ইউরোপে আনন্দের মেলা – সবাই গেছে বাইরে

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০১৮, ০৯:৪০

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, ১২ মে, এবিনিউজ : “হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে। / শত বরণের ভাব–উচ্ছাস কলাপের মতো করেছে বিকাশ, আকুল পরান আকাশে চাহিয়া উল্লাসে করে যাচে রে’’। (প্রকৃতি/রবি ঠাকুর)

ইউরোপে এখন বসন্ত। চমৎকার রৌদ্রস্নাত দিন। কদিন ধরে হল্যান্ড সহ গোটা ইউরোপে এমনই রোদের খেলা চলেছে যে মন আপনাতেই তা তা থৈ থৈ নৃত্যে নেচে উঠে। মনে মনে বলি– ‘বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়’। প্রকৃতির সাথে মনের একটা নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে, আর সে কারণে বাইরের আকাশ ভালো হলে মনের আকাশও আপনিতে ভালো হয়ে উঠে। বছরের বার মাসের দশ মাসই গোটা ইউরোপ থাকে মেঘে ঢাকা। আর তাই রোদ দেখা দিলে ইউরোপীয়রা আক্ষরিক অর্থে পাগল হয়ে উঠে। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পরে ছেলে–মেয়ে–বুড়ো সবাই। সমুদ্র কিনারা ভরে যায় সমুদ্র–সঙ্গমে আসা নর–নারীতে। স্বল্প বসনে, বালুচরে ঘন্টার পর ঘন্টা শরীরকে বিছিয়ে দেয়, করে সান–বাথ বা সূর্য স্নান, সমুদ্র স্নান নয়। চোখ ধায়, ইংরেজীতে যাকে বলে ’ট্রিট ফর আইস’। সাতাশ বছর আগে যখন এদেশে আসি তখন বুঝে উঠতে পারতাম না, গরম এলে এরা অর্থাৎ ইউরোপীয়রা এমন পাগল হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে কেন। ক’বছরের মাথায় টের পাই কেন, এক সময় নিজেকেও তাদের সাথে মিশিয়ে দেই। সামারের ছুটিতে বেরিয়ে পড়ি নতুন দেশের সন্ধানে, বেরিয়ে পড়ে অনেক বাংলাদেশি। এই বসন্ত এলে প্রবাসী বাঙালীরাও বসন্ত উৎসবে মেতে উঠে। আয়োজন করে নাচ–গানের, বাঙালি খাবার–দাবার, পিঠাও। দেশ থেকে গাঁটের পয়সা খরচ করে আনা হয় সংগীত, নৃত্য শিল্পী। গায়ক–গায়িকা গানের তালে নাচে, নাচে বাঙালি দর্শক।

