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতে সহায়তা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বড় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে সিপ বা স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম একটি। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এর বাস্তবায়নে কাজ করছে। আরেকটি হচ্ছে, নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেয়ার জন্য জয়িতা। সিপের আওতায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণীকে এরই মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং আরো ১২ হাজারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শর্ত রয়েছে— প্রশিক্ষিতদের মধ্যে ন্যূনপক্ষে ৭০ শতাংশের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এরই মধ্যে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ৭১ শতাংশ কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। তবে বেশির ভাগ চাকরিতে যোগদান করেছেন। স্বল্পসংখ্যক উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। পিকেএসএফ শুধু এদের মধ্যে থেকে নয়, তার নিজস্ব অন্যান্য কর্মসূচির আওতায় আগ্রহী চিহ্নিত করে ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির। এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে, উল্লিখিত প্রশিক্ষণ, বাজারতথ্য ও বাজারজাতে সহায়তা, প্রযুক্তিপ্রাপ্তিতে সহযোগিতা এবং উপযুক্ত অর্থায়ন পদ্ধতি। নিবিড় তদারকির ব্যবস্থাও রয়েছে। ব্যক্তি-মানুষের চাহিদা ও আগ্রহের বিষয় জেনে সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে উঠে এসেছে রংপুর, কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার ৭২ শতাংশ বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের পরও দারিদ্র্যের হার হ্রাস করা যায়নি—

আমার মনে হয়, কুড়িগ্রামে জরিপটি বন্যা-পরবর্তী সময়ে করা হয়েছে। আমি সম্প্রতি সরেজমিন কুড়িগ্রামের অবস্থা পরিদর্শন করেছি। বর্তমানে অবস্থা এত খারাপ না। তবে অতিদরিদ্র গোষ্ঠীগুলোর এবং অতিদরিদ্র্র অঞ্চলগুলোর অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তবতায় ভিন্নতা রয়েছে। কর্মসূচিতে সে ভিন্নতাকে যথাযথভাবে ধারণ করতে হবে। হাওড়-বাঁওড়, চরাঞ্চল, উপকূল, দ্বীপ, পাহাড়, বন্যাপ্রবণ ও খরাপ্রবণ এলাকার ক্ষেত্রে যে অঞ্চলে কাজ করা হচ্ছে, সেখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ, আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও সমস্যা এবং সম্ভাবনা গৃহীত কর্মসূচিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হতে হবে। আর সব কার্যক্রম স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব বিষয়ে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্যক্রমে যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দূর করার ব্যবস্থা করা জরুরি। আসলে পূর্বধারণাপ্রসূত প্রকল্প বা কার্যক্রম নয়, সংশ্লিষ্ট মানুষকে কেন্দ্র করে তাদের বাস্তবতা চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন বিভিন্ন কার্যক্রমে ঘটালেই টেকসই সফলতা অর্জন সম্ভব।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে তহবিল আসাও বন্ধ হবে। এক্ষেত্রে এনজিওগুলোর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

দেশের মানুষের আয় বাড়ছে এবং বাড়তে থাকবে। এ অবস্থায় এনজিও কার্যক্রমের জন্য বিদেশী অর্থ আসা শুধু কমবে না, বন্ধও হয়ে যেতে পারে একসময়। এরই মধ্যে বেশ কমে গেছে। তবে বড় এবং অনেক মাঝারি এনজিওর নিজেদের ভালো সঞ্চয় রয়েছে। তারা নিজেদের সঞ্চয় থেকে একটা পর্যায়ে কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে পারবে। অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রমের পরিসর না বাড়িয়ে তারা নির্দিষ্ট অঞ্চলে আরো গভীরে যেতে পারে। এর মাধ্যমে এনজিওটির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কাজের সুযোগ থাকবে, যদিও সময়ে সময়ে কাজের ধরন বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমে আসতে হবে। আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে আমাদের মানসিকতা ও কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে।

অনেক কাজ রয়েছে, যেখানে তেমন অর্থের প্রয়োজন হয় না। যেমন- পিকেএসএফ সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দরিদ্রদের সমৃদ্ধ বাড়ি গড়তে উৎসাহিত করছে, পরামর্শ দিচ্ছে, পাশে দাঁড়াচ্ছে। যাদের পাঁচ থেকে সাত ডেসিমল জমির বাড়ি রয়েছে, তারা পরিকল্পিতভাবে বাড়ির জমি ব্যবহার করে মাসে গড়ে ৮-১০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। পাশাপাশি বাড়িটিও পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম থাকে। এ কার্যক্রম সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০০ ইউনিয়নে চলমান রয়েছে। এ কাজে বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না, শ্রম বেশি লাগে। (দৈনিক বণিক বার্তা থেকে সংগৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