জিপিএ–৫ তৈরির কারখানা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০১৮, ১৮:০২

ফজলুল হক, ০৩ জুলাই, এবিনিউজ : (এক)

মাঝে মাঝে পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে, মন এলোমেলো হয়ে যায়। সমাজ এবং মানুষের উপর আস্থা কমতে শুরু করে। এখন মানুষের উপর আস্থা রাখা কঠিন। টাকা কামানো ছাড়া মানুষের অন্য কোন এজেন্ডা আছে, এটা আমার বিশ্বাসই হতে চায়না। ‘মানুষ– মানুষের জন্য,’ এসব কথা, ‘কাজীর গরু, খাতায় আছে, গোয়ালে নয়’– এর মতো। মানুষের উপর আস্থা হারাবেন না, একথা সবাই বলে, কিন্তু কেউ মানেনা। এসব কথা কেন বলে, আমার মাথায় ঢোকে না। আগে– মানুষের উপর আস্থা রাখা যেতো। আহমদ শিপার উদ্দিন ভাই ফেসবুকে দুই লাইনের কবিতা পোস্ট করেছেন। আমি প্যারোডি বানিয়েছি। ‘ধন খাইব পোগে– মানুষ খাইব রোগে।’ এক তরুণ আমাকে বলে, এত হতাশ হইলে চলে? তাকে বলি, একদিন শরীর পোকায় খাবে। তখন তোমার ধন চলে যাবে অন্য লোকের হাতে। একদিন রোগ জীবাণু শরীরে বাসা বাঁধবে। তুমি কিছু করতে পারবে না। সে তরুণ ব্যবসায়ী– দরদ ভরা দৃষ্টিতে আমাকে দেখে। স্যার, আপনি কেন এত ভয় পাচ্ছেন? আমরা আপনার ছাত্ররা কেন আছি? আমি বলি, মানুষ মানবতার চাইতেও অর্থের পেছনে বেশি ছোটে, মানুষ এখন স্বার্থপর হয়ে গেছে।

আমার দুই সাবেক ছাত্র আমাকে দেখতে আসে। বলে, স্যার, আপনি নাকি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন? বাইরে কম যাওয়া আসা করেন? আমি বলি, হ্যাঁ। ছাত্র বলে, কাউয়ার্ডস বার বার মরে, ডাইস মেনি টাইম্‌স বিফোর দেয়ার ডেথ। কিন্তু স্যার, আপনি তো সাহসী। আপনি মৃত্যু ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত এটা বিশ্বাস হয় না। এমন হতে পারে যে আপনি আল্লাহতালার ভয়ে কাতর? আমি বলি, মৃত্যু আসবেই। কাউকে ছাড় দিবেনা। কি ফরখ পড়ে মৃত্যু কি রাজ সিংহাসনের উপর হলো? না, ধুলিধুসরিত রাজপথে হলো? মাটির তলায় যেতেই হবে। মৃত্যুকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। ছাত্ররা বল্ল, স্যার, আমরা চার বন্ধু আপনার কাছে প্রাইভেট পড়তাম। আপনাকে মাসে মাসে টাকা দিই নাই। আপনি চান নাই। আমরা জানতাম, তখন আপনার টাকার দরকার ছিল। আপনার মা বাবা, ভাই বোনদের নিয়ে এক বিশাল পরিবার আপনার আয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল। পরিবার চালাতে গিয়ে আপনি হিমশিম খেতেন। আমরা চার বন্ধু আজ প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। আপনি রাগ করবেন না– বললে, বলতে পারি। আমরা আপনার ঋণ শোধ করতে চাই। আমি হাসি। তোমরা কি ভাবে ঋণ শোধ করবে? আমি তাদের বলি। তোমরা আমার জন্য দোয়া কর। যাতে আমার কবর বিলাস বহুল অ্যাপার্টমেন্টের মতো খোলামেলা হয়। ছাত্ররা বল্ল, আমরা এসেছি, আপনাকে একটা এপার্টমেন্টের চাবি উপহার দেয়ার জন্য। আমার মনে হয়, আমি তরুণদের যা বোঝাতে চাই– তারা তা বুঝতে চায় না। বা বুঝতে পারেনা। তারা বলছে, আমরা চাই আমাদের স্যার আরামে রাত কাটাক। নিশ্চিন্ত থাকুক।

