দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের কারণে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে বাংলাদেশের ৪৩ বছর লেগেছে

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০১৮, ১৭:৪৬

ড. মইনুল ইসলাম কলাম, ১৫ জুলাই, এবিনিউজ : গত ১৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলেরকমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক পত্রের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশ যেহেতু স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটেগরি থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটেগরিতে উত্তরণের তিন ধরনের পূর্বশর্ত পূরণ করেছে তাই ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পর্ব শুরু হলো। এই উত্তরণ পর্ব আগামী ছয় বছর মনিটর করার পর ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা করবে। ২০২৭ সাল থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সব নিয়ম–কানুনের আওতায় আসবে। জাতিসংঘ এই স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের ক্যাটেগরির প্রচলন করেছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার বহু সাধ্য–সাধনা করে বাংলাদেশকে এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত করাতে সক্ষম হয়েছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্যে প্রযোজ্য অনেক ধরনের সুযোগ–সুবিধা লাভের প্রত্যাশায়, যদিও সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার কোন দেশকে সাধারণত এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ছিল না। বলা বাহুল্য, ঐ সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সুবিধেগুলো পাওয়া বাংলাদেশের জন্যে অপরিহার্য বিবেচিত হয়েছিল। এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্তির পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ছিল, স্বাধীনতা–পরবর্তী চরম সংকটজনক অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে উঠে এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে সক্ষম হবে। এক দশক দূরের কথা, এই উত্তরণে ৪৩ বছর লেগে গেল বাংলাদেশের। আমার বিশ্বাস, দুর্নীতি, পুঁজি লুন্ঠন এবং পুঁজি পাচারের কারণেই এই বিলম্ব।

এটাও জানা প্রয়োজন, বিশ্বের ‘ভিক্ষুকদের ক্লাব’ হিসেবে পরিচিত এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতে ঘানা, ভিয়েতনাম এবং জিম্বাবুয়ের মতকিছু দেশ কখনোই রাজি হয়নি তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় থাকা সত্ত্বেও।

ভিয়েতনামের নজিরটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য: দুই দশকের ভয়াবহ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু ১৯৭৫ সালে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের চার বছর পর। মার্কিনীরা ভিয়েতনামকে আক্ষরিক অর্থে একটি ধ্বংসস্তূপরিণত করেও তাদের অবমাননাকর পরাজয় এড়াতে পারেনি। এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা–ঘোষণাকারী ভিয়েতনামকে ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত যুদ্ধে নামতে বাধ্য করেছিল ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স। কিন্তু, ১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফু তে ফ্রান্সকে পরাজিত করেও আবার অহেতুক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের শিকার হতে হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামকে। একুশ বছরের প্রতিরোধ যুদ্ধে তারা মার্কিনীদেরকে পলায়নে বাধ্য করেছিল ১৯৭৫ সালে। সেজন্যেই বলা হয়, বিশ্বের দু’দুটো প্রবল পরাক্রান্ত সামরিক সুপারপাওয়ারকে পরাজিত করা বিশ্বের একমাত্র দেশ ভিয়েতনাম। ‘জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই অবিস্মরণীয় কবিতার লাইনটি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য ভিয়েতনামের বীর জনগণের ক্ষেত্রে। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম কখনোই জাতিসংঘের ‘স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতে আবেদন করেনি। অথচ, কী নিদারুণ কষ্টকর ছিল ১৯৭৫–পরবর্তী বছরগুলোতেভিয়েতনামের সাধারণ জনগণের জীবন! আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই, এই ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি’র চাইতে কম ছিল। কিন্তু, ২০১৬ সালের প্রকাশিত ইউএনডিপি, আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী ভিয়েতনামের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট ড: হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭২ সালে বলেছিলেন, স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি ‘তলাবিহীন আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি’ হতে যাচ্ছে। সত্তর দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কিত ফালান্ড ও পার্কিনসনের বিখ্যাত বইটিরও নাম দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেইস অব ডেভেলাপমেন্ট।একথা অনস্বীকার্য যে ডঃ কিসিঞ্জার কিংবা ঐ বইয়ের লেখকদেরকে তাঁদের হতাশাজনক ভবিষ্যদ্বাণী এবং শিরোনামের জন্যে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ, স্বাধীন দেশ হিসেবে যাত্রা শুরুর পর্যায়ে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্যে বছরে যে দেড় কোটি টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হতো তার মাত্র এক কোটি দশ লাখ টন ঐ সময়টায় উৎপাদন করার সামর্থ্য ছিল আমাদের। বাকি ৩৫–৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য বিশ্বের কাছে ভিক্ষা চাইতে হতো, কারণ ঐ ঘাটতি খাদ্যশস্য আমদানি করার সামর্থ্যও ছিল না আমাদের। ১৯৭২ সালে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য পাট ও পাটজাত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। ফলে, দেশের যৎসামান্য রপ্তানি আয় দিয়ে ঐ সময় আমদানি ব্যয়ের ৩০ শতাংশও মেটানো যেতোনা। ঐপর্যায়ে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যখন ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক তেল সংকট শুরু হলো তখন দেশের অর্থনীতি বেসামাল হয়ে গেলো। অথচ, বঙ্গবন্ধুর সরকার যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব ব্যাংক, আই এম এফ এবং দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর পছন্দসই সরকার ছিল না তাই ঐ মহাসংকটে বাংলাদেশ যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য–সহায়তা পায়নি। আরো দুর্ভাগ্যজনক হলো, ১৯৭৩ সাল থেকে দেশে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও পুঁজি লুন্ঠন শুরু হয়ে গেলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর দলের দুর্নীতিবাজ নেতা–কর্মী, শ্রমিক নেতা, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানাগুলোর প্রশাসক–কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ১৯৭৪ সালে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ উপেক্ষা করে কিউবার কাছে বাংলাদেশের পাটের বস্তা রপ্তানির অপরাধে কৈফিয়ত তলবের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য–সাহায্যেরগম বহনকারী পাঁচটি জাহাজকে মার্কিন সরকারের আদেশে মাঝপথে যাত্রা স্তগিত করে বিভিন্ন দেশের বন্দরে নোঙর ফেলতে হয়েছিল। আমরা জানি যে ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। (দুর্ভিক্ষের একমাত্র কারণ ঐ মার্কিন সিদ্ধান্ত ছিল না, কিন্তু ঐ জাহাজগুলো সময়মত বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারলে এত মানুষকে হয়তো অনাহারে মরতে হতো না! ১৯৭৩ সাল থেকে খাদ্যদ্রব্যের নাটকীয় দামবৃদ্ধির কারণে যে ‘এনটাইটেলমেন্ট ফেইল্যুর’ বা খাদ্যদ্রব্যের ওপর মৌসুমী বেকার জনগণের অধিকারহীনতা সৃষ্টি হয়েছিল নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের গবেষণায় সেটাকেই দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।)