হল্যান্ডে কদিন ধরে উৎসবের জোয়ার বইছে যেন। ২৭ এপ্রিল ছিল ‘রাজার দিন’, ডাচ ভাষায় বলে ‘কোনিংসদাগ’। হল্যান্ডে এই দিনটি জাতীয় ছুটির দিন হিসাবে পালন করা হয়ে থাকে। গোটা দেশের প্রতিটি নগরীতে বসে আনন্দ মেলা, ঘটা করে আয়োজন করা হয় গানের উৎসব, রাজা আসেন একটি নির্দিষ্ট শহরে। নাচে–গানে–মদে মাতাল হয় গোটা দেশ। ঘরে ঘরে উড়ে তিন রঙের জাতীয় পতাকা। জমে উঠে সেকেন্ড–হ্যান্ড বাজারগুলি। সারা বছরের জমানো পুরানো খেলনা, কাপড়, নিত্যদিনের ব্যবহার সামগ্রী গাড়ি ভর্তি করে ডাচদের অনেকেই শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ভোর থেকে শুরু হওয়া এই সমস্ত সেকেন্ড হ্যান্ড বাজারে বসে পড়ে। কেবল অর্থ অর্জন মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, অনেকে বসে সবার সাথে মিশে, আড্ডা দিয়ে দিনটিকে উপভোগ করার জন্যে। নানা ধরনের মুখরোচক খাবারের দোকান বসে, বসে ড্রিংকসেরও। কফি শপ ও বারগুলি এই দিন চুটিয়ে ব্যবসা করে। বর্তমান রাজা, উইলিয়াম আলেক্সজান্ডার তার মা, ভূতপূর্ব রাণী প্রিন্সেস বিয়াট্রিক্স থেকে সিংহাসন লাভ করার পর থেকে এই দিনটির নাম পরিবর্তন হয়। প্রিন্সেস বিয়াট্রিক্স পর্যন্ত এই দিনটিকে বলা হতো ‘কোনিংইনস দাগ’ অর্থাৎ ‘রাণীর দিন।’ তখন দিনটি পালিত হতো ৩০ এপ্রিল। তারও অনেক আগে ১৮৮৫ সালের ৩১ আগস্ট তৎকালীন ডাচ রাণী, প্রিন্সেস ভিলহেলমিনার পঞ্চম জন্মদিন থেকে এই বিশেষ দিনটি পালন শুরু। ১৮৯০ সালে ভিলহেলমিনা রাণী হলে এই দিনটি ‘প্রিন্সেস দাগ’ বা প্রিন্সেস ডে নাম ধারণ করে। তার মেয়ে প্রিন্সেস জুলিয়ানা ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতায় আরোহন করলে তার জন্ম দিনকে (৩০ এপ্রিল) ঘিরে শুরু হয় ’রাণীর দিবস’ বা ‘কোনিংইনসদাগ’। অতএব দেখতে পাই এই বিশেষ দিনটি পরিবর্তন হয়েছে রাণীর বদলের পর। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বর্তমান রাজার মা, প্রিন্সেস বিয়াট্রিক্স ১৯৮০ সালে রাণী হিসাবে মতারোহন করলেও তিনি তার মায়ের জন্ম দিবসকে ঘিরে এতদিন ধরে চলে আসা ‘রাণীর দিবস’– এ কোন পরিবর্তন আনলেন না। রাণী প্রিন্সেস বিয়াট্রিক্সের জন্মদিন হলো ৩১ জানুয়ারি। হল্যান্ডে তিন রাণীর পর রাজবংশে প্রথম বারের মত এলেন রাজা, রাজা উইলিয়াম। তার মা প্রিন্সেস বিয়াট্রিক্স ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালে উইলিয়াম হন রাজা। তার (রাজা) জন্মদিন ২৭ এপ্রিল। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৬৭ সালে, বর্তমান বয়স ৫১। তিনি এসে এই বিশেষ দিনটির তারিখ পরিবর্তন করলেন, পরিবর্তন হলো স্বাভাবিক কারণে নামেও। রানীর দিবস থেকে হলো রাজার দিবস বা কোনিংইনদাগ। আর এই বিশেষ দিনটিকে ঘিরে গোটা হল্যান্ড দিনভর মেতে উঠে উৎসবে, ভোর থেকে গোটা দেশ ব্যাপী আয়োজিত এই উৎসব চলে গভীর রাত তক।

রাজার দিবস পার হতে না আসে ‘লিবারেশন ডে’ বা ‘মুক্তির দিন’ , সেটি ৫ মে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দিন হল্যান্ড জার্মান নাৎসী দখলবাহিনী থেকে মুক্ত হয়। হিটলার বাহিনী ইউরোপের অনেক দেশের মত হল্যান্ডও নিজেদের দখলে নিয়েছিল। ১৯৪৫ সালের এই দিন কানাডীয়, বৃটিশ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন, পোলিশ, আমেরিকান, বেলজিয়ান, ডাচ এবং চেকোশ্লাভাকিয়ার সেনা বাহিনী হল্যান্ডকে নাৎসি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই দিনটি প্রতি পাঁচ বছর পর পর পালন করা হতো, কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে এই দিনটিকে ’জাতীয় ছুটি’ ঘোষণা করা হয় এবং ঘটা করে পালন করা হয় দিনটিকে। শ্রদ্ধা জানানো হয় বীর শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে। সে কাজটি প্রথমে ঘটে করে করেন দেশের রাজা। প্রতি বছর মিত্র দেশগুলি থেকে আসেন সে সময় এ দেশ মুক্ত করতে হিটলার বাহিনীর সাথে লড়েছিলেন যে সমস্ত বীর যোদ্ধারা তারা। ফি বছর কমছে এই যোদ্ধাদের সংখ্যা। কমে আসছে দিনটিকে ঘিরে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি। অনেকটা বাংলাদেশের মত। বাংলাদেশেও কমে আসছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা। ইউরোপের মত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারাও জাগতিক নিয়মে এক সময় বিদায় নেবেন। পার্থক্য ইউরোপে নাৎসি বাহিনীর সাথে যারা লড়েছেন তাদের সবাই রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত। অন্যদিকে দুঃখের সাথে বলতে হয়, বাংলাদেশে এখনো অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা রয়ে গেছেন নীরবে, নিভৃতে ও চরম অবহেলায়। অনেকের জুটেনি সরকারি কোন স্বীকৃতি। নকলের ভীড়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই হারিয়ে গেছেন, হয়েছেন ভিক্ষুক– সে আমরা পত্র–পত্রিকায় দেখি। জাতির জন্যে এটি যে কত লজ্জা, অপমান আর কলঙ্কজনক সে আমরা জাতি হিসাবে কতটুকু উপলদ্ধি করতে পারছি জানি না। পারলে তার প্রতিকারে কী কোন ব্যবস্থা নিচ্ছি? এ দায়িত্ব কার? আমার? আপনার? সমাজের না সরকারের না গোটা জাতির?

লেখক: প্রবাসী
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