একটি শিশুর অকাল মৃত্যু, চিকিৎসক এবং আমাদের মূল্যবোধ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৮, ১৫:৫৮

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, ০৭ জুলাই, এবিনিউজ : আবারো অভিযোগ ডাক্তারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ কর্তব্যে অবহেলার, যার ফলশ্রুতিতে কচি প্রাণের অবসান। আমাদের দেশে ডাক্তারের বিরুদ্ধে এমনতর অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এমন অভিযোগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায়শঃ শোনা যায়। পত্র–পত্রিকায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসে এই জাতীয় দুঃখজনক সংবাদ। অভিযোগ তথাকথিত ‘অত্যাধুনিক মেডিকেল ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে, ডাক্তারের বিরুদ্ধে। চিকিৎসায় অবহেলা ছাড়াও অভিযোগ প্রয়োজন ছাড়াই কেবল বাড়তি অর্থ ‘হাতিয়ে’ (এই ক্ষেত্রে উপার্জন শব্দটা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলাম) নেয়ার জন্যে রোগীকে ‘আই সি ইউ’–তে পাঠানোর। অভিযোগ প্রয়োজন ছাড়াই ‘সীজার’ করে সন্তান প্রসব করানোর। জীবনের চাইতে অর্থ বড় হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। ফলে সেবা প্রদান হয় ব্যাহত। একজন ব্যক্তি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন নিতান্ত উপায়হীন হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কারণ তখন তার বাঁচা–মরা এক, উপরে সৃষ্টিকর্তার উপর, দুই, নীচে ডাক্তারের উপর নির্ভর। বলতে পারেন ‘উপায়হীন’ কেন বলছেন? বলছি এই কারণে, সবাই, একেবারে এ থেকে জেড পর্যন্ত– সবাই জানে জাক্তারের কাছে যাওয়া মানে স্রেফ গলা–কাটা। কথায় আছে ‘থানার ধারে–কাছে কানা যায়না’। আমাদের দেশে থানার সাথে আর একটি প্রতিষ্ঠান এবং পেশা যোগ হয়েছে তা হলো, ডাক্তার এবং তথাকথিত ’অত্যাধুনিক প্রাইভেট মেডিকেল ক্লিনিক’। এদের কাছে যাওয়া মানে গলা–কাটা সহ নানা অভিযোগ, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এবারের অভিযোগ আড়াই বছরের ছোট শিশু রাইফার সংশ্লিষ্ট ডাক্তার এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে। অভিযোগ– সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের অবহেলার কারণে দৈনিক সমকালের সিনিয়র সাংবাদিক রুবেল খানের শিশুকন্যা রাইফার মৃত্যু ঘটে। যার গেছে সেই বুঝে কত গভীর এই ফিরে–না আসার জন্যে যাওয়ার ব্যথা। রাইফার মা–বাবার স্থানে নিজেকে দাঁড় করিয়ে নিজের সন্তানটিকে যদি রাইফা ধরে নেই, তাহলেই অনুভবে অনুভব করা সম্ভব কতটা বেদনাদায়ক, কতটা কঠিন এমন অকাল মৃত্যু। হাসপাতালে নিলেই রোগী বেঁচে উঠবে তার কোন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা এটি সত্যি বটে, কিন্তু যে মৃত্যু এড়ানো যেত, যে মৃত্যু ঘটে যার সেবায় বাঁচার কথা তার হাতে, তখন তাকে বোধকরি কিছুতেই ক্ষমা করা যেতে পারেনা। যাওয়া উচিতও নয়। ডাক্তারের কারণে যদি এমন ধরনের কোন দুঃখজনক ঘটনা ঘটে থাকে তা নির্দ্বিধায় বলা চলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু অপরাধ যে ঘটেছে তা সাব্যস্ত করবে কে? পুলিশ প্রশাসনে কোন পুলিশ কর্মকর্তা বা কর্মচারী কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি কোন শিক্ষক বা কর্মচারী কোন অপরাধ করেছে বলে অভিযোগ উঠে, তাহলে তার তদন্ত এবং বিচারের ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধ হয়েছে কিনা, অপরাধ হয়ে থাকলে তার শাস্তি নিশ্চিত করে। এমনটি আমরা দেখে আসছি, যদিওবা এই ধরনের বিভাগীয় লোকজন দিয়ে তদন্ত কতটুকু নিরপেক্ষ হয় সে নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় আমরা কি দেখি, আমরা অবাক হয়ে দেখি ম্যাক্স হাসপাতালে কচি রাইফার মৃত্যুর পর ডাক্তাররা একগাঁট্টা হয়ে যার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল কেবল তার পক্ষই নিলেন না, উল্টো তাবৎ সাংবাদিক সমাজকে হুমকি দিতে লাগলেন এই বলে প্রয়োজনে তারা সাংবাদিকদের কারো চিকিৎসা করবেন না। কতটা বিবেকবর্জিত, নীতিহীন হলে এই ধরনের ‘অগ্রহণযোগ্য ও অপরাধযোগ্য শব্দাবলী’ উচ্চারণ করা সম্ভব! বোধকরি বাংলাদেশ বলেই এই ধরনের উচ্চারণ, এই ধরনের আস্ফালন অতি সহজে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রশ্ন করতে পারেন, আমাদের দেশে হেন কোন অপরাধ আছে যা করে পার পাওয়া যায় না? হয়তো না। তবে এই পার–পাবার রাস্তা সবার জানা নেই। যাদের জানা আছে, যাদের আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত। তাদের জন্যে এই রাস্তা পার হওয়া খুব একটা কঠিন বলে মনে হয়না। একজন পেশাধারী ডাক্তার, যিনি আবার ডাক্তারদের সংগঠনের নেতা কী করে এই বলে হুমকী দিতে পারেন যে, সাংবাদিকদের চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়া হবে। কোন যুক্তিতে, কোন সংজ্ঞায় একে মেনে নেয়া যায়না। সতীর্থ সাংবাদিকরা কথিত ‘অবহেলার কারণে রাইফার মৃত্যুতে’এক হয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ডাক্তারের শাস্তি দাবী করে তাদের বিক্ষোভ এবং প্রতিবাদ চালাতে থাকেন। তারা অভিযোগ করেন বিএমএ নেতা, ডাঃ ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী ম্যাক্স হাসপাতালকে বাঁচাতে ডাক্তারদের ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি তারা তার (ডাঃ ফয়সাল) ডাক্তারি সনদ বাতিলেরও দাবি জানান।

