তারুণ্য ও রাজনীতির আবশ্যকতা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০১৮, ১০:৪৬

অজয় দাশগুপ্ত, ১৩ জুলাই, এবিনিউজ : মাঝে মাঝে তারুণ্য এমন সব কান্ড করে যা আমাদের বুকের ছাতি বড় করে তোলে। তারাই আমাদের ভবিষ্যত। তারাই ভরসা। আবার এমন সব কান্ড করে যা আমাদের বুকের রক্ত হিম করে ফেলে। নানা সংঘাতে রাজনীতিদীর্ন আমাদের সমাজে কোটা আন্দোলন এক নয়া সমস্যা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন বাতিল করা হবে। তাহলে সমস্যা কোথায়? এমনতো না যে আজ বললেই কাল বাতিল হবে। সব বিষয়ে একটা প্রক্রিয়া আছে। প্রক্রিয়া থাকে। কাজেই সে সময়টুকু দিতে হবে। না দেয়ার আগেই যারা তারুণ্যকে নিয়ে খেলছে তারা যেমন অপরাধী তেমনি অপরাধী অধৈর্য মারনেওয়ালারা। তারা আর কিছু পারুক বা না পারুক লাঠিসোটা আর অস্ত্র নিয়ে নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের বেশ পেটাতে পারে। এই পেটানোর ফলে কার লাভ হয়? লাভ হয় তাদের যারা চায় দেশের বিভ্রান্ত তারুণ্য আহাজারি করে মরুক। যারা চায় তারা রাজাকার হোক। আর সে সুযোগ করে দিচ্ছে সরকারী দলের লোকজন। কি দুর্ভাগ্য আমাদের। উপাচার্যের মত বিশাল পদবীর মানুষ ও যা ইচ্ছে বলেন। এই যে তিনি এদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে দিলেন এতে কি আসলে তাঁর কোন লাভ হয়েছে? সবদেশে সবকালে ছাত্র ছাত্রীরাই প্রতিবাদ করে। তাদের যৌবনের ধর্ম ই তাই। কখনো তাদের বুঝিয়ে কখন দাবী মেনে কখনো সামান্য শাসন করেই বাগে আনতে হয়। এর সঙ্গে জঙ্গির সম্পর্ক কি? তা ছাড়া এরা আমাদেরি সন্তান আমরা বুঝে না বুঝে তাদের জঙ্গির দলে ঠেলে দিয়ে আসলে কি কোন কিছু লাভ করতে পারবো? তাই সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে দেশে ছাত্র ছাত্রী বা তারুণ্যের রাজনীতি করার দরকার আছে কি না।

তারুণ্য রাজনীতি করবে কি করবে না এটা নিয়ে মতভেদ আছে দেশে। খুব স্বাভাবিকভাবে এখন যে পরিবেশ তাতে অভিভাবকেরা চাইবেন সন্তান যেন সে পথ না মাড়ায়। এটা খুব যৌক্তিক চাহিদা। কারণ রাজনীতি মানে এখন আর কোন আদর্শ বা নৈতিক কিছুনা। বহু আগেই সে ইমেজ হারিয়ে ফেলেছে রাজনীতি। অথচ আমাদের দেশের ইতিহাস জুড়ে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় অধ্যায়। ষাট দশকের ছাত্র রাজনীতি এদেশকে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করার কাজ শুরু করেছিল। তাদের জীবন ও সংগ্রাম ছিল মানুষের জন্য অনুকরণীয়। সে সময় তারা স্লোগান দিতো একটি বাংলা শব্দ একজন বাঙ্গালির জীবন। ষাট দশকের সেই সুবর্ণকালে আসাদ ঘরে না ফিরলেও শামসুর রাহমানের ভাষায় ফিরে গিয়েছিল আসাদের সার্ট। সেই সূচনাকে আরো প্রাণবন্ত আরো অর্থবহ করে তুলেছিল তাদের উত্তরাধিকারীরা।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও সূচনা লগ্নে তারুণ্যের যে সংগ্রাম ও ভূমিকা তার উজ্জলতায় স্বাধীনতা পেয়েছিলাম আমরা। চার খলিফা নামে খ্যাত ছাত্র রাজনীতির চার নেতার কেউই মূল দলে থেকে বা সরে গিয়ে নিজেদের আসন পাকা করতে না পারলেও একাত্তর অবদি এরাই আমাদের তারুণ্যের স্তম্ভ। ছাত্র রাজনীতি না থাকলে পাকিস্তানি শাসকদের লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর মোকাবেলা করাটা সহজ হতোনা। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির মূল নেতা ও মাথার ওপর সূর্যের মত থাকলেও এরাই ছিল ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। সে সময়কার তারুণ্যের জয়জয়াকার বা ভূমিকা বুঝতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানলেই এর সত্যতা চোখে পড়বে। মুজিব বাহিনী কাদেরিয়া বাহিনী শেখ ফজলুল হক মনি বা সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা নিয়ে আজ আমরা যত তর্ক বিতর্ক করিনা কেন সে সময়কালে এরা না থাকলে বাঙ্গালি পড়ে পড়ে মার খাওয়ার বাইরে ঘুরে দাঁড়াতে পারতোনা। মুক্তিযুদ্ধে যারা লড়াই করতে গিয়েছিলেন সেই শহিদ রুমি বা অসংখ্য শহিদের বেশীরভাগই ছিলো তরুণ। যারা লড়াই করতে গিয়েছিল তাদের রক্তে যৌবন চোখে তারুণ্য মগজে স্বাধীনতা। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