কিন্তু, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবার নারকীয়ভাবে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী অবৈধ সরকারগুলো বাংলাদেশকে আবারো পাকিস্তানে পরিণত করার মিশনটি সুসম্পন্ন করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। অতএব, খোন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র সাহায্য–ভিক্ষুক, পুঁজি–লুটেরা চরিত্রকে সাদরে আঁকড়ে ধরে। ১৯৯১ সালের পরগত ২৭ বছর ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারগুলোও বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পাওয়ার লোভ সংবরণের কোন তাগিদ অনুভব করেনি। প্রকৃতপক্ষে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে নানান ধরনের রিলিফ, খয়রাতি সাহায্য, বৈদেশিক অনুদান এবং স্বল্প–সুদের ঋণ (সফ্‌ট লোন) পাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়াতে বাংলাদেশের গত ৪৩ বছরের সরকারগুলোর কাছে স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটেগরি থেকে উত্তরণকে আর তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি। জিয়াউর রহমান যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদী আরব ও চীনের খুবই পছন্দসই শাসক ছিলেন তাই তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বাংলাদেশে বৈদেশিক অনুদান এবং সফ্‌ট লোনের বান ডেকেছিল। প্রফেসর রেহমান সোবহানের বিশ্বখ্যাত বই The Crisis of External Dependence এর নবম পৃষ্ঠার সারণীতে দাবি করা হয়েছে যে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈদেশিক অনুদান ও ঋণপ্রবাহ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮১–৮২ অর্থ–বছরে জিডিপি’র অনুপাত হিসেবে ১৩.৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল, যেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৈদেশিক সাহায্য–নির্ভরতার নজির। জিয়াউর রহমান গর্বভরে বলতেন, ‘Money is no problem’। বিএনপি সরকারের ১২ বার বাজেট উপস্থাপনকারী অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমানও বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সংগ্রহে তাঁর সাফল্যকে খুবই ফলাও করে উল্লেখ করতেন। ১৯৭৫ সাল থেকে জিয়াউর রহমান যেভাবে কেনাবেচার রাজনীতিকে এদেশের ক্ষমতার অংগনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ঐ রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ লুন্ঠনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়েছিল তাঁকে। (তিনি নিজে দুর্নীতি করতেন না বলে ধারণা রয়েছে!)অতএব, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭৩ সাল থেকে বৈদেশিক অনুদান ও রিলিফ চুরি যেভাবে ক্রমেই বিস্তার লাভ করছিল জিয়াউর রহমানের প্রায় ৫ বছর সাত মাসের শাসনামলে তাঁর সুচিন্তিত আশকারার ফলে বৈদেশিক সাহায্য লুন্ঠন এবং রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এদেশে প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছে।

