বাংলাদেশ বিরোধী শক্তির কফিনে শেষ পেরেক

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০১৮, ১২:১৮

সাব্বির আহমেদ, ১৩ জুলাই, এবিনিউজ : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ে সামরিক, কূটনৈতিক সাহায্য সহযোগিতা করেছিল ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারত এবং লিওনিদ ব্রেজনেভের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারতের সঙ্গে সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ছিল।

ভারত সোভিয়েত স্টাইলে কমিউনিজম গ্রহণ না করলেও স্বাধীনতার আগে থেকেই দেশটি সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী। তৎকালীন সরকারী দল কংগ্রেস শুরু থেকেই মধ্যবাম ধারার একটি রাজনৈতিক দল। ৪৭ সালে স্বাধীন হবার পর থেকে ভারতে সাধারণের মনে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রতি চরম ঘৃণা বিরাজমান ছিল।

এসব কারণে ভারতের স্বাভাবিক বন্ধু হয়ে ওঠে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন ও আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।

স্বাধীনতার পরে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল খাদ্যের, তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুননির্মাণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। ভারত তখন নিজেই খাদ্য সংকটে জর্জরিত। সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল না বাড়তি খাদ্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে তাই বাধ্য হয়েই খাদ্য সাহায্য চাইতে হয়েছিল আমেরিকার কাছে। আমেরিকাকে সন্তুষ্ট রাখতে বদলানো হয়েছিল অর্থমন্ত্রীও। তাজউদ্দীন সাহেবকে বদলে বঙ্গবন্ধু অর্থমন্ত্রী বানালেন মার্কিন লবির খন্দকার মোশতাক আহমেদকে। তাতেও আমেরিকার মন ভরল না। বহু চেষ্টা করেও আমেরিকার কাছ থেকে ৭৪ সালে সময়মত খাদ্য সাহায্য না পেয়ে বঙ্গবন্ধু আমেরিকার লাইনে হাটা পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিলেন। সোভিয়েত ধারায় তিনি গঠন করলেন বাকশাল; কায়েম হল বাংলাদেশ স্টাইলে কমিউনিজম। বাংলাদেশে বাকশাল সহ্য করতে পারেনি আমেরিকা। চিলির আলেন্দের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর নাম উঠে গেল আমেরিকার কিলিং লিস্টে।

আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় পাকিস্তান। পেছনের শক্তি সৌদি আরব, চীন আর আমেরিকা। বাংলাদেশ বিরোধী শক্তির এই বাংলাদেশ দখল বলবৎ থাকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট। এসময় আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের আগে থেকেই ভারতের সরকারে ছিল ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস; দলের প্রধান ছিলেন তাঁর পুত্রবধূ, সোনিয়া গান্ধী; অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বাংলাদেশের বন্ধু, প্রণব মুখার্জী।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন আর আমেরিকা এসময়ে বিপরীত মেরুতে; চীনের সঙ্গে আছে মুক্তিযুদ্ধ বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া। ভারতের কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক তখন তলানিতে পৌঁছেছিল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সুযোগ পেয়েছিল পাকিস্তান আর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ বলয় থেকে বেরিয়ে আসার। সুযোগটা আরও বড় হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং পদ্মা সেতু ইস্যুতে আমেরিকার বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান নেয়ায়। সুযোগটা আওয়ামী লীগ কাজেও লাগিয়েছিল পুরোপুরি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতা দখল করে নিজের রাজনীতির স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলোকে একত্রিত করে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেই রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিদের। বহু দলীয় গণতন্ত্রের নামে বঙ্গবন্ধুর সময়ে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীসহ অন্যান্য স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলোকে তিনি রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। দেশে ফিরিয়ে আনেন গোলাম আযমসহ পালিয়ে যাওয়া অনেক যুদ্ধাপরাধীকে। প্রধানমন্ত্রী বানান স্বাধীনতা বিরোধী মুসলীম লীগার শাহ আজিজুর রহমানকে। জিয়াউর রহমান মন্ত্রী সভার আরেক কুখ্যাত সদস্য রাজাকার আব্দুল আলিম। ক্ষমতা দখলের মাত্র ৫৪ দিন পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন ১১ হাজার অভিযুক্তকে জিয়াউর রহমান জেল থেকে ছেড়ে দেন ৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। জিয়াউর রহমান সৃষ্ট বাংলাদেশ বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী অভয়ারণ্যে বেরিয়ে আসে দেশের ভেতর গা ঢাকা দেয়া রাজাকার, আলবদর, আলশামসেরা; দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থান এবং হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। অগ্রহণযোগ্য হয়েছিল মুসলিম লীগও। এরকম পরিস্থিতিতে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির জন্য একটা নতুন প্লাটফর্ম দরকার ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যদিয়ে এই প্লাটফর্মের নেতা ঠিক হয়ে গিয়েছিল; বাকি ছিল শুধু প্লাটফর্মের কর্মী-সমর্থকদের একত্রিত করার কাজ। দলগত ভাবে জামায়াতের ইসলামী আর মাওলানা ভাষানীর শিষ্য মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে সৃষ্ট হয় বিএনপি। স্বাধীনতা বিরোধী মুসলিম লীগ, নেজামে লীগ, অন্যান্য সুবিধাবাদী আর কিছু ক্ষমতালোলুপ ‘চামবাজ মুক্তিযোদ্ধা’ যোগ দেয় জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে। পরবর্তী সময়ে ভাসানীর ন্যাপের তথাকথিত বাম রাজনীতি করা এবং হক-তোহায় ধারার উগ্র বামপন্থীরাও যোগ দেয় জিয়াউর রহমানের ‘টাউট প্লাটফর্মে’।