ইয়াবা, ভায়াগ্রা, মদ এসব খারাপ জিনিস। তবুও মানুষ মদ খায়। ইয়াবা, ভায়াগ্রা সেবন করে। মাদকের অপকারীতা বোঝাতে পারলে মানুষ মদ ইয়াবা ছেড়ে দেবে, এই চিন্তা থেকে গ্রামের মানুষকে বোঝাতে এক পল্লীতে গেছে একটি টিম। তারা এক বালতিতে নেয় মদ, অপর বালতিতে পানি। এক গাধাকে বালতির কাছে নিয়ে গেল, গাধা মদের বালতি লাথি দিয়ে ফেলে দিল। পানির বালতি থেকে পানি পান করল। টিম ম্যানেজার বল্লেন, প্রিয় গ্রামবাসী, আপনারা কি শিখলেন? গ্রামের লোকেরা বল্ল, আমরা শিখলাম, গাধা মাদক খায়না। গাধারাই মাদককে লাথি মারে।

ঠিক আছে, টিমের কর্তাগণ এক বালতিতে পানি ভরলেন, একটি পোকাকে সে বালতিতে ফেলে দিলেন। পোকা মনের আনন্দে বালতির পানি খায় আর সাতার কাটে। আরেক বালতিতে নেয়া হলো ১০০টি ইয়াবা গোলা পানি। ওই পোকাকে ইয়াবার শরবতের মধ্যে ফেলা হলো। ফেলার সাথে সাথে পোকা মারা গেলো।

প্রিয় গ্রামবাসী, টিম ম্যানেজার ভাষণ দিতে উঠলেন, বল্লেন, আপনারা কি শিখলেন? গ্রামবাসী বল্ল, আমরা শিখলাম, ইয়াবা খেলে পেটের পোকা, চির কিরমি মরে যায়। ইয়াবা পেটের জন্য ভাল। আমরা বলি একটা– আর উনারা বোঝেন আরেকটা।

হা, হা, মানুষ সাদাসিধে। গ্রামের মানুষ বেশি বেশি সহজ সরল। তাকে তত্ত্ব কথা আমি কখনো বোঝানোর চেষ্টা করি না। আমি একটা বললে– তারা আরেকটা বুঝবে। কিন্তু আমার শিল্পপতি ছাত্ররা আমার কথা মানছে না। বলে– স্যার, দুদিনের দুনিয়া। কান্দিয়া কান্দিয়া রাত পার করতে চাই না। খাও দাও ফুর্তি কর। মর্সিয়া ক্রন্দন চাই না। আমাদের ছোট্ট উপহার গ্রহণ করে নেন। আপনি কষ্টে থাকেন, সেটা আমরা চাই না। আপনার কথা শুনতে চাই না। আপনার শান্তি চাই। হাত বের করেন। চাবি নেন।

(দুই)