সমরপ্রভু এরশাদ বিএনপি আমলের এই ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেই বিচারপতি সাত্তারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। পবিত্র কুরআন শরীফের ওপর হাত রেখে তিনি এই জিহাদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি কিছুদিন তিনি সাইকেলে চড়ে অফিসে যাওয়া–আসা করার ছবিও আমাদেরকে দেখতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু, এই চরম ভণ্ড, দুর্নীতিবাজ ও নারীসঙ্গলোলুপ অবৈধ শাসক বাংলাদেশকে দুর্নীতির লীলাক্ষেত্রে পরিণত করার জন্যেই এখন সারা বিশ্বে ‘থিফঅব বাগদাদ’ উপাধিতে ভূষিত হয়ে গেছেন। এই স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামল থেকেই বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাকে ‘চৌর্যতন্ত্র’ (kleptocracy) আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই চৌর্যতন্ত্র শক্তিশালী হতে হতে ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ’ অর্জন করেছিল। ১৯৯১ সালে নির্বাচনী গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর নির্বাচিত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি–জামায়াত সরকারের সময়েই এই লজ্জাজনক চ্যাম্পিয়নশীপ জুটেছে বাংলাদেশের কপালে। অতএব, বিএনপি–জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ যে দুর্নীতি দমনে মোটেও আগ্রহী নয় সেটাই গত ২৭ বছর ধরে বাংলাদেশের দুঃখজনক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি, পুঁজি লুন্ঠন ও পুঁজি পাচার।

এতদসত্ত্বেও, বাংলাদেশের জনগণ মাতৃভূমির এই লজ্জাজনক পরিচয় মুছে ফেলার জন্যে দেশে–বিদেশে জীবন–পণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এবং তারই ফলশ্রুতি৪৩ বছর পর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ। সত্তর ও আশির দশকের বিশ্ব–ভিক্ষুকের দীনহীন অবস্থা থেকে গত সাড়ে তিন দশকে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রধান ভূমিকা পালন করে চলেছে কৃষিখাত, রপ্তানি খাত, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্রঋণ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত।তালিকাটি দেখুন:

১। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করে চলেছে। যদিও ২০১৭ সালের অকাল বন্যার ফলে গত বছর দেশে খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল এবছর আবার আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ফিরে পেয়েছি। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ স্থান দখল করেছে। শাক–সব্জি উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২০১৭–১৮ অর্থ–বছরে৩,৪৯৮ কোটি ডলারে পৌঁছে গেছে, অথচ ১৯৮১–৮২ সালে তা ছিল মাত্র ৭৫.২ কোটি ডলার। ৩। বাংলাদেশের এক কোটি ত্রিশ লাখেরও বেশি মানুষ বিদেশে কাজ করছেন ও বসবাস করছেন। তাঁরা ২০১৭–১৮ অর্থ–বছরে ফর্মাল চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। হুন্ডি পদ্ধতি ও অন্যান্য ইনফর্মাল চ্যানেলে আরো ৮–১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে, এই ২৩–২৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বৈদেশিক বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে চলেছে। ৪। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘খানা আয়–ব্যয় জরিপ মোতাবেক ২০১৬ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্য সীমারনিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত ২৪.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১০ সালে দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ৩১.৫ শতাংশ, ২০০৫ সালে ছিল ৪০ শতাংশ, আর ২০০০ সালে ছিল ৪৪ শতাংশ। ৫। ১৯৮১–৮২ অর্থ–বছরে বাংলাদেশের জি ডি পি’র অনুপাত হিসেবে বৈদেশিক সাহায্য ১৩.৭ শতাংশ পৌঁছে গিয়েছিল। গত ৩৭বছরে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর এদেশের অর্থনীতির নির্ভরতা কমতে কমতে ২০১৬–১৭ অর্থ–বছরে জি ডি পি’র দুই শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। ২০১৬–১৭ অর্থ–বছরের ঐ বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মাত্র ২ শতাংশের মত ছিল খাদ্য সাহায্য, আর বাকি ৯৮ শতাংশই ছিল প্রকল্প ঋণ। বাংলাদেশ এখন পণ্য–সাহায্য নেয় না। ৬। ২০১৮ সালের জুনেবাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল৩,২২৫ কোটি ডলার। ৭। বাংলাদেশের জি ডি পি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৭–১৮ অর্থ–বছরে৭.৬৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। ৮। ক্ষুদ্র ঋণ আন্দোলনের সাফল্য গ্রামের ভূমিহীন নারীদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পৌঁছে দেওয়ার একটা অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক চতুর্থাংশ ঋণগ্রহীতা তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছেন। ৯। দেশের দ্রুত বিকাশমান পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, আর এই শ্রমিকদের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক অবস্থানের এসব নারীর প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পখাতে কর্মসংস্থান তাঁদের বঞ্চনা ও চরম দারিদ্রের বিরুদ্ধে একটি তাৎপর্যপূর্ণ নিরোধক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তৈরি পোশাক শিল্পখাত বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের একটি অত্যন্ত ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১০। বাংলাদেশের সাড়ে তের কোটি মানুষ এখন মোবাইল টেলিফোনের আওতায় এসে গেছে, এবং ছয় কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। সেজন্যেই বলছি, দুর্নীতি, পুঁজি লুন্ঠন ও পুঁজি পাচারের কারণে বিলম্বিত এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করার সংগ্রামে এখন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতিবিদ; ইউজিসি প্রফেসর

এই বিভাগের আরো সংবাদ