রোহিঙ্গা গণহত্যা : আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিচার শুরু

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৪৯ | আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:২৫

রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর সেনাবাহিনীর গণহত্যা নিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলাটির শুনানি শুরু হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা তিনটায় নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এ শুনানি শুরু হয়। 

শুনানির শুরুতে প্রধান বিচারক সোমালিয়ার নাগরিক আব্দুলকায়ি আহমেদ ইউসুফ অভিযোগ পড়ে শোনান। এরপরে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের পক্ষে দুইজন অ্যাডহক বিচারক নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি।

তিনি তাদের মনে করিয়ে দেন, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন।

গাম্বিয়ার পক্ষে মামলায় প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। অন্যদিকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে মামলায় লড়ছেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি।

মঙ্গলবার আদালতে গাম্বিয়া তার বক্তব্য উপস্থাপন করবেন এবং কাল বুধবার মিয়ানমার তার অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।

আদালতে অং সান সু চি। ছবি: রয়টার্স

এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকেলে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে। মামলার রায় পেতে স্বল্পতম আট সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত লাগতে পারে।

গাম্বিয়ার পক্ষে লজিস্টিক সহায়তা দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মাসুদ বিন মোমেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকেও একটি প্রতিনিধি দল গেছে।

আদালতের বাইরে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত তিন রোহিঙ্গা। ছবি: রয়টার্স

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া গত ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলাটি দায়ের করে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রাখাইনে গণহত্যা, গণধর্ষণসহ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ করা হয়েছে ওই মামলায়।

আইসিজেতে মিয়ানমারের বিপক্ষে দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। তবে গাম্বিয়ার পক্ষে এ ব্যাপারে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে নেদারল্যান্ডসের হেগে গেছেন।

তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। জাতিসংঘে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে তাকেই হেগে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১৫ সদস্যের আদালত
এই আদালতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন সোমালিয়ার বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট চীনের বিচারপতি ঝু হানকিন। বিচারকদের নির্বাচন করেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদ। অন্য সদস্যরা হলেন স্লোভাকিয়ার বিচারপতি পিটার টমকা, ফ্রান্সের বিচারপতি রনি আব্রাহাম, মরক্কোর মোহাম্মদ বেনুনা, ব্রাজিলের অ্যান্টোনিও অগাস্টো কানকাডো ত্রিনাদে, যুক্তরাষ্ট্রের জোয়ান ই ডনোহু, ইতালির গর্জিও গাজা, উগান্ডার জুলিয়া সেবুটিন্দে, ভারতের দলভির ভান্ডারি, জ্যামাইকার প্যাট্রিক লিপটন রবিনসন, অস্ট্রেলিয়ার রির্চাড ক্রর্ফোড, রাশিয়ার কিরিল গিভরগিয়ান, লেবাননের নওয়াফ সালাম এবং জাপানের ইউজি ইওয়াসাওয়া।

কেন মামলা করলো গাম্বিয়া
২০১৮ সালে বাংলাদেশে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন হয়। এই সম্মেলনে গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্থলে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবেদ্যুকে পাঠানো হয়। ঢাকায় পৌঁছানোর পরে তামবেদ্যু অন্য দেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন। ২০১৮ সালের ৫ ও ৬ মে অনুষ্ঠিত ওই মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মুসলিম দেশগুলো সিদ্ধান্ত নেয় রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য গাম্বিয়ার নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি করা হবে এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ গাম্বিয়া সম্পন্ন করবে। 

বাংলাদেশসহ অন্য আরও কয়েকটি দেশ এই কমিটির সদস্য, সবার সহযোগিতা নিয়ে গাম্বিয়া এ বছরের ১১ নভেম্বর মামলা করে।

গাম্বিয়ার আরেকটি সুবিধা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত ও গণহত্যা বিষয়ক বিচার প্রক্রিয়া বিষয়ে অগাধ জ্ঞান আছে দেশটির বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি’র। ৪৭ বছর বয়সী ব্যারিস্টার আবুবকর রুয়ান্ডা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলার কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করেছেন।

এছাড়া জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সুবাদে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত যা জাতিসংঘের কোর্ট হিসেবে পরিচিত, সে বিষয়েও ভালো ধারণা আছে তার। মামলা পরিচালনার কাজে আবু বকরকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত আইনি প্রতিষ্ঠান ফলি হগ সহায়তা করছে। এই ফলি হগ সমুদ্র সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে আইনি প্রতিষ্ঠান ছিল।

মামলার আবেদনে যা বলা হয়েছে
গাম্বিয়া তার প্রাথমিক আবেদনে গণহত্যা কনভেনশনের ৯ নম্বর ধারা বলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়ই জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের রিপোর্ট, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টসহ অন্যান্য রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে গাম্বিয়া বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে।

গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে আইসিজে’র কাছে কয়েকটি বিষয়ে সুরাহা চাওয়া হয়েছে। মিয়ানমার গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে সে সম্পর্কিত ঘোষণা, মিয়ানমার যেন এই কনভেনশন মেনে চলে সে সম্পর্কিত ঘোষণা, যারা গণহত্যা করেছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, প্রত্যাবাসনসহ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।

যেহেতু এ ধরনের মামলা অনেকদিন ধরে চলে, সেজন্য গাম্বিয়া একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়েছে এই আদালতের কাছে, যাতে করে মিয়ানমার এই সংক্রান্ত কোনও প্রমাণ ধ্বংস করে না ফেলতে পারে। এই আদেশের শুনানি হবে ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আশা করা হচ্ছে, শুনানি শেষে এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি আদেশ পাওয়া যাবে।

মামলা পরিচালনায় গাম্বিয়াকে সহায়তা করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের নেতৃত্বে একটি বড় প্রতিনিধিদল নেদারল্যান্ডসে উপস্থিতি থাকবেন।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