মুজিববর্ষে সেরা উপহার

  ইকরামউজ্জমান

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। আইসিসির অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভয়ডরহীন, প্রত্যয়দীপ্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং শৃঙ্খলিত ক্রিকেট খেলে শক্তিশালী ভারতকে ৩ উইকেটে (ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে) পরাজিত করে যুবদল দেশবাসীকে শুধু আনন্দ উপহারই দেয়নি, গৌরবান্বিত করেছে, পাশাপাশি নিজেরাও মহিমান্বিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন এবং সাফল্য।

দেশের ক্রিকেটের জন্য এটি একটি বিশাল অর্জন এবং চিরস্মরণীয় অনুকরণীয় ঘটনা। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেরাটা খেলে, যোগ্য দল হিসেবে। এই জয় বাংলাদেশের প্রাপ্য ছিল। উভয় দেশের মধ্যে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে বাংলাদেশ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এগিয়েছিল। চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বকে দিয়েছে শক্তিশালী বার্তা। আর সেটি হলো বাংলাদেশের রাত পোহাতে আর বেশি বাকি নেই। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে সিনিয়র বা যুব দলের কোনো পার্থক্য নেই। চ্যাম্পিয়ন ইজ চ্যাম্পিয়ন। চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা সাধারণ  বিষয় নয়, এটি অনেক বড় বিষয়। যুব ক্রিকেটাররা দেশের প্রাণপ্রিয় পতাকাকে সবচেয়ে উঁচুতে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে, যা উত্তরসূরিরা পারেননি। এখানেই ক্রীড়াঙ্গনের সৌন্দর্য। ১৯৯৮ থেকে সামর্থ্যের লড়াইয়ে অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে এসে স্বপ্নের বাস্তবায়ন। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুম থেকে স্বপ্ন জয়। স্বপ্নের  পেছনে সামর্থ্য নিয়ে দৌড়ানো শতভাগ সফল। এখন আরো বড় স্বপ্নের পেছনে প্রস্তুত হয়ে ছোটা।

অধিনায়ক আকবরের নেতৃত্বে মাঠের যোদ্ধা, টিম ম্যানেজমেন্ট, সাপোর্টিং স্টাফ এবং ক্রিকেট বোর্ডকে অভিনন্দন—অনন্য বিজয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সামনে এবং পেছনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে অবদান রাখার জন্য। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের পেছনে বোর্ডের বিনিয়োগ শতভাগ সফল হয়েছে। দেড় বছর ধরে প্রস্তুতি, দেশে-বিদেশে ৩০টির বেশি ম্যাচ খেলেছে এই দল। এতে করে অভিজ্ঞতা বেড়েছে, দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ মিলেছে। অনূর্ধ্ব-১৯ দল সব সময় একটি ইউনিট হিসেবে খেলেছে। এই দলের বৈশিষ্ট্য হলো দলে সবার পারফরম্যান্সকে এক করে একসঙ্গে মিলিয়ে লক্ষ্য সাধন। এ বিষয়টি ফাইনাল ম্যাচে ব্যত্যয় হয়নি। দলগত পারফরম্যান্সে অসাধারণ বিজয় এসেছে। স্নায়ুর চাপে ভুগেছে ঠিকই—কিন্তু সেটা সামাল দেওয়ার পরীক্ষায় তারা পাস করেছে। খেলা তারা উপভোগ করেছে। মানসিক শক্তির পারদকে কখনো নিচে নামতে দেয়নি। জয়ের ক্ষুধা আর ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে আপস করেনি। সামর্থ্যের শতভাগ প্রয়োগে তারা পিছিয়ে পড়েনি।

অনূর্ধ্ব-১৯ যুব ক্রিকেটাররা এমন একটি সময় বিশ্ব জয় নিশ্চিত করেছে, যখন দেশের সিনিয়র ক্রিকেটারদের একক এবং দলগত পারফরম্যান্স ঘিরে ক্রিকেট রসিক মানুষ উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগে ভুগছেন। যুবদলের বিশ্বজয়ের আলো অনুপ্রাণিত করবে সিনিয়র দলকে, শুধু তা-ই নয়, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের  মধ্যে  খেলার  প্রতি আকর্ষণ এবং ভালোবাসা অনেক বেশি বাড়াবে। দেশের ক্রিকেটের সম্ভাবনার দ্বার আরো বেশি উন্মুক্ত হবে। এই সময়ে এই জয়ের বড় বেশি দরকার ছিল।

