আওয়ামী লীগের ৭০ বছর অর্জন অনেক বড়

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৮, ১৭:৩৫

মোতাহার হোসেন, ০৫ জুলাই, এবিনিউজ : প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরও ইচ্ছা, লক্ষ্য থাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া। কারণ জনগণের অধিকার আদায়, উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধি সাধনের জন্য ক্ষমতাই বড় নিয়ামক শক্তি। রাজনৈতিক দলসমূহের ক্ষেত্রে এটা প্রচলিত ধারণা এবং অভীষ্ট লক্ষ্য। তবে এটাও সত্যি যে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ জাতিকে উপহার দিয়ে বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপন করেছিল আওয়ামী লীগ। ১৯৭০ সালের ৭ মার্চ রমনার রেস কোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ‘‘এবারের সংগ্রাম–আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম… তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর… আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবানা।’’ শুধু তাই নয়, একটি জাতির মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়েও রয়েছে এই দলের অনন্য সাধারণ ভূমিকা। ভাষার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলে বন্দী করা হয়। অনুরূপ দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন মেন্ডেলা তাঁর দেশের কালো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ ২৭ বছর কারা নির্যাতনভোগ শেষে অবশেষে কালো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার গঠন করার সুযোগ পান।

এখানে কথাগুলো আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবেই এসেছে। উপমহাদেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের মধ্যদিয়ে ৭০ বছরে পদার্পণ করলো। গত ২৩ জুন ছিল আওয়ামী লীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবাষির্কী। প্রাচীন এই দল প্রতিষ্ঠার ৭০ বছরে ক্ষমতাকাল হচ্ছে মাত্র ১৯ বছর। আর ক্ষমতার বাইরে রাজপথে জনগণের অধিকার, ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে ৫০ বছর মানে অর্ধশত বছর। এই সাত দশকের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী দলটি ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেয়েছে মাত্র ১৯বছর; ৫০ বছরই থাকতে হয়েছে মতার বাইরে। এই দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে আন্দোলন–সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদের। আর এ আন্দোলন–সংগ্রামের অধিকাংশ সময় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ ছিল সামরিক সরকার, গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরাচারী সরকার। আওয়ামী লীগের গঠন এবং এর পরবর্তী আন্দোলন–সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করে সহজেই এই হিসাব পাওয়া যায়।

এই দলের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠার ৫ বছরের মাথায় সমমনা কয়েকটি দলকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে আওয়ামী লীগ প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পায়। সেই সময় ১৩ মাস ক্ষমতায় থাকার সুযোগ হয় কোয়ালিশন তথা যুক্তফ্রন্ট সরকারের। ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলে এই এক বছরই আওয়ামী লীগ দেশ শাসনের সুযোগ পায়। বাকি ২৩ বছরই দলটির কেটেছে পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন–সংগ্রাম করে। এই সংগ্রামের বড় অংশ ছিল সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও দেশ শাসনের সুযোগ দেওয়া হয় না বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে। এ জন্য দলটিকে বেছে নিতে হয় স্বাধীনতা–সংগ্রামের পথ।

১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন এরপর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে দেশের শাসনভার গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালো রাতে ঘাতকচক্র সপরিবারের জাতিরজনক এবং বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্যদিয়ে এরপর আবারও দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয় দলটিকে। আন্দোলন করতে হয় দুটি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে। পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ৫ বছর পর আবারও ক্ষমতা হাতছাড়া হয় তাদের। এরপর ২০০৯ সালে নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর টানা সাড়ে ৯ বছর ক্ষমতায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দলটি।

অবশ্য স্বাধীনতার ৪৭ বছরের মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে এককভাবে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি সময় দেশের নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামীলীগ বর্তমান মেয়াদ নিয়ে ১৮ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করছে। বিএনপি দেশ শাসন করেছে ১৩ বছরের মতো। আর দল হিসেবে জাতীয় পার্টি ৫ বছর দেশ শাসন করেছে। এর বাইরে আরো ৪ বছর সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এরশাদ। তবে দল গঠনের আগে ও পরে সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশ শাসন করেন প্রায় ৯ বছর অর্থাৎ ১৯৮১ থেকে ১৯৯০। আওয়ামী লীগের বর্তমান মেয়াদে বিরোধী দল হিসাবে জাতীয় পার্টি সরকার পরিচালনায় সহযোগিতা করছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দলটির বর্তমান প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এককভাবে দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বিদেশে থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালে দলের ‘ঐক্যের প্রতীক’ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন।

এরপর থেকে অদ্যাবধি তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন। সব মিলিয়ে তার নেতৃত্বের বয়স ৩৭ বছর। এর আগে অবশ্য তিনি ইডেনে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনটি পদে অধিষ্ঠিত থেকে মোট ২৫ বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন। এর মধ্যে সভাপতি হিসেবে ৮ বছর, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৩ বছর এবং ৪ বছর দায়িত্ব পালন করেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে মুক্তিযুদ্ধে নের্তৃত্বদানকারি প্রাচীনতম এই দলের বর্তমান নেতৃত্বকে আরো সুসংগঠিত করে, সম্ভাবনাময় নতুন ও তরুণ প্রজন্মের নেতা–কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণ মানুষকে জনসম্পৃক্ত করে আগামীতেও রাষ্ট্রপরিচালনায় অধিষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করতে প্রয়াস অব্যাহত রাখবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