'সংবাদ', বঙ্গবন্ধু ও নতুন প্রজন্ম

  তপন কুমার রায়

১৮ মে ২০২০, ২১:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

দেশের প্রাচীনতম, ঐতিহ্যবাহী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাবাহক দৈনিক সংবাদের জন্মদিন ১৭ মে। কালের যাত্রায় এ দিনে পত্রিকাটি ৭০ বছরে পদার্পণ করছে। একটি পত্রিকার সাত দশক ধরে পথ চলা কি কম কথা? নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে আজকের 'সংবাদ' এর অতীত কি বলে? নতুন প্রজন্ম কি জানে এদেশের সংবাদপত্র শিল্পের বিবর্তনে, মুক্তিযুদ্ধে , মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে দৈনিক সংবাদের পথচলার কথা? দৈনিক সংবাদ এখন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। মানবিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যময় বটে। মুখের বুলি তার সাদা কাগজে ফুটে ওঠে। জন্মটা ১৯৫১ এর ১৭ মে। মুসলীম লীগের হাত ধরে। জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভাল, এই প্রবাদের স্মারক হয়ে ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে মুসলীম লীগের ভরাডুবির পর দেশীয় ব্যক্তির মালিকানায় অভিভাবকত্বের পরিবর্তন আসে সংবাদের শিশুকালে। সময়ের স্রোতে "সংবাদ" হয়ে উঠে এদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম ক্ষুরধার। যেই ক্ষুরধারায় স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভরসা করেছেন। আস্থা রেখেছেন। যার প্রমাণ মেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা 'কারগারের রোজনামচা'য়। লিখেছেন, " আগামীকাল খবরের কাগজ এলে সঠিক খবর পাওয়া যাবে এই আশায় রইলাম। আমি বলে দিয়েছি দৈনিক পাকিস্তান রাখবো না, 'সংবাদ' কাগজ যেন দেওয়া হয়। পূর্বে ছিল.........। এখন সংবাদও আসবে ( কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১০১)।"

দেশের মানুষের মনে, তাদের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হৃদয়ে দৈনিক সংবাদ জায়গা করে নিলেও পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রের জাল পাতা ছিল 'সংবাদ'এর চলার পথে। ষড়যন্ত্রের বিস্তার বঙ্গবন্ধুর কথায়, "আমাদের পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তিনটা কাগজের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছে। একটা সংবাদ, পূর্ব পাকিস্তানের কাগজ, আর দুইটা 'নওয়াই ওয়াক্ত' ও কোহিস্তান'- পশ্চিম পাকিস্তানের। প্রায় সকল কাগজকেই সরকার ছলে বলে কৌশলে নিজের সমর্থক করে নিয়েছে। যে দু'চারটা কাগজ এখনও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে জনগণের দাবি দাওয়া তুলে ধরছে তাদের শেষ করার পন্থা অবলম্বন করেছে সরকার। ইত্তেফাক প্রেস তো বাজেয়াপ্ত।....... সংবাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে শেষ করার অবস্থা ( কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-:১৫৪)।" বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী ভাবনাই শেষে সত্যি হয়। " দৈনিক সংবাদ কাগজটাও বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। শুধু প্রকাশকের নাম বদলাবার অনুমতি না দিয়ে ১৬ বৎসরের কাগজটা বন্ধ করে দিতে পারে কোনো সভ্য সরকার? (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-২৪৫)।"