সাংবাদিকতা নিয়ে লেখাপড়া করে এমন কিছু ছাত্র আমাকে বলে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এর বিরুদ্ধে, বাণিজ্যিক স্বার্থকে, মুনাফামুখী শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করতে আমরা একটা সেমিনার করব, আপনাকে যেতে হবে। আমি বলি, তোমাদের সেমিনারে গিয়ে আমি কি করব? হবু সাংবাদিকরা বল্ল, আপনি বক্তব্য দেবেন। আপনি শিক্ষক– কাম– বুদ্ধিজীবী– আপনার কথা শুনে মানুষ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকবে। কি স্যার, ঠিক বলিনি? আমি বলি, সাংবাদিকরা যা বলে, তা ঠিক। তবে আমি সেমিনারে যাবো না। তোমরা যা ভাব, আর আমি যা ভাবি, তা এক নয়। তারা বিস্মিত, স্যার, আপনি এটা কি বললেন? আমি বলি, বেশির ভাগ মানুষ একটি বিষয়কে খণ্ডিত ভাবে দেখে। হবু সাংবাদিকরা বলে, যেমন? আমি বলি, এখনো আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে এবং শিক্ষা মাফিয়া দ্বারা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। সরকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে একশত ভাগ এমপিও দিচ্ছে। ছাত্রী উপবৃত্তি দিচ্ছে। বিনামূল্যে বই ও অন্যান্য উপকরণ দিচ্ছে। ল্যাপটপ দিচ্ছে। ভবন বানিয়ে দিচ্ছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম বানিয়ে দিচ্ছে। বাজেট এর বাইরে ও শিক্ষাতে সরকার– প্রধান তহবিল দিচ্ছেন। যেমন ধর, ‘হেকেপ প্রকল্প’, সামনে এই প্রজেক্টে ৭০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে। এসব করা হচ্ছে, শিক্ষাকে অ–বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু তোমরা দেখ, এত টাকা ব্যয় করে সরকার স্কুল কলেজ চালাচ্ছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা পয়সা দিচ্ছে– সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে, হানড্রেড পারসেন্ট এক্সেলেন্স বজায় রেখে চলছে? আমাদের অ–বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে। বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে যে সকল “শিক্ষা–মাফিয়া” আছে– তাদের নির্মূল করতে হবে। মাফিয়ারা “শিক্ষা” খেয়ে ফেলবে। তারা অতীত দেখছেন না, সে অতীতে কোচিং সেন্টার চালাত, বিদেশে ছাত্র পাঠানোর ব্যবসা করত। এখন কলেজ চালায়– এখন সে অধ্যক্ষ। মন্ত্রীদের ম্যানেজ করার সক্ষমতা থাকলে– অনেক কিছু করা যায়। ভুয়া পিএইচডি নিয়ে সমাজে দাপিয়ে বেড়ানো যায়। হবু সাংবাদিকদের বল্লাম, সার্বিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অদক্ষতা আছে, এটাকে অজুহাত হিসেবে দেখায় শিক্ষা মাফিয়া। দু’চারজন ‘তেলবাজ’ শিক্ষাকে কব্জা করে ফেলছে, কিন্তু আমরা কথা বলতে পারছি না– এর চাইতে আফসোসের ব্যাপার আর কি আছে? ছেলেরা বলে, স্যার, সাংবাদিকের নিরাপত্তা আছেনি? আকাশের যত তারা লেখককে ফাঁসাইবার জন্য আছে তত ধারা। সাবধান থাকবেন।

(তিন)

ইন্টারনেট এখন জোকস এর ভাল উৎস। আগে রিডার্স ডাইজেস্ট পড়তাম, ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ান জোকস –এ রকম জোকস এর বই পড়তাম, লাফটার দ্যা বেষ্ট মেডিসিন– পড়তাম, এখন ফেসবুক খুললেই হয়। মন খারাপ থাকলে জোকস ভাল মেডিসিন। সিইউ ফ্রেন্ডস পেজে পেজের সদস্যরা জোকস পোস্ট করে ফেবু ইউজারদের হাসিয়ে কাবু করে ফেলেন। মন খারাপ থাকার সুযোগ থাকে না। আই লাইক সি ইউ ফ্রেন্ডস পেজ ভেরী মাচ। বাট আই এম এমেচার ইন ফেবু।

