নতুন আইন ও অধরা নিরাপদ সড়ক

  ফাহমিদা হক

২২ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৫৩ | আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

সময় আর জীবন দু’টোই মূল্যবান, তারপরও একটিকে বেছে নিতে হয় প্রয়োজনের তাগিদে। মানুষের জন্যেই আইন আর সেই আইন ভাঙ্গার কাজটাও মানুষই করে। সময়ের সাথে প্রগতির পথে পুরাতনকে ফেলে প্রয়োজনের তাগিদে নতুনকে গ্রহন করতে হয়, এটা সময়ের দাবি।বাংলাদেশের সড়ক - মহাসড়কের বিশৃঙ্খলা দেখলে মনে হবে এখানে কোন আইন নেই। কিন্তু আমরা জানি দেশে আইন ছিলো, আছে কিন্তু তারপরেও কেন এতো বিশৃঙ্খলা? 

আইনের প্রয়োগ না থাকলে সেই আইন অর্থহীন। সময়ের সাথে যুগোপযোগী আইন না হলে সেই আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা থাকবেই আর বিশৃঙ্খলার জট কখনো খুলবে না। নিরাপদ সড়ক না হলে, উন্নয়নের জোয়ার বেশী দূর এগোতে পারে না, মানুষের জান মালের নিশ্চয়তা না দিতে পারলে সকল উন্নয়ন এক সময় মুখ থুবড়ে পরে। বেশী ভাড়া গুনতেও রাজী জনগণ চায় যাত্রাটি যেন হয় নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন। বহু বছর ধরে চলতে থাকা সড়ক ব্যবস্হাপনার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রভাবশালী মালিক- শ্রমিক সংগঠনগুলোর যে অশুভ আঁতাত তা ভেঙ্গে দিতে না পারলে সড়ক ব্যবস্হাপনায় শৃঙ্খলা কখনো আসবে না, এভাবেই চলতে থাকবে আরো বহু যুগ যুগ ধরে।

দেশের গোটা পরিবহন ব্যবস্হাকে সারা বছর আমরা বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে চলতে দিবো, কোন আইন কানুনের ধার ধারবো না, সংস্কারের সুপারিশগুলো অকার্যকর থাকবে আর নিরাপদ নির্বিঘ্ন সড়ক আশা করবো সেটি কেবল আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু না। বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার মতে, বাংলাদেশে সড়ক দূর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ ব্যক্তির প্রাণহানি হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতিবছর সড়ক দূর্ঘটনায় গড়ে ১২,০০০ হাজার মানুষ নিহত ও ৩৫,০০০ হাজার মানুষ আহত হন।

আমরা লক্ষ করছি যে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা আইন কানুনের তোয়াক্কা করেন না, এমনকি সড়ক চলাচল নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তাও মানেন না। যাত্রী সাধারণ তাদের কাছে জিন্মি হয়ে আছে।

গত বছর সড়কে ছাত্র হ্ত্যাকে কেন্দ্র করে এক অভাবনীয় ছাত্র আন্দোলন “ নিরাপদ সড়ক চাই “ গোটা পৃথিবীতে সাড়া জাগিয়েছিলো, জাতির বিবেককে প্রচন্ডরকমভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যার সরাসরি ফল হিসেবে দেশে একটি নতুন আইন হয়েছে। ওই আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগষ্ট ৮ বছর আটকে থাকা সড়ক পরিবহন আইন দ্রুত মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত হয়। এর বছর খানেকের বেশী সময় পর ১ নভেম্বর সড়ক পরিবহন আইন হিসেবে তা কার্যকর হয়। নতুন আইন আগের চেয়ে কঠোর হয়েছে, শাস্তি ও জরিমানার পরিমান অনেক বাড়ানো হয়েছে। সময়ের সাথে মিলিয়ে আইনটিতে আধুনিকায়নও হয়েছে ।তবে আইনটি শুরুতেই হোঁচটও খেয়েছে।

নতুন আইন ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করার কথা থাকলেও তা করা যায়নি। দু’ দফায় দুই সপ্তাহ পিছানো হয়েছে, তার পরেও নানা বিভ্রান্তি এখনো রয়ে গেছে। যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী বলে দিয়েছেন, আইন কার্যকর হয়ে গেছে।নতুন আইন নিয়ে যাত্রী কল্যান সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, এই নতুন আইন মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভূমিকা রাখবে যদি আইনটি আরো যাত্রী বান্ধব হয়। ওনার মতে মন্দের ভালো যে, দীর্ঘদিন যেখানে আইনের শাসন অনুপস্হিত ছিলো সেখানে নতুন এই আইনে অপরাধ আর দন্ডের পরিমান মেনে সুষ্ঠভাবে প্রয়োগ করতে পারলে সড়ক পরিবহনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

