উদ্যোক্তারাই আমাদের ভরসার প্রতীক : ড. আতিউর রহমান

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০১৮, ১৩:৩৩

ঢাকা, ২৬ জুন, এবিনিউজ : বাংলাদেশের সাফল্যের গল্প আসলে উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প। বিশেষ করে এ দেশের ক্ষুদে ও মাঝারি তরুণ উদ্যোক্তারা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের আর্থিক মানচিত্র বদলে ফেলেছেন অনেকাংশেই। প্রযুক্তিও তাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার যে অঙ্গীকার বর্তমান সরকার করেছে তার কারণে গ্রামগঞ্জ ছাড়াও সারাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নানা উদ্যোগ বিকশিত হচ্ছে। এখন প্রয়োজন এদের জন্য উপযুক্ত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। তাই তাদের উদ্দেশে বেশ কিছুদিনের জন্য কর ও ভ্যাট সুবিধা বহাল রাখতে হবে। স্বল্প সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। আর তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশে সক্ষম করে তুলতে হবে।

চলছে বাজেট মৌসুম। সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংসদ, রাজনৈতিক অঙ্গন সর্বত্রই বাজেটকে ঘিরে বইছে উষ্ণ হাওয়া। তাই আমি আর এই বিষয়টি নিয়ে উত্তাপ বাড়াতে চাই না। বরং আমি দৃষ্টিটা আরেকটু প্রসারিত করে আমাদের অর্থনীতির মূল শক্তি কোথায় এবং সেই শক্তিকে আরও সুদৃঢ় কী করে করা যায় সেই দিকে নজর ফেরাতে চাই। সে জন্য আমাদের পরিসংখ্যান ও ইতিহাসÑ দুটো দিকেই নজর দিতে হবে। শুরুতেই আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক দিকগুলোর দিকে তাকাই। গত দশ বছরে আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই পোক্ত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়লে ভালো হতো। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধি হতে যাচ্ছে ৭.৬ শতাংশ। উন্নয়নশীল বিশ্বের চেয়ে অন্তত সাড়ে তিন শতাংশ বেশি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ফ্লাইওভার মহাসড়কসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মেগা অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার একনিষ্ঠ রয়েছে বলেই অর্থনীতির চাকা এমন সচল রয়েছে। গত দশ বছরে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। কৃষি খুব ভালো করছে। এ বছর সারাদেশেই কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল। ধানচাল ছাড়াও মাছ, সবজি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির উৎপাদনের ধারা বাড়ন্ত। অতিদারিদ্র্য কমে বারো শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। আমাদের মাথাপিছু আয় এই দশ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়ে এখন ১,৭৫২ ডলার। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের মানব উন্নয়নে, যেমন গড় আয়ু, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নÑ সব সূচকেই আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হওয়ার সব কটি সূচকেই বাংলাদেশ যোগ্যতা অর্জন করেছে। আশা করছি ২০৩০ সালে এমডিজির মতোই এসডিজি অর্জনেও বাংলাদেশ তার সুনাম অক্ষুণœ রাখবে।

  আমাদের আর্থ-সামাজিক এই সাফল্যের পেছনে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের অসাধারণ অবদানের কথা না বললেই নয়। আর এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের সামাজিক গতিময়তার জন্যই। একাত্তরের প্রতিকূলতা জয় করে এই সমাজ তার ভেতরে এক অভাবনীয় লড়াই করার শক্তি সঞ্চয় করে রেখেছে। আর সেই কারণে অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তা ব্যবসা-বাণিজ্যের নানামুখী বাধা ডিঙিয়ে ঠিকই বের হয়ে আসছে। সংখ্যার বিচারেও আমাদের জনসংখ্যা খুবই তরুণ। পনেরো বছরের কম বয়সী তরুণের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ। ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যার হার ১৯.৫ শতাংশ। চীন, ভারত ও ভিয়েতনামে এই হার যথাক্রমে ১৩ শতাংশ, ১৬.৯ শতাংশ, ১৮.৪ শতাংশ। এই তরুণরাই আমাদের মূল জনশক্তি। এদের অংশগ্রহণেই আমাদের শ্রমবাজার গতিশীল ও সাশ্রয়ী। এই বৈশ্বিক পরিবেশে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তারা শুধু রপ্তানি শিল্পেরই বিকাশ ঘটাচ্ছে তাই নয়, ই-কমার্স থেকে শুরু করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, সমাজ ও প্রশাসনকে গতিময় রাখতে তারা অসামান্য ভূমিকা রাখছে। তবে যথেষ্ট গুণমানের শিক্ষা না পেয়ে তরুণদের বিরাট অংশের কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত ঘটছে না। তাই শঙ্কা ও অসন্তোষ রয়েছে। এর প্রমাণ আমরা হালের সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় দেখতে পেয়েছি। তাই আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটাও ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারাই বেশি করে করতে পারেন। উদ্যোক্তা তৈরির জন্য তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব ¯œাতক বের করছি তারা আমাদের আধুনিক শিল্পায়ন ব্যবস্থাপনায় অপ্রাসঙ্গিকই থেকে যাচ্ছে। অথচ শিল্প খাতের মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলী শ্রীলংকা, ভারত ও আশপাশের দেশ থেকে আমদানি করে বছরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার গুনতে হচ্ছে। আবার দেখুন তেজগাঁওয়ে অবস্থিত আমাদের টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ¯œাতকই বেকার নেই। অর্থাৎ আমরা দক্ষতার চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষিত কর্মী তৈরি করতে পারছি না। আমাদের এক্ষুণি ব্যবসায় ও শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি ট্রেডকোর্স চালু করা, আরও বেশি করে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। হালে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ব্যবস্থাপক ও উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণে মনোযোগী হয়েছে। এই ধারা আরও জোরদার করতে হবে। আমরা জিডিপির মাত্র ০.১৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়ন বাবদ ব্যয় করি। চীন করে ১.৫-২ শতাংশ। আমাদের কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপযুক্ত ‘ইনোভেশন-ল্যাব’ রয়েছে? আমাদের ব্যক্তি খাতই বা এই খাতে কতটা খরচ করে? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও আমাদের সরকারি খরচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় খরচের অর্ধেকেরও কম। ব্যক্তি খাতও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে বরং ব্যবসাই বেশি করছে।

