ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের ঘাটতির উল্লম্ফন অর্থনীতির জন্যে বিপজ্জনক: আমদানি ও পুঁজি পাচারের লাগাম টেনে ধরুন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০১৮, ১৭:৪০

ড. মইনুল ইসলামের কলাম, ০১ জুলাই, এবিনিউজ : এখন আমরা সবাই বুঝতে পারছি যে দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের খেলাপী ঋণ সমস্যার মূলেও রয়েছে এই পুঁজি পাচার সমস্যা। তার মানে, সরকার যতই লুকাবার চেষ্টা করুক না কেন এই ক্রমবর্ধমান ঋণ–খেলাপ সমস্যা বাড়তেই থাকবে। বড় বড় রাঘববোয়ালদের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণের সিংহভাগ আদতে দেশেই নেই। এই অর্থ প্রধানত ওভারইনভয়েসিং, আন্ডারইনভয়েসিং এবং ‘হুন্ডি সিস্টেমের’ মাধ্যমে অতি সহজে বিদেশে পালিয়ে গেছে। অতএব, এসব রাঘব বোয়ালদেরকে ধরপাকড় শুরু করলে দেখা যাবে গোপনে ইনাদের দেশ থেকে বিদেশে পলায়নের হিড়িক পড়বে। কারণ, তাঁদের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য–সদস্যা ইতোমধ্যেই বিদেশে ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন। ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণবাগিয়ে তাঁরা বহুদিন ধরে বিদেশে পুঁজি পাচারে ব্যাপৃত রয়েছেন। এখন সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচার মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিশ্বের সকল উন্নত দেশে এবং বিশেষত ‘ট্যাক্স–হ্যাভেন’ হিসেবে বহুল–পরিচিত দেশগুলোতে এখন সহজেই পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান ২০১৭–১৮ অর্থ–বছরে দেশের আমদানি বিল ৬০ বিলিয়ন ডলার মানে ছয় হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে কিংবা ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, এবং ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। গত ২০১৬–১৭ অর্থ–বছরে আমদানি হয়েছে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, এক বছরে এক লাফে আমদানি ব্যয় ১৩ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটাকে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। গত বছর আগাম বর্ষা এবং বন্যায় বোরো ধানের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ায় উৎপাদন ঘাটতি পূরণে এক বছরে খাদ্যশস্য আমদানি প্রায় এক কোটি টনে পৌঁছে যাওয়ায় ঐ খাতে আমদানি ব্যয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প ও এলএনজি টার্মিনাল এবং পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্পের মত বেশ কয়েকটি মেগাপ্রকল্পের প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবাহ যুক্ত হওয়ায় এ–বছরের আমদানি বিল অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। এতদ্‌সত্ত্বেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমদানি বিলের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন কোন মতেই অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির কারণে হচ্ছে না। এই উল্লম্ফনের মূল কারণ দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার প্রক্রিয়া মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত হয়ে যাওয়া।

গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে, এটা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয়। আইএলও এবং গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির মত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা বেশ কিছুদিন ধরেই এ–ব্যাপারে বিপদ সংকেত দিয়ে চলেছে, কিন্তু আমাদের দেশের নীতি–প্রণেতাদের এই ইস্যুতে মোটেও আগ্রহী হতে দেখা যাচ্ছে না। আইএলও প্রায় তিন বছর আগে ঘোষণা করেছে যে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় পাঁচ/ছয় বিলিয়ন ডলার পুঁজি বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রায় দু’বছর আগে নিউইয়র্ক–ভিত্তিক গবেষণা–সংস্থা গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) ঘোষণা দিয়েছে যে তাদের সর্বশেষ গবেষণা মোতাবেক বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালে নয় বিলিয়ন ডলার মানে নয়শ কোটি ডলারেরও বেশি পুঁজি বিদেশে পালিয়ে গেছে। আমি নিজেও আমার বেশ কয়েকটি কলামে সরকারকে সাবধান করে দিয়েছি যে কার্যকরভাবে দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকে রুখে দেওয়ার জন্যে যথাযথ নীতি গ্রহণ জরুরি। এটা প্রতিরোধ করা অসাধ্য নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কিভাবে পুঁজি পলায়নকে সফলভাবে নিরুৎসাহিত করা যায় তার নজির বিভিন্ন দেশে সৃষ্টি হয়েছে যেখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। আমদানি বাণিজ্যে ওভারইভয়েসিং বিশ্বের সকল উন্নয়নশীল দেশে অতি পরিচিত এবং বহুল–প্রচলিত পুরানো সমস্যা, যেটাকে পুঁজি পাচারের সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একইসাথে, রফতানি বাণিজ্যে আন্ডারইনভয়েসিং বাংলাদেশের রফতানিকারকরা সফলভাবে ব্যবহার করে চলেছেন পুঁজি পাচারের জন্যে, এটাও ওয়াকিবহাল মহলের জানা থাকার কথা। এদেশের রফতানিকারকরা তাঁদের রফতানি আয় সবটুকু দেশে আনছেন না, এটাও নীতি–প্রণেতারা না জানার কথা নয়। আমাদের গার্মেন্টস ও নীটওয়ার শিল্পের রফতানিকারকরা যে কানাডার টরোন্টোর বেগমপাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সেটাও আমরা বহুদিন ধরে গবেষণার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে যাচ্ছি। মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির সিংহভাগ খদ্দেরও ব্যবসায়ী–শিল্পপতিরা। যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ—যেখান থেকেই তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করা হোক দেখা যাবে পুঁজিলুটেরা রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ আমলা, সামরিক অফিসার, প্রকৌশলী, ক্ষমতাসীন মহলের কৃপাধন্য ব্যবসায়ী, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা–নেত্রীদের পরিবার–আত্মীয়–স্বজন মাশাআল্লাহ সবাই দলে দলে বিদেশে ঘর–বাড়ি–রিয়াল এস্টেট–ব্যবসাপাতি কিনে পুঁজি পাচারের ফায়দাভোগীদের দল ভারী করে চলেছেন। এদেশের এফবিসিসিআই, বিজিএমআই, বিভিন্ন চেম্বার কিংবা বণিক সমিতির অতীতের বা বর্তমান নেতৃবৃন্দের, ব্যাংক–মালিকদের কিংবা বড়সড় ব্যবসায়ী–শিল্পপতিদের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য–সদস্যা কোথায় বসবাস করছেন খবরাখবর নেয়া হলে আমার এই দাবির অকাট্য প্রমাণ মিলবে। বাংলাদেশের প্রতিটি ছোট–বড় প্রকল্পের খরচ যে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে বিশ্বের সর্বোচ্চে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে তার কারণ এই পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের মোচ্ছব। শেখ হাসিনার উন্নয়নের মহোৎসব যে উপরে উল্লিখিত পুঁজিলুটেরাদের বেধড়ক্‌্‌ পুঁজি লুণ্ঠনে ঘৃতাহুতি দিয়ে চলেছে সে অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে না।

