ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচনে পাঁচশো'র বেশি কর্মকর্তা কেন মারা গেলেন?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯, ১৮:২০

গত মাসে ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রপতি, জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একদিনে এত বড় ভোট প্রক্রিয়া পৃথিবীতে খুব একটা দেখা যায় না।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচনের জন্য দেশটিকে বড় ধরণের মূল্য দিতে হয়েছে কিনা। যেই মূল্য তাদের নির্বাচন কর্মকর্তাদের জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় নির্বাচনকে ঘিরে ভোটের সময় এবং পরবর্তী কয়েকদিনের মাথায় ৫০০ জনেরও বেশি নির্বাচনী কর্মকর্তা মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ভোট প্রক্রিয়ার আয়োজন ও গণনা করার অতিরিক্ত চাপ ও ক্লান্তি তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচনে দেশব্যাপী ৭০ লাখ কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিল।

এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, ইন্দোনেশিয়ায় গড় মৃত্যুহারের চাইতে কি এই মারা যাওয়ার পরিমাণ বেশি। নাকি নির্বাচনের কারণে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছে?

কতজন কর্মকর্তা মারা গেছেন?

১৭ই এপ্রিলের ভোটটি ছিল বড় ধরণের একটি প্রশাসনিক মহড়া, যেখানে ভোটার সংখ্যা ১৯ কোটিরও বেশি।

১৮ হাজার দ্বীপ দিয়ে গঠিত এই দেশটির আয়তন প্রায় ২০ লাখ বর্গ কিলোমিটার।

ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচন কমিশন বিবিসিকে জানায়, ভোটে ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, যার মধ্যে ৫৬ লাখ ৭২ হাজার ৩০৩ জন বেসামরিক কর্মী।

বাকিরা ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আর সমস্ত ভোটের গণনা করা হয়েছে হাতে হাতে।

বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হওয়া প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনেক জয়গায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভোট গণনা শেষ করতে সারারাত ধরে সব কর্মকর্তা ভোট গুনে গিয়েছেন, আবার অনেকে গণনা করা অবস্থাতেই পরদিন পর্যন্ত টানা জেগে ছিলেন।

নির্বাচন কমিশন জানায় যে ২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ২৭০ জনেরও বেশি কর্মী অতিরিক্ত কাজের চাপে মারা গেছেন।

ঐ বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ১,৮৭৮ জন।
পরে এই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৫৫০ জন ছাড়িয়ে যায়।

মৃত্যুর সংখ্যা কি স্বাভাবিকের চাইতে বেশি ছিল?

নির্বাচনের সাথে জড়িত ৭০ লাখেরও বেশি কর্মকর্তার মধ্যে যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী মারা গেছেন তার সঙ্গে দেশটির জাতীয় মৃত্যুহারের একটি তুলনা করা হচ্ছে।

প্রশ্ন হল, নির্বাচনের কারণে এই মৃত্যুর সংখ্যা কি স্বাভাবিক মৃত্যুহারের তুলনায় বেশি ছিল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৭ সালের তথ্য অনুসারে, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিবছর ১,০০০ জনে ৭.১৬ জনের মৃত্যু হয়।

এখন এই মৃত্যুহারের হিসাব ওই ৭০ লাখ কর্মকর্তার হিসাবের সাথে মেলানো হয়, তাহলে প্রতিদিন মারা যাওয়ার কথা রয়েছে প্রায় ১৩৭ জনের।

ধরা যাক, প্রত্যেক নির্বাচনী কর্মকর্তা চার দিন ধরে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল - অর্থাৎ ভোটের প্রস্তুতি, ভোট গ্রহণ এবং পরবর্তী গণনা পর্যন্ত।

দেশটির জাতীয় মৃত্যু হারের উপর ভিত্তি করে, এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৫৪৮ জন মানুষের মারা যাওয়ার কথা।

ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচন কমিশন থেকে দেয়া হিসাবের সাথে এই হিসাব অনেকটাই মিলে যায়।

কোন গোষ্ঠী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

অনেকটাই অনুমান নির্ভর এই হিসাবে কারও বয়স, লিঙ্গ, স্বাস্থ্য শর্তাবলী বা অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হয়নি।

ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যে কর্মকর্তারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগের বয়স ৫০ বছরের বেশি ছিল।

সুতরাং এটা পরিষ্কার যে সামগ্রিক জনসংখ্যার তুলনায় নির্বাচন কর্মীদের মৃত্যু হার বেশি।

অব্যাহত বিতর্ক

নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের যে অবস্থায় কাজ করতে হয়েছে সেটা তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনে মৃত্যু নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে কয়েকটি স্বাস্থ্য পরিস্থিতির তালিকা তৈরি করা হয়। হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, মেনিনজাইটিস এবং সেপিসিসসহ মৃত্যুর জন্য দায়ী বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য শর্তাদি তালিকাভুক্ত করা হয়।

ক্লান্তি ও চাপের মুখে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাদের অনেকেই ভোট গণনা শেষ করার জন্য ২৪ঘন্টা বা তার বেশি সময় ধরে কাজ করেছিলেন।

সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেও অনেকে কাজ করেছেন। তাছাড়া এপ্রিলে আবহাওয়াও উষ্ণ ছিল।

কর্মকর্তাদের মৃত্যু নিয়ে এই বিতর্কের কারণে এখন থেকে দেশটির যেকোনো নির্বাচনে কর্মকর্তাদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

কাজের মধ্যে নির্দিষ্ট সময় পর পর বিরতি রাখার পাশাপাশি কার্যপ্রবাহের যথাযথ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কথা চলছে।

ইন্দোনেশিয়াকে এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র - যেমন ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচনের বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিবিসি

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food