একটি সুইসাইডাল নোট ও আমাদের বিবেক

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০১৮, ১৭:২১

লীনা পারভীন, ২৭ জুলাই, এবিনিউজ :  “আমার Suicide করার কারণ একমাত্র রিমি মেডাম। সে শুধু আমাকে দেখে তার জিদ কমানোর জন্য। সে অযথা পরীক্ষায় আমার খাতা নিসে। আর পরীক্ষায় কম নাম্বার দিসে। তোমরা যদি পার তাহলে সে মেডামের মানসিক চিকিৎসা দাও। Mental Hospital এ পাঠাও। মেডাম আমারে অভিশাপ দিসে, তাই আমি ভালো result খারাপ হইছে। Maliha”
এটি একটি সুইসাইডাল নোট। জ্বি পাঠক এটি ১৪ বছরের সুমাইয়া আক্তার মালিহা নামের এক স্কুল ছাত্রীর সুইসাইডাল নোট। মালিহা শহীদ ফারুক ইকবাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়তো। শাহজানপুরে বাবা মায়ের সাথে বাস করতো সে। স্কুলের এক শিক্ষিকার খারাপ আচরণে অপমানিত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ বাসায় ফ্যানের সাথে ঝুলে গলায় ফাঁস দিয়ে নিজেকেই সরিয়ে দিয়েছে এই পৃথিবী থেকে।
সংবাদটি যখন পড়ছিলাম তখন আমার চোখের সামনেই ভেসে উঠলো মালিহারই বয়সী আমার দুই ছেলের মুখ। তারাও দশম শ্রেণিতে পড়ে। আমার ছেলেরা আমার সাথে বন্ধুর মতই। নিজে একজন কর্মজীবী মা হিসেবে সবসময় চেষ্টা করি সন্তানদের সবটুকু তাদের মত করে দিতে। যখনই সময় পাই তার পুরোটাই বাচ্চাদের সাথে দেয়ার চেষ্টা করি।
সারাদিন তাদের সাথে ফোন ব্যতিত যোগাযোগ হয় না। সন্ধ্যায় যখন কর্মক্লান্ত হয়ে ফিরে আসি তখন ছেলে দুটো দরজা খুলেই যখন আমার গালে চুমু দিয়ে বলে হাই, মা, তখন মনে হয় এরাইতো আমার পৃথিবী। আমার জীবন, আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা। সংসারের হাজারও না পাওয়ার মাঝে এরাই আমাকে শক্তি ও সাহস দেয়। ছেলেদের যত আলাপ, অভিযোগ সবই আমাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। চেষ্টা করি তাদের সারাদিনের রুটিনকে শেয়ার করতে।
সেদিন খাবার টেবিলে যখন আমার ছেলেরা জানালো যে তাদের স্কুলের একজন শিক্ষক তাদের প্রতি নেতিবাচক আচরণ করে তখন ছেলেদের বুঝিয়েছি অন্যভাবে। বুঝিয়েছি শিক্ষকরা হচ্ছেন গুরুজন। তাদের সাথে যেন ভুলেও বেয়াদপি না করে। হয়তো তিনি তাদের ভালোর জন্যই বলেন হয়তো আমার ছেলেরাই ভুল বুঝে। স্কুলের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময় নানা বিতর্কিত রাজনৈতিক আলাপ করেন বলেও শুনেছি।
একদিন ভেবেছিলাম স্কুলে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবো। পরে আবার ভেবেছি যদি সেই শিক্ষক ভালোভাবে না নেয় তাহলে ফলাফল উল্টোটাও হতে পারে। যেমনটা ঘটেছিলো মালিহার ক্ষেত্রে। শিক্ষিকা রিমির বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করেছিলো মালিহা। কিন্তু কিছুই হয় নি।
ভেবেছি আর কদিনইবা আছে। থাক, মানিয়ে নিয়ে চলুক। ওদের প্রিটেস্ট চলছে। সেদিন এসে অভিযোগ করলো সেই টিচার সবাইকে রেখে তাদের খাতা সবার আগে নিয়ে নিয়েছে বলে তারা ফুল মার্ক্স উত্তর দিতে পারেনি। একে নিজের সময় নেই স্কুলে গিয়ে সকল বিষয়ে দেখভাল করতে তার উপরে আবার যদি পাল্টা প্রতিশোধ নেয় ছেলেদের উপর তখন সামলানো আরও কঠিন হবে।

