সুগারের রোগীদের লুকিয়ে খাওয়ার সমাধান কী?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৮, ১৮:৫৮

ঢাকা, ২৩ আগস্ট, এবিনিউজ : কলকাতার কালীতলা লেনের বাসিন্দা রবিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। পদস্থ সরকারি চাকুরিজীবী। বয়স ৫১ পেরিয়েছে। হাসিখুশি লোক। ফুটবলঅন্ত প্রাণ। লোকে বলে, বিশ্ব ফুটবলের পা থেকে মাথা- প্রায় সবই রবি মুখুজ্জের মাথার হার্ড ড্রাইভে সেভ রয়েছে।

ফুটবল বাদে রবিবাবুর আর এক ভালোবাসা হল খাওয়া। কষিয়ে রান্না তিনি রসিয়ে গ্রহণ করেন। তবে গত ৬ মাস ধরে এমনতরো ভালো মানুষটার মন একেবারেই ভালো নেই। তাঁর ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। ওষুধ চলছে। পাশাপাশি রয়েছে ব্যায়াম। বেঁধে দেওয়া হয়েছে খাওয়াদাওয়া। প্রথম দু’টি বিষয়ে তেমন আপত্তি না থাকলেও, খাওয়ার ওপর খবরদারি নিয়ে বেজায় চটে রয়েছেন। তাঁর কথায়, ও রকম ছাইভস্ম খেয়ে আর বাঁচা যায় না ভাই। তাই সবার অজান্তেই বাড়ির ফ্রিজ খুলে বা বাইরে দোকান থেকে ভালোমন্দ সব টপাটপ মুখে তুলি!
হ্যাঁ, ডায়াবেটিসের রোগীদের এমন আজব কাণ্ড নিয়ে বাড়ির লোকের ঘুম উধাও। বারণ সত্ত্বেও লুকিয়েচুরিয়ে খাওয়া থামে না। দেখা দেয় নানা শারীরিক সমস্যা।

চিকিৎসকরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় জানাচ্ছেন, নতুন রোগ ধরা পড়েছে এমন অল্পবয়সি পুরুষ রোগীর মধ্যেই খাবারের বাধা নিষেধ না মেনে লুকিয়েচুরিয়ে হাবিজাবি খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

এই সমস্যা সম্বন্ধে আরও বিশদে জেনে নেওয়া দরকার-

খাবার নিয়ে কেন এত সতর্কতা?

টাইপ ১ বা টাইপ ২- যে কোনো ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসাতেই খাবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষত, অনেক ক্ষেত্রেই টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার নেপথ্যে খাবার এবং জীবনযাত্রার প্রভাব থেকে যায়। তাই এই রোগে আক্রান্ত প্রতিটি মানুষকে খাওয়া নিয়ে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে।

আসলে খাবারের মাধ্যমে গৃহীত কার্বোহাইড্রেট অন্ত্রে এসে ভেঙে গিয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়। সেই গ্লুকোজ শরীর গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে সহজ হিসেব বলছে, বেশি খাবার খেলে শরীরে বেশি পরিমাণে গ্লুকোজ তৈরি হবে। সেই অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর গ্রহণ করলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাবে। তাই এই যুক্তিতে ডায়াবেটিসের রোগীকে অবশ্যই খাবারের বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

দেখা যায়, শারীরিক পরিশ্রম কম করা স্থূল মানুষের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। তাই কোনও স্থূল মানুষের ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় মেপে খাওয়ার বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রিত খাবার খাওয়া ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমিয়ে স্থূল রোগীর সুগার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
অন্যদিকে কিছু ডায়াবেটিসের রোগীর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম থাকে। এমন রোগীর ক্ষেত্রেও সঠিক খাবারের মাধ্যমে ওজন বাড়িয়ে নিতে হয়। তাই সবদিক থেকেই একজন ডায়াবেটিসের রোগীকে খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলা ভালো।

হাবিজাবি খেলে বড় বিপদ

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থেকে হার্ট, কিডনি, নার্ভ সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে সমস্যা দেখা দেয়। তবে জানার বিষয় হল, এই সমস্ত সমস্যার নেপথ্যে সুগারের পাশাপাশি হাই কোলেস্টেরল, হাই ব্লাডপ্রেশার সহ নানা জটিলতা জড়িয়ে থাকে। আর এই সমস্তটার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে খাওয়াদাওয়া। তাই ডায়বেটিস রোগীকে অতিরিক্ত তেল, ঝাল, মশলা, নুন ও মিষ্টি এড়িয়ে চলতে বলা হয়। এবার এই বিষয়গুলিকে প্রতিনিয়ত অমান্য করে চললেই হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেলিওর, স্ট্রোক সহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যা আসে।