কয়েকশ’ মুক্তিযোদ্ধা সেনা হত্যা করে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্বল করে দিলে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান। দেশের ভেতর বেড়ে যায় আইএসআই এবং সিআইএ’র এজেন্ডা বাস্তবায়ন; বাংলাদেশের রাজনীতি যৌথভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে ইসলামাবাদ আর ওয়াশিংটন থেকে। বহু মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী জিয়াউর রহমান নিজেও নিহত হন সেনা অভ্যুত্থানে। জিয়াউর রহমান নিহত হলেও জামায়াতের কলা-কৌশলের কারণে সেনাবাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ কমে না পাকিস্তান আর আমেরিকার।

‘৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ‘৯১ সালে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশীয় দালালদের (যারা নিজেরা নিজেদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বলে পরিচয় দেয়) আওয়ামী লীগ এবং ভারত বিরোধী ব্যাপক প্রচারণা চালায় সেনাশাসক জিয়াউর রহমান সৃষ্ট ক্যান্টনমেন্ট দল বিএনপি’র পক্ষে। এদের অবাধ মিডিয়া প্রচারণা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করে তার পত্নী বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা বিরোধী দলটিকে। এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে জামায়াতে ইসলামীর ১৮ আসনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন বেগম জিয়া। বিনিময়ে ২টি সংরক্ষিত মহিলা আসন ছেড়ে দেয় যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামকে। বেগম জিয়ার এই সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার, সৌদিপন্থি মুসলিম লীগার আব্দুল মতিন চৌধুরী।

