পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু জামায়াত কর্মীর, উত্তাল কাশ্মীর

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০১৯, ২০:৪৮

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের অবন্তীপুরায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া এক মুসলিম যুবক পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়ার পর উপত্যকা জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

নিহত যুবকের নাম রিজওয়ান আসাদ পন্ডিত, তিনি ছিলেন স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক এবং সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামিয়ার একজন সক্রিয় কর্মী।

ঠিক কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, পুলিশ সে ব্যাপারে কিছু না জানালেও পুলিশ সূত্রগুলো দাবি করছে, জঙ্গীবাদে জড়িত সন্দেহেই ওই যুবককে আটক করা হয়েছিল। তার পরিবার বা রাজ্যের মানবাধিকার কর্মীরা অবশ্য সে কথা মানছেন না।

গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে জাতীয় সড়কের ওপর যে আত্মঘাতী হামলায় চল্লিশজনের বেশি ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিল, রিজওয়ান আসাদ পন্ডিতদের বাড়ি সেই জাতীয় সড়ক থেকে বেশি দূরে নয়।

তার বাবা আসাদউল্লাহ পন্ডিত কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামিয়ার একজন রোকন, ছেলেও যুক্ত ছিলেন সেই সংগঠনের কাজে।

দেরাদুন থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করে আসার পর রিজওয়ান ছিলেন স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, পাশাপাশি ছাত্রদের টিউশনও দিতেন।

পরিবার স্বপ্ন দেখত শিগগিরি সে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করবে। কিন্তু তার বদলে এখন অবন্তীপুরায় তাদের দোতলা বাড়ির সামনে শোকের মাতম।

গতকাল বিকেলে পুলিশ তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পর থেকেই এলাকার মহিলারা তাদের বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে একটানা বিলাপ আর কান্নাকাটি করে চলেছেন।

রিজওয়ানের সবচেয়ে ছোট ভাই জুলকারনাইন জানাচ্ছেন, "রবিবার রাতে স্থানীয় থানার পুলিশ ডিএসপি-র নেতৃত্বে আমাদের এলাকায় হানা দিয়ে দু-তিনটে বাড়ি ঘিরে ফেলে।"

"তারপর মহিলাদেরসহ পরিবারের বাকি সবাইকে বাইরে একটা ঘরে আটকে রেখে ওকে তুলে নিয়ে যায়। তারা হুমকিও দিয়ে যায়, এ খবর যেন আমরা বাইরে কাউকে না-বলি।"

"পরদিন থানায় খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি ওকে শ্রীনগরের কার্গো ক্যাম্পে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে - আর মঙ্গলবার শুনলাম ওকে মেরেই ফেলা হয়েছে।"

"অথচ ওর সাথে জঙ্গীদের কোনও সম্পর্কই ছিল না, এটা ঠান্ডা মাথায় একটা খুন - আমরা যার তদন্ত চাই।"

শ্রীনগর বিমানবন্দরের কাছে যেখানে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের সদর দফতর, সেটি 'কার্গো ক্যাম্প' নামেই কুখ্যাত - বহু কাশ্মীরি যুবকই সেখানে চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ।

সেই কার্গোতে রিজওয়ান আসাদের মৃত্যু হয়েছে, এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই উপত্যকার বিভিন্ন জায়গায় ক্ষ্ব্ধু তরুণরা রাস্তায় নেমে আসেন।

সেই সব ভারত-বিরোধী জমায়েত থেকে স্লোগানও উঠতে থাকে, রিজওয়ানের রক্ত কাশ্মীরে বিপ্লব আর আজাদী এনে দেবে।

কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হামিদা বানো বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "বর্বরতাও যে কত স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে এই ঘটনা তার একটা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।"

"ভারতে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই যেন তারা মুসলিমদের নির্মূল করার এজেন্ডা নিয়ে চলছে ... কাশ্মীরে সেটা আগেও ছিল, কিন্তু এখন আর কোনও রাখঢাক নেই।"

"কখনো গুম, কখনো এনকাউন্টার, কখনও কাস্টডিয়াল ডেথ - কাশ্মীরে নির্বিচার হত্যা চলছেই। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা একটা গণহত্যাই যেন রুটিনে পরিণত হয়েছে।"

কাশ্মীরে গত মাসে যে জামায়াতে ইসলামিয়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে এখন জঙ্গীবাদের কোনও সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করছেন অধ্যাপক বানো।

তিনি বলছিলেন, "ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন জামাত কাশ্মীরে খুবই প্রভাবশালী - কিন্তু বিগত পনেরো বছরে তারা নিজেদের অনেক পাল্টে নিয়েছে, জঙ্গীবাদ থেকে একেবারেই সরে এসেছে।"

"তাদের প্রায় গোটা নেতৃত্ব ক্র্যাকডাউনে খতম হয়ে যাওয়ার পর তারা এখন শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক কাজকর্মেই মন দিয়েছে।"

"তারা জঙ্গীবাদ সমর্থন করছে না বলে সৈয়দ আহমেদ শাহ গিলানির মতো নেতাও জামাত ছেড়ে নিজের দল তেহরিক-ই-হুরিয়ত গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন।"

অথচ জামাতের কর্মী রিজওয়ান আসাদ পন্ডিতকে সেই জঙ্গী সন্দেহেই পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল - তার পরিবার ও মহল্লার লোকজন সেটা কিছুতেই মানতে পারছেন না। বিবিসি

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food