তা সত্ত্বেও আমাদের এতটা নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ অতীত। আমাদের বস্ত্র খাতের সমৃদ্ধিতে আকৃষ্ট হয়েই ব্রিটিশরা সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে উপমহাদেশে এসেছিল। বাংলার বস্ত্রশিল্পকে ধ্বংস করেই হয়েছে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব। সেই উদ্বৃত্ত পুঁজি গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পায়নের পেছনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ওই মার্কিন পুঁজি আবার ইউরোপ পুনর্গঠনে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার ভাগ পেয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকং। এসব দেশও বস্ত্র খাতের বিকাশের মাধ্যমেই অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পুঁজি আসতে শুরু করে আমাদের বস্ত্রশিল্পে। সেই সুবাদেই প্রায় আড়াই শতাব্দী পরে আমরা আবার বস্ত্র খাতের হারানো গৌরব অনেকটাই ফিরে পেয়েছি। আজ বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম বস্ত্র রপ্তানিকারক। রপ্তানি থেকে আহরিত পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে অনেকগুলো রপ্তানিমুখী শিল্পে। ফলে জুতো, ওষুধ, সিরামিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাইসাইকেল, জাহাজ নির্মাণসহ রপ্তানিমুখী শিল্পায়নে বড় ধরনের সাফল্য আসছে। বাংলাদেশ সরকারের উপযুক্ত নীতি প্রণোদনা, ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় উদ্ভাবনীমূলক সমর্থন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দূরদর্শী রেগুলেশন এই শিল্পায়নের শক্ত পাটাতন তৈরি করতে সাহায্য করেছে। আর লাখ লাখ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রম ও এগিয়ে যাওয়ার আকাক্সক্ষা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্য থেকেই পরবর্তী সময়ে বড় উদ্যোক্তার আবির্ভাব ঘটছে। বিশ্ব পরিস্থিতিও বাংলাদেশের অনুকূলে কাজ করছে। অনেকেই মনে করেছিলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পে ধস নামবে। কিন্তু আমাদের লড়াকু উদ্যোক্তারা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই সংকটকে সুযোগে রূপান্তরিত করেছেন। এই সংগ্রামে ক্রেতাদের সংগঠন অ্যালায়েন্স ও অ্যাকর্ড, উন্নয়ন সহযোগীদের (বিশেষ করে জাইকা ও বিশ্বব্যাংক) সমর্থন, বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ নীতি সমর্থন বড় ধরনের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। আমার মনে আছে, যেদিন রানা প্লাজা দুর্ঘটনাটি ঘটল ওইদিন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা সেদিন বলেছিলাম, এই দুর্যোগ বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠবে এবং পরবর্তীকালে একে সুযোগে পরিণত করবে। পরের দিন জাপানি রাষ্ট্রদূত আমার বাসায় চলে এলেন। বললেন, এসএমই খাতে যে কম সুদের ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জাইকা বিতরণ করছে তা থেকে একশ কোটি টাকা আলাদা করে ছোট ও মাঝারি গার্মেন্টসশিল্পের নিরাপত্তা বিধানে যেন দেওয়া হয়। আমরা দ্রুতই সরকারের সঙ্গে আলাপ করে নয়া এক ঋণ কর্মসূচির সূচনা করলাম। এই কর্মসূচি এখনো চলছে আরও বৃহত্তর পরিসরে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর পর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আরও তিনশ মিলিয়ন ডলারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের ঋণের ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি আরও দু’শ মিলিয়ন ডলার আমরা রিজার্ভ থেকে আলাদা করে শুধু সবুজ বস্ত্র ও চামড়া কারখানার জন্য নয়া ঋণ কর্মসূচি চালু করি। তা ছাড়া ইডিএফ দু’শ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে দুই বিলিয়নেরও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করেছিলাম। সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় বেশি পরিদর্শক নিয়োগ ছাড়াও নানামুখী তৎপরতা বস্ত্রশিল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের ব্যাপক উন্নতি করতে নীতি সমর্থন দিয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশের মূল রপ্তানি শিল্প একটি সংকট থেকে শুধু উঠে দাঁড়িয়েছে তাই নয়, এখন তার প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ এক খবরে জানতে পারলাম, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি গত চার মাসে প্রায় তিন শতাংশ হারে বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তারা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, চীনের কাছ থেকে যে হারে বস্ত্র কিনছে তার চেয়ে বেশি হারে বাংলাদেশ থেকে কিনছে। বর্তমানে মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের ভাবমূর্তি কমপ্লায়েন্সের উন্নতির কারণে বেশ উজ্জ্বল। তাই ৫.৬২ শতাংশ ডিউটি দিয়েও বাংলাদেশের বস্ত্র খাত মার্কিন বাজারে তার শক্তিমত্তা দেখিয়ে চলেছে। এ বছর ভারতেও আমাদের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর পাশাপাশি আমাদের তৃণমূলের অসংখ্য ক্ষুদে উদ্যোক্তারা কৃষি, মৎস্য, তাঁত ও কুটির শিল্পে ভীষণ তৎপর। তৃণমূলেও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অসংখ্য ডিজিটাল উদ্যোক্তার সৃষ্টি হয়েছে। ইউনিয়ন তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আউটসোর্সিং ব্যবসাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন অর্থায়নের নীতি সমর্থন দিয়ে নারীসহ এসএমই উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে কৃষি ও এসএমই ঋণ দেওয়ার জন্য অ-সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এসব ক্ষুদে উদ্যোক্তার পাশে থাকার অভিনব কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। লাখ লাখ বর্গাচাষিও এই ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মাত্র দুই শতাংশ হারে গৃহায়ন প্রদান করে তাদের আবাসনের সহায়তা দিচ্ছে।

