কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মাংস খায়?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৪৫

আপনি হয়তো শুনেছেন যে আজকাল অনেকেই মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে চাইছেন কিম্বা খাবারের তালিকা থেকে এই মাংসকে একেবারেই ছেঁটে ফেলতে চাইছেন। এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন কিন্তু বাড়ছে।

নানা কারণেই তারা মাংস খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছেন যার মধ্যে রয়েছে- স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করা, পরিবেশ রক্ষা আবার অনেকে পশুপাখির জীবনের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

বলা হচ্ছে, ব্রিটেনে প্রতি তিনজনের একজন অঙ্গীকার করছেন যে তারা মাংস খাওয়া একেবারেই বাদ দিয়েছেন কিম্বা কমিয়ে দিয়েছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সংখ্যা প্রতি তিনজনে দু'জন।

মাংস খাওয়া কমিয়ে দেওয়ার জন্যে সম্প্রতি সারা বিশ্বে একটি প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রত্যেক সোমবারকে বিবেচনা করা হচ্ছে মাংস-মুক্ত দিন হিসেবে। বলা হচ্ছে অন্তত এই দিনটিতে যেন লোকজন মাংস কিম্বা যেকোনো ধরনের প্রাণীজাত খাদ্য পরিহার করেন। সংবাদ মাধ্যম ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকেও কম মাংস খাওয়ার উপকারিতা তুলে ধরা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাস্তবে কি আসলেই এসবের কোন প্রভাব পড়ছে?

আয় বাড়ছে

আমরা জানি যে সারা বিশ্বে গত ৫০ বছর ধরে মাংস খাওয়ার পরিমাণ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৬০ এর দশকে যতো মাংস উৎপাদন করা হতো বর্তমানে তার তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি উৎপাদিত হচ্ছে। হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ষাটের দশকে সাত কোটি টন মাংস উৎপাদিত হতো কিন্তু ২০১৭ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি টন।

এই একই সময় ধরে বিশ্বের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ১৯৬০ এর দশকে আমাদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিনশো কোটি কিন্তু এখন এই সংখ্যা সাড়ে সাতশো কোটিরও বেশি।

কিন্তু এটাও ঠিক যে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই মাংস খাওয়ার পরিমাণ পাঁচগুণ বাড়েনি। এর পেছনে আরো একটি বড় কারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি। সারা বিশ্বেই মানুষ আগের তুলনায় ধনী হয়েছে। গত অর্ধ শতাব্দীতে গড় আয় বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি।

আমরা যদি তুলনা করে দেখি যে কোথায় কতো মাংস খাওয়া হচ্ছে তাহলে দেখবো যেসব দেশ যতো বেশি ধনী সেসব দেশে ততো বেশি মাংস খাওয়া হচ্ছে। এখন যে শুধু জনসংখ্যাই বেড়েছে তা নয়, একই সাথে বেড়েছে মাংস কিনতে পারা মানুষের সংখ্যাও।

কে সবচেয়ে বেশি মাংস খায়

সারা বিশ্বে এই প্রবণতা খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখি যে ধন সম্পদের সাথে এর একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে। ২০১৩ সালের হিসেবই পাওয়া যায় সবশেষ। তাতে দেখা যাচ্ছে এক বছরে কোন দেশে কতো মাংস খাওয়া হয় সেই তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া।

তারপরেই রয়েছে নিউজিল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এই দুটো দেশে একজন ব্যক্তি বছরে ১০০ কেজির বেশি মাংস খায়, যা প্রায় ৫০টি মুরগি কিম্বা একটি গরুর অর্ধেকের সমান।

অবশ্য মাংস খাওয়ার এই উচ্চ হার চোখে পড়বে পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশেই। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে একজন মানুষ বছরে ৮০ থেকে ৯০ কেজি মাংস খেয়ে থাকেন।

কিন্তু এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যাবে গরিব দেশগুলোতে। সেসব দেশের লোকজনের মাংস খাওয়ার পরিমাণ খুবই কম। ইথিওপিয়ায় একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে প্রায় সাত কেজি, রোয়ান্ডায় আট কেজি এবং নাইজেরিয়াতে ৯ কেজির মতো মাংস খেয়ে থাকেন। ইউরোপের একজন নাগরিক গড়ে যতো মাংস খান এসব দেশের মানুষের মাংস খাওয়ার পরিমাণ তার দশগুণ কম। নিম্ন আয়ের বেশিরভাগ দেশগুলোতেই মাংস এখনও একটি বিলাসবহুল খাদ্য।

উপরে যেসব পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হিসেব করা হয়েছে শুধু কতোটুকু মাংস খাওয়া হচ্ছে সেটা বিবেচনা করে। কিন্তু বাড়িতে বা দোকানপাটে যেসব মাংস ফেলে দেওয়া হচ্ছে সেটা এসব হিসেবে ধরা হয়নি।

মধ্য আয়ের দেশগুলোতে মাংসের চাহিদা বাড়ছে

এটা একেবারেই পরিষ্কার যে ধনী দেশগুলোতে প্রচুর মাংস খাওয়া হয় আর দরিদ্র দেশগুলোতে খাওয়া হয় কম। গত ৫০ বছর ধরে এই প্রবণতাই চলে আসছে। কিন্তু কথা হলো আমরা সবাই মিলে এখন এতো বেশি মাংস খাচ্ছি কেন?

