ঘুরে এলাম শান্তিনিকেতন : লায়লা আরজুমান

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৮, ১০:৫৫

ঢাকা, ১১ জুলাই, এবিনিউজ : সেই ছোটবেলা থেকে শান্তিনিকেতনের নাম শুনেছি। টেলিভিশন, ছবিতে শান্তিনিকেতন দেখেছি। তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল, যদি শান্তিনিকেতন যেতে পারতাম! অবশেষে সেই ইচ্ছাটা পূরণ হলো। স্বামী, ছোট ছেলে সাবাবসহ কলকাতায় ঘুরতে এসে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। কলকাতা থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে বোলপুর নামক স্থানে শান্তিনিকেতন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নি। রাস্তা ভালো বলে জার্নি ভালো লেগেছে। মাঝপথে লেংচ্ছা নামক মিষ্টির দোকানে চালক গাড়ি থামাল। এখানে হালকা নাশতা করে আবার রওনা হলাম। প্রথমেই গেলাম ্তুজঅঞঅঘ কটঞঐও্থ নামক শান্তিনিকেতনের রেস্ট হাউসে। এখানে অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে এলাম। চারদিকে বড় বড় গাছ, সবুজের সমারোহ, বিভিন্ন রকমের গাছ সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢুকতেই কবিগুরুর শান্তিনিকেতন নিয়ে লেখা কয়েকটি চরণ মনে পড়ে গেল- মোদের শালের ছায়াবীথি/ বাজায় বনের কলগীতি,/সদাই পাতার নাচে মেতে আছে আমলকী কানন/ আমাদের শান্তিনিকেতন

বারবার বড় ছেলে সাদাবের কথা মনে হচ্ছিল। সাদাব তার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততার কারণে যেতে পারেনি। সে গেলে অনেক ছবি তুলত, আনন্দ করত। আমরা একজন ট্যুরিস্ট গাইড নিয়ে শান্তিনিকেতন দেখা শুরু করি। প্রথমেই পড়ল 'উপাসনা গৃহ'। এই গৃহের স্থাপনা অনেক মনোমুগ্ধকর। পাখির কলকাকলি চারদিকে। একটু সামনে এগিয়ে গেলে 'শান্তিনিকেতন গৃহ'। এটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ নির্মিত প্রাচীনতম আবাসগৃহ। বালক রবীন্দ্রনাথের প্রথম শান্তিনিকেতন বাস এই গৃহেই। অনেক দিন ধরে এই গৃহেই ছিল অতিথি নিবাস। এই গৃহেই রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যান, যা বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহূত। ভেতরে অনেক পারিবারিক ছবি ও বর্ণনা আছে। এই বাড়ির সামনে বিশ্ববিখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজের একটি শিল্পকীর্তি আছে। শিল্পটি হচ্ছে একজন মা তার শিশুকে কোলে রেখেছে। সামনে এগিয়ে গেলে বকুল গাছ। গাছের নিচে সিমেন্টের তৈরি গোল করে বসার জায়গা, বেদি। এ রকম বেশ কিছু গোল চত্বর আছে। এখানে বসেই ক্লাস হয়। প্রকৃতি, গাছ, মাটির পাশাপাশি ও কাছাকাছি পড়াশোনা চলে। সুন্দর হাওয়ায় বকুল গাছের পাতাগুলো দুলছে। এই জায়গাটির নাম 'বকুলবীথি'। এখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পুরানো সেই দিনের কথা গানের সুর, চরণ বারবার মনে হচ্ছিল :

মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়-

বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়...