এটা একটা শহরের কিংবা একটা গ্রামের ইসকুল– গ্রামের মানুষ গরিব কৃপণও। পকেট থেকে পয়সা বের করতে চায় না। এখানে আপনি–দেখবেন, শহরের মানুষ চালাক। তাদের পকেট থেকে টাকা বের করার কৌশল জানতে হয়। গ্রামে শিক্ষা মাফিয়ারা আসে না। মধু না থাকলে মৌমাছি থাকবে না। গুড় না থাকলে পিঁপড়া যাবে না। গ্রামের গরিব– আম–ছালা দুটোই তার নাগালের বাইরে। স্কুলে পড়ালেখা হয় কিনা, এটা নিয়ে গ্রামবাসী ভাবে না। শহরের স্কুলে ইন্সপেক্টর এসেছেন। দশম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকেছেন। ছাত্রকে প্রশ্ন করলেন, আমাদের দেশ ভাল? না, খারাপ? ছাত্র বলে, ভাল। ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করলেন, আমাদের এই ভাল দেশের রাষ্ট্রপতি কে? ছাত্র বল্ল, জননেত্রী শেখ হাসিনা। ইন্সপেক্টর বল্লেন, আমি প্রশ্ন করেছি, রাষ্ট্রপতি কে? ছাত্র এবার বল্ল, স্যার, মনে পড়েছে, শেখ হাসিনা না খালেদা জিয়া। ইন্সপেক্টর বল্লেন, এটা ইসকুল? না আর কি? ছাত্র বলে স্যার, মাফ করে দিন, এরশাদ। ইন্সপেক্টর বল্লেন, এই ব্যাটা তুই ক্লাস টেনে ক্যামনে উঠেছিস? আমি তোর নাম কেটে দিলাম। তুই যা গ্রামে, মাঠে গিয়া গরু চরা। ছাত্র বলে, আমার নাম কাটবেন? আমি গরু চরাব? হা হা হা। আমার নাম কাটার ক্ষমতা আপনার নাই। ইন্সপেক্টর– বলেন, বেয়াদপ? তোর কেমন সাহস? ছাত্র বলে, আমি বেয়াদপ নই। স্কুলের খাতায় আমার নাম নাই। কাটবেন কি করে? ইন্সপেক্টর বল্লেন, তুই ছাত্র না? সে বলে আমি মাঠে গরু চরাই। স্যারে ডাকেন, কইলেন দশ টাকা পাবি, আর পাবি ঝালমুড়ি, কেলাসে আইস্যা বইস্যা থাক। ইন্সপেক্টর মাস্টারকে বল্লেন, মাস্টার সাব, আপনার লজ্জা নাই? শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করেন? আপনারা শিক্ষা ব্যবসায়ীরা জাতিকে শেষ করে দিবেন। আপনারা শিক্ষা ব্যবসায়ীদের উপর খোদার গজব পড়ুক। আপনার হাতে ফোস্কা পড়ুক। আপনার মতো শিক্ষা ব্যবসায়ীদের পোন্দে ফোঁড়া উঠুক। আপনাকে বরখাস্ত করলাম। শ্রেণি শিক্ষক বলে, আপনার বাপের সাধ্য আছে নি আমাকে বরখাস্ত করার? আমি মাস্টার নাকি? সামনের ওই মুদির দোকান দেখেন সেটা আমার। মাস্টার সাবে আমারে ডাইক্যা কইলো, ওই মানিক্যা শহর থাইক্যা এক বেডা নাকি আইবো। আমি হাটে গেলাম। কেলাস ঘরে যাইয়া বইস্যা থাক। রেগে মেগে ইন্সপেক্টর গেলেন হেড স্যারের রুমে। আপনি হেড স্যার? হেড স্যার বলে, কোন সমস্যা? ইন্সপেক্টর বলে, আপনারা এসব কি করছেন? নকল ছাত্র, নকল শিক্ষক, এটা স্কুল? উনি বল্লেন, আমার মামা এই স্কুলের হেড স্যার। উনি জমির দালালি করেন। উনার একটি নাপিতের দোকান ও একটি দর্জির দোকান আছে। উনি জমি কিনতে অন্য টাউনে গেছেন। আমাকে কইল বোর্ড থেকে ইন্সপেক্টর আইলে তারে ২৫ হাজার টাকার বান্ডিলটা ধরাইয়া দিস। স্যার, এইডা স্কুল না, জিপিএ– ৫ বিক্রির দোকান? ইন্সপেক্টর বল্লেন, তোমরা বাঁচি গেলা। আমি ইন্সপেক্টর না। আমার দাদা ইন্সপেক্টর। উনি কন্ট্রাক্টরি করেন। টেন্ডার ড্রপ করতে গেছেন. . .।

শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে করতে দয়া করে এই অবস্থায় নিয়ে আসবেন না। স্কুলকে জিপিএ–৫ বিক্রির দোকান বানাবেন না। আপনি মন্ত্রী হোন, যেই হোন, মাফিয়া পুষবেন না। শিক্ষা বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। আমরা চোখে অন্ধকার দেখছি।

