ট্রাম্পের ভুল থেকেও যেন শিক্ষা নিই

  আহমদ রফিক

০৬ এপ্রিল ২০২০, ২১:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

এখন করোনা বিনে কথা নেই। কারণ করোনা ভাইরাস গোটা বিশ^ দলিত-মথিত করে বেড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর দাপটে, ব্যতিক্রম মাত্র কয়েকটি দেশ, তাও কতদিন তারা ওই আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে, বলা কঠিন। দুই বিশ্বযুদ্ধের তুলনা টেনে ইতিহাস চর্চায় মনোযোগীদের মধ্যে এমন ধারণা প্রায়শ দেখা যায় যে মারি-মহামারি বা দুর্যোগ পরাক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্পর্শ করতে বা কাবু করতে পারবে না।

মার্কিনি শাসক কারো কারো হয়তো বা এমন ধারণা। ধারণার কারণ তাদের অর্থশক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শক্তি। আমরাও এমনটাই ভাবতে অভ্যস্ত। করোনা ভাইরাস সে ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ভাবা যায়, ইতোমধ্যে প্রায় তিন লক্ষাধিক যুক্তরাষ্ট্রবাসী নাগরিক করোনা ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত এবং তা দ্রুত বেড়ে চলেছে। এর পরিণাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে?

অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না এখন এমন বক্তব্যই উঠে আসছে। আসার পেছনে মূল কারণ বা ব্যক্তিটি হচ্ছে স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিযোগ মিথ্যা নয় যে চীনে এ আক্রমণ শুরু হওয়ার পর বেশ খোশমেজাজে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি করোনা সংক্রমণের অর্থনৈতিক বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছিলেন। এর মানবিক তথা অমানবিক দিকটি নিয়ে নয়।

কারণ তিনি একজন সফল বৃহৎ ব্যবসায়ী ব্যবসার অলিগলিতে বিচরণে তার আগ্রহ সর্বাধিক। তাই একাধিকবার সাংবাদিকদের সঙ্গে করোনা প্রসঙ্গে তার আলোচ্য বিষয় ছিল এর অর্থনৈতিক প্রভাবের নেতিবাচক দিক। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস ঢুকে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভেদ করে, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যাতায়াতের কল্যাণে বা অন্য কোনো সূ² পথে।

প্রতিরোধক ব্যবস্থা তখনই নেয়া শুরু করা দরকার ছিল ব্যাপক ও বিবিধ মাত্রায়। ইতোমধ্যে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা এ মহামারিকে বিশ্বমারি (‘প্যান্ডেমিক’) আখ্যা দিয়ে যথযাথ সতর্কতা ও প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে চলেছে। এ আহ্বান ছিল বিশ্বজুড়ে সব দেশের উদ্দেশ, বাদ ছিল না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

দুই.
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেসব সুরক্ষার আয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার মনে করেননি, তার পরিণামটা দেখা যাচ্ছে আক্রান্তের পরিসংখ্যানে। এখন তিনি অভিযোগের কাঠগড়ায়। সময় মতো সঠিক ব্যবস্থা নিয়ে অবস্থার গুরুত্ব সামাল দিতে পেরেছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া খবরে তেমনই তথ্য প্রকাশ।

আমাদের উদ্বেগ যেমন মানব বিশ্ব নিয়ে, স্বভাবতই ততোধিক নিজ দেশ নিয়ে। কারণ বাংলাদেশের মহামারি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো তেমন মজবুত ও পাকাপোক্ত নয়। একবার আক্রমণ ব্যাপকতা পেলে প্রতিরোধ করা কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভবের কোঠায় গিয়ে দাঁড়াবে। কাজেই সে দুর্বলতা স্মরণে রেখে যত সব ব্যবস্থাপনা। সামনে উদাহরণ অনেক। ইতালি-স্পেন ভয়াবহ রকম ব্যাপকতায় আক্রান্ত, তেমনি মৃত্যুর হার। আক্রমণের হার বিবেচনায় ট্রাম্পের বিশাল ভুবন সবার ওপরে। ওদের হয়তো সঠিক প্রযুক্তি, অনেক সরঞ্জাম আছে, আমাদের নেই। তাই আমাদের জন্য সর্বাধিক সতর্কতা অতি আবশ্যিক।

