ভারত-চিন দ্বন্দ, কোয়াডের বাস্তবতা, নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও বাংলাদেশের নেতৃত্ব

  এস. রায় মজুমদার

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

লেখক
কিসিন্জারের কুখ্যাত ‘বাস্কেট কেস’ ন্যারেটিভ বাংলাদেশের জন্য বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব নেবার ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল এক কৃত্রিম বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। সেসব এখন অতীত। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন এক নয়া মেরুকরণের মুখোমুখি, এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্য অপেক্ষমান এক টালমাটাল বিশ্বকে সঠিক নির্দেশনা দেবার জন্যে কতখানি প্রস্তুত, সেটিই জাতির সামনে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যেসব স্বভাব-সংশয়বাদীরা আমার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকাচ্ছেন, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই যে বাংলাদেশ জন্ম থেকেই বিশ্বমিডিয়ায় হেডলাইন হয়ে অভ্যস্ত। বঙ্গবন্ধুর গগনস্পর্শী ক্যারিশমা নিয়ে ঘোরতর সংশয়বাদীরও সন্দেহ থাকার কথা নয়। একটি ছোট ঘটনার উল্লেখই এপ্রসঙ্গে যথেষ্ট হবে মনে করি। ভারতের প্রাক্তন বিদেশ সচিব এবং মনমোহন সিংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জে. এন. দিক্ষিতের ১৯৯৯ সালের বই (Liberation and Beyond: Indo-Bangladesh Relations 1971–99, Konark Publishers. 1999.) থেকে বলছি। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ঘুরে বৃটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের বিমানে দিল্লী হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফেরেন বলে আমরা সবাই জানি। যেটুকু অনেকে জানি না তা হলো, ঐ একই যাত্রায় দিল্লী থেকে কোলকাতা পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীও বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়। সংক্ষিপ্ত সে যাত্রা বিরতিতে বঙ্গবন্ধু ইচ্ছা প্রকাশ করেন এককোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া পশ্চিম বাংলার বাংগালিদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা জানাতে। ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সেদিন যথারীতি কলকাতা গড়ের মাঠে ইন্দিরা গান্ধীর জন্য এক পূর্বনির্ধারিত জনসভায় তাঁকে সে সুযোগ করে দেয়া হয়। সেটি ছিল আসন্ন নির্বাচণী মওসুম। বক্তব্য শুরুর আগে বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জানতে চান যে তিনি শ্রীমতি গান্ধীর পক্ষে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি করে দেবেন কি-না, যেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে গান্ধী নিসংশয় থাকতে পারেন। ইন্দিরা গান্ধী কি উত্তর দিয়েছিলেন, জানা যায় না। তবে দিক্ষিত বঙ্গবন্ধুর হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর পর্যবেক্ষণ সেখানে হাজির করেছেন। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলছেন যে তিনি তখন শ্রীমতি গান্ধীর চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে যেন এই অভিব্যক্তি স্পষ্ট: এই মানুষটিকে আমি পাকিস্তানের জেলখানায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে দুনিয়ার তাবড় নেতাদের ঘোল খাইয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের হাতে পৌছেঁ দিতে যাচ্ছি। এখনও সে নিজ দেশের মাটিতে পা রাখেনি। আর এখনই কিনা সে ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর নিজের দেশের নির্বাচনে জিতিয়ে দেবার মত ক্যারিশমা এবং আত্মবিশ্বাস পোষণ করে! বিশ্ব রাজনীতিতে এই নেতা না জানি কোথায় গিয়েপৌঁছবে! দীর্ঘদিন আগে পড়া বলে স্মরণ থেকে অনুবাদেউল্লেখ করছি। পৃষ্ঠানম্বর সহ যথাযথ উদ্ধৃত করতে পারছি না বইটি হাতে না থাকায়। তবে যাঁরা পড়েছেন, ঠিকই বুঝছেন যে আমি সঠিক বলছি।

