কোটা সংস্কার: যোগ্যরা কখনোই বেকার থাকে না

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০১৮, ১২:৪৭

সুলতান মির্জা, ১৮ জুলাই, এবিনিউজ : সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার বা বিরোধী নামের একটি অপ্রয়োজনীয়, অগুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন কে কিভাবে কিছু ব্যক্তি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করছে, তা দেখে সত্যি খুব লজ্জা লাগছে। এটাই আমরা? এটাই কি আমাদের চারিত্রিক গুণাবলী? এটাই কি এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি?

একটু পিছনের দিক থেকে বলতে হচ্ছে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সময়ে বিএনপি জামাতের যুদ্ধাপরাধের বিচার বিরোধী ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় আমাদের কয়েকটি ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া ও বিখ্যাত দুটি প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে ‘দুর্বৃত্ত’ নামের একটা শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল এই দেশের মানুষ। সারাদেশে আন্দোলনের ডাক দিতো বিএনপি-জামাত আর পেট্রোল বোমা, ককটেল বোমা, বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করতো ‘দুর্বৃত্ত’ নামের লোকেরা। সেই দুর্বৃত্ত নামের লোকগুলোকে আজো খুঁজি মনে মনে। এখন তারা কই আছে? কেমন আছে? কি করছে? কি খাচ্ছে?

যদিও কোটা বিরোধী আন্দোলনের সূচনাটা ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামীলীগ সরকারের সময়। যখন শেখ হাসিনার সরকার অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে যখন কাজ শুরু করেন, ঠিক সেই সময়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হিসেবে রাস্তায় নামে কোটা বিরোধী এই আন্দোলন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত জামায়াতে ছাত্রশিবির আন্দোলন করেছে রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখেছিল মর্মে। সাঈদী ভক্ত পরিচয়ে, রাজাকারের বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে ইসলাম বাঁচানোর সৈনিক পরিচয়ে, ছাত্রলীগের পায়ের রগ কাটছে সাধারণ জনতার পরিচয়ে, জঙ্গি উৎপাদন ও বিতরণের সময় সাধারণ আলেম ওলামা পরিচয়ে এবং এখন এই কোটা বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে। মোদ্দা কথা আজব গুজব তথ্য ছড়িয়ে আন্দোলন সংগঠিত করার প্রাথমিক মিশনে জামাত শিবির বেশ সফল। তবে লক্ষ্য অর্জনে তেমন সফল নয়। প্রশ্ন আসতে পারে কেন? উত্তর হলো, গুজব বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখা যায় না, প্রাথমিক আবেগে আনু, সাকিরা হয়তো কেঁদে ফেলে মিডিয়া গরম করে। কিন্তু বাস্তবতার বাজারে যার মূল্য শূন্য। একটা সময়ে ভুল শুধরে হয়তো কেউ লজ্জা পায়, কেউ হয়তো নানান যুক্তি তুলে ধরে।

দেখুন পাইকারি হারে সবাইকে জামাত শিবির বলাটা ঠিক সমর্থনযোগ্য নয়। তবে, শিবিরের মাধ্যমে জন্ম নেয়া যেকোনো মুভমেন্টের সাথে ন্যূনতম একমত, সহমত ধারণ করে তাদেরকেও শিবির বলাটা খুব বেশি অন্যায় হবে বলে মনে করি না।

বিশ্বকাপের ডামাডোলে ভেবেছিলাম আসিফ নজরুলের মত বিশেষ সময়ের বিশেষ শিক্ষক বুদ্ধিজীবীরা হয়তো ভুলেই গেছে কোটা বিরোধী আন্দোলনের কথা। কিন্তু বিশ্বকাপ থেকে প্রথমে আর্জেন্টিনা পরে ব্রাজিলের বিদায় নেওয়ার পরে আস্তে আস্তে বিশেষ সময়ের ঐ বিশেষ শিক্ষক বুদ্ধিজীবীরা গর্ত থেকে বের হতে শুরু করে। এবং তারা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আছে এখনো বেশ গতিতেই। একটি অগুরুত্বপূর্ণ তিল কে গুরুত্বপূর্ণ তালের আটি বানাতে কাজ করছে, কলাম লেখছে, টক শো করছে, বিদেশি দূতাবাসের কাছে ইমেইল করছে আরও কতকিছু।