৯১-৯৬ শাসনামলে আব্দুল মতিন চৌধুরীর ছত্রছায়ায় এবং তত্ত্বাবধায়নে জামায়াতে ইসলামীর শিকড় গভীর থেকে গভীরে যেতে থাকে। সরকারী পদগুলোতে শিবির কর্মীদের নিয়োগ এসময় থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে। ৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভের পর থেকে বিএনপি-জামায়াত বন্ধুত্ব প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী জোট গঠন জামায়াত-বিএনপি রাজনৈতিক গাঁটছড়া পাকাপোক্ত করে। পুরস্কার স্বরূপ প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরীসহ জামায়াতের দুই নেতা মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রী করে তাদের গাড়িতে তুলে দেয়া হয় জাতীয় পতাকা। নিজামী এবং মুজাহিদ দু’জনেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৭১ সালের মানবতা বিরোধী কাজের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়। আপিলাত ডিভিশন সে শাস্তি বহাল রাখলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বেগম জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৪ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং ২০০১ সালে সরকার গঠন করেন। প্রতিবারের নির্বাচনের সময়ে তিনি জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলামসহ অন্যান্য ছোট ছোট বাংলাদেশ বিরোধী দলগুলো, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দল ফ্রিডম পার্টি, এবং সুশীল সমাজ নামক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালালদের সহায়তা পেয়েছেন। বিতর্কিত ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে মাত্র কয়েকদিন সরকার পরিচালনা করলে বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে সে সরকার ভেঙ্গে দিতে তিনি বাধ্য হন। তিন মেয়াদে তিনি মোট ১০ বছর সরকার পরিচালনা করেছেন। জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করলেও বেগম জিয়ার প্রথম সরকার কম বিতর্কিত ছিল। তৃতীয় মেয়াদের ৫ বছর বিএনপি’র রাজনৈতিক মূলধন শূন্য করে ফেলে। বিএনপি’র রাজনৈতিক মূলধন শূন্য করার কাজে নেতৃত্ব দেন ‘যুবরাজ’ নামে আলোচিত বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান।

২০০১ সালে সরকার গঠন করার কিছুকাল আগে থেকেই বিএনপি রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসেন তারেক রহমান। সে বছরের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় মুখ্য ভূমিকা রেখে বিএনপি’র মূল চালকের আসনে আসীন হন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে এ সময়ে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে বিএনপি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। তারেক রহমানের ব্যাক্তিগত রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবন হয়ে ওঠে দুর্নীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশি-বিদেশি সরকারী ঠিকাদারেরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ পাওয়ার জন্য ধর্না দিতেন হাওয়া ভবনে। হাওয়া ভবনে ১০% জমা না দিলে পাওয়া যেত না সরকারী বড় কাজ। তারেক রহমানের এসব দুর্নীতি পরবর্তী সময়ে আদালতে প্রমাণ হয়েছে। পলাতক তারেক রহমানকে শাস্তি দিয়েছেন বাংলাদেশের আদালত। দুর্নীতি করে পাচার করা টাকা ফেরত আনা হয়েছে তারেক ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার-বন্ধু গিয়াস উদ্দিন মামুনের যৌথ নামে থাকা সিঙ্গাপুরের ব্যাংক একাউন্ট থেকে। বেগম জিয়ার আরেক পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর দুর্নীতির টাকাও ফেরত আনা হয়েছে সিঙ্গাপুরের ব্যাংক থেকে। সিমেন্স মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বাংলাদেশে এসে সাক্ষ্য দিয়ে গেছে কোকোর বিরুদ্ধে।

দুর্নীতি ছাড়াও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চলছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে শেষ করে দিতে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এই হামলায় জড়িতরা আদালতে স্বীকার করেছে যে তারেক রহমানের হাওয়া ভবনে মিটিং করে ঠিক করা হয় হামলার পরিকল্পনা। হামলায় ব্যবহার করা হয় পাকিস্তানী আর্জেস গ্রেনেড। ২১ আগস্ট হামলা ছাড়াও বিএনপি’র ২০০১-০৬ শাসনামলে সংগঠিত আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়া এবং আহসানউল্লাহ মাষ্টার হত্যা মামলায় তারেক রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

