একজন মাহাথির ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০১৮, ১২:২৭ | আপডেট : ১২ মে ২০১৮, ১২:৪৫

ড. মইনুল ইসলাম, ১২ মে, এবিনিউজ : ৯ মে ২০১৮ তারিখে মালয়েশিয়ায় একটি অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়ে গেল, যার নেতৃত্ব দিলেন ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার চমকপ্রদ উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কিংবদন্তি নেতা, তদানীন্তন বিশ্বের সাড়া জাগানো মালয়েশিয়ার বহুল আলোচিত ও নন্দিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বিন মোহাম্মদ। মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমানকে ‘স্বাধীন মালয়েশিয়ার স্থপতি’ হিসেবে পরম শ্রদ্ধার আসনে অভিষিক্ত করা হলেও চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরকে ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক’ (ফাদার অব মডার্ন মালয়েশিয়া) নামে অভিহিত করা হয়। কারণ তাঁর অনন্যসাধারণ, পরম সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের গুণেই ওই ২২ বছরে এককালের পশ্চাত্পদ উন্নয়নশীল দেশ মালয়েশিয়া একটি আধুনিক ও উন্নত দেশের কাতারে নিজেকে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর ‘ভিশনারি’ কর্মসূচি ‘ভিশন টোয়েন্টি টোয়েন্টি’ সারা বিশ্বের জনগণের কাছে এক অতুলনীয় জাতি গঠনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসনীয় হয়ে থাকবে চিরদিন। আবার রাষ্ট্রক্ষমতাকে সমাজের আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মাহাথির যেভাবে মালয়েশিয়ার সবচেয়ে পশ্চাত্পদ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠী মালয়িদের অবিশ্বাস্য দ্রুততায় দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক আধুনিকায়নের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন, এটিও সারা বিশ্বের জনগণের উন্নয়নের চিন্তাধারায় একটি ‘নতুন প্যারাডাইম’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ আয় পুনর্বণ্টন ও সব ধরনের সুযোগের সমবণ্টন মালয়েশীয় সমাজে সবদিক থেকে এগিয়ে থাকা সংখ্যালঘু চৈনিক জাতিগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে সমাজের সংখ্যাগুরু মালয়ি জাতিগোষ্ঠীকে টেনে তোলার প্রক্রিয়া নয়। সমাজের সামষ্টিক আয়, সম্পদ ও শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়ে তোলার প্রক্রিয়াকে প্রবল গতিশীল করার মাধ্যমে ‘বৃহত্তর কেকের বৃহত্তর অংশ সমাজের সব জাতিগোষ্ঠীর ভাগে বেশি বেশি বণ্টনের’ নীতির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে আয়, সম্পদ ও সুযোগের পুনর্বণ্টনে কাউকে বেশি দিতে চাইলে কারো ভাগে কম পড়ার আশঙ্কা অমূলক। কারো কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অন্যের ভাগে বেশি দিতে চাইলে সমাজে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু ‘বৈষম্য নিরসনমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কৌশল’ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতি অবলম্বন করলে কোনো জাতিগোষ্ঠীকে বঞ্চিত না করেও পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীকে সামনের কাতারে তুলে আনা যায়। এ ‘ভিশনারি দর্শন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাহাথির যে মালয়েশিয়ানদের হূদয়ের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তারই জাজ্বল্যমান প্রমাণ এই ৯ মের সাধারণ নির্বাচন, যেখানে ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের পর ৬০ বছর ধরে নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ‘বারিসান নাসিওনাল’ (ইংরেজি অর্থ ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট) জোটকে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘পাকাতান হারাপান’ বিপুল ভোটে পরাজিত করে মালয়েশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিরোধী জোটকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীনের সুযোগ করে দিয়েছে। ‘পাকাতান হারাপান’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ইংরেজিতে ‘অ্যালায়েন্স অব হোপ’, বাংলায় ‘আশার জন্য ঐক্যজোট’। মালয়েশিয়ার ১ কোটি ৪৩ লাখ ভোটারের ৭৬ শতাংশ এ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। মোট সংসদীয় আসন ২২২টির মধ্যে বিরোধী জোট পেয়েছে ১২১টি সংসদীয় আসন, বারিসান নাসিওনাল পেয়েছে ৭৯টি আসন। মাহাথির দাবি করেছেন, তাঁর জোট এরই মধ্যে ১৩৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন পেয়ে গেছে। মালয়েশিয়ার বর্তমান সুলতান তাঁর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি মেনে নিয়ে ১০ মে ২০১৮ তারিখে মালয়েশিয়ার সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরকে শপথ পড়িয়েছেন। অতএব বিশ্বের সাম্প্রতিকতম ব্যালট বিপ্লবটি আপাতত সুসম্পন্ন হয়েছে।