ঠিক এই সময়েই পত্রিকায় মালিহার এই সংবাদ। আমি সত্যি আতংকিত হয়ে পড়েছি। আমি জানি আমার মত আরও অভিভাবকদেরও একই অবস্থা। মালিহার পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের ব্যবসা শিক্ষার শিক্ষক পরীক্ষার খাতা টেনে নিয়ে যান এবং এতে করে মালিহা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে কারণ সে ধরেই নিয়েছে তার পরীক্ষার ফল খারাপ হবে। ঘটনাটি মিরাকল মনে হলেও একদম আমার ছেলেদের ঘটনার সাথে মিলে যায়।
প্রশ্ন আসে, আমাদের মত অভিভাবকরা তাহলে কার উপর নির্ভর করবে? বিদ্যালয়কে ধরা হয় পৃথীবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। এই স্কুল কলেজেই আমাদের সন্তানেরা শিখে কেমন করে মানবিক মানুষ হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। আধুনিক ও একক সমাজব্যবস্থায় যেখানে সন্তান কেবল মা আর বাবাকেই চিনে আর কোন আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ থাকে না বললেই চলে।
বাবা এবং মা দুজনেই কর্মজীবী এমন পরিবারের সংখ্যাই এখন বেশী। আমার জমজ দুই ছেলে ছোটবেলা থেকেই গৃহকর্মীদের কাছেই বড় হয়েছে। সেখানে আমরা অভিভাবকরা একটি ভালো স্কুলে সন্তানদের পাঠাই কিছু ভালো শিক্ষা পাবে এই আশায়। আমরা যা দিতে পারিনা শিক্ষকরা সেই ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু সেই শিক্ষক যদি আমাদের সন্তানদের হন্তারক হিসেবে সামনে আসে তাহলে আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া আর কী উপায় আছে আমাদের?
আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এমনিতেই বেহাল অবস্থা। একদিকে বহুমূখী শিক্ষা আরেকদিকে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মনিটরিং নাই বললেই চলে। যে যেভাবে পারছে স্কুল কলেজের অনুমতি নিচ্ছে। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কোমলমতি শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসছে।
একটা সময় যখন শিক্ষক মানেই ছিলো সবচেয়ে সম্মানের, সবচেয়ে জ্ঞানী ও সবচেয়ে বেশি অনুকরণীয় চরিত্র সেখানে এখন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর অভিযোগ থেকে ছাত্র ছাত্রীদের আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। সমাজের এই স্বীকৃত অংশটিরই যদি হয় এই অবস্থা তাহলে অন্যান্যদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

জানা গেছে সেই শিক্ষিকা কেবল মালিহা নয়, অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথেও খারাপ আচরণ করেন। তার মানে এটা প্রকাশ্য ঘটনা। তাহলে স্কুল কর্তৃপক্ষের কী কোন দায়িত্ব নেই? যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো সেটি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়াই উচিত।
এই ঘটনা আমাদেরকে কয়েকটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে। সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে একটি মনিটরিং সেল বসানো এখন সময়ের দাবি। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষার জন্য মনোবিদ নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে কেবল শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদেরও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ রাখতে হবে।
আমাদের সমাজে নানা প্রকার জটিলতার মধ্যে দিনে দিনে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেই কোন বিনোদনমূলক কার্যক্রম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার পাশাপাশি বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা যাতে করে তারা কেবল পাস ফেইল নিয়েই ব্যস্ত না থাকে। তাদের অন্যান্য সুপ্ত প্রতিভার প্রকাশেরও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাঠ্যসূচিকে জীবনমুখী করে সাজাতে হবে।
সবশেষে সরকারের কাছে একটা দাবি করতেই চাই একজন অভিভাবক হিসেবে, শিক্ষক নিয়োগের সময় তার সাইকোলজিক্যাল টেস্টকে বাধ্যতামূলক করুন। আমরা চাইনা আর কোন মালিহা নিজেকে এভাবে জীবনকে চেনার আগেই শেষ করে দিক। দৃঢ় বিশ্বাস সেই শিক্ষক কোন না কোন কারণে ব্যক্তিগত জীবনে স্বাভাবিক নয় এবং এরই প্রতিফলন হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ ব্যবহার। একজন শিক্ষকতো তার শিক্ষার্থীদের কাছে মায়ের আসনের থাকার কথা। তিনি কেন অযথা খারাপ আচরণ করবেন? (জাগোনিউজ২৪.কম থেকে সংগৃহীত)

লেখক : কলামিস্ট।

এই বিভাগের আরো সংবাদ