পঁচাত্তরের পনরই আগস্ট মানবাকৃতি পশুরা বঙ্গবন্ধুকে অকালে হত্যা না করলে আধুনিক বিশ্ব এশিয়ান ঐতিহ্যের পথ ধরে গান্ধী, নেহরু, সুকর্ণ, নাসেরদের কাতারে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে নি:সন্দেহে পেয়ে যেত আমাদের গর্ব হিসেবে আরও এক মহান বরনীয় বিশ্ব নেতাকে। স্বাধীনতার পর পরই জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণ তা প্রমান করে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর উক্তি তা প্রমান করে। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যুগপৎ আমন্ত্রণের উত্তরে বঙ্গবন্ধুর ‘সুইজারল্যান্ড’ থাকার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে উদীয়মান বিশ্বনেতৃত্বের বিচক্ষণতার প্রমান মেলে। জাতির মহা দুর্ভাগ্য, সে অমিত সম্ভাবনা তখনকার মত হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রমানিত বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এশিয়ার পূর্বগৌরব ফিরিয়ে আনতে পারেন। বিশেষত সাম্প্রতিক ভারত-চিন দ্বন্দের সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া হিসেবে এশিয়ায় এবং পুরো বিশ্বে নয়া মেরুকরণের জোরালো ইংগিতের প্রেক্ষাপটে সে সম্ভাবনা আরও বেশি প্রবল বলেই প্রতীয়মান। আজকের প্রসঙ্গ সেটাই।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অমেরিকার বিপরীতে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে চিনের উত্থান-সম্ভাবনা শি জিন পিং নিজের হাতেই শেষ করছেন। এ প্রসংগে আরও কিছু বলার আগে একটু পেছনে যেতে হচ্ছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েতের পতনের পর একমেরু বিশ্বে একচ্ছত্র আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে দাপট দেখানোর পর দৃশ্যত খরচ কমাতে শাসক পাল্টানো (Regime change)নীতি থেকে সরে আসতে থাকে। বিশেষ করে এশিয়ায়। বুদ্ধিটা ছিল হোয়াইট হাউসের ডাকসাইটে পলিসি প্ল্যানার এবং ‘সভ্যতার সংঘাত’-খ্যাত স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের এককালের দাপুটে সহকর্মী জিবিগনিউ ব্রজেজিনস্কির (Zbigniew Brzezinski). ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গ্রান্ড চেসবোর্ড’ (The Grand Chessboard) বইতে জিবিগনিউ প্রথম ‘ইউরেশিয়ান বলকান্স’ (Eurasian Balkans) কথাটা ব্যবহার করেন। বলকান অঞ্চলের দেশগুলোতে শক্তি প্রয়োগ না করে বরং অভ্যন্তরীন সাংস্কৃতিক/ধর্মীয় ওলট-পালট লাগিয়ে দিয়ে কাজ উদ্ধারের পরামর্শ দেন তিনি। পরবর্তীতে রাশিয়া এবং চিন ‘ইউরেশিয়ান’ কথাটি এবং ধারণাটি নিয়ে নেয়। জিবিগনিউয়ের তত্ত্বের পাল্টা হিসেবে তাঁরা ‘ইউরেশিয়ান ব্রাদারহুড’ ধারণাটি বাজারে চালাতে শুরু করে। চিনের ’বেল্ট এন্ড রোড’  নামে তথাকথিত মেগাপ্রকল্পের সাথে গুলে সেটি বাজারজাতকরণের চেষ্টা চলে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, লাওস সহ আফ্রিকার দেশে দেশে চিনের ‘ঋণ ফাঁদ’ বিপদজনক ভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়তে শুরু করলে ‘ইউরেশিয়ান ব্রাদারহুড’ বেশ বড় ধাক্কা খায়। ইতোমধ্যেই নিজের অথরিটারিয়ান কর্তৃত্ববাদ প্রয়োগ করে শ্রম শোষণের মাধ্যমে নিজেকে ’গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ এবং ’গ্লোবাল সাপ্লাই চেনের’ সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে চিন। ১৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বনে গিয়ে রাশিয়ার মত প্রভাবশালীদের ঋণ দিয়ে কিনে ফেলে একরকম ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে ড্রাগন। 