অথচ ‘বারিসান নাসিওনাল’ জোটের প্রধান শরিক ‘ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন’, সংক্ষেপে ইউএমএনও ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাহাথিরেরও দল ছিল, ১৯৮১ সালে ওই দল থেকেই মনোনীত হয়ে পরপর পাঁচবার নির্বাচনে জিতে বারিসান নাসিওনাল জোটের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা-উত্তর ৬১ বছরের মধ্যে দীর্ঘতম সময়ের জন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং সফলতম প্রধানমন্ত্রী মাহাথির ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তাঁর জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকতেই স্বেচ্ছা অবসরে গিয়েছিলেন ২০০৩ সালে। এবারের নির্বাচনে পর্যুদস্ত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকও মালয়েশিয়ার অত্যন্ত ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। মাহাথিরের হাত ধরেই তাঁর ভাবশিষ্য ও উত্তরসূরি হিসেবে নাজিবের রাজনীতিতে আসা। নাজিব রাজাকের পিতা তুন আবদুর রাজাক হোসেন মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমানের উত্তরসূরি দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। নাজিব রাজাকের এক চাচা তুন দাতুক অন মালয়েশিয়ার তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এ রকম খানদানি রাজনৈতিক পরিবারের বংশধর নাজিব রাজাকের সৌভাগ্যের দরজা খুলে দিয়েছিলেন স্বয়ং মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে মাহাথিরের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁরই হাতে গড়া ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে মাহাথিরের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় কিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতিকে কেন্দ্র করে। ড. আনোয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাসের’ প্রবল সমর্থক ছিলেন। (১৯৭৭ সালের মে মাসে ড. আনোয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করে দেশে ফেরেন। আমি ১৯৭৫-৭৬ সালে কানাডা থেকে মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলাম। তাই সাড়ে চার মাস অত্যন্ত কাছে থেকে ড. আনোয়ারকে জানার সৌভাগ্য হয়েছিল।) ওই ঝগড়ার পেছনে মার্কিন কট্টর দক্ষিণপন্থী মহল এবং ইহুদিবাদীদের (জায়োনিস্ট) উসকানি ছিল, ড. আনোয়ারকে দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর পদে বসানোই তাদের এজেন্ডা ছিল। ওই সময় চলছিল পূর্ব এশীয় অর্থনীতিগুলোর ‘ফিন্যান্সিয়াল মেল্টডাউন’। হয়তো অনেকের মনে আছে, একজন ইহুদিবাদী বিলিয়নেয়ার জর্জ সরোস দম্ভভরে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিলেন, মাহাথির ক্ষমতায় থাকলে কিংবা তাদের কথামতো না চললে তিনি মালয়েশিয়ার মুদ্রা রিঙ্গিতের মানের ‘মেল্টডাউন’ ঘটিয়ে মালয়েশীয় অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবেন। কারণ তাদের দৃষ্টিতে মাহাথির একজন ‘অ্যান্টি-সেমিটিক’ মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক। যাহোক, মাহাথিরের সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে জর্জ সরোসের সে দম্ভোক্তি বিফলে গিয়েছিল। কিন্তু ড. আনোয়ারকে শায়েস্তা করতে মাহাথির ওই সময় তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার কোর্টে সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়। পরে ড. আনোয়ার একজন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং মাহাথিরের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক ঝড় তোলার প্রয়াসে লিপ্ত হন। ফলে সম্পর্কটা চরম বৈরিতায় পরিণত হয়। একই সঙ্গে ড. আনোয়ারের বেশকিছু সহযোগীর বিরুদ্ধেও নানা হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে মাহাথিরকে প্রচার-প্রপাগান্ডার শিকার হতে হয়েছিল, বিশেষত পাশ্চাত্যের জায়োনিস্ট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহল থেকে। এমনকি পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় তাঁকে একজন ডিকটেটর হিসেবে চিত্রিত করার একটি শক্তিশালী ‘চরিত্রহনন ক্যাম্পেইন’ও পরিচালিত হয়েছিল তাঁর সাহসী ও প্রতিবাদী ‘তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কের’ ভূমিকার কারণে। মজার ব্যাপার হলো, এসব প্রচার-প্রপাগান্ডা মাহাথিরের জনপ্রিয়তা কমানোর পরিবর্তে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল দেশে-বিদেশে। জনপ্রিয়তার শিখরে থেকেই তিনি রাজনীতি থেকে অবসর ঘোষণা করেছিলেন ২০০৩ সালে।

