ফুটবল পায়ে রই তাকিয়ে বিশ্বপর্দায়

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০১৮, ১৭:৪৮

ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, ০৪ জুলাই, এবিনিউজ : ফুটবল বিশ্বকাপ, রাশিয়া ২০১৮, অপূর্ব স্বর্ণফল ধরেছে বহুবর্ণ পাঁপড়ির মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে।

বিশ্ব ফুটবল যদি হয় ফুল, তবে গৌরবের সৌরভের এই ফুল এখন ফুটে আছে ধরিত্রীর সকল ঘরে, ঘরের ছাদে। বিশ্ব ফুটবল যদি এ মুহূর্তের একফালি চাঁদ হয়, মন ভরে দেখে একটু হাত দিয়ে ছোঁয়ার ইচ্ছেস্বপ্নে বুঁদ ধরণীর সকল হৃদয়। বিশ্ব ফুটবল যদি এ সময়ের জলপ্রপাত হয়, তবে তার মিষ্ট নদী স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সবদেশ জাতি। ফুটবল মধুভান্ডে সবাই উপচে পড়েছে, বিশ্ব ফুটবলে নারী পুরুষ শিশু বুড়ো সবার একটু খেলতে ইচ্ছে করছে। এই যে– এক চালক তার রিকশা বাহনের সামনে পছন্দের পতাকা পত্‌পত্‌ উড়িয়ে দিলে। বিশ্বমঞ্চ বেঁধে দিলো ঐকতান। এই ফাঁকে লেখা হয়ে যাক পদ্যটা–

পায়ে পায়ে ঘোরে বল– তাই নাম ফুটবল,

হাতে যদি লেগে যায়– তাতে দোষ ‘হ্যান্ডবল’

‘ডি বক্সে’ অপরাধ– পেনাল্টির স্বাদ ঘোল,

মাঠে ও গ্যালারিতে মহারণ– খেলছে দুই দল।

পাসে পাসে ছোটে বল– দুরু দুরু লাগে দোল

দেখা দিলে গোলপোস্ট– নিশানার শটে খোল

‘গোল’ ‘গোল’ উল্লাস– এ নহে শোরগোল

কার গোল মাথা হতে এলো খেলা ফুটবল!

মজার পৃথিবীতে এমন মজার সময় আর হয় না। সব জীবিত চোখ ওই মহাযজ্ঞের দিকে চেয়ে আছে। আমার মাত্র দু চোখ, এক মন। এ দিয়ে এতো বড়ো আয়োজন উচ্ছ্বাস কি সামলানো যায়! এসময়ে আমার ও সকলের আর কয়েকটা করে চোখ মন বেশি থাকলে এমন কি অশুদ্ধ মহাভারত হতো? চোখের পলকে গোলাকার বস্তুটা কোনদিক থেকে যে কোনদিকে মজা পেয়ে পেয়ে ছুটছে তা দেখবো, নাকি দেখবো নতুন দিনের তারকাদের ফুটবল শৈলী, না দেখতে থাকবো গ্যালারির বর্ণিল চিত্রনাট্য।

হাতে কোলে করে নিয়ে আসা বলটা মধ্যবিন্দুতে রেখে বংশীবাদকের ইঙ্গিত বাঁশিতে শুরু হয়ে একটা মনোরম বলের বিপরীতে বাইশজনের ছুটোছুটি– বেশ কঠিন খেলা, গোল গিলে ফেললে তা শোধ করা ভীষণ কঠিন, অন্তত বর্তমানে বল পেটানো, ৫০ ওভারে ৪৮৬ রান তুলে ফেলার ক্রিকেটীয় দর্শনের তুলনায়। এক আত্মভোলা দার্শনিক নাকি একবার একটা বল নিয়ে এতজনের কাড়াকাড়ি হুড়োহুড়ি দেখে আফসোস করে বলেছিলেন– ‘আরে বাছা ওদের প্রত্যেককে একটা করে বল দিয়ে দিলে আর এমন কি খরচা পড়তো’? আমার সাথে যাদের সংযোগ বেশি, তারা আর ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ বাস্তবতার কারণে সে ছোটকালে নিজেকে ফিরিয়ে নিতে পারে না, মানে নিজেই হাটতে বসতে একটা সমর্থক পতাকা পুরো টুর্নামেন্ট সময় হাতে হাতে নিয়ে ঘুরবে, যেভাবে বালক– বালিকা দল মানানসইভাবে তা করতে পারে– ফলে তাদের কার হৃদয়ে কোন রাজকীয় দলের বসবাস তা সরাসরি জিজ্ঞেস না করলে জানা যায় না। সুতরাং কৌতূহল মিটানো প্রশ্নোত্তরে সহকর্মীদের মধ্যে সমর্থনের যে জোয়ার, বলাবাহুল্য তা বহুকালিন সেই বাঙালি কাতরতার আশ্রয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দল, অবশ্য সারা দুনিয়া জুড়েও তা। আর কে না জানে ডোরাকাটা আকাশী ও পাকা ফসলের প্রথম রঙ ধরে ওঠা হলদে, জার্সিদ্বয়ের অকাল বিদায়ে সহসা বর্ণহীন হয়ে যায় প্রতিযোগিতার উৎসব দ্যুতি।

তবে পাল্টা প্রশ্ন করে বসে ড. সেলিনা– ‘স্যার আপনার পছন্দের দল’?