মার্কিন জোটের সামগ্রিক অর্থনীতির রমরমা পড়ে যাওয়ায় এবং ট্রাম্পের আমেরিকা তার মিত্রদের নিরাপত্তায় কম গুরুত্ব দিয়ে বরংঘর গেছানোতে নজর দেয়ায় চিনঅনেকটা ফাঁকা মাঠে দক্ষিণ চিন সাগরে নিজের মোড়লগিরি কায়েম করার পথে নামে। নিজের কেবল পেছনে অনুসরণ করা সামরিক ও উদিয়মান অর্থনীতির এশিয় প্রতিবেশি শক্তি ভারতকে বিবেচনায় নিতে চায়নি চিন। পাকিস্তানকে ঋণের ফাঁদে অনেকটা কিনে ফেলে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার নীতিতে অগ্রসর হতে থাকে ড্রাগন। ভারতকে বাইপাস করে একচিটিয়া নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সামরিক কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করার শি জিন পিংয়ের নীতির বিরুদ্ধে বাগড়া দেয়ার চেষ্টা করেছে ভারত। চিন তাতে আমল না দিয়ে গায়ের  জোর খাটিয়ে সোজা করার নীতি নিয়েছিল। কারণও ছিল। স্বাধীনতার পর নেহরুর আমল থেকেই ভারত চিনের স্বার্থকে চ্যালেন্জ করে কোন নীতি নেয়নি। দালাইলামাকে আশ্রয় দিয়েও তিব্বত, এমনকি হংকং ও তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও ‘এক চিন’ নীতি মেনে এসেছে। ভিয়েতনামের অনুরোধ সত্বেও চিনের বুলিংয়ের বিরুদ্ধে বন্ধুর সহায়তায় যুদ্ধ জাহাজ পাঠায়নি। আমেরিকার ক্রমাগত অনুরোধ উপেক্ষা করে ‘ইন্ডো-প্যাসিফিক’ (Indo-Pacific)-এ আমেরিকা-ভারত-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবিত ‘সামরিক’ জোট ‘কোয়াড’(QUAD. বিস্তারিত দেখুন: https://nationalinterest.org/feature/return-indo-pacific-quad-26891) কার্যকর করতে বিরত থেকেছে। সত্তর বছর ধরে কোন চ্যালেন্জে না যাওয়া ভারতকে চিন ধরেই নিয়েছিল যে ঐতিহ্যগত জোটনিরপেক্ষ অবস্থান ছেড়ে ভারত কখনও আমেরিকার জোটে যাবে না। তাছাড়া, ভারতের সামরিক সরবরাহ শুরু থেকেই সোভিয়েত এবং পরবর্তীতে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং তথাকথিত ‘ইউরেশিয়ান ব্রাদারহুড’-এর খাতিরে হলেওভারতকে ন্যুনতম আস্থায় নেয়ার ধার না ধেরে চিন বরং ‘বেয়াড়া’ ভারতকে গালোয়ান স্টাইলে শায়েস্তা করার পথে পা বাড়ায়। আর তাতেই ধরা।