এরকম হওয়ার পেছনে একটা কারণ হচ্ছে- বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই মাংস খাওয়ার ব্যাপারে বড় রকমের চাহিদা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকে চীন ও ব্রাজিলে বড় রকমের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে এবং এর সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাংস খাওয়ার পরিমাণও।

কিন্তু চীনে এই পরিবর্তনটা ব্যাপক। ষাটের দশকে একজন চীনা বছরে পাঁচ কেজিরও কম মাংস খেতেন কিন্তু আশির দশকে সেটা বেড়ে দাঁড়ালো ২০ কেজি। আরো অবাক হওয়ার মতো যে গত কয়েক দশকে এটা তিনগুণেরও বেশি বেড়ে হয়েছে ৬০ কেজি।

একই ঘটনা ঘটেছে ব্রাজিলেও। এই দেশটিতে মাংস খাওয়ার পরিমাণ ১৯৯০ এর দশকের পর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ছাড়িয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোকেও। এর মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে ভারত।

সেখানে ১৯৯০ এর পর গড় আয় প্রায় তিনগুণ হয়েছে কিন্তু মাংস খাওয়ার পরিমাণ সেভাবে বাড়েনি। মানুষের মনে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে যে বেশিরভাগ ভারতীয় নিরামিষাশী। কিন্তু সারা ভারতে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কিছু না কিছু মাংস খায়।

তারপরেও দেশটিতে মাংস খাওয়ার হার উল্লেখযোগ্য রকমের কম। একজন ভারতীয় বছরে গড়ে চার কেজি মাংস খান। সারা বিশ্বের মধ্যে তারাই সবচেয়ে কম মাংস খান।

এর পেছনে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণ থাকতে পারে। অনেক ধর্মেই মাংস খেতে বারণ করা হয়েছে। যেমন হিন্দুরা গরুর মাংস বর্জন করেন।

পশ্চিমে কি মাংস খাওয়া কমছে?

ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় অনেকেই বলছেন যে তারা মাংস খাওয়া কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আসলেই কি সেরকম কিছু হচ্ছে? পরিসংখ্যান কিন্তু সেরকম কিছু বলছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের সবশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে দেশটিতে বরং মাথাপিছু মাংস খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।

আমরা হয়তো ভাবতে পারি যে যুক্তরাষ্ট্রে মাংসের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। সেখানে দেখা যাচ্ছে ২০১৮ সালে দেশটিতে মাংস খাওয়ার পরিমাণ ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রকমের বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেও এই একই চিত্র।

পশ্চিমা দেশগুলোতে মাংস খাওয়ার হার যখন থিতু অবস্থানে রয়েছে, অথবা সামান্য বেড়েছে, তখন মাংসের ধরনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তার অর্থ হচ্ছে- লোকজন এখন রেড মিট অর্থাৎ গরু বা শূকরের মাংস খাওয়া কমিয়ে হাঁস মুরগির মাংসের দিকে ঝুঁকছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে যতো মাংস খাওয়া হয় তার অর্ধেক হাঁস মুরগির মাংস। কিন্তু সত্তরের দশকে এটা ছিল এক চতুর্থাংশ। তবে এই পরিবর্তনকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যে ইতিবাচক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মাংস খেলে কী হয়

কোন কোন ক্ষেত্রে মাংস খাওয়া ভালো। পরিমাণ মতো মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার খেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে, বিশেষ করে অল্প আয়ের দেশগুলোতে। তবে বেশিরভাগ দেশেই এমন পরিমাণে মাংস খাওয়া হয় যা লাভের বদলে ক্ষতিই করে থাকে।

স্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে এই মাংস। গবেষণায় দেখা গেছে অতিরিক্ত পরিমাণে রেড মিট ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খেলে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিছু কিছু ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে।

রেড মিটের বদলে হাঁস মুরগির মাংস খাওয়া ইতিবাচক প্রবণতা। মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশের জন্যেও এটা একটা সুখবর। কিন্তু তারপরেও ভবিষ্যতে মানুষের মাংস খাওয়ার অভ্যাসে আরো বড়ো ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরী বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা।

তার মানে শুধু মাংসের ধরনে পরিবর্তন আনলেই হবে না, বরং আমরা কতোটুকু মাংস খাচ্ছি সেদিকেও নজর দিতে হবে। বস্তুত, মাংসকে আবারও বিলাসী খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।-বিবিসি 

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