২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নিলেও বারিসান নাসিওনালের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ মাহাথিরের হাতেই ছিল ২০১৫ সাল পর্যন্ত। মাহাথির ক্ষমতা ছাড়ার সময় ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী পদটি যে আবদুল্লাহ বাদাওয়ির হাতে অর্পণ করে এসেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে অবস্থান নিয়ে তিনিই নাজিব রাজাককে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নাজিব রাজাক মাহাথিরের আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগের কারণে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ওয়ানএমডিবি (ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ) নামের একটি সরকারি বিনিয়োগ সংস্থা থেকে নাজিব ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের ব্যাপারটি সম্পর্কে, যার মধ্যে ৭০০ মিলিয়ন ডলার নাজিব রাজাকের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। ব্যাপারটি সম্পর্কে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তদন্ত শুরু হওয়ার পর সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়, যদিও নাজিব ওই অর্থ তাঁকে সৌদি আরব সরকার উপহার দিয়েছে বলে দাবি করেন এবং তিনি কোন দুর্নীতি করেননি বলে পুরো অভিযোগটি নাকচ করে দেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বারিসান নাসিওনাল মোট ২২২ সদস্য পদের মধ্যে ১৩৩ পদে জিতে আবারো সরকার গঠন করে, দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন নাজিব রাজাক। এ সত্ত্বেও ওই নির্বাচনে ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সারা দেশের পপুলার ভোটে বারিসান নাসিওনাল থেকে বেশি ভোট পেতে সমর্থ হয়, যদিও গ্রামাঞ্চলের ভোট ধরে রাখতে সমর্থ হওয়ায় বারিসান নাসিওনাল পার্লামেন্টে অনেক বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়ে যায়। কিন্তু নির্বাচনের পর ওই দুর্নীতির অভিযোগের সমর্থনে আরো জোরালো তথ্য-উপাত্ত পাওয়ায় অভিযোগটি দেশে-বিদেশে ক্রমেই ব্যাপক বিশ্বাসযোগ্যতা পেতে শুরু করে। অন্যদিকে অভিযোগ খণ্ডানোর অভিপ্রায়ে নাজিব নানা ধরনের কৌশল এবং আইনি ক্ষমতার অপব্যবহারের পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ব্যাপারটি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে সমকামিতা ও দুর্নীতির অভিযোগটি পুনরুত্থাপিত করে আবারো তাঁকে জেল খাটানো সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিকটু ছিল। ২০১৫ সালে স্বয়ং মাহাথির ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নাজিব রাজাকের পদত্যাগ দাবি করার পর দুজনের সম্পর্ক চরম বৈরিতায় পর্যবসিত হয়। এর ফলে নাজিব নানাভাবে মাহাথিরের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ শুরু করেন এবং তাঁকে আইনগতভাবে নাকাল করতে উঠেপড়ে লেগে যান। এ অবস্থায় ২০১৬ সালে মাহাথির বারিসান নাসিওনাল থেকে পদত্যাগ করে নতুনভাবে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে একটি বিরোধী দল গঠন করেন এবং নাজিব রাজাকের পতনে সর্বশক্তি প্রয়োগের আহ্বান জানান। নাজিবও এ নতুন দলটিকে নস্যাৎ করতে নানা কৌশল অবলম্বন শুরু করে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই মাহাথিরকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী জোট পাকাতান হারাপান থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে নাজিব রাজাককে বিতাড়নের আন্দোলন গড়ে তোলা হয় ড. ইব্রাহিম আনোয়ারের সম্মতিতেই। বিনিময়ে মাহাথির অঙ্গীকার করেন, তিনি নির্বাচিত হলে মালয়েশিয়ার সুলতানের কাছে ড. আনোয়ারকে ক্ষমা করার সুপারিশ করবেন, যাতে অতি দ্রুত জেল থেকে মুক্তি পেয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে ড. আনোয়ার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে সক্ষম হন। আপাতত ড. আনোয়ারের স্ত্রী আজিজা মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার নিযুক্ত হবেন।