যুব ক্রিকেটে বিশ্বজয়ের সাফল্য যে শুধু ক্রিকেট চত্বরকে অনুপ্রাণিত করবে, চাঙ্গা করবে তা নয়—দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অন্যান্য খেলার চত্বরেও এর প্রভাব পড়বে। তরুণসমাজ ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের আসল শক্তি। এরা বিশ্বাস করতে পারবে ক্রিকেটে সম্ভব হলে অন্যান্য খেলায়ও এটা অবশ্যই সম্ভব। লক্ষ করছি ক্রীড়াঙ্গনে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে অনেক খেলায় যুবরা ভালো করছে। কিন্তু এর পরের স্তরে এসে আর সেটা সম্ভব হয়ে উঠছে না। কারণ হলো তখন আর তারা সযত্নে লালন-পালনের মাধ্যমে ‘গ্রুম’ হতে পারছে না। তরুণদের ওপর বিশ্বাস রেখে যদি ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলায় এদের নিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে। প্রয়োজন শুধু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করে তার বাস্তবায়ন।

ক্রীড়াঙ্গনকে ঘিরে আমাদের হতাশা, অভিমান, অভিযোগ এবং ক্ষোভ আছে এটা সত্যি। তার পরও কিন্তু ক্রীড়াঙ্গন থমকে নেই—এগিয়ে চলেছে। আর এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে যুবসমাজের অবদানটাই বেশি।

ক্রিকেট দলের অসাধারণ বিজয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সমাজসেবী প্রত্যেকে খেলোয়াড় ও টিম ম্যানেজমেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। রবিবার রাতে খেলা শেষ হওয়ার পরপরই পুরো দেশজুড়ে আনন্দ-উৎসব হয়েছে। মানুষ ক্রীড়াঙ্গনকে ভালো অবস্থায় দেখতে চায়। মানুষ দেখতে চায় মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত দুর্জয় ক্রীড়াঙ্গনকে।

দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ সব সময় চলছে। ক্রীড়াঙ্গনও এগিয়ে যাবে—এই বিশ্বাস জাতি পোষণ করে। শুধু প্রয়োজন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে কাজ করা।

দেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালন করছে। ক্রীড়াঙ্গনেও এটি বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। আইসিসির বৈশ্বিক চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব-১৯ যুবদল প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটা তো জাতির পিতার প্রতি যুবসমাজের সবচেয়ে বড় সম্মান প্রদর্শন। তিনি তো সব সময় চেয়েছেন দেশের মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে—এটা তো ছিল তাঁর স্বপ্ন এবং লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু নিজে খেলাধুলা ভালোবাসতেন, তিনি ছিলেন খাঁটি একজন ক্রীড়ানুরাগী। যুবাদের বিশ্বকাপ জয় মুজিববর্ষের সেরা উপহার।

এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে আমাদের এই উপমহাদেশের দুটি দেশ বাংলাদেশ এবং ভারত। এর আগে ২০০৬ সালে ভারত ও পাকিস্তান ফাইনাল খেলেছে। সেই ফাইনালে পাকিস্তান জিতেছে। এবার  আরেকটি বিষয় হলো সেমিফাইনালে উঠে আসা চার দলের মধ্যে তিনটি দলই ছিল (ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) উপমহাদেশের। শুধু বাইরে থেকে নিউজিল্যান্ড। ভারত পাকিস্তানকে আর নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করে বাংলাদেশ ফাইনাল খেলেছে। যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করতে চাচ্ছি সেটি হলো উপমহাদেশে ক্রিকেটের ভিত ক্রমেই শক্ত হচ্ছে।  যুবদের নিয়েই তো কাজ করে এগিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশের বিজয় সবাইকে আনন্দিত করেছে। অনুপ্রাণিত করেছে। এই উপমহাদেশের তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এরই মধ্যে বড়দের বিশ্বকাপ জিতেছে। এই দেশগুলো যদি পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ব জয় বাস্তবায়িত করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তবধর্মী ক্রিকেট পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সেটা বাস্তবায়িত করার জন্য কাজ করা। সামর্থ্য এবং সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। প্রমাণ তো পেলাম। বড় স্বপ্ন দেখতেই হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