প্রকৃতির দাক্ষিণেই, নাকি করোনার করুণায় বাংলাদেশে আক্রমণ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেনি। কিন্তু এ অবস্থা কতদিন থাকবে, কেউ বলতে পারে না। কারণ এর বিস্তার ঘটে যথেষ্ট দ্রুত সময়ে। মারিতাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশে আক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায় খুব একটা দূরে নয় প্রথম সংক্রমণে আক্রান্তের সময়সীমা হিসাবে মাসখানেকের মধ্যেই ব্যবস্থা না নিলে মারি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

প্রতিরোধক ব্যবস্থা বলতে আমরা যা বুঝি, তার প্রথমটি হলো সন্দেহভাজন বা আক্রান্তকে বিচ্ছিন্ন করা। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা বহু আলোচিত। প্রথমত, পরীক্ষা সরঞ্জামের স্বল্পতা, যে কারণে অনেক আক্রান্ত শনাক্তকরণের বাইরে থেকে যাবে, সম্ভবত যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মারাত্মক একটি ভুল বা শিথিলতা হলো ইতালি, স্পেন প্রভৃতি আক্রান্ত দেশ থেকে আগত প্রবাসী বাঙালি সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে/আইসোলেশনের বিচ্ছিন্নতায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। চেষ্টাও চলেনি।

প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে বিমানবন্দর থেকেই তারা হারিয়ে গেছে অর্থাৎ যে যার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে সরকারের অগোচরে। বেশ কিছুদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় এ সংবাদটি দেখেছিলাম, সংখ্যা কয়েক হাজার। এদের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি, এক বা একাধিক ব্যক্তি করোনা ভাইরাস বহন করে থাকে, তার পরিণাম কী হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তিন.
সরকার যে ইতিবাচক উদ্যোগটি নিয়েছে তা হলো, রাজধানী লকডাউন, পরে গোটা দেশ নাগরিকদের জরুরি কাজ ছাড়া গৃহবন্দি করে রাখা ওষুধের দোকান, কাঁচা বাজার, মুদি দোকান ছাড়া সব বন্ধ। বন্ধ শিক্ষায়তন, জনসমাবেশ, অনুষ্ঠান, এমনকি পহেলা বৈশাখের আসন্ন নববর্ষ অনুষ্ঠানও বন্ধ। তাতে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা পালিত হলেও মূল একাধিক জায়গায় গুরুত্বের সঙ্গে নজরদারি করা অত্যন্ত জরুরি।

যেমন সন্দেহভাজন বা সামান্য লক্ষণধারীদের শনাক্তকরণ পরীক্ষা, পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে বিচ্ছিন্নকরণ ব্যবস্থা। সেই পরীক্ষা কাজটি ব্যাপকভাবে হচ্ছে কিনা তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ। এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্ক নজরদারি ও ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এটা প্রতিরোধক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। পরীক্ষার সুবন্দোবস্তের সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া দরকার।
তবে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও সেবিকার জন্য প্রতিরোধক সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ। এখানে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ফলে রোগীর চিকিৎসা ও সেবা বিপর্যস্ত। এ সম্পর্কে সংবাদপত্রগুলোতে প্রতিদিন নানা শিরোনামে খবর ছাপা হচ্ছে। যেমন ‘হাসপাতালে ভর্তি-সেবা বন্ধ’/‘চিকিৎসা পাচ্ছেন না রোগীরা’।