মালয়েশিয়ার এ সফল ব্যালট বিপ্লব থেকে বাংলাদেশের বেশ কতগুলো শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রথম শিক্ষণীয় হলো, মাহাথিরের নেতৃত্বগুণে যে মালয়েশিয়া অর্থনৈতিকভাবে উন্নত একটি দেশে পরিণত হয়েছে, সে কথা এত প্রচার-প্রপাগান্ডা সত্ত্বেও জনগণের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। এ রাষ্ট্রনায়ক যখন ডাক দিলেন, তাঁর কিছু অসম্পন্ন কাজ জীবনের এই শেষ সায়াহ্নে সুসম্পন্ন করার জন্য স্বল্পকালের জন্য আরেকবার ক্ষমতায় যাওয়া প্রয়োজন, তখন জনগণ তাঁর এ আকুতিতে প্রবলভাবে সাড়া দিয়েছে। কারণ তাঁর ৯২ বছর বয়সে স্বৈরশাসক হওয়ার কোনো খায়েস যে থাকতে পারে না, সেটা সবাই উপলব্ধি করেছে। আর শত অভিযোগ সত্ত্বেও মাহাথিরের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছরেও কোনো দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কোনো কোর্টে প্রমাণ করতে পারেননি। ড. আনোয়ারও পারেননি, নাজিব রাজাকও পারেননি। তাঁর ছেলেকে নানা অন্যায় ব্যবসায়িক সুবিধা দিয়েছেন বলে মাহাথিরের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রপাগান্ডা এখনো জোরদার রয়েছে, কিন্তু জনগণ যে এসব অভিযোগ বিশ্বাস করেনি, তারই প্রমাণ তাঁর এ ঐতিহাসিক বিজয়। এখানেই রয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় শিক্ষা। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে নির্বাচনী গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত অন্তর্র্বতীকালীন সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে চারটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার কোনোটিতেই ক্ষমতাসীন দল বা জোট পুনর্র্নিবাচিত হয়নি। কারণ দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের কারণে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছিল। ২০১৪ সালে খালেদা জিয়া এবং তাঁর ছেলের মারাত্মক চালের ভুলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় মহাজোট একতরফা নির্বাচনে দ্বিতীয়বার জেতার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল। এবার বিএনপি আর এহেন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেবে না। অতএব, অবাধ ও জালিয়াতিমুক্ত নির্বাচন হলে ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ জিততে পারবে কিনা, সেটা নিয়ে আবারো শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ মহাজোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের বর্তমান নয় বছরের মেয়াদেও দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের ব্যাপারে জনগণের কাছে তাদের ভূমিকাকে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী মনে হচ্ছে না। নিত্যদিনের দুর্নীতি ও অপশাসনের শিকার জনগণের মনে এসব স্মৃতি এখন অনেক বেশি তরতাজা, ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোটের দুর্নীতির কাহিনীগুলো এতদিনে অনেকটুকু ফিকে হয়ে গেছে। অথচ গত নয় বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনগুলো দেশটির অতীতের নেতিবাচক ইমেজকে ক্রমেই পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। কিন্তু এর সুফল আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে নিজেদের ঘরে তুলতে পারবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন। আমার মতে, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে শেখ হাসিনার পুনর্র্নিবাচিত হওয়ার চাবিকাঠি ধারণ করছে এ দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে তিনি যে সত্যিই আপসহীন, সেটা জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। নির্বাচনের আগে আট মাস সময় রয়েছে। তিনি চাইলে এ আট মাসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেন। এমনকি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য প্রার্থী মনোনয়নে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমেও তিনি জনগণকে এ বার্তাটা পৌঁছে দিতে পারেন যে, তিনি দুর্নীতির ব্যাপারে সত্যি সত্যিই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছেন। তাহলে তাঁর আমলে অর্জিত অর্থনৈতিক সাফল্যকে জনগণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে বলেই আমার বিশ্বাস। ২০১৮ সালে আরেকটি জালিয়াতিপূর্ণ সংসদ নির্বাচন দেশকে মহাসংকটের গিরিখাদে নিক্ষেপ করবে বলেই আমার আশঙ্কা। তৃতীয় যে শিক্ষাটি রয়েছে তা হলো, এবারো মালয়েশিয়ার নির্বাচনে জলিয়াতি করার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন নাজিব রাজাক। আবার বিরোধীদের দমনেরও নানা ফন্দিফিকির শুরু করেছিলেন তিনি, সব এখন ভেস্তে গেছে। এখান থেকে মহাজোটের শিক্ষা নেয়া উচিত, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন দিয়ে জনগণের মন জয় করতে না পারলে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু চাণক্যনীতি আখেরে সফল হবে না। চতুর্থ এবং সর্বোত্তম শিক্ষা হলো, অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে সংশোধনের নিষ্ঠাবান অঙ্গীকার বিশ্বাসযোগ্যভাবে করতে পারলে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। (বণিক বার্তা)

লেখক : ইউজিসি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