বিএনপি’র রাজনৈতিক মূলধন শূন্য করার কাজে তারেক রহমানের আরেক কাজ জামায়াত এবং তৎসৃষ্ট জঙ্গিদের সঙ্গে বিএনপি’র ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের নিয়ে বিএনপি গঠিত হলেও জিয়াউর রহমান নিজে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় এবং দলটিতে কিছু মুক্তিযোদ্ধা থাকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধপন্থি দল হিসেবে প্রচারণা চালায়। ৭০ এর নির্বাচনে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে ভোট দেয়া ২৮% লোক সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচারণার আড়ালে বিএনপিতে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষশক্তি হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ পায়। এদের মুক্তিযুদ্ধপন্থি হবার চেষ্টা এতটাই ব্যাকুল হয়ে ওঠে যে এরা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক আখ্যায়িত করে প্রচারণা চালাতে থাকে। মার্কিন দালাল সুশীল সমাজের বহুকালের চেষ্টায় সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধপন্থি মুখোশের থোড়াই কেয়ার করে তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এবং তাদের সৃষ্ট জঙ্গিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে থাকে। তারেক রহমানের ক্ষমতায় পুষ্ট জঙ্গিরা রাজশাহী অঞ্চলে প্রকাশ্যে ভিন্নমতাবলাম্বীদের হত্যা করতে শুরু করে। বাংলা ভাই প্রকাশ্যে সশস্ত্র অবস্থায় মোটরসাইকেল নিয়ে রাজপথে পুলিশ নিরাপত্তায় মহড়া দিয়েছিল। ‘বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি’ বলে মন্তব্য করেন জামায়াত-বিএনপি জোটের মন্ত্রী যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য ২০১২-১৩ সালে দেশজুড়ে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে জামায়াতে ইসলামী। এসময়ে তারা দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ হত্যা, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের উপর আক্রমণ করে পুলিশ হত্যা, সরকারী-বেসরকারি অফিস-আদালতে হামলা করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বাড়িতে আক্রমণ করে অগ্নিসংযোগ এবং অর্ধশতাধিক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা, বাসে পেট্রোলবোমা মেরে কয়েক’শ নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে। জামায়াতের এসব কাজে প্রকাশ্যে নৈতিক সমর্থন দেয়া এবং অপ্রকাশ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে বিএনপি। বেগম জিয়া দলের প্রধান পদে আসীন থাকলেও ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপি’র সকল রকমের কর্ম-পরিকল্পনা করা হয় তারেক জিয়ার সিদ্ধান্তে। ১৩ সালের নৈরাজ্য চলাকালীন লন্ডন থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরীর টেলিফোন আলাপ ফাঁস হলে দেশবাসীর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে তারেক রহমানের জামায়াত প্রীতি এবং জঙ্গি মানসিকতা। তারেক রহমানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ২০০৫/০৬ সালে তারেক রহমানকে আমেরিকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। কানাডার দুই আদালত বিএনপিকে “সন্ত্রাসী দল” বলে মতামত দেয়।

সরকার পতনের আন্দোলনের নামে ১৫ সালের শুরুতে লাগাতার অবরোধের ডাক দিয়ে বেগম জিয়া বসবাস করতে শুরু করেন দলীয় কার্যালয়ে। দীর্ঘ ৯২ দিন সেখানে অবস্থান করে তিনি দেশজুড়ে চালান পেট্রোলবোমা সন্ত্রাস। এ সন্ত্রাসে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় কয়েকশ সাধারণ পথচারী, গবাদি পশু; ধ্বংস করা হয় কয়েক হাজার যানবাহন। সে সন্ত্রাস চলাকালে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবং গণফোরাম নেতা ডঃ কামাল হোসেন সন্ত্রাসীদের কাছে হার স্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বলেছিলেন আওয়ামী লীগকে। এত ব্যাপক সন্ত্রাসের পরেও সরকার টলাতে না পেরে বেগম জিয়া অবরোধের সমাপ্তি ঘোষণা না করে বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হন। ১৩-১৫ সালের পেট্রোলবোমা সন্ত্রাস সাধারণ মানুষের কাছে বেগম জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিঃশেষ করে দেয়। দেশজুড়ে এত ব্যাপক অগ্নি সন্ত্রাস, বিশেষ করে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে যিনি রাজনৈতিক দাবী আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন তাকে জনগণের নেতা হিসেবে আর মেনে নেয়নি সাধারণ মানুষ, এমনকি তার দলের নেতা কর্মীরা পর্যন্ত। বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত তার ডাকে সে আন্দোলনে সাড়া দেননি।