ষড়যন্ত্র, দমন, নিপীড়নে,  হামলা আগুনে অনেকবার হোচট খেতে হয়েছে দৈনিক সংবাদকে। তবে দমে থাকেনি 'সংবাদ'। ষড়যন্ত্রের দমন-পীড়নে পথিমধ্যে যাত্রা বিরতি মাত্র। দৈনিক সংবাদের বজ্রধ্বনি বেজে উঠেছিল বারংবার। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের পরের দিন দৈনিক সংবাদ নজর কেড়েছিল এদেশের আপামর জনসাধারণের। সংবাদের প্রথম পাতায় " এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম: মুজিব" শিরোনামে ছবি সহ যে বিশালাকৃতির খবর তা প্রকাশে অন্য পত্রিকাগুলো এমন দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। 
অবশ্য সেই মার্চের শেষেই এমন বজ্রলেপ শিরোনামের প্রতিশোধ নিয়েছিল দুরাচারী পাকিস্তান সরকার। বংশালে অবস্থিত 'সংবাদ' এর পত্রিকা অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। আগুনে পুড়ে যায় 'সংবাদ'এর কার্যালয়। সঙ্গে পুড়ে মারা যায় ঘুমন্ত সাংবাদিক শহীদ সাবের।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস দৈনিক সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। এসময় 'সংবাদ' এর ক্ষুরধার ক্ষীণ হলেও থেমে থাকেনি সংবাদের সাংবাদিকরা। দৈনিক সংবাদের রণেশ দাশ গুপ্ত, আবুল হাসনাত, সন্তোষ গুপ্ত কলমের বদলে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। ১৯৭২ এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনে আবার প্রকাশিত হয় 'সংবাদ'। স্বাধীন দেশ। মুক্ত গণমাধ্যম। তবে গণমাধ্যমের মুক্তবাক আবার রুদ্ধ হয় ৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর। তখন গণমাধ্যমের প্রতিকূল পরিবেশ। 
তবে ১৯৭৫ পরবর্তী গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে অন্যান্য পত্রিকা থেকে সব সময় ব্যতিক্রম সাহস দেখিয়েছে দৈনিক সংবাদ। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পত্রিকাগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেই তার সত্যতা উপলব্ধি ও অনুমেয় হবে। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে "বঙ্গবন্ধু কিংবা জাতির জনক" উপাধি ব্যবহার, ছবিসহ খবর প্রচারে তুলনামূলক ভাবে দৈনিক সংবাদ যে দৃঢ়তা আর দুঃসাহসিক মাত্রা দেখিয়েছে তা অন্য কোনো পত্রিকা দেখাতে পারেনি বলে গণমাধ্যমে গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনই বলে দেয়। 

নতুন প্রজন্মের একজন হলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দৈনিক সংবাদের ক্যাম্পাস রিপোর্টার হিসেবে দেশের গুণী ব্যক্তিজন, বহুমাত্রিক অনলাইন সূত্র সহ নানা মাধ্যমে 'সংবাদ' এর ঐতিহ্য উপলব্ধি করার সুযোগ হয়েছে। ষাটের দশকের কবি সরোজ দেব একবার ক্যাম্পাসে এসেছিলেন ভ্রমণে। পরিচয়ে দৈনিক সংবাদে আমার সংশ্লিষ্টতা শুনে রণেশ দাশ গুপ্তকে স্মরণ করে বলেন, যেমনি সংবাদ ছিল, তেমনি ছিল সংবাদের কর্মীরাও। সংবাদের যে অনেক ঐতিহ্য। তুমি সংবাদে কাজ করো! 

বাংলাদেশ আজ অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। আজকের বাংলাদেশের একজন বঙ্গবন্ধু ছিল। এখনও কোটি মানুষের হৃদয়ে আছে। এই বাংলাদেশ সৃষ্টির আদিতে দৈনিক সংবাদ নামের একটি পত্রিকা ছিল। যা আজও আছে। উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায়। বংশাল থেকে এখন ১০০০- পুরানা পল্টনে। দেশের মানুষের অধিকারে, স্বপ্নে, মননে দৈনিক সংবাদ ছিল, আছে এবং থাকবে। 

তথ্যসূত্র: কারাগারের রোজনামচা, উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদন। 

লেখক: দৈনিক সংবাদ-এর সাবেক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, বর্তমানে শিক্ষানবিশ উপ পুলিশ পরিদর্শক। 
ই-মেইল:[email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