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ। অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

(এক)

মাঝে মাঝে পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে, মন এলোমেলো হয়ে যায়। সমাজ এবং মানুষের উপর আস্থা কমতে শুরু করে। এখন মানুষের উপর আস্থা রাখা কঠিন। টাকা কামানো ছাড়া মানুষের অন্য কোন এজেন্ডা আছে, এটা আমার বিশ্বাসই হতে চায়না। ‘মানুষ– মানুষের জন্য,’ এসব কথা, ‘কাজীর গরু, খাতায় আছে, গোয়ালে নয়’– এর মতো। মানুষের উপর আস্থা হারাবেন না, একথা সবাই বলে, কিন্তু কেউ মানেনা। এসব কথা কেন বলে, আমার মাথায় ঢোকে না। আগে– মানুষের উপর আস্থা রাখা যেতো। আহমদ শিপার উদ্দিন ভাই ফেসবুকে দুই লাইনের কবিতা পোস্ট করেছেন। আমি প্যারোডি বানিয়েছি। ‘ধন খাইব পোগে– মানুষ খাইব রোগে।’ এক তরুণ আমাকে বলে, এত হতাশ হইলে চলে? তাকে বলি, একদিন শরীর পোকায় খাবে। তখন তোমার ধন চলে যাবে অন্য লোকের হাতে। একদিন রোগ জীবাণু শরীরে বাসা বাঁধবে। তুমি কিছু করতে পারবে না। সে তরুণ ব্যবসায়ী– দরদ ভরা দৃষ্টিতে আমাকে দেখে। স্যার, আপনি কেন এত ভয় পাচ্ছেন? আমরা আপনার ছাত্ররা কেন আছি? আমি বলি, মানুষ মানবতার চাইতেও অর্থের পেছনে বেশি ছোটে, মানুষ এখন স্বার্থপর হয়ে গেছে।

আমার দুই সাবেক ছাত্র আমাকে দেখতে আসে। বলে, স্যার, আপনি নাকি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন? বাইরে কম যাওয়া আসা করেন? আমি বলি, হ্যাঁ। ছাত্র বলে, কাউয়ার্ডস বার বার মরে, ডাইস মেনি টাইম্‌স বিফোর দেয়ার ডেথ। কিন্তু স্যার, আপনি তো সাহসী। আপনি মৃত্যু ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত এটা বিশ্বাস হয় না। এমন হতে পারে যে আপনি আল্লাহতালার ভয়ে কাতর? আমি বলি, মৃত্যু আসবেই। কাউকে ছাড় দিবেনা। কি ফরখ পড়ে মৃত্যু কি রাজ সিংহাসনের উপর হলো? না, ধুলিধুসরিত রাজপথে হলো? মাটির তলায় যেতেই হবে। মৃত্যুকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। ছাত্ররা বল্ল, স্যার, আমরা চার বন্ধু আপনার কাছে প্রাইভেট পড়তাম। আপনাকে মাসে মাসে টাকা দিই নাই। আপনি চান নাই। আমরা জানতাম, তখন আপনার টাকার দরকার ছিল। আপনার মা বাবা, ভাই বোনদের নিয়ে এক বিশাল পরিবার আপনার আয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল। পরিবার চালাতে গিয়ে আপনি হিমশিম খেতেন। আমরা চার বন্ধু আজ প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। আপনি রাগ করবেন না– বললে, বলতে পারি। আমরা আপনার ঋণ শোধ করতে চাই। আমি হাসি। তোমরা কি ভাবে ঋণ শোধ করবে? আমি তাদের বলি। তোমরা আমার জন্য দোয়া কর। যাতে আমার কবর বিলাস বহুল অ্যাপার্টমেন্টের মতো খোলামেলা হয়। ছাত্ররা বল্ল, আমরা এসেছি, আপনাকে একটা এপার্টমেন্টের চাবি উপহার দেয়ার জন্য। আমার মনে হয়, আমি তরুণদের যা বোঝাতে চাই– তারা তা বুঝতে চায় না। বা বুঝতে পারেনা। তারা বলছে, আমরা চাই আমাদের স্যার আরামে রাত কাটাক। নিশ্চিন্ত থাকুক।

