জনগণ ও রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি : অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০১৮, ১১:৫২

ঢাকা, ১২ মে, এবিনিউজ : রাষ্ট্র তথা জনগণের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়েছে, এটা শত্রুও স্বীকার করবে। তবে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এখন আর নিম্নমধ্যবিত্ত নেই। নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অধঃনমন হয়ে দরিদ্র শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়েছে, হয়তো যৎসামান্য মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, হাজার হাজার কোটিপতির সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারছে না এর সংখ্যাও কমেনি। সামাজিক বিশ্লেষণ শেষে কী দাঁড়ায়, এ নিয়ে সত্যিকার তিনটি কারণ সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে।

প্রথমটি হলো চিকিৎসার দায় মেটাতে গিয়ে অভাবহীন একটি পরিবার অভাবগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ Out of pocket expenditure, যা পরিবারের পক্ষে মাসিক আয় বা বার্ষিক সঞ্চয়ের বেশি হচ্ছে। যেমন ধরুন আপনার সন্তানের একটা কঠিন রোগ হলো, যার চিকিৎসা শেষ ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ টাকার বা ৫০ লাখ টাকার (ক্যানসার, বাইপাস) ঘর ছুঁই ছুঁই। যা আপনার বার্ষিক বা সারা জীবনের সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি। ফলে আপনাকে টাকাটার জন্য ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কখনো বা সুদে কখনো বা বিনাসুদে কিন্তু টাকাটা আপনাকে ফেরত দিতে হচ্ছে। টাকা শোধের জন্য আপনাকে সন্তান, স্ত্রী এবং আপনার দৈনন্দিন চাহিদার কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অথবা সঞ্চিত সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে, কখনো কখনো আপনি এ সম্পদ আর পুনরায় সংগ্রহ করতে পাচ্ছেন না, বরং দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং এই ঋণগ্রস্ততার কারণে পরিবারের কর্তাব্যক্তিটি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন অথবা অধিক পরিশ্রমে ফিরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে ক্লান্ত বা অবসন্ন হয়ে পড়েন, নেমে আসে পারিবারিক অশান্তি। চিকিৎসা শেষে পূর্ণ আরোগ্য লাভ হলে অথবা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বুঝতেই পারছেন কীভাবে পরিবারটি আর্থিক দিক শুধু নয়, তিলে তিলে পারিবারিক নিয়মনীতি ভেঙে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে মধ্যবিত্ত কৃষক, যারা জমিজমা ছাড়া ন্যূনতম মধ্যবিত্তের মালিক, তাদের বছরে এক বা একাধিক ফসল বিনষ্ট হলে তারা যেমনি প্রচ- আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি কাজের অভাবে ওই সব এলাকার কৃষিশ্রমিকদের হয় প্রাণান্তকর অবস্থা। অগ্রিম শ্রমের দাদন গ্রহণ করে থাকলে তো কথাই নেই। কাজের অভাবে, দারিদ্র্যের কশাঘাতে, স্ত্রী-পুত্র, কন্যার মুখে অন্ন জোটাতে না পেরে তারা হন শহরমুখী, যেখানে তাদের আশ্রয় হয় রাস্তায় বা বস্তিতে। ফলে রোগাক্রান্ত হয়ে আবার শিকার হন চিকিৎসক তথা হাসপাতালের, সরকারি হাসপাতাল হলেও তাদের ওষুধের ব্যবহার ও আনুষঙ্গিক খরচাদি নির্বাহ করতে গিয়ে বিক্রি হয় শেষ সম্বল। অনাহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বা পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত হয়ে পুরো পরিবারই আক্রান্ত হয় রোগব্যাধিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে যদি ছয় মাসের মধ্যে আগের অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে না আনা যায়, তা হলে তা হয়ে দাঁড়ায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়। পরিবেশ বিপর্যয় হলো মানবস্বাস্থ্যের অন্যতম ক্ষতি এবং কৃষকের ফসল বিপর্যয়ের কারণ।

তৃতীয়টি হলো মামলা বা মোকদ্দমা। ছোটবেলার শোনা একটি গল্প। ভাইপো, শহরে গেছেন কোনো একটি কাজের জন্য। অতিদ্রুত তার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায়, পরবর্তী ট্রেন ছাড়তে অনেক সময় হাতে থাকায় অলস সময়টা কি করে কাটাবেন তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। গভীর চিন্তার ফসলের সমাধান হলো, কোর্টে গিয়ে চাচার বিরুদ্ধে একটা মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়া এবং যাথারীতি মিথ্যা মামলা ঠুকে দিলেন চাচাকে হয়রানি করার জন্য।

বর্তমানে আমার এলাকার চিত্র ও অনুরূপ। যার শুরু ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে আমার এলাকার এমপি হন জনাব রেদোয়ান আহমেদ। পরবর্তী সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, আবার আচমকা মেয়াদের মাঝামাঝি পৌঁছার আগেই তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে ছিটকে পড়েন, কারণ হয়তো উনি বা তখনকার প্রধানমন্ত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া জানেন, অতিরিক্ত হিসেবে জানতে পারে তদানীন্তন গোয়েন্দা সংস্থা।

২০০১-এর নির্বাচনোত্তর সারা দেশের মতো চান্দিনাও এক বিভীষিকার জায়গায় পরিণত হয়, যা ’৭১-এর বর্বরতাকে হার মানায়। কিছু কিছু এলাকায়, অর্থাৎ ফরিদপুর ভোলা, খুলনায় হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হলেও চান্দিনায় মুসলিমরাও এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাননি। আমার পাশের বাড়ির সামাজিকভাবে চাচা। উনার একটা সিগারেট-পানের দোকান ছিল বাজারে। প্রথমে দোকান লুটপাট। তারপর টং নামক দোকনটিকে পুড়িয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। তাতেও ক্ষ্যান্ত হননি, তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে দেশান্তরিত করা হয়। এই যেই মামলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতি চালু করলেন ডা. অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ, এই সংস্কৃতি এখন চলমান। ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত মামলা-হামলায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কত হাজার লোক চান্দিনা ছেড়ে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় এসে আশ্রয় নেন তার পরিসংখ্যান বলা দুষ্কর। তোমাকে বাঁধবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। সেই দুর্দন্ত প্রতাপশালী এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে তার সরকারের আমলেই দুর্নীতির মামলা হয়েছে (শুনেছি)। আমি এসবের খবর রাখি না, কেননা এ যে কি যন্ত্রণা নিজে এ টের পেয়েছি, স্বাচিপ করার অপরাধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলার ফলাফল বাদী-বিবাদীর অর্থের অপচয়। পোয়াবারো উকিল ও পুলিশের। সেই সময় নাবালিকার ওপর পাশবিক অত্যাচারও ছিল বর্ণনাতীত। ছাত্র হয়ে নিজের শিক্ষকের বাড়ির লুটপাটের ঘটনা, এ কথাই মনে করিয়ে দেয়, সন্ত্রসীর কাছে মা-বোন, শিক্ষক-শিক্ষা সবকিছুই তুচ্ছ।

উল্লিখিত যে কারণে মানুষ স্বাস্থ্যসেবার দায় মেটাতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে, সেই সর্বস্বহারা মানুষগুলোর কাছে স্বাস্থ্যনীতি কি সমাধান দিতে পারবে। স্বাস্থ্যনীতি ভাবনায় একটি বিপজ্জনক প্রবণতা আমি গত ৪০ বছরে ডাক্তারি জীবনে লক্ষ করছি।  (দৈনিক আমাদের সময় থেকে সংগৃহীত)

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত : ভাইস চ্যান্সেলর (সাবেক)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