নতুন আইনে উল্লেখযোগ্য বিধানগুলোর দিকে নজর দিলে দেখবো-

১। সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে; 
২। বেপরোয়াভাবে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা হলে ৩ বছর কারাদন্ড বা ৩ লাখ টাকা অর্থদন্ড হবে। বা উভয় দন্ডে 
দন্ডিত হতে পারে। দন্ডের টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি পাবে; 
৩। মোটর যান দুর্ঘটনায় আহত বা প্রাণহানি হলে ৫ লাখ টাকা বা ৫ বছরের জেল;
৪। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ৬ মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে; 
৫। নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালালে ৬ মাসের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে; 
৬। ভুয়া রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ৬ মাস থেকে ২ বছরের কারাদন্ড অথবা ১ থেকে ৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড; 
৭।ফিটনেস বিহীন ঝুকিপূর্ন মোটরযান চালালে ৬ মাসের কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে; 
৮। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে ১ মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থ দন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে; 
৯। সঠিক স্হানে পার্কিং না করলে, নির্ধারিত স্হানে যাত্রী উঠা-নামানো না করালে ৫ হাজার টাকা জরিমানা; 
১০।গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বললে ১ মাসের কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা; 
১১। একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট কাটবে এমন কি এভাবে একসময় তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে; 
১২। নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে বেশী ভাড়া নিলে ১ মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে; 
১৩। আইন অনুযায়ী লাইসেন্স পেতে হলে চালককে অষ্টম শ্রেণী পাস আর হেলপারদের ৫ম শ্রেণী পাস হতে হবে; 
১৪। গাড়ি চালাতে হলে অন্তত ১৮ বছর বয়স হতে হবে।এছাড়া সংরক্ষিত আসনে অন্য যাত্রী বসালে ১ মাসের কারা দন্ড বা অর্থ দন্ড, এমনকি উভয় দন্ড হতে পারে।

আমরা হলাম এমন জাতি, যে জাতিকে সভ্যতা এখনো ছুঁতে পারেনি, যে কোনকিছুর অপব্যবহার কিভাবে করতে হয় তা আমাদের চেয়ে বেশী কেউ পারে না।আইন অমান্যের শাস্তি বা জরিমানা বেশী হলে তা মেনে চলার একটা চাপ থাকে বৈকি, কিন্তু আমাদের মতো দেশে কঠোর আইন অপব্যবহারের আশন্কাকেও তা বাড়িয়ে তোলে।যেমন আমাদের ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয় এখন সবার জানা। চিন্তার বিষয় একটাই যেহেতু শাস্তি বা জরিমানার পরিমান বেশী, এই আইনের অপব্যবহার হলে জনগণের হয়রানির আর শেষ থাকবে না।

রাস্তায় গাড়িতে কেউ আইন ভাঙলে তার ব্যবস্হা পুলিশ নেবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু যদি পুলিশ হয়রানি করে, অনেক ক্ষেত্রে আইন যে ভাঙ্গা হয়েছে তা প্রমাণ করার কোন ব্যাপারই না রাখে এবং তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরো খারাপ ব্যবহার বা অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হয়? এ ক্ষেত্রে আশন্কা থেকেই যায় কারণ পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা পরিবহন থেকে পুলিশ কিভাবে চাঁদা নেয়, পুলিশের যুক্ততা কতটুকু তাঁরাই সবচেয়ে ভালো বোঝে।

নতুন আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা রয়েছে, এর সাথে অনেকগুলো বিষয় পরস্পর সম্পর্কিত
যেমন- প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্হা বা পর্যাপ্ত লোকবল নিশ্চিত না করে আইনের শতভাগ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের চিন্তা করা কেবলই বোকামি । বিশাল জনগোষ্ঠীর এক শহরে পার্কিং ব্যবস্হা পর্যাপ্ত নেই বললেই চলে, তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যে সব সমস্যা জেঁকে বসে আছে তা চাইলেও এতো দ্রুতই হাতে তুড়ি দিয়ে বিদায় করা সম্ভব না। এর জন্যে দরকার পর্যায়ক্রমে সারা দেশে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্হা গ্রহন করা।

প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া দেশের প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে পরিবহন অব্যবস্হাপনা।এদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে সেই তুলনায় যোগাযোগ ব্যবস্হা সাবলিল হচ্ছে না।যেই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্হা যতো ভালো তার বানিজ্যের প্রসার ততো ভালো।বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ভালো, কিন্তু রপ্তানিতে ধ্স নামলে এই অগ্রগতি ধরে রাখা যাবে না। পাকিস্তান ,ভারতকে পিছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

বিশ্বব্যাংকেরএই স্বীকৃতি ধরে রাখতে হলে রপ্তানী ব্যায় কমানোর কোন বিকল্প নেই। পরিবহন সেক্টরের জটিলতা রেখে রপ্তানি খাতকে সময় ও ব্যায় কমিয়ে টেকসই করা যাবে না। মোটকথা বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলেও আমাদের পরিবহন সেক্টরের অব্যবস্হাপনা দুর করতে হবে। রপ্তানি পণ্যে লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়িয়ে পণ্যের ব্যায় কমিয়ে প্রতিযোগিতার বাজার ধরে রাখতেই হবে।

দীর্ঘসময় ধরে রাহুর কবলে গ্রাস হয়ে আটকে থাকা পরিবহন সেক্টরকে রাহু মুক্ত করতে হবে।এরা সব আমলেই প্রচন্ড প্রতাবশালী, কোনকিছুকে তোয়াক্কা করে না, বার বার জনগনকে জিন্মি করে, ধর্মঘটের নামে প্রতারণার নাটক করে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেয়, সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি করে। সেই সুযোগে ফায়দা লুটে নিজের স্বার্থ রক্ষা করে। নতুন আইন কার্যকর হলেও পরিবহন মালিক- শ্রমিকদের অযৌক্তিক দাবীর কারণে যেন এর প্রয়োগে সংশয় না থাকে। এ পরিস্হিতিতে সরকারের দৃঢ ভূমিকাই একমাত্র পরিবহন মালিক- শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধ করে কঠোরহস্তে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের রুখে দিতে পারে। পরিবহন সেক্টরের স্হায়ী শৃংঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গ্রহনযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হোক সরকার। জনগণ পাক নিরাপদ সড়ক।

লেখক: নিউ মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর, সিজিএস; পরিচালক, সিসিএন

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