সেপ্টেম্বর - হায় বিশবিশ! অতঃপর 

  দেবাহুতি চক্রবর্তী

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:০৫ | অনলাইন সংস্করণ

একাত্তরের সেপ্টেম্বর এলেনস গিন্সবার্গ প্রত্যক্ষ করেন। মুক্তিযুদ্ধের  কারণে মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট-যন্ত্রণায় ব্যথা নিঃসৃত কলমে রচনা করেন -"যশোর রোড"-- কবিতা। পরবর্তীতে ভাষান্তরে মৌসুমী ভৌমিকের কন্ঠে ---"সেপ্টেম্বর --হায় একাত্তর "-- আজও শিহরিত করে সবার চেতনাকে। সেপ্টেম্বর -একাত্তর পুরো যুদ্ধকালীন সময়ের একটা প্রতীকী মাস। যেহেতু কবিতা, তাই সবকিছু বিশদ বর্ণনা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড়ো খেসারত দিয়েছে এদেশের নারীসমাজ। ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে লক্ষ লক্ষ মা -বোন।  তবু্ও মুক্তির স্বপ্ন থেমে থাকেনি। যুদ্ধ আর মৃত্যুকে সাথে নিয়েই স্বপ্ন দেখা লক্ষ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ। স্বস্তি আর শান্তি ছিল এটুকুই। 

কিন্তু স্বাধীন দেশে সেটুকুও বিপন্ন হয়েছে বারবার। নানাভাবে -নানাপথে। ধারাবাহিক ভাবে রয়ে গেছে নারী ও কন্যা শিশুর ওপর হানাদার বাহিনীর মতো নিষ্ঠুর বর্বরতা। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীসমাজ আজও নিরাপত্তাহীন। অথচ প্রায় পঞ্চাশ বছরে এই দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল বলে প্রচারিত। জীবন যাত্রার অভূতপূর্ব মান বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, মিলিওনার -বিলিওনারের সংখ্যা বৃদ্ধি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জন্য একটা দৃষ্টান্ত। আর এই বর্ধিতকরণের অগ্রযাত্রায় নারীর শ্রম শুধু সম নয়, কোথাও কোথাও বেশি। সরকারি - বেসরকারি বিভিন্ন খাতে যে কোন চ্যালেঞ্জিং পদে নারী কাজ করে যাচ্ছে। এই পদায়ন নারীকে অপেক্ষাকৃত আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রা রুখতে আজও নারী কেন নির্মম সহিংসতার শিকার?  কেন  বারবার বিভিন্ন সরকারের আমলেই নারীকে ঘরবন্দী করার অদ্ভুত এক পাঁয়তারা?  করোনাকালীন জাতীয়, বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সময়েও অনেক কিছু থমকে গেলেও নারীর প্রতি এই বর্বরতা থেমে নেই। অপেক্ষাকৃত বেড়েছেই বলতে হবে। 