অন্য একটি দৈনিকে খবর : ‘করোনা চিকিৎসায় প্রস্তুত নয় সব হাসপাতাল।’ এ দুঃসংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য তারা অন্তত ডজনখানেক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার উপযোগী করে গড়ে তুলতে যাচ্ছেন এবং তা এপ্রিলের শেষ দিকে ট্রাম্পের মতো বসে না থেকে পূর্বোক্ত ব্যবস্থাগুলো এবং বর্তমান পরিকল্পনা প্রথম আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পর থেকে নেয়াই তো দরকার ছিল। বিচক্ষণ দেশগুলো তেমন ব্যবস্থাই নিয়েছে এবং তার সুফলও পেয়েছে।

শনাক্তকরণ, বিচ্ছিন্নকরণ ও চিকিৎসা এ মূল বিষয়গুলোর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘স্বাস্থ্য বিভাগের শিথিলতা অনস্বীকার্য’। এখন অবশ্য করণীয় সম্পর্কে প্রচার চলছে সরকারি-বেসরকারি পক্ষে। আমাদের জানামতে অন্তত মাসখানেক ধরে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষ পরীক্ষা বন্ধ প্রশ্ন : কী হবে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের। চিকিৎসক-সেবিকাদের প্রতিরোধক সরঞ্জাম সরবরাহ কি এতই কঠিন ছিল, এখনো কঠিন যে চিকিৎসক-সেবিকারা তাদের দায়িত্ব পালনে অক্ষম? তাদের ভাবনা : নিজে বেঁচে, তবে তো চিকিৎসা, সেবা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় এবং অন্যান্য ব্যবস্থায় ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক-সেবিকাদের নিরাপত্তা উপযোগী সরঞ্জাম আমদানি বা তৈরি এবং ব্যবস্থাপনা আমাদের মনে হয় অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করার কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং তা বাস্তবায়ন করা স্বাস্থ্য বিভাগের, এক কথায় সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিক কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

একটি অপ্রিয় সত্য কথা বলতে হয়, বাংলাদেশে যেহেতু করোনা সংক্রমণ খুব ধীর পায়ে হাঁটছে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার দিকটিতে তেমনি শিথিলতার স্পর্শ, কিন্তু করোনা যদি হঠাৎ করেই দ্রুত পায় হাঁটতে শুরু করে তখন তার নাগাল পাওয়া বাংলাদেশ সরকার তথা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে অসম্ভবই হয়ে দাঁড়াবে। তাই আবারো বলি, আগেও লিখেছি, বিচক্ষণ মানুষ সময়ের এক ফোঁড়ে বিশ্বাসী, তারা তাই সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি দ্রুত চালে সম্পন্ন করেন। করেন, বিপন্ন জনগণের জীবন রক্ষার্থে। বিশ্বজুড়ে এখন একমাত্র স্লোগান ‘করোনা ঠেকাও, মানুষ বাঁচাও’। বলা বাহুল্য বাংলাদেশ সে স্লোগানের অংশীদার। এটা মানবিক চরিত্রের স্লোগান। স্বভাবতই এর রয়েছে কর্মতৎপরতার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার।

এ অবস্থায় অর্থনৈতিক স্বার্থ, ব্যবসায়িক স্বার্থ যে প্রধান না হয়ে ওঠে, অর্থনৈতিক চাহিদার গুরুত্ব স্বীকার করেই এ সত্য বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের মেনে চলতে হবে। না হলে যে বিপর্যয় এগিয়ে আসবে তা ইতালি-স্পেনের রূপ ধারণ করবে, ঠেকানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।

তখন হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো বিবর্ণ মুখে বলতে হতে পারে অত্যন্ত বেদনাদায়ক সময় আসছে বাংলাদেশের জন্য। যা ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য’। সঠিক সময়ে সঠিক ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিলে এমনই হয়। বাংলাদেশ যেন এমন ভুল না করে। দ্রুত সর্ব ঘটে সর্ব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করার কর্মযজ্ঞ এখনই শুরু করতে হবে, পেছনের ঘাটতি পূরণ করতে। কোনো দেশের ভুল, কোনো দেশের সফলতা যেন আমাদের পথ চলার মাপকাঠি হয়।

লেখক: গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

এই বিভাগের আরো সংবাদ