’প্যানডোরার বাক্স’ খুলে ফেলেছে চিন। ভারতকে শায়েস্তা করতে গিয়ে এখন জিন পিং শুধু নিজের চিনকেই নয়, বরং পুরো বিশ্বকেই এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা এশিয়ার। চিনের নিজের বুলি ইউরেশিয়ান ব্রাদারহুডের হাতে হারিকেন তো উঠেছেই, সেইসাথে নিজের চামড়া বাঁচানো দায় হয়ে ওঠে কিনা সন্দেহ। গালোয়ান হামলার পর সারা বিশ্ব থেকে যে বার্তা পাচ্ছে চিন, তাকে বিপর্যয়করই বলা চলে। যে চিন ২০১৫ সাল থেকে নির্বিঘ্নে দক্ষিণ চিন সাগরে কৃত্রিম দ্বিপ বানিয়ে প্রতিবেশিদের একরকম ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে নিজে গেড়ে বসেছিল, হঠাৎ আমেরিকা সেখানে বিমানবাহী নৌবহর পাঠিয়ে চিনের মোড়লিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে। পালে হাওয়া পেয়ে ভারত প্রথম বারের মত চিনের অধিকারের দাবী চ্যালেন্জ করে দক্ষিণ চিন সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। চিনকে প্রকাশ্যে চ্যলেন্জ করেছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। চিন-নির্ভর সাপ্লাই চেনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে চিন থেকে ব্যবসায় গুটিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশে নিয়ে যেতে শুরু করেছে জাপান এবং আরও অনেকে। চিনের চোখ রাঙানি সামাল দিতে ভারত থেকে ব্রহ্মস ক্রুজ মিসাইল কেনার চুক্তি করছে ইন্দোনেশিয়া। এমন যে ফিলিপাইন কম্যুনিস্ট চিনের অনেক কাছাকাছি ছিল, চিন তাঁকেও ছাড় দেয়নি। আগ্রাসী হয়ে ফিলিপাইনের সমুদ্র এলাকা দখলে রেখেছে আন্তর্জাতিক আদালতে ফিলিপাইনের মামলা জেতার পরও। এখন সুযোগ বুঝে ফিলিপাইনও ড্রাগনের বিরুদ্ধে ফণা তুলছে। বৃটেন এবং ফান্স প্রথম থেকেই ভারতকে নিয়ে আমেরিকার ‘কোয়াড’ জোটের ধারণাকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। ইউরোপে চিনের স্বার্থের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল জার্মানি। চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সর্বশেষ ইউরোপ সফরে হল্যান্ডের পর জার্মানিও হংকং পদক্ষেপের কারণে চিনকে হতাশ করে ফিরিয়েছে। শুধু তাই-ই নয়। জার্মানি প্রথমবারের মত ইন্ডো-প্যাসিফিকে ’কোয়াড’ জোটকে সমর্থন করে বিবৃতিও দিয়েছে। ভারতের পর আরও অনেকেই নিরাপত্তা ঝুঁকির অজুহাতে চাইনিজ অ্যাপ নিষিদ্ধ করতে শুরু করেছে। হুয়াওয়ে তো আগেই নিষিদ্ধ। এমনকি রাশিয়াও নিজের ব্রেন চাইল্ড ‘ব্রিক’ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না) এর স্বার্থে ভারতের সাথে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চিনকে চাপ দিচ্ছে। শুধু তাই-ই নয়। চিনের স্বার্থ উপেক্ষা করে চিন-শত্রু কোয়াডের বড় সদস্য ভারতের সাথে মালাক্কা প্রণালীতে এই মুহূর্তে সামরিক নৌমহড়া দিচ্ছে রাশিয়া। ড্রাগনের অতিরিক্ত মাথাব্যাথার কারণ হয়ে শ্রীলংকার নির্বাচিত দুই ভাই চিন থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘ভারত-প্রথম’ বিদেশ নীতির ঘোষণা দিয়েছে গেলো সপ্তাহে। আরও আছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর মোক্ষম দাগাটা দিয়েছে থাইল্যান্ড। মালাক্কা প্রণালীতে ভারতীয় নেভির সম্ভাব্য হুমকি এড়াতে থাইল্যান্ডের মধ্য দিয়ে নিজের টাকায় মেগাখাল কে. আর. এ. (KRA) কেটে পার পেতে চেয়েছিল ড্রাগন। থাইল্যান্ড সে প্রস্তাব বাতিল করে সেই সাথে তিনটি চিনা সাবমেরিন কেনাও বাতিল করে দিয়েছে।সুতরাং বলাই বাহুল্য, লেজে-গোবরে করে ফেলেছে চিন।