গত পরশু দিন এক টিভি টকশোতে একটি টক শোতে, ভদ্রলোক আসিফ নজরুল সাহেব রেফারেন্স টাইপের প্রসঙ্গে বলছিল তিনি নাকি এই কোটা বিরোধী আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রথম আলোতে এখন পর্যন্ত ৫টি কলাম লিখেছেন। সেখানে বিস্তারিত ভাবে বেশ তথ্য উপাত্ত যুক্তি তর্ক সকল কিছু দিয়েই উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে কেন কোটা বিরোধী আন্দোলন যৌক্তিক। হয়তো ভদ্রলোকের কথা অনেকেই মনোযোগ সহকারে শুনেছে, কেউ কেউ হয়তো বুঝেছেও, তবে আমাদের মত অনেকের যে বুঝতে কষ্ট হয়েছে বা উনার কথা শুনে মনের কোণে প্রশ্ন জেগেছে, এই লোক আইনের শিক্ষক হলো কিভাবে?

যেখানে সারা বিশ্বের কোন দেশেই সরকারী চাকরি দেশীয় অর্থনীতি উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য মোটেও গুরত্বপূর্ণ কোন টপিক নয়। এক চাকরি এক পরিবার, কেউ একজন পেল, তাতে তার পরিবার ভালো থাকবে, না পেলে আরেকজন চাকরিটা পেয়ে যাবে, সরকারী চাকরির পদ কিন্তু শূন্য থাকবে না। এই দেশের এই ভূমিতে জন্ম নেওয়া কেউ না কেউ একজন ঠিকই কিন্তু পেয়ে যাবে। সেখানে আসিফ নজরুলের মত লোক কিভাবে, রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য সরকারী চাকরির গুরুত্ব উপস্থাপন করলো সেটাই ভাবনার বিষয়। কি জানি হয়তো বা ভদ্রলোক লন্ডন থেকে ফোন পেয়েছেন, গত এপ্রিলে যেমনটা পেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক মামুন সাহেব। সেজন্য হয়তোবা সেই ফোনের দায় থেকে উনি উনার মতাদর্শ ঢাবির কিছু শিক্ষক নিয়ে কথা রাখার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করছে।

ঢাবির সম্মানিত বিপ্লবী দয়াবান শিক্ষক মহোদয়ের কাছে ৪ টা প্রশ্ন রাখলাম…

১। কোটা বিরোধী এই আন্দোলন থেকে যখন মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানদের গালি দেয়া হয়, তখন কি আপনারা তার প্রতিবাদ করেছিলেন?

২। কোটা বিরোধী এই আন্দোলনের ছেলে মেয়েরা শরীরে, পোস্টারে রাজাকার লিখে যখন মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ কে অপমান করে তখন কি এর প্রতিবাদ করেছিলেন?

৩। কোটা বিরোধী এই আন্দোলন থেকে যখন জাতির পিতাকে কটাক্ষ করা হয়, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করা হয় তখন কি আপনারা প্রতিবাদ করেছিলেন?

৪। কোটা বিরোধী এই আন্দোলন থেকে গুজব ছডিয়ে যখন রাতের আঁধারে ভি.সি স্যারের বাসা ভাংচুর করে লুটপাট করেছিল তখন কি আপনারা এর প্রতিবাদে শহীদ মিনারে দাঁডিয়েছিলেন?

আশা করি উত্তরগুলো শিক্ষকদের কেউ না কেউ টক শোয়ের মাধ্যমে জাতিকে জানাবেন।

এবার মুল কথায় ফিরে আসি, ঢাকায় যখন একটা ফ্লাইওভার নির্মাণ হয় তখন সব বিষয়ে নাক গলানো আমাদের দেশের বাম ঘরানার পণ্ডিত রাজনীতিবিদেরা প্রায়ই প্রশ্ন তুলে থাকে যে, এইসব ফ্লাইওভারে কুড়িগ্রাম বা দিনাজপুরের কি লাভ হবে ? পালটা প্রশ্নে যদি উনাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবিত দাবির আলোকে যদি কোটা প্রথা বিলুপ্তি হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে কুড়িগ্রাম বা দিনাজপুরের বেকার যুবকদের কি লাভ হবে ? আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কোটা আছে এখন, এমন তো নয় সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ বন্ধ আছে। নিয়োগ হচ্ছে যা কোটা থাকা না থাকার উপরে আটকে থাকেনি। কথা হলো, যারা চাকরি পাচ্ছে, তারা তো এই দেশেরই মানুষ। তাই না? যেখানে বাংলাদেশের মোট চাকরির মধ্যে সরকারী চাকরির % মাত্র ১০%। বাকি ৯০% হলো প্রাইভেট বা পাবলিক কোম্পানি। সেখানে এই ১০% সরকারী চাকরিজীবী কোনভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে?

