কামাল লোহানী : অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর

  ড. মিল্টন বিশ্বাস

২১ জুন ২০২০, ১৩:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

কামাল লোহানী (১৯৩৪-২০২০) ২০ জুন প্রয়াত হলেন। তিনি ছিলেন আপাতমস্তক সংস্কৃতি জগতের বাসিন্দা। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য মানুষ হিসেবে তাঁর আলাদা পরিচয় ছিল। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপের সুযোগ ঘটে কথাসাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিক সালাম সালেহ উদদীনের মাধ্যমে। সালাম ভাইয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি একাধিকবার এসেছেন। সেই অনুষ্ঠানগুলোতে আমি উপস্থাপনা করেছি।এজন্য তাঁর বাসাতেও যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে। রাফিয়া আবেদীন আপার বাসাতেও আমরা আড্ডায় বসেছি। অবশ্য এর আগে তাঁকে দেখেছি শিল্পকলা একাডেমিতে আর পত্রিকার পাতায় কলামিস্ট কিংবা টিভির বক্তা হিসেবে।তিনি ছিলেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।বামপন্থী আবুবকর সিদ্দিক এখন খুলনায় তাঁর বোনের বাসায় রোগশয্যায় শায়িত। ঢাকার কেউ সংবাদ রাখেন বলে মনে হয় না।একদা গণসংগীত নিয়ে আলাপচারিতায় দু’জনের সখ্যের বিশদ বিবরণ পেয়েছিলাম। কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইও এঁদেরই সমবয়সী। কামাল লোহানী একাধিকবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উদীচীর অনুষ্ঠানে এসেছেন। তখনও তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে।এজন্য তাঁর প্রয়াণ আমার জন্য কষ্টের; জাতির জন্য শোকের।    
১৯৩৪ সালের এই জুন মাসের ২৬ তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে। তাঁর পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। তিনি বেঁচে ছিলেন দীর্ঘ ঐতিহাসিক কালপর্বে। অবশ্য ৮৬ বছর বেঁচে থাকা পৃথিবীর ইতিহাসের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে খুবই ক্ষুদ্র একটি কাল কিন্তু মানব জীবনের জন্য দীর্ঘ একটি পথ। ২০১৪ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেবায় নিজের পুরো শরীর দান করেছেন কামাল লোহানী। এই কাজটি এদেশের খুব বেশি মানুষ করতে পারেন নি। অধ্যাপক ড. আহমেদ শরীফ কিংবা অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস প্রমুখ ব্যক্তি ছাড়া। তাঁর মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলনসহ বাঙালি সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে তিনি ছিলেন একজন পুরোধা ব্যক্তি।’ অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, ‘আমরা একজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অসাধারণ যোদ্ধাকে হারালাম।’
আমার মতো কামাল লোহানীর সঙ্গে অনেক তরুণেরই সরাসরি যোগাযোগ ছিল। স্বাধীনতা পর্বে জন্মগ্রহণকারী আমাদের মতো জুনিয়রদের সঙ্গেও তিনি আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। কারণ তিনি ছিলেন সংস্কৃতি জগতের অতি পরিচিত মুখ, সহৃদয় বন্ধু। ছায়ানট, উদীচী, ক্রান্তিসহ বহু সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সংযোগ। ষাটের দশক থেকে রাজনীতি আর সংস্কৃতি যখন যূথবদ্ধ তখন তিনি ছিলেন সেই বন্ধনের অন্যতম অগ্রপথিক। আর ২০২০ সালে ‘মুজিববর্ষে’ এসেও সেই চেতনা বিকাশে কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি খুব বেশি উচ্চাভিলাষী ছিলেন না; সাদা মনের মানুষ হিসেবে তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অতি সরল। তাঁর সাদা পোশাক, মোটা চশমার ফ্রেম এবং সুবিশাল ব্যক্তিত্ব মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করত। তিনি যে ক’টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি ছিলেন সেই সংগঠনের কর্মীবৃন্দ তাঁকে পেলে আগলে রাখত- ভিড় থেকে, নানারকম অবাঞ্চিত উপদ্রব থেকে। বাঙালির ঐতিহ্য-ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের বিভিন্ন উৎসব কিংবা দিবসে মিডিয়াতে তাঁর উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। তিনি কথা বলতেন প্রজ্ঞা দিয়ে; সংগীতের প্রতি তাঁর প্রাণের টান ছিল; সেই টানে সুমধুর কণ্ঠে ঢেউ তুলতেন দর্শক শ্রোতার মনে। কামাল লোহানী এদেশের প্রগতিশীল চেতনার অন্যতম দিশারি; অগ্রসেনাও বটে। পাকিস্তান আমলে তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। একাধিকবার কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। ষাটের দশকে পাক শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণে আত্মনিবেদিত ছিলেন। গণসংগীতের অন্যতম স্র্রষ্টা কামাল লোহানী ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাবেতার কেন্দ্রের মুখ্য সংগঠক। তাঁর কণ্ঠ থেকেই ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের ঘোষণা বিশ্ববাসী শুনেছিল। সেদিন পাঁচ বাক্যের নিউজটি তিনিই নিজ হাতে লিখেছিলেন। দু’টি বাক্য এ রকম-‘আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।’ স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দায়িত্ব পান ঢাকা বেতারের। 
রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি আজীবন বামপন্থী কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল প্রশ্নাতীত। একইসাথে কারাগারে ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদের মতো নেতাদের সাথেও। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে আবারো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রাজপথে নেমে আসেন কামাল লোহানী। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এই জোটের ভূমিকা ছিল অনন্য। একইভাবে ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে সাংস্কৃতিক জোটগুলো যে অবদান রাখে তাতে কামাল লোহানীই মহিমান্বিত হন।