সাংবাদিক এবং ডাক্তার– সমাজের দুটি ভিন্ন ক্ষেত্রে এদের অবস্থান। এই দুই পক্ষই দুটি ‘আলোকিত’ পেশার প্রতিনিধিত্বকারী। দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় দেখলাম একটি সংবাদ, শিরোনাম– “সাংবাদিক–চিকিৎসক মুখোমুখি’’। দু–পক্ষই প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে এবং দু পক্ষের সমাবেশ থেকে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। সাংবাদিক পক্ষ প্রতিবাদ করবে সেটাই স্বাভাবিক। কেননা তাদের সতীর্থ তার আদরের সন্তানকে হারিয়েছে এবং তাদের বদ্ধমূল ধারণা ওই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের অবহেলার কারণে এই মৃত্যু। আর তাই তারা বিচার চান এবং সে কারণে তাদের এই প্রতিবাদ সমাবেশ, যা স্বাভাবিক। কিন্তু বি এম এ সমাবেশ করলো কেন? সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যে ও অশোভন আচরণ করা হয়েছে। চিকিৎসা সেবার ব্যাঘাত ঘটিয়ে এই প্রতিবাদ না করে বি এম এ–র নেতারা যদি বলতেন, ’ঠিক আছে, আমরা তদন্ত করে দেখব, আসলে এমন কিছু ঘটেছে কিনা, ঘটলে তার বিহিত করা হবে’, তাহলে তারা জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারতেন। কেননা সাধারণ জনগণ জানেন, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে এমনতর অভিযোগ নতুন কোন ব্যাপার নয়। আশার কথা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডাঃ কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং ইতিমধ্যে সাংবাদিকরা তার কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানান। যে বিষয়টি বি এম এ নেতার জানার খুব প্রয়োজন ছিল অথচ জানতেন না, তাই বললেন ডাঃ জাহাঙ্গীর হোসেন। সাংবাদিকদের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন, “চিকিৎসা বন্ধ করার হুমকি দেবার ক্ষমতা কারো নেই। এমনকি কোন শত্রুও চিকিৎসা নিতে এলে চিকিৎসক তাকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য’’। আশা করবো তদন্ত কমিটি কাজ করবেন এবং ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন।