– ‘দেখি আগে কোন দুইদল ফাইনালে ওঠে’।

– ‘স্যার এটা কেমন কথা– সমর্থনের দল একটাতো থাকবেই’।

– ‘যে দল মাঠে ভালো খেলে সে যেন জয় পায়– ভালো খেলার দলটা হেরে গেলে আমার মন যে মেঘভারে ভারী হয়ে যায়’।

– ‘তার মানে যে দল জেতে, আপনি সে দলের– স্যার এটাতো একটা সুবিধাবাদী ব্যাপার’।

আরেকজনের মন্তব্য– ‘তাহলে তো স্যার আপনার কাপ জয় সুনিশ্চিত’।

তবে ভাবনা আছে,সবগুলো দল কেন বাছাইপর্বে খেলে প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হবে? পৃথিবীর সবচে বেশি ফুটবল ভক্ত অনুরক্ত দেশ হিসেবে ভোটাধিকার ব্যবস্থা রেখে যদি একটা দল রাখা হতো, আর তারি বদৌলতে পা নামা জাতীয় কতক দল নামিয়ে রেখে বাংলাদেশকে ওটানো হলে কি পুলকে না আমরা ভেসে থাকতে পারতাম!

অন্তরঙ্গ বন্ধু প্রফেসর প্রদীপও বর্তমানে জোর ব্রাজিল সমর্থক, তবে একসময়ে ইতালি– জার্মান ফাইনাল ম্যাচে জার্মান সমর্থন করতেন তা দিব্যি মনে আছে। তাঁর মেধাবী মন্তব্য– ‘সমর্থন তো সেটা, নিজের দল দুর্বল হলেও যেন জিতে যায়– না হলে খেলা দেখার মজা কি?’ তা হয়তো হবে! কিন্তু উগ্র সমর্থনে হাঙ্গামা– হুজ্জোত– নিজ হার্ট স্পন্দন বন্ধও করে ফেলে এই আবেগী বাঙালি। আবার এও দেখা যায় পছন্দের দল লাপাত্তা হলে নতুন দিনের প্রাতে মনবদল নতুন না। অবশ্য সেদিন মেসি কোং এর বিদায় ঘণ্টা বেজে যাবে বলে বেশ অস্থিরতায় ছিলেম নিজেই, এখন কেন জানি একটু বেদনাভারও– জার্মানির ফিরে যাওয়াতে। সুতরাং নিজের মন নিয়ে ভেবে থাকাটা যেখানে বেশ তালগোল পাকানো, সেখানে পরের মন নিয়ে কি হবে– রবি ঠাকুর একবার একথাটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কোন এক বিল্ডিং এর ছাদে নাকি নানা বাসার নানা সমর্থন নিশানা একটা দণ্ড হতে উড়িয়ে দেখা হয়, আর একেকটার বিদায়ে সে পতাকা বিনয়ের সাথে সরিয়ে ফেলা হয়– ব্যাপারটা সময়োচিত।

তবে মজা! মজা তো বেশ পাচ্ছি। একেক সময় নন্দনশৈলির স্টেডিয়ামে ফুটবল এর একেক রকম নাচ মজা দেখে মজা হচ্ছে। একেক গ্যালারিতে একেক মূর্ছনা শোনে মজা হচ্ছে– ঘরে বাইরে কতো কথা, বিজ্ঞ– অনভিজ্ঞ আলোচনা শুনে বুঝে বেশ মজা হচ্ছে– ফুটবল ঈশ্বরের মতো নির্বিকার আনন্দে (?), ঘোর সমর্থক না হয়েও।

মাঝে মধ্যে ভাবি, কাজী নজরুলের মতো রূপপ্রেম কাতর আমি, যদি কুমার রোনালদো হয়ে খেলতে নেমে পায়ের পাতায় পাতা বল দিয়ে শৈল্পিক জাদুতে এগিয়ে যেতে যেতে গোলপোস্টের কাছাকাছি এসে দূর গ্যালারিতে অপেক্ষমাণ চিরজনমের কোনো প্রিয়া হরিণী হৃদয় চোখের সাথে দৃষ্টিবিনিময়ে আবদ্ধ হই, তখন নির্ভুল লক্ষ্যের গোল কি আমি আর পাবো? যদি না পাই, তবে কি শাকিরার সঙ্গী হয়ে মাঝ মাঠে বল রেখে একটা ফুটবল গান নাচ রচনা করে উড়িয়ে ভাসিয়ে দেবো উড়ন্ত চুমুর মতো –

আমরা ফুটবল খেলি ফুটবল খেলি– নানা দেশের জার্সি পরে

সোনার কাপ বিশ্বলোকে স্বপ্নচোখে, কপোল ছুঁয়ে তুলবো ঘরে।

জাদুর বল গড়িয়ে মাঠে নাচে ছোটে– ভুবন শিশুর ছন্দ তালে

বুকের কাঁপন হাসি–কান্না গোলপোস্টের দারুণ জালে

‘গোল পৃথিবীর’ ‘গোল বলেতে’ আতশবাজি আনন্দবান থরে থরে।

ফুটবল পায়ে রই তাকিয়ে বিশ্বপর্দায় ওই মায়া মুখের রূপ বাতিতে,

সকল মানুষ সকল বয়স সকল ভাষা এক ভাষাতে সুর ধ্বনিতে

‘এক কাপ– এক বিশ্ব’ বোধে ভালবাসার রংধনুতে ওঠলো ভরে।

লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