ইয়াবা, ভায়াগ্রা, মদ এসব খারাপ জিনিস। তবুও মানুষ মদ খায়। ইয়াবা, ভায়াগ্রা সেবন করে। মাদকের অপকারীতা বোঝাতে পারলে মানুষ মদ ইয়াবা ছেড়ে দেবে, এই চিন্তা থেকে গ্রামের মানুষকে বোঝাতে এক পল্লীতে গেছে একটি টিম। তারা এক বালতিতে নেয় মদ, অপর বালতিতে পানি। এক গাধাকে বালতির কাছে নিয়ে গেল, গাধা মদের বালতি লাথি দিয়ে ফেলে দিল। পানির বালতি থেকে পানি পান করল। টিম ম্যানেজার বল্লেন, প্রিয় গ্রামবাসী, আপনারা কি শিখলেন? গ্রামের লোকেরা বল্ল, আমরা শিখলাম, গাধা মাদক খায়না। গাধারাই মাদককে লাথি মারে।

ঠিক আছে, টিমের কর্তাগণ এক বালতিতে পানি ভরলেন, একটি পোকাকে সে বালতিতে ফেলে দিলেন। পোকা মনের আনন্দে বালতির পানি খায় আর সাতার কাটে। আরেক বালতিতে নেয়া হলো ১০০টি ইয়াবা গোলা পানি। ওই পোকাকে ইয়াবার শরবতের মধ্যে ফেলা হলো। ফেলার সাথে সাথে পোকা মারা গেলো।

প্রিয় গ্রামবাসী, টিম ম্যানেজার ভাষণ দিতে উঠলেন, বল্লেন, আপনারা কি শিখলেন? গ্রামবাসী বল্ল, আমরা শিখলাম, ইয়াবা খেলে পেটের পোকা, চির কিরমি মরে যায়। ইয়াবা পেটের জন্য ভাল। আমরা বলি একটা– আর উনারা বোঝেন আরেকটা।

হা, হা, মানুষ সাদাসিধে। গ্রামের মানুষ বেশি বেশি সহজ সরল। তাকে তত্ত্ব কথা আমি কখনো বোঝানোর চেষ্টা করি না। আমি একটা বললে– তারা আরেকটা বুঝবে। কিন্তু আমার শিল্পপতি ছাত্ররা আমার কথা মানছে না। বলে– স্যার, দুদিনের দুনিয়া। কান্দিয়া কান্দিয়া রাত পার করতে চাই না। খাও দাও ফুর্তি কর। মর্সিয়া ক্রন্দন চাই না। আমাদের ছোট্ট উপহার গ্রহণ করে নেন। আপনি কষ্টে থাকেন, সেটা আমরা চাই না। আপনার কথা শুনতে চাই না। আপনার শান্তি চাই। হাত বের করেন। চাবি নেন।

(দুই)