পুরো জায়গা হেঁটে বেড়ালাম, সবাই মিলে ছবি তুললাম। একটা জায়গায় দেখি অনেক আমগাছ লাগানো। নাম আম্রকুঞ্জ। এখানেও বেদি আছে। এই বেদিতে বর্তমানে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আম্রকুঞ্জের দক্ষিণ কোণে একটি ছোট দোতলা বাড়ি, নাম 'দেহলী'। বর্তমানে এটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর নামানুসারে 'মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা' নামে পরিচিত। কিছু দূরে একটা কুঠি, নাম মহুয়া কুঠি। আরেকটু সামনে গেলে ছাতিমতলা, যে ছাতিমতলার নাম সব সময় শুনে এসেছি। এই ছাতিমতলা থেকেই শান্তিনিকেতনের উৎপত্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুর নামক স্থানে তার বন্ধু ভুবনমোহন সিংহের বাড়ি যাচ্ছিলেন। তখন ছাতিমতলায় কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেন। এখানে তিনি মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি পেয়েছিলেন। অতঃপর তার বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে আবার রওনা হন। তিনি ছাতিমতলাসহ জায়গাটি কেনার জন্য তার বন্ধুর কাছে প্রস্তাব দেন। বন্ধু ২০ বিঘা জমি এমনিতেই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিতে চাইলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই বিনা মূল্যে জমি নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। অতঃপর এক বছর পর এক টাকার বিনিময়ে কোর্টে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে জমিটি তিনি কিনে নেন। এই শান্তিনিকেতনের মূল ছাতিমতলা থেকেই আবর্তিত। সেকালের বড় ছাতিম গাছ ঝড়ে পড়ে যাওয়ার পর নতুন ছাতিম গাছ লাগানো হয়েছে। ছাতিমতলার গেটের কাছে গেলেই ওপরে লেখাটি চোখে পড়বে। লেখা আছে- 'তিনি/আমার প্রাণের আরাম,/ মনের আনন্দ,/ আত্মার শান্তি।' 

শান্তিনিকেতনে আছে সিংহ সদন, শমীন্দ্র পাঠাগার, গৌরমঞ্চ। আরও আছে বিদ্যালয় গৃহ। সুদীর্ঘকাল এই গৃহেই ছিল আশ্রম গ্রন্থাগার। বড় বড় গাছের সারি পার হয়ে দেখলাম মাটির নির্মিত একটি ঘর। এখানে মহাত্মা গান্ধী থেকেছেন। তারই স্মৃতিস্বরূপ এই মাটির ঘর। শান্তিনিকেতনের দর্শনার্থীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান রবীন্দ্র মিউজিয়াম। আছে উত্তরায়ন। উত্তরায়ন গেটে ঢুকে প্রথমে বাড়িটি পড়ে, তার নাম বিচিত্রা। এখানে রবীন্দ্রভবন। এখানে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সময়ে বাস পাঁচটি বাড়ি আছে। বাড়িগুলোর নাম কোর্নাক, শ্যামলী, উদীচী, পুনশ্চ, উদয়ন। কোর্নাকের পূর্বদিকের প্রধান ঘর-সংলগ্ন বারান্দাটি দু'ধাপ নিচে নেমে ছড়িয়ে গেছে সামনের দিকে। এখানে সারি সারি খাম দেওয়া খোলা বারান্দা। এই খোলা বারান্দায় এক সময় রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত কবিতা পাঠের আসর বসিয়েছেন। ১৯৩৬ সাল নাগাদ শ্যামলী থেকে রবীন্দ্রনাথ পুনশ্চ নামক বাড়িতে উঠে আসেন। এ বাড়িতে ছাদহীন খোলা বারান্দা আছে। এটি তার বিশেষ প্রিয় ছিল। উদীচী উত্তরায়নে রবীন্দ্রনাথের শেষ বাড়ি। কবি এই বাড়িতে ১৯৩৯ সালের শেষদিকে বাস করেছেন। উদয়ন বাড়ির বারান্দায় কবির শেষ জন্মদিন উদযাপিত হয়েছিল। উত্তরায়ন প্রাঙ্গণে অনেক লোক ঘুরছে, দেখছে। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। যে পথটি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের পাঁচটি বাড়ি দেখার জন্য যেতে হয়, সেই স্থানে কিছু ছবি তুলি। সবাই মিলে গল্প করতে করতে রতন কুঠিতে ফিরে এলাম। পরদিন সকালে শান্তিনিকেতনের ক্লাস দেখতে গেলাম। বকুলবীথিতে ক্লাস চলছে। হলুদ পোশাক পরা ছেলেমেয়েরা গাছের নিচে গোল হয়ে বসে ক্লাস করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র পাঁচজনকে নিয়ে ক্লাস শুরু করেছিলেন। এইভাবেই প্রকৃতির কাছাকাছি ক্লাস নিয়েছিলেন। বারবার মনে হচ্ছিল, এই শান্তিনিকেতনে তিনি হেঁটেছেন; রচনা করেছেন অনেক সাহিত্য, কাব্য। ঘুরে বেড়িয়েছেন সর্বত্র।  (দৈনিক সমকাল থেকে সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