তাছাড়া কোটা বিরোধী আন্দোলন যারা করছে তারা কারা? নিজের পেশার ঘরে কি লিখে? ছাত্র নাকি শিক্ষিত বেকার? উত্তর যদি হয় ছাত্র, তাহলে জিজ্ঞাসা হচ্ছে, আগে কি পড়াশোনা করে সার্টিফিকেট অর্জন করবে নাকি সার্টিফিকেট ছাড়াই চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দেবে? যেখানে সারাদেশে লক্ষ লক্ষ বেকার বসে আছে, সেখানে একজন রানিং শিক্ষার্থী কিভাবে পড়াশোনা শেষ করার আগেই চাকরির জন্য আন্দোলন করে? কি উদ্দেশ্য? চাকরি নাকি ধান্দাবাজী করা? উত্তর কি?

আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এমনিতেই। একজন সরকার প্রধানের প্রথম কাজ হচ্ছে অন্ন, বাসস্থান, শিক্ষা, ব্যবস্থা আগে ঠিক করা। বাংলাদেশটা এগুচ্ছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে, মাছ উৎপাদন হচ্ছে, দেশের অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, দেশি বিদেশী বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর্থিক খাত শক্তিশালী হচ্ছে রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ হচ্ছে। এমন অবস্থায় কোটা বাতিল করতেই হবে, কেন? কি কারণে কোটা বাতিল এতো গুরুত্বপূর্ণ? আর কোটা বাতিল করলেই যে কারো চাকরি নিশ্চিত হবে। কে দিলো এই তথ্য? নিয়োগে কোটার মুল ব্যবহার শুরু হয় কখন? যেখানে বেশ কয়েকটা ধাপ অতিক্রম করতে কোটা প্রথার কোন প্রয়োগ থাকে না, সেখানে চাকরী প্রার্থী যদি ধাপগুলো অতিক্রম করতে না পারে, তাহলে কোটা প্রথা বিলুপ্তি বা বাতিল হলেই প্রার্থী কিভাবে উপকৃত হবে?

উদাহরণ হিসেবে কোটা আন্দোলন করছে রাশেদের প্রসঙ্গেই বলা যাক, সে প্রিলিমিনারী দিয়েছে ২ বার, দুইবারই সে প্রিমিলিনারী অতিক্রম করতে পারেনি। এখন তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কোটা সংস্কার বা বাতিল হলো, তাতে করে রাশেদের কি লাভ হবে ? সে তো প্রিলিমিনারিই অতিক্রম করতে পারে না। কোটা থাকা না থাকায় তার চাকরি নিশ্চিত হবে কিভাবে? যদিও এই আন্দোলনে রাশেদ একা নয়, ভালো করে খোঁজ খবর নিলে দেখা যাবে প্রিলিমিনারীতে টিকতে না আরও রাশেদ এই আন্দোলনে আছে, মেধায় যারা প্রিলিমিনারী অতিক্রম করতে পারবে না আগামী ২০০ বছরেও, এখন এইসব রাশেদেরা যদি মনে করে থাকে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা উঠে গেলেই তাদের চাকরি হয়ে যাবে। আপনার যদি মেধা থাকে, আপনি এটলিস্ট ভালো করে পড়াশোনাটা চালিয়ে যান, আগে পড়াশোনা শেষ করুন, ভালো রেজাল্ট করুন, গুজব ছড়ানো কিংবা গ্রহণ পরিহার করুন। বাংলাদেশে প্রকৃত মেধাবীর জন্য চাকরির অভাব নেই।

বলা যায়, মেধাবীর অভাবে চাকরির পদ শুন্যই থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। আরো ভালো করে বললে, যোগ্য লোক একটাও বেকার নেই। আর অযোগ্য লোক? কোন জায়গায় তাদের স্থান নেই বা হয় না।

সংগৃহিত

লেখক : অনলাইন একটিবিটিষ্ট

এই বিভাগের আরো সংবাদ