সাংবাদিকতা নিয়ে লেখাপড়া করে এমন কিছু ছাত্র আমাকে বলে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এর বিরুদ্ধে, বাণিজ্যিক স্বার্থকে, মুনাফামুখী শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করতে আমরা একটা সেমিনার করব, আপনাকে যেতে হবে। আমি বলি, তোমাদের সেমিনারে গিয়ে আমি কি করব? হবু সাংবাদিকরা বল্ল, আপনি বক্তব্য দেবেন। আপনি শিক্ষক– কাম– বুদ্ধিজীবী– আপনার কথা শুনে মানুষ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকবে। কি স্যার, ঠিক বলিনি? আমি বলি, সাংবাদিকরা যা বলে, তা ঠিক। তবে আমি সেমিনারে যাবো না। তোমরা যা ভাব, আর আমি যা ভাবি, তা এক নয়। তারা বিস্মিত, স্যার, আপনি এটা কি বললেন? আমি বলি, বেশির ভাগ মানুষ একটি বিষয়কে খণ্ডিত ভাবে দেখে। হবু সাংবাদিকরা বলে, যেমন? আমি বলি, এখনো আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে এবং শিক্ষা মাফিয়া দ্বারা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। সরকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে একশত ভাগ এমপিও দিচ্ছে। ছাত্রী উপবৃত্তি দিচ্ছে। বিনামূল্যে বই ও অন্যান্য উপকরণ দিচ্ছে। ল্যাপটপ দিচ্ছে। ভবন বানিয়ে দিচ্ছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম বানিয়ে দিচ্ছে। বাজেট এর বাইরে ও শিক্ষাতে সরকার– প্রধান তহবিল দিচ্ছেন। যেমন ধর, ‘হেকেপ প্রকল্প’, সামনে এই প্রজেক্টে ৭০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে। এসব করা হচ্ছে, শিক্ষাকে অ–বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু তোমরা দেখ, এত টাকা ব্যয় করে সরকার স্কুল কলেজ চালাচ্ছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা পয়সা দিচ্ছে– সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে, হানড্রেড পারসেন্ট এক্সেলেন্স বজায় রেখে চলছে? আমাদের অ–বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে। বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে যে সকল “শিক্ষা–মাফিয়া” আছে– তাদের নির্মূল করতে হবে। মাফিয়ারা “শিক্ষা” খেয়ে ফেলবে। তারা অতীত দেখছেন না, সে অতীতে কোচিং সেন্টার চালাত, বিদেশে ছাত্র পাঠানোর ব্যবসা করত। এখন কলেজ চালায়– এখন সে অধ্যক্ষ। মন্ত্রীদের ম্যানেজ করার সক্ষমতা থাকলে– অনেক কিছু করা যায়। ভুয়া পিএইচডি নিয়ে সমাজে দাপিয়ে বেড়ানো যায়। হবু সাংবাদিকদের বল্লাম, সার্বিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অদক্ষতা আছে, এটাকে অজুহাত হিসেবে দেখায় শিক্ষা মাফিয়া। দু’চারজন ‘তেলবাজ’ শিক্ষাকে কব্জা করে ফেলছে, কিন্তু আমরা কথা বলতে পারছি না– এর চাইতে আফসোসের ব্যাপার আর কি আছে? ছেলেরা বলে, স্যার, সাংবাদিকের নিরাপত্তা আছেনি? আকাশের যত তারা লেখককে ফাঁসাইবার জন্য আছে তত ধারা। সাবধান থাকবেন।

(তিন)

ইন্টারনেট এখন জোকস এর ভাল উৎস। আগে রিডার্স ডাইজেস্ট পড়তাম, ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ান জোকস –এ রকম জোকস এর বই পড়তাম, লাফটার দ্যা বেষ্ট মেডিসিন– পড়তাম, এখন ফেসবুক খুললেই হয়। মন খারাপ থাকলে জোকস ভাল মেডিসিন। সিইউ ফ্রেন্ডস পেজে পেজের সদস্যরা জোকস পোস্ট করে ফেবু ইউজারদের হাসিয়ে কাবু করে ফেলেন। মন খারাপ থাকার সুযোগ থাকে না। আই লাইক সি ইউ ফ্রেন্ডস পেজ ভেরী মাচ। বাট আই এম এমেচার ইন ফেবু।