বেকায়দা বুঝে এখন পিছু হটছে চিন। চাপে পড়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথের সাথে মস্কোতে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানিজেশন(SCO) সম্মেলনের সাইডলাইনে বৈঠকের প্রস্তাব পাঠায় চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। এশিয়াবাসী আশা করছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ বৈঠকে ভাল কিছু বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এশিয়ার জন্যে বিপদ বাড়িয়ে ভাল কিছু বৈঠকে ঘটেনি। মনে হচ্ছে চিনের বোধোদয় হতে দেরি হয়ে গেছে। কোয়াডের চার জাতি সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সম্মেলনের পর এখন সেপ্টেম্বরের শেষে দিল্লি সম্মেলনে ‘কোয়াড চার্টার’ চূড়ান্ত হবার সম্ভাবনা। আর তাই চিনা কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘গ্লোবাল টাইম্স’ এখন এশিয়ার স্বার্থ হানি করে আমেরিকার জোটে না যাবার জন্যে ভারতকে দিনে তিনবার করে সবক দিলেও ভারত তা আর কানে তুলছে বলে মনে হয় না। উল্টে রাজনাথ মস্কো থেকে ফেরার পথে অনির্ধারিত যাত্রা বিরতিতে তেহরানে ইরানী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে একঘন্টা কুড়ি মিনিট বৈঠক সেরে এসেছেন। চাবাহার বন্দর নিয়ে চিনের সম্ভাব্য সামরিক উচ্চাভিলাষের ব্যাপারে যে দুই নেতার মধ্যে আলাপ হয়নি, পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশেষ করে ভারত-ইরান দীর্ঘ সুসম্পর্কের ইতিহাস বিবেচনায়। 

এশিয়ার জন্যে সামনে বিপদাশংকা। এ অঞ্চলে ভারতের জোটনিরপেক্ষ নীতির কারণে ভারত মহাসাগর দীর্ঘকাল যাবৎ পরাশক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকতে পেরেছে। এক উদীয়মান পরাশক্তির গোয়ার্তুমি এশিয়ার দ্বিতীয় পরাশক্তিকে অমেরিকার নেতৃত্বে ইন্ডো-প্যাসিফিক সামরিক জোটে ঠেলে দিতে উদ্যত। ভারত মহাসাগরে পরাশক্তির, বিশেষত আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি চিন-ভারত-বাংলাদেশ সহ এশিয়ার কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। আর এখানেই কালবিলম্ব না করে যোগ্যতম এশিয় নেতৃত্বের এগিয়ে আসা সবচেয়ে জরুরী। কোথায় সেই নেতৃত্ব? বিবদমান দুই শক্তির বাইরে কে নিতে পারে মধ্যস্ততার ভূমিকা? পারমানবিক শক্তি পাকিস্তান? সে তো ব্যর্থতার খাতায় নাম লিখিয়ে চিনের ঋণে বাঁধা পড়ে দাসখত দিয়ে বসে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের কোন নেতৃত্বের সে গ্রহণযোগ্যতা দৃশ্যমান নয়। জাপান-অস্ট্রেলিয়া তো পক্ষ নিয়েই ফেলেছে। বাকি থাকে মহাথির। রাজনীতির বাইরে তিনি। তাছাড়া বয়সও তাঁর বড় বাধা। দেশীয় ও বৃহত্তর আঞ্চলিক নেতৃত্বের সকল প্রমানিত যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে এই দু:সময়ে এশিয়ার ত্রানকর্তা হয়ে বিশ্বসংকটের এই ক্রান্তিকালে ঐতিহাসিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন বিশ্বমঞ্চে ইতোমধ্যেই নজর কাড়া উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের সফলতম রাষ্ট্রনেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের ভাষ্যকার।

এই বিভাগের আরো সংবাদ