অজুহাত অনেক

যে সমস্ত ডায়াবেটিস রোগী খাবারে অনিয়ম করেন, পরিবারের লোকেদের বোঝানোর জন্য তাঁদের মুখে দু-একটা অজুহাত লেগেই থাকে। অনেক রোগী বলেন, আমার খিদে পেয়েছিল। হাতের কাছে কিছু পাইনি। তাই ফ্রিজ থেকে দু’টো রসগোল্লা খেয়ে নিলাম। এমন যুক্তিকে একদমই মান্যতা দেওয়া যায় না। চিকিৎসকরা অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন রোগীর পেটের খিদে কম। জিভের খিদে থাকে বেশি। তাই তাঁরা এমনটা করেন। তবে অনেক রোগীর সুগারের ওষুধ থেকে শরীরে সুগার লেভেল অনেকটা নেমে যেতে পারে। তাই তখন তাঁদের খিদে পায়। এমনটা হলে কিন্তু চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।

এখন অনেক চিকিৎসকই রোগীর খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে অতটা বাধানিষেধ আনেন না। কিছু রোগী এই বিষয়টিকেই নিজেদের রসনাতৃপ্তির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। ডাক্তার হয়তো বলেছেন, মাঝেমধ্যে এক-দু’টো মিষ্টি খেলে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু রোগী এই পরামর্শকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে প্রায়দিনই মিষ্টি খেতে শুরু করে দেন। কেউ বারণ করলেই বলেন, ডাক্তার তো খেতে বলেছেন। তখন অন্যরা আর বারণ করার সুযোগ পান না। এটাও কিন্তু ঠিক নয়।

সমস্যা মেটাতে

*প্রথমেই একজন ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে পারেন। তিনি সবদিক বিচার করে একটা খাদ্যতালিকা বানিয়ে দেবেন। সেই খাদ্যতালিকা অনুযায়ী খাবার খেলেই শরীরের পক্ষে মঙ্গল। কারও কোনও বিশেষ খাবারের প্রতি আসক্তি থাকলে প্রথমেই ডায়েটিশিয়ানকে বলতে পারেন। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। অনেক রোগীই মিষ্টি খেতে ভালোবাসেন। তাঁদের আবদার থাকে খাবার পর অন্তত একটা মিষ্টি যদি খেতে দেওয়া যায়। একজন ডায়েটিশিয়ান রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে রোজ রাতে একটা মিষ্টি খাওয়ার ছাড়পত্র দিতেই পারেন। কিন্তু তিনি হিসেব কষে রোগীর রাতের খাবার থেকে কোনও একটি খাবার কমিয়ে দিয়ে ক্যালোরি গ্রহণে সামঞ্জস্য নিয়ে আসেন। এই পদ্ধতিতে রোগী খাবারেও তৃপ্তি পান। শরীরও ভালো থাকে।

*খাবার নিয়ে খুব বেশি কড়াকড়ি করা যাবে না। বেশি কড়াকড়ি করলে সকলের অজান্তেই লুকিয়েচুরিয়ে খেয়ে নেবেন। তাঁকে বোঝানো দরকার। খুব সমস্যা হলে রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসুন। তিনি তাঁকে বুঝিয়ে বলতে পারেন।

*এখানে বাড়ির লোকের খুব বড় ভূমিকা রয়েছে। মনে রাখবেন, পরিবারের অন্য সদস্যরা ভালোমন্দ খেলে রোগীরও খাওয়ার ইচ্ছে হওয়া স্বাভাবিক। তাই পরিবারের সকলে মিলে একই ধরনের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

*শুভ অনুষ্ঠানে মিষ্টিমুখ ও পেটপুজো আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির অঙ্গ। তবে একজন সুগারের রোগীর প্রায়দিন এমন খাওয়াদাওয়া একদমই উচিত নয়। তাই বাড়িতে সুগারের রোগী থাকলে এই বিষয়ের ওপর নজর দিন।

এবিএন/মাইকেল/জসিম/এমসি

এই বিভাগের আরো সংবাদ