সবাই চেষ্টা করেছে বলেই পোশাকশিল্প খাত এমন করে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই খাতকে আরও সবুজ ও সক্ষম করার জন্য আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যেসব উদ্ভাবনীমূলক নীতি সমর্থন দিতে শুরু করেছিলাম তা যেন অক্ষুণœ থাকে। এই খাতের ওপর হালে বাড়তি যে তিন শতাংশ করপোরেট করের প্রস্তাব করা হয়েছে তা প্রত্যাহারের অনুরোধ করছি। তা ছাড়া সবুজ কারখানার ওপর দুই শতাংশ বেশি করারোপের প্রস্তাবটিও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। উল্টো এ ক্ষেত্রে বাড়তি প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করছি। রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ঝুঁকিও অনেক। বিশেষ করে এর ফলে নগরায়ণ অপরিকল্পিত রূপ নিতে পারে, পরিবেশের অবনতি ঘটতে পারে, শ্রমিকদের জীবনমান চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই উদ্যোক্তারা যেন এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেরাও সক্রিয় হন এবং সরকারের সহায়তামূলক নীতি সমর্থন পান সে জন্য সংগঠিত হন।

আমাদের বৃহৎ শিল্প উদ্যোক্তারা এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের বুদ্ধিমত্তা ও সমর্থন স্বস্বার্থেই দেবেন। বিশ্বায়নের এই যুগে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নেওয়ার মতো সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। কিন্তু ক্ষুদে-মাঝারি উদ্যোক্তাদের সেই সক্ষমতা নেই। তাদের জন্যও বড় উদ্যোক্তাদের চেম্বারকে উদ্যোগী হতে হবে। কারণ ছোট-বড় মিলেই শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ‘ইকো সিস্টেম’ গড়ে ওঠে।

বস্ত্র খাত ছাড়াও বাংলাদেশের আরও অনেক খাতে উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক উৎপাদক, টায়ার উৎপাদক, আসবাবপত্র উৎপাদকদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিলে তারাও বস্ত্র উদ্যোক্তাদের মতো বিশ্ববাজার দখল করতে সক্ষম হবেন। ভারত ও চীনে এখন বড় বড় গাড়ি উৎপাদকরা কারখানা খুলেছে। বছরে ২০ লাখ গাড়ি এই দুই দেশে তারা উৎপাদন ও বিক্রি করছে। এসব গাড়ির টায়ার, প্লাস্টিক পার্টস আমরা বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করতে পারি। আমাদের পাটতন্তু দিয়ে গাড়ির বডির একাংশ তৈরি করা সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে চাই নীতি সক্রিয়তা। তা ছাড়া আমরা কৌশলগতভাবে এমন এক স্থানে অবস্থিত যে আমাদের ঢাকা, চট্টগাম, সিলেট বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ইউরোপের এয়ারলাইন্সগুলোকে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে তারাই এসব বিমানবন্দর গড়ে তুলবে। সে জন্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করার নিয়মনীতি সহজ করা, নিরাপত্তা জোরদার করা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজতর করার মতো সহায়ক নিয়মনীতি দরকার। আগামী দিনের উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে এখন থেকেই আমাদের আরও সম্মুখমুখী, দূরদর্শী নীতিসংস্কার ও নীতি সমর্থন দিয়ে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে হবে। (দৈনিক আমাদের সময় থেকে সংগৃহীত)

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