নারী নির্যাতনের অনেক ধরণ -ধারণ বাদ দিয়ে আজ শুধু ধর্ষণ জনিত রিরংসার মাঝেই সীমিত আলোকপাত করতে চাই। তাও সীমিত সময়কে নিয়ে। মানে এই বিশবিশকে ঘিরেই। বছরের প্রথম আট মাসে ধর্ষণ , দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত হত্যার রেকর্ডকৃত সংখ্যা ৮৮৯ জন। অর্থাৎ মাসিক গড় ১১১ জন। হত্যা ৪১ জন।  আর এই সেপ্টেম্বরে ধর্ষকামী গোষ্ঠী যেন এক উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় নেমেছে মনে হয়।  ধর্ষণ  বৈচিত্র্য   কত রকমের তাও দেখা যাচ্ছে। 
মাসের প্রথম দিক সাভারে ১৪ বছরের নীলা রায় কে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করতে না পারায় রিক্সায় ভাইয়ের পাশ থেকে টেনে বীভৎস হত্যার ঘটনা বিচলিত করে সবাইকে। এর রেশ কাটতে না  কাটতেই শুরু হয়  ধর্ষণের সেই অপ্রতিরোধ্য স্রোত। খাগড়াছড়ির আদিবাসী কিশোরীর নিজ ডেরায় দলবদ্ধ ধর্ষণের জেরে ক্ষতবিক্ষত দেহের রক্তস্রোতের ছবি  আর মা -বাবার কাঁধে ভর দিয়ে সেই কিশোরীর ন্যূব্জ রক্তাক্ত দেহ  দেখে শিউরে উঠেছে অনেকেই। লজ্জিত হয়েছে পুরো জাতি। ৭ সেপ্টেম্বর এক নারী  পোশাক শ্রমিককে জোর পূর্বক ধর্মান্তকরণ আর ধর্ষণ, ভোলার মনপুরায় দলবদ্ধ ভাবে কিশোরী ধর্ষণ,  বরিশালগামী লঞ্চের কেবিনে ধর্ষণ ও হত্যা, তেরোখাদায় পুলিশ বাহিনীর কর্মচারীর চতুর্থ শ্রেণীর শিশু ধর্ষণ,  চট্রগ্রামের লোহাগাড়ায় ইউ পি সদস্যের বিধবা যুবতী ধর্ষণ,  শ্বশুর ও ভাসুরের বিরুদ্ধে দুইটি ভিন্ন ঘটনায় ভিন্ন স্থানে ধর্ষণের অভিযোগ, নাটোরের রাইগ্রামে ও চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ এর দুইটি ভিন্ন ঘটনায় পিতার বিরুদ্ধে কন্যার ধর্ষণের অভিযোগ, চাপাই নবাবগঞ্জে তেরো বছরের ধর্ষণের শিকার কিশোরীর আত্মহত্যার আর এক কারণ প্রভাবশালীরা পরিবারকে টাকার বিনিময়ে আপোষে বাধ্য করা,  ফরিদপুর থেকে প্রেমিকাকে বেড়াতে নিয়ে গাইবান্ধায় দলবদ্ধ ধর্ষণ,  কলেজ বন্ধ থাকা অবস্থায় সিলেটের এমসি কলেজ প্রাঙ্গণে নববিবাহিতা দম্পতি বেড়াতে গেলে ছাত্রাবাসে থাকা প্রভাবশালী ছাত্র নেতারা স্বামীকে তালাবদ্ধ রেখে তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় স্তম্ভিত বাংলাদেশ। না, এরপরেও থেমে নেই ঘটনা প্রবাহ। নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জে সন্তানের সামনে মাকে পালাক্রমে ধর্ষণ, চারজন ছাত্রীকে টিকটক এপের মডেল সেজে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দিন ধর্ষণের সিরিয়াল রেপিস্ট রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে আটক,   মাসের শেষদিনের প্রথম পাওয়া ঘটনা --রাজশাহীর তানোরা উপজেলায় তিনদিন এক গীর্জায় আদিবাসী কিশোরীকে আটকে রেখে ফাদারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ। বাকি কয়েক ঘন্টায় আর কী খবর পাওয়া যাবে, জানি না। উল্লেখিত সব ঘটনাই  বিভিন্ন পত্র - পত্রিকার। অনুল্লেখিত আরও ঘটনা আছে কীনা জানার দরকার নেই। যা পাওয়া গেল, তাই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই একটা মাসকেই বছরের প্রতীক হিসেবে আমরা ভাবতে পারি।  

বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরণের মাদকের জমজমাট বাজার ও ব্যবসার  কেন্দ্র। সাথে লাগামহীন পর্ণ ছবির দাপট। সাইবার ক্রাইম বাড়ছে উদ্বেগজনক ভাবে। সেইসাথে ভোগবাদী সমাজের অবাধ হাতছানি।  আছে পুঁজিবাদী বিশ্বের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় নামা ক্ষমতাবলয়ের অবাধ দূর্ণীতি। নিজেদের টিকে থাকার জন্য যাদের মধ্যস্বত্বভোগী এক সন্ত্রাসী বাহিনী টিকিয়ে রাখতে হয়। এই দূর্ণীতিবাজ ক্ষমতাশালীদের আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে যারা অচিরেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ইম্পিউনিটি বা দায়মুক্তির অজস্র নিদর্শন এদের চোখের সামনে। আইন ও বিচারবিভাগকে পরোয়া করতে হয় না এদের। সব মিলিয়ে যা হবার তাই আগেও হয়েছে, এখনও হয়েই যাচ্ছে। তাই বিকৃত যৌন উন্মাদনা ও লালসা ধর্ষণের কারণ,  পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গতন্ত্র ধর্ষণের কারণ হিসেবে বিবেচিত হলেও সর্বক্ষেত্রে এক কথায় প্রযোজ্য নয়। এই সেপ্টেম্বরের অভিযুক্তদের অধিকাংশই সরকারি দলের ক্ষমতাবাজদের ছত্রছায়ায় লালিত - পালিত। যা খুশি করার একটা অনুচ্চারিত লাইসেন্স এদের আছে।  বেগতিক অবস্থায় সাহেদ - পাপিয়ার মত মাথার ওপরের ছায়া কখনও যে সরে যেতে পারে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের উন্মাদনায় একথা কারও মনে থাকে না।   এরশাদ সিকদার, বাংলা ভাই  বিভিন্ন নজির চোখের সামনে থাকা স্বত্বেও। দূর্নীতির দুর্বৃত্তায়ন ছাড়া ক্ষমতাশালীদের টিকে থাকা কঠিন। আর এই প্রভাবশালীরা টিকে থাকে  বিভিন্ন  আমলে সরকারের  সাথে আঁতাতে। পুঁজিবাদী ধারার রাষ্ট্রীয় চরিত্র যার পোষকতা করতে বাধ্য। 