এটা একটা শহরের কিংবা একটা গ্রামের ইসকুল– গ্রামের মানুষ গরিব কৃপণও। পকেট থেকে পয়সা বের করতে চায় না। এখানে আপনি–দেখবেন, শহরের মানুষ চালাক। তাদের পকেট থেকে টাকা বের করার কৌশল জানতে হয়। গ্রামে শিক্ষা মাফিয়ারা আসে না। মধু না থাকলে মৌমাছি থাকবে না। গুড় না থাকলে পিঁপড়া যাবে না। গ্রামের গরিব– আম–ছালা দুটোই তার নাগালের বাইরে। স্কুলে পড়ালেখা হয় কিনা, এটা নিয়ে গ্রামবাসী ভাবে না। শহরের স্কুলে ইন্সপেক্টর এসেছেন। দশম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকেছেন। ছাত্রকে প্রশ্ন করলেন, আমাদের দেশ ভাল? না, খারাপ? ছাত্র বলে, ভাল। ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করলেন, আমাদের এই ভাল দেশের রাষ্ট্রপতি কে? ছাত্র বল্ল, জননেত্রী শেখ হাসিনা। ইন্সপেক্টর বল্লেন, আমি প্রশ্ন করেছি, রাষ্ট্রপতি কে? ছাত্র এবার বল্ল, স্যার, মনে পড়েছে, শেখ হাসিনা না খালেদা জিয়া। ইন্সপেক্টর বল্লেন, এটা ইসকুল? না আর কি? ছাত্র বলে স্যার, মাফ করে দিন, এরশাদ। ইন্সপেক্টর বল্লেন, এই ব্যাটা তুই ক্লাস টেনে ক্যামনে উঠেছিস? আমি তোর নাম কেটে দিলাম। তুই যা গ্রামে, মাঠে গিয়া গরু চরা। ছাত্র বলে, আমার নাম কাটবেন? আমি গরু চরাব? হা হা হা। আমার নাম কাটার ক্ষমতা আপনার নাই। ইন্সপেক্টর– বলেন, বেয়াদপ? তোর কেমন সাহস? ছাত্র বলে, আমি বেয়াদপ নই। স্কুলের খাতায় আমার নাম নাই। কাটবেন কি করে? ইন্সপেক্টর বল্লেন, তুই ছাত্র না? সে বলে আমি মাঠে গরু চরাই। স্যারে ডাকেন, কইলেন দশ টাকা পাবি, আর পাবি ঝালমুড়ি, কেলাসে আইস্যা বইস্যা থাক। ইন্সপেক্টর মাস্টারকে বল্লেন, মাস্টার সাব, আপনার লজ্জা নাই? শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করেন? আপনারা শিক্ষা ব্যবসায়ীরা জাতিকে শেষ করে দিবেন। আপনারা শিক্ষা ব্যবসায়ীদের উপর খোদার গজব পড়ুক। আপনার হাতে ফোস্কা পড়ুক। আপনার মতো শিক্ষা ব্যবসায়ীদের পোন্দে ফোঁড়া উঠুক। আপনাকে বরখাস্ত করলাম। শ্রেণি শিক্ষক বলে, আপনার বাপের সাধ্য আছে নি আমাকে বরখাস্ত করার? আমি মাস্টার নাকি? সামনের ওই মুদির দোকান দেখেন সেটা আমার। মাস্টার সাবে আমারে ডাইক্যা কইলো, ওই মানিক্যা শহর থাইক্যা এক বেডা নাকি আইবো। আমি হাটে গেলাম। কেলাস ঘরে যাইয়া বইস্যা থাক। রেগে মেগে ইন্সপেক্টর গেলেন হেড স্যারের রুমে। আপনি হেড স্যার? হেড স্যার বলে, কোন সমস্যা? ইন্সপেক্টর বলে, আপনারা এসব কি করছেন? নকল ছাত্র, নকল শিক্ষক, এটা স্কুল? উনি বল্লেন, আমার মামা এই স্কুলের হেড স্যার। উনি জমির দালালি করেন। উনার একটি নাপিতের দোকান ও একটি দর্জির দোকান আছে। উনি জমি কিনতে অন্য টাউনে গেছেন। আমাকে কইল বোর্ড থেকে ইন্সপেক্টর আইলে তারে ২৫ হাজার টাকার বান্ডিলটা ধরাইয়া দিস। স্যার, এইডা স্কুল না, জিপিএ– ৫ বিক্রির দোকান? ইন্সপেক্টর বল্লেন, তোমরা বাঁচি গেলা। আমি ইন্সপেক্টর না। আমার দাদা ইন্সপেক্টর। উনি কন্ট্রাক্টরি করেন। টেন্ডার ড্রপ করতে গেছেন. . .।

শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে করতে দয়া করে এই অবস্থায় নিয়ে আসবেন না। স্কুলকে জিপিএ–৫ বিক্রির দোকান বানাবেন না। আপনি মন্ত্রী হোন, যেই হোন, মাফিয়া পুষবেন না। শিক্ষা বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। আমরা চোখে অন্ধকার দেখছি।

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ। অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