এই ওভারইনভয়েসিং–আন্ডারইনভয়েসিং এর চাইতেও পুঁজি পাচারকে একেবারেই সহজ করে দিয়েছে বাংলাদেশের এক কোটি ত্রিশ লাখ অভিবাসী/এনআরবি’র রেমিট্যান্স প্রেরণে গেড়ে বসে থাকা ‘হুন্ডি পদ্ধতি’। এখন আমরা সবাই বুঝতে পারছি যে দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের খেলাপী ঋণ সমস্যার মূলেও রয়েছে এই পুঁজি পাচার সমস্যা। তার মানে, সরকার যতই লুকাবার চেষ্টা করুক না কেন এই ক্রমবর্ধমান ঋণ–খেলাপ সমস্যা বাড়তেই থাকবে। বড় বড় রাঘববোয়ালদের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণের সিংহভাগ আদতে দেশেই নেই। এই অর্থ প্রধানত ওভারইনভয়েসিং, আন্ডারইনভয়েসিং এবং ‘হুন্ডি সিস্টেমের’ মাধ্যমে অতি সহজে বিদেশে পালিয়ে গেছে। অতএব, এসব রাঘব বোয়ালদেরকে ধরপাকড় শুরু করলে দেখা যাবে গোপনে ইনাদের দেশ থেকে বিদেশে পলায়নের হিড়িক পড়বে। কারণ, তাঁদের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য–সদস্যা ইতোমধ্যেই বিদেশে ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন। ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণবাগিয়ে তাঁরা বহুদিন ধরে বিদেশে পুঁজি পাচারে ব্যাপৃত রয়েছেন। এখন সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচার মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিশ্বের সকল উন্নত দেশে এবং বিশেষত ‘ট্যাক্স–হ্যাভেন’ হিসেবে বহুল–পরিচিত দেশগুলোতে এখন সহজেই পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকার এখন ব্যাংকগুলোর মালিক পক্ষকে যেভাবে বিভিন্ন সুবিধে দিয়ে ওগুলোকে তাঁদের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করতে উঠেপড়ে লেগেছে তাতে পুঁজি–পাচার যে আরো প্রচন্ডভাবে উৎসাহিত হবে সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। যেহেতু দেশের বড় বড় আমদানিকারকরাই এখন বিভিন্ন ব্যাংকের মালিক এবং পরিচালকদের অন্তর্ভুক্তই কিংবা তাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন তাই তাঁদের আমদানি রফতানির এলসি বা ইনভয়েস সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে প্রসেস করা বা রিজেক্ট করার ক্ষমতা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জন্যে দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এখন মিড–লেভেল বা নিচু স্তরের ব্যাংকাররা দিনরাত খেটে এসব রাঘববোয়ালদের পুঁজি লুণ্ঠনকে শক্তিশালীকরণের অসহায় অংশীদারের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।বলা বাহুল্য, তাঁদের চাকরি নিয়েই টানাটানি পড়বে এগুলো নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করলে। আবার ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারি উদঘাটিত হলেও প্রথমেই কোপ পড়বে তাঁদের ওপর। (আমার পরিচিত বেশ কয়েকজন ব্যাংকার এখন দীর্ঘদিন হাজতে দিনযাপন করছেন বেসিক ব্যাংকের মামলার কারণে, কিন্তু আবদুল হাই বাচ্চু দিব্যি বহাল তবিয়তে দিন গুজরান করছেন!) অতএব, ওভারইনভয়েসিং এবং আন্ডারইনভয়েসিং শক্তভাবে ঠেকানোর জন্যে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমছে। পাবলিক–প্রাইভেট নির্বিশেষে ব্যাংকগুলোতে খেলাপী ঋণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটাই প্রধান কারণ। বখরা ভাগাভাগির এবং দুর্নীতির রোগটাও তো এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আমদানির মহা–উল্লম্ফনের পেছনেও ব্যাংকগুলোর এই ক্রমবর্ধমান দুর্নীতিই প্রধানত দায়ী। ওভারইনভয়েসিং এবং আন্ডারইনভয়েসিং কমাতে হলে ব্যাংকের কয়েক শত মালিক–পরিচালকের ক্ষমতার তান্ডব প্রতিরোধ করতেই হবে। ব্যাংকগুলোর শীর্ষস্থানীয় নির্বাহীগণ সহ প্রকৃত ব্যাংকাররা এখন দিনদিন যেভাবে মালিক–পরিচালকদের কাছে অসহায় বলির পাঁঠা কিংবা সক্রিয় বখরা–ভাগাভাগির পার্টনারে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন সেটা থামানো না গেলে ব্যাংকিং সিস্টেমকে বাংলাদেশের এই মহাশক্তিধর ‘রবার–ব্যারনদের’ মৃগয়াক্ষেত্রের ভূমিকা পালন থেকে ফেরানো যাবে না।

এ বছরের লেনদেন ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের চলতি খাতে (কারেন্ট একাউন্টে) এপ্রিল মাসের মধ্যেই সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার ঘাটতি সৃষ্টি হয়ে গেছে, জুন মাসের শেষে এই ঘাটতি দশ বিলিয়ন ডলার পেরিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। কারণ, রফতানি আয় এবং নীট রেমিট্যান্স মিলিয়ে ৬০ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয়ের মধ্যে বড়জোর ৫০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা যাবে, বাকি দশ বিলিয়ন ডলার হয় বৈদেশিক ঋণ দিয়ে মেটাতে হবে নয়তো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে নিতে হবে। দেশের সাধারণ জনগণের অগোচরে এদেশের বৈদেশিক ঋণ গত এক বছরে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। রূপপুর, মাতারবাড়ী, পায়রাসহ যেসব মেগা–প্রকল্পের জন্যে ‘সাপ্লায়ার’স ক্রেডিট’গ্রহণ করা হয়েছে ওসব ঋণের অর্থ দেশে আসতে শুরু করায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এখনো বড়সড় ধস দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়ার পরিবর্তে এক বিলিয়ন ডলার কমে গেছে গত এক বছরে। অতএব যে কথাটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীকে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই তাহলো, অবিলম্বে আমদানির উল্লম্ফন এবং পুঁজি পাচারের মোচ্ছবের লাগাম টেনে ধরুন। নয়তো, অর্থনীতির ‘ম্যাক্রো–ইকনমিক ব্যালেন্স’ তছনছ হতে বেশি সময় লাগবে না।

লেখক : অর্থনীতিবিদ; ইউজিসি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