দ্রুত রাষ্ট্রের চরিত্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে এমন ভাবার কোন সুযোগ এখন নেই। প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থাকে অপেক্ষাকৃত  স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রেখে প্রমাণিত অভিযুক্তদের যথাসম্ভব দ্রুততায়  শাস্তি হোক, সেটাই চাওয়ার। এক ধরণের আবেগপ্রবণ নর -নারী আছে, যারা জনসমক্ষে নানা ধরণের শাস্তি দাবি করে। এর একটা খারাপ দিক আছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে এমন কোন আইন উদ্ভাবন যাতে তরান্বিত না হয়, যা নারী এবং সামগ্রিক সমাজকে পেছনে নিয়ে যায়। আমাদের সাংবিধানিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কোন কিছু ভুলেও প্রত্যাশা করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে উগ্র মৌলবাদী অপশক্তি যে কোন সময় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তারচেয়ে বরং প্রকৃত অর্থে সামগ্রিক ক্ষেত্রে জনসচেতনতা গড়ে তোলা অতি জরুরি। শুধু সরকার, শুধু কিছু সংগঠন, শুধু কিছু ব্যক্তি নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে ভাবার সময় এসেছে, --"দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। "-- দেশকে আপন করতে নিজেদের অন্তর শক্তির দায় -দায়িত্বও নিশ্চিত করতে হয়। অভিযুক্তরা কেউই  শত্রু কোন দেশ থেকে আমদানি হয় নাই। তাদের নষ্ট -ভ্রষ্ট হবার নিত্য উপাদান আমাদের সবার চোখের সামনে বিদ্যমান। আত্মকেন্দ্রিকতা আর ভয় নিয়ে বসে থাকলে হবে না। নারী -পুরুষ নির্বিশেষে উপলব্ধি করতে হবে, ঘর আর বাহির দুইই এখন নারীর জীবনে শ্বাপদসংকুল হয়ে গেছে। নারী মানেই সংশ্লিষ্ট পরিবার। পরিবার মানেই সব বয়সের, সব লিঙ্গের, সব ধর্মের মানুষের ভোগান্তি। 

আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য নারী সংসদ সদস্য, এবং উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তা আছেন।৷ তারা ক্ষমতা আর পদের আনুগত্যর বাইরে আসবে না।  রাষ্ট্র ও সরকারের চরিত্র দিয়েই সকল অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। তাদের কার্যপরিধির সীমারেখা আমরা জানি। তাই সেপ্টেম্বর--হায় একাত্তর গেয়েও মানুষ যেমন যুদ্ধ করেছে, এখনকার অবস্থাও অনেকটাই তেমন। সেপ্টেম্বর --হায়  বিশবিশ দীর্ঘশ্বাস ফেলেও সকল দূর্নীতি, দুরাচার, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে  সচেতনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।" বিষকে বিষের দাহ দিয়ে দহন করে মারতে হবে "---  এই বিশবিশে সেটাই  নাহয় আমরা ভাবি। 

লেখক : আবোল-তাবোল শিশু সংগঠনের সভাপতি।

এই বিভাগের আরো সংবাদ