ডাক্তাররা আমাদের সমাজের অতি প্রয়োজনীয় অংশ। একে পাশ কেটে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব। পছন্দ করেন আর নাই করেন, শরীর বেঁকে বসলে এই ডাক্তারের কাছেই আপনাকে যেতে হবে। ডাক্তাররা তা জানেন, আর জানেন বলেই, তাদের অনেকেই এই সুযোগের অপব্যবহার করেন, রোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন অর্থ। অপারেশন থিয়েটারে রোগী রেখে টাকা অগ্রিম জমা না দিলে ‘কাটাকাটি’ হবে না বলে জানিয়ে দেয়ার মত ঘটনাও আমরা পত্র–পত্রিকায় দেখেছি। এমনটি কেন হবে? চিকিৎসা সেবা হচ্ছে সব চাইতে বড় মাপের সেবা। চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসকদের নিয়ে এই কলামে বেশ কয়েকবার লিখেছি। নানা প্রসঙ্গে আমার লেখায় এসে গেছেন তারা। পনের/ষোল বছর আগে এই কলামে লিখেছিলাম একটি ঘটনা। সহপাঠী ও বন্ধু সাইফুলের ছোট ভাই, ডাক নাম হবু (আসল নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না)। কলেজিয়েট স্কুল থেকে স্ট্যান্ড করা ছেলে হবু এক সময় ডাক্তার হয়ে বেরুলো। যোগ দিলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনেই এক ক্লিনিকে, যার প্রধান ছিল আমার পরিচিত এক ডাক্তার, একই পাড়ায় বড় হয়েছি। ঘটনাটি ডাক্তার হবুর মুখেই শোনা। সবে সে পাস দিয়ে ডাক্তার হিসাবে জয়েন করেছে। একদিন এক রোগী এলো ক্লিনিকে। হবু ছিল ডিউটিতে। তার সিনিয়র ডাক্তার ভাইরা তখন ছিল না। হবু স্বাভাবিক ভাবে রোগীকে পরীক্ষা করে বসতে বললো। এমন সময় এলো এক সিনিয়র ডাক্তার ভাই। তিনি এসে রোগীকে দেখে সাথে সাথে শুইয়ে দিয়ে ইন্টার–ভেনাস স্যালাইন লাগিয়ে দিলেন। এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যেন রোগী এই যায় যায়। তার নিকটজনেরা উদ্বিগ্ন। ক্ষণিক বাদে হবু তার ওই সিনিয়র ডাক্তার ভাইকে বলে, “ভাই, এটার তো প্রয়োজন ছিল না, রোগীর তো তেমন সিরিয়াস কিছু হয়নি’’। অনেকটা ধমকের সুরে হবুকে তার সিনিয়র ডাক্তার ভাই বলে, “তাতে কী! রোগী এলেই এমন একটা সিচুয়েশন ক্রিয়েট করবা, যাতে রোগী এবং রোগীর সাথে যারা আসে তারা যেন মনে করে ‘কেইস’ সিরিয়াস। তা না করলে তো বড় ’বিল’ বানাতে পারবে না’’। হবু লা–জবাব। ঘটনাটা হবু আমাদের বয়লিউ এভেন্যুয়তে বাবার সরকারি বাসায় বসে বর্ণনা করেছিল। লক্ষ্য করি হবু অনেকটা হতাশ। শুনে তাকে বলি, ‘তুমি নতুন পাস করে বেরিয়েছ তো, এখনো নীতিবোধ, সেবা, মানবতা ইত্যাদি তোমার মাঝে কাজ করছে। দিন যাক, দেখবে তুমিও ওদের দলে গা ভাসিয়েছো’’। না, তরুণ ডাক্তার হবু ওই ডাক্তারের দলে নিজের গা ভাসায় নি। অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি নিয়ে সে দেশ ছেড়ে বেঁচেছে, বাঁচিয়েছে নিজের বিবেককে, শিক্ষাকে। এখন সে সেদেশে ‘ডাক্তারি’ করছে।

কারো মৃত্যু হতেই পারে, কিন্তু কারণ–ভেদে অনেক মরণকে কেবল সহজভাবে নয়, কোন–ভাবেই গ্রহণ করা যায় না। কোমলপ্রাণ রাইফার মৃত্যু তেমন একটি মৃত্যু। রাইফার এই অনাকাঙিক্ষত মৃত্যু আমাদের আবারো নতুন করে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মানব–সন্তান হিসাবে আমাদের মূল্যবোধ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। এর আগের সংখ্যায়ও লিখেছিলাম, দিন যত যাচ্ছে আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, অন্যকে ভালোবাসা, অন্যের উপকার করা, কারো বিপদে এগিয়ে আসা, এমন কী সুবচন – সব একে একে নির্বাসনে গেছে, যা এখনো অবশিষ্ট তা শেষ হবার বাকি বলে। সবার মাঝে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা কী করে অনেক অনেক অর্থ কামানো যায়। সে যেন কোন কিছুর বিনিময়ে হোক না কেন। এই মরণ–নেশা যতদিন না দূর হবে ততদিন জাতি হিসাবে আমরা দাঁড়াতে সক্ষম হবো না, অর্থনৈতিকভাবে যতই এগিয়ে যাই না কেন। মানবিক মূল্যবোধ ছাড়া মানুষের কি কোন মূল্য আছে?

লেখক: প্রবাসী
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