২০০১-০৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক অরাজকতা, জঙ্গি সৃষ্টি – বাংলাভাইদের উত্থান, বিরোধী দল হত্যা, নিপীড়ন, জামায়াত-শিবিরের দৌরাত্ম্য, যুদ্ধাপরাধীদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়া, সর্বোপরি হাওয়া ভবন সৃষ্টি করে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দুর্নীতিতে পরপর পাঁচ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা পাওয়া বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলে থেকেও করেছেন একই রকমের কাজ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তিনি শুধু বাধাই দেননি যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধকে অস্বীকার করেছেন; হরতাল করে, বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হত্যা-ধ্বংস করে বিচার বানচাল করার চেষ্টা করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন; পনেরই আগস্ট মিথ্যা জন্মদিন পালন করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকে উপহাস করেছেন। ১/১১ সরকারের দায়ের করা দুর্নীতির মামলা, পরবর্তী সময়ে অগ্নি সন্ত্রাসের হুকুমের আসামী হিসেবে এবং অন্যান্য কারণে তার বিরুদ্ধে ৩০টির অধিক মামলা বর্তমানে চালু রয়েছে। এর একটির রায়ে তার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। তিনি আরও কয়েকটি মামলায় পাঁচ মাসের অধিককাল ধরে জেল হাজতে আছেন। তার বিরুদ্ধে যত মামলা আছে তার অধিকাংশের জন্য সাজা হওয়া স্বাভাবিক।

বেগম জিয়া জেলে যাবার পর বিএনপি’র নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন বেশ কয়েকটি মামলায় সাজা প্রাপ্ত, পলাতক আসামী তারেক রহমান। তাকে দলের দায়িত্ব দেয়ার জন্য বিএনপি’র গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত লোককে নেতৃত্ব গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তারেক জিয়া টেলিফোনে নির্দেশনা দিয়ে দলের কাজ চালাচ্ছে। তার নেতৃত্বে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা ঘটেনি। এমনকি তিনি নিজের মায়ের মুক্তি নিয়ে আন্দোলন করতে পারেননি। পারেননি খালেদা জিয়ার পক্ষে দেশি বা বিদেশি জনমত সৃষ্টি করতে কিংবা কোন রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করে সরকার বিরোধী অবস্থান জোরালো করতে। কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভাগ বসাতে তিনি চেষ্টা করেছেন যা প্রকাশ হয়ে পড়েছে লিক হয়ে যাওয়া টেলিফোন আলাপে। এতে তার এবং তার দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণই হয়েছে। তারেক জিয়ার মধ্যে বড় দলের নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলী যে নেই তা এখন প্রমাণিত।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দল আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী এবং জঙ্গিবাদীদের রাজনীতির বিরুদ্ধে; হত্যা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ কাজে তারা দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পাচ্ছে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির রাজনীতি শেষ হয়েছে। তদুপরি টানা দুই টার্ম সরকার পরিচালনা কালে তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ সফরে এসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের মডেল’।

একদিকে বাংলাদেশেকে আওয়ামী লীগ যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে এবং তার বিপরীতে সময়োপযোগী রাজনৈতিক কর্মসূচির অভাবে বিএনপি গণসম্পৃক্ততা হারিয়েছে। বেগম জিয়ার হাজতবাসকেও কাজে লাগাতে পারেনি অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত বিএনপি। বেগম জিয়া’র মুক্তির দাবী জনসমর্থন পায়নি। বেগম জিয়ার হাজতবাস এবং তারেক রহমানের ফেরারী জীবনে বিএনপি’র নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতা। বেগম জিয়া বা তারেক রহমান সহসা ফিরে এসে রাজনীতির হাল ধরবেন এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তারা হাল ধরেলেও অতীত কর্মের কারণে জনপ্রিয়তা ফিরে পাবেন – এমন আশা করা বাড়াবাড়ি হবে। সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে জিয়া পরিবারের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা বিরোধী প্লাটফর্মে গঠিত জনবিচ্ছিন্ন বিএনপি তালেবান স্টাইলের জঙ্গিবাদী, মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে আর বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। ডানপন্থিদের সময় হয়েছে নতুন প্লাটফর্ম বানানোর।
-সংগৃহিত

লেখক: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও শিক্ষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