আসলে ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে প্রগতিশীল মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছিল বিশ শতকের তৃতীয় দশকে। সেসময় শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং  কয়েকটি বিখ্যাত কলেজকে কেন্দ্র করে নিজেদের চেষ্টায় ধর্মীয় কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা থেকে বের হয়ে এসে সমাজে মানবতাবাদের জয় ঘোষণা করেছিলেন। ‘শিখা’ গোষ্ঠীসহ অন্যান্য সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল তারই অনন্য নজির। আধুনিক শিক্ষা বলতে তখন ইংরেজি শিক্ষাকে বোঝানো হতো যেহেতু কালটা ছিল ব্রিটিশ শাসনের যুগ। সেই শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতার আবেদন ছিল একটি বিশেষ দিক। ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এদেশের মুসলমানরা অনেকাংশে ব্রিটিশ বিরোধী এবং পাকিস্তান আন্দোলন দ্বারা উজ্জীবিত হলেও দেশভাগের পরই তাদের মোহভঙ্গ ঘটে। তবে প্রগতিশীল ধারাটি অব্যাহত থাকে। বঙ্গবন্ধু কলকাতা শহরের পাঠ চুকিয়ে ফিরে এসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেসময় কামাল লোহানী পাবনা শহরে এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র।  ভাষা-আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। আর তখন থেকেই রাজনীতি ও দেশহিতের ব্রতে নিজেকে শপে দেন। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ইতি ঘটে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একদিকে রাজনীতি অন্যদিকে সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চায় নিজেকে উজাড় করে দেন যা ২০২০ সাল অবধি বজায় থাকে।
কামাল লোহানী প্রথম গ্রেফতার হন ১৯৫৩ সালে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনার প্রতিবাদ তখনও সারা দেশজুড়ে চলছে; রক্তের দাগ শুকায়নি। শহরে মুসলিম লীগের কাউন্সিলে যোগ দিতে আসা নুরুল আমিনের আগমনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করা পাবনার রাজনৈতিক নেতা, এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনিও গ্রেফতার হন। এরপর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে ২৯ মে থেকে ‘গভর্নরের শাসন’ চালু হলে ধরপাকড়ের সূচনায় তিনি বন্দি হয়ে ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে ছাড়া পান। এরপর পাবনা শহর ছেড়ে ঢাকায় এসে শুরু করেন সাংবাদিকতার জীবন।
১৯৫৫ সালে যোগ দেন দৈনিক ‘মিল্লাত’ পত্রিকায়। চাকরি পেতে সহযোগিতা করেছিলেন চাচাতো ভাই ফজলে লোহানী। একই বছর তিনি মাওলানা ভাসানীর ন্যাপে যোগ দেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মিল্লাতের পর আরো বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত ছিলেন।১৯৭৩ সালে ‘দৈনিক জনপদ’ নামে একটি নতুন পত্রিকায় যোগ দেন।১৯৭৪ সালে ‘বঙ্গবার্তা’, এরপর ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক হন তিনি। ১৯৭৮ সালে তাঁকে সম্পাদক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে ‘বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট’-এ যোগ দেন। আর নতুন উদ্যমে সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন। একসময় তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদক পান কামাল লোহানী। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে তিনি সবসময় তাদের পাশে ছিলেন।
১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হলে কামাল লোহানী আত্মগোপন করেন। ১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর তিনি ‘ছায়ানট' সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হন। সাড়ে চার বছর ওই দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি’ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন। ছায়ানটের মতো ‘ক্রান্তি’র গণসংগীত মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে শিল্পীদের সংগঠিত করার সাথে তিনি সম্পৃক্ত থেকেছেন মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে পূর্ব বাংলার শিল্পীরা যে ভূমিকা রেখেছিল, তার সঙ্গেও কামাল লোহানী সম্পৃক্ত ছিলেন পুরোপুরি। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর হয়ে গান গাইতেন আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, সুখেন্দু দাশ, আবদুল লতিফসহ প্রথিতযশা শিল্পীরা। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা কামাল লোহানী ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দুই দফা মহাপরিচালক ছিলেন। অবশ্য ১৯৯১ সালে তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ষোলো মাসের মাথায় বিএনপি’র সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি পিআইবিতে ফিরে যান।এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা হিসেবে গণ্য করা হয়।
মূলত কামাল লোহানীর মতো দেশপ্রেমিক, মুক্ত মনের মানুষ এবং সৎ ব্যক্তিত্বের তিরোধান আমাদের অন্তরকে কাতর করেছে। যিনি নিজের নীতি ও আদর্শে অবিচল থেকে সবসময় দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন তিনি এই প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।মানুষের মুক্তি ও শোষণমুক্ত সমাজের জন্য সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেছিলেন তিনি; জাতীয় রাজনীতির দুর্যোগ মুহূর্তে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর দেখানো পথেই হাঁটবে বলে আমরা মনে করি।

লেখক : কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected])

এই বিভাগের আরো সংবাদ