বয়স্ক মানুষেরা তাদের বয়সের সাথে সাথে গুটিয়ে যাবেন এটাই নিয়ম। বিজ্ঞান বলে একটা বয়সের পর মানুষের মগজের কোষ শুকিয়ে আসে। তাদের চিন্তাশক্তি লোপ পেতে শুরু করে। এটা যে কতটা সত্য আমাদের মতো মানুষেরা এখন তা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাই। বলাবাহুল্য এর সাথে কমে আসে ঝুঁকি নেয়ার সাহস। বলা হয় শৈশব হলো আদর ও স্নেহের যৌবন দ্রোহের ও আবিষ্কারের পরিণত বয়স হিসেব মেলানো ও স্মৃতিকাতরতার। ফলে দুনিয়া বদলে দেয়া মানুষেরা কম বয়সেই তাদের কাজগুলো করে ফেলেন। রাষ্ট্র বা দেশ নিয়ে কিছু করার জন্য যৌবনের চাইতে ভালো বয়স হতেই পারেনা। আমাদের দেশের নেতৃত্বে যৌবনের ঘাটতি আজ এতটাই প্রকট আমরা এমন সব কথা শুনি বা এমন সব কান্ড দেখি যাতে নেতাদের স্মৃতিভ্রষ্টতা স্পষ্ট। অথচ বঙ্গবন্ধু এমনকি চারনেতাও তাঁদের বয়স থাকতে থাকতেই নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে গেছিলেন।

সবকিছুতেই উত্তেজনা আমাদের। আমরা হুজুগে জাতি। এর ভালোমন্দ দু দিক ই স্পষ্ট এখন। ভালোটা এই, আমাদের দেশে অনাচার আর সহিংসতার শেষ নাই। সেসব ভুলে মানুষ কিছুদিনের জন্য হলেও আনন্দে মেতে ওঠে। আর মন্দ হচ্ছে বাড়াবাড়ি। সবকিছুতে আমরা এমন ভাগাভাগি আর রেষারেষির শিকার হই যা ভাবতেও ভয় লাগে। এই যে বিশ্বকাপ ফুটবল, গোড়াতে বলি আমরা কি ভালো ফুটবল খেলি? না খেলতে পারার কোন ইচ্ছে আছে আমাদের? দেশের ফুটবলের হাল চরমে। এককালে আমাদের ধ্যান জ্ঞান ছিলো ফুটবল। ঢাকা মহমেডান বা আবাহনী ওয়ার্ন্ডাস কিংবা ব্রাদার্স ইউনিয়নের জন্য পাগল হয়ে থাকতাম আমরা। কবেই গত হয়েছে সেসব দিন। এখন ক্রিকেটের যুগ। অল্প কিছু দেশ এ খেলাটা খেলে। বিশেষত যারা ইংল্যান্ডের কলোনী ছিলো তারাই মূলত এখেলায় আছে। সেখানে আমরা মোটামুটি একটা জায়গা করে নেয়ায় আমাদের মানুষজন খুশী। আমরা বিশ্বমানের ক্রিকেট খেলি একথা যতটা সত্য তারচেয়েও সত্য এই মান পরিমাপের জন্য আছে মাত্র সাত আটটা দেশ। ফুটবল এত সোজা কিছুনা। সারাবিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এ খেলার পাগল। এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপ আমেরিকা সাত মহাদেশের সবাই আছে এতে। আমি বিগত বিশ বছরের অধিক যেদেশে থাকি যেদেশ আমাকে নাগরিকত্ব দিয়ে আপন করে নিয়েছে সেই সুদূর অষ্ট্রেলিয়াও আছে এ দলে। শুধু থাকা না বছরের পর বছর চূড়ান্ত পর্বে খেলে এই দেশ। এবার তারা কেমন খেলছে সেটা সারা দুনিয়া দেখেছে। মাত্র আড়াই কোটি বা তার চেয়ে কম জনসংখ্যার এই দেশ যেকোন খেলায় বিশ্বমানের। কারণ তারা খেলাকে খেলা হিসেবে নেয়। সাথে থাকে প্রফেশানিলিজম। যে কারণে আন্তরিকতা থাকলেও বাড়াবাড়ির জায়গা নাই।

খেলা থেকে জীবন সব জায়গায় এমন আবেগ আর উত্তেজনার জাতিতে রাজনীতি তারুণ্যে কতটা থাকবে আর থাকলে কি হবে রূপরখা সেটাই এখন ভাবার বিষয়। কারণ বল কিন্তু মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে। ছবিতে দেখছি লাজ লজ্জা ভুলে গালে রাজাকার লিখে মাঠে নামছে তারুণ্য। মেয়েরাও। এভাবে শব্দটি গালাগাল থেকে সম্মানের রূপ নিলে জাতির আর মাথা তুলে বাঁচার পথ থাকবেনা। সরকারী বেসরকারী কোন ছাত্র রাজনীতি ই আসলে এখন আর তেমন দরকার নাই। এটাই ভাবার বিষয় আমাদের।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামলেখক।
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