কে কাকে কী পরামর্শ দেয়

সাক্ষ্যপ্রমাণ ভিত্তিক নীতি যে রাজনীতিকে দেখতে পায় না

  জঁ দ্রেজ়

০৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের গর্বিত হওয়ার কারণ আছে- বাঙালি আবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছে। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল অসামান্য অর্থনীতিবিদ নন, তিনি এক জন সুভদ্র সমাজমনস্ক মানুষ, দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ। তাঁকে নিয়ে এবং তাঁর দুই নোবেলজয়ী সহকর্মী এস্থার দুফলো ও মাইকেল ক্রেমারকে নিয়ে বাঙালির গর্ব স্বাভাবিক।

পুরস্কার ঘোষণার দিন দুফলো বলেছিলেন, এই পুরস্কার কেবল তাঁদের নয়, এটা ‘গোটা মুভমেন্ট’-এর পুরস্কার। মুভমেন্ট বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্স বা উন্নয়নের অর্থনীতির সেই ধারাটিকে যেখানে দারিদ্রের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খোঁজা হয় র‌্যান্ডমাইজ়ড কন্ট্রোল ট্রায়াল (আরসিটি) পদ্ধতিতে পরীক্ষানিরীক্ষার পথে। ইদানীং যাকে ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ ভিত্তিক নীতি’ (এভিডেন্স বেসড পলিসি) বলা হয়ে থাকে, এই আরসিটি পদ্ধতিই তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। খুব সরল ভাবে বললে, একই রকম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দু’দল মানুষের মধ্যে এক দলের ক্ষেত্রে কোনও নতুন নীতি বা ব্যবস্থা প্রয়োগ করে, এবং অন্য দলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন না ঘটিয়ে, তার পর দুই দলের অবস্থার হেরফের মাপার মাধ্যমে সেই নতুন নীতি বা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণের প্রক্রিয়াই হল আরসিটি।

‘এভিডেন্স’ বা ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ’ শব্দটাকে এক সময় আরসিটি-র সমার্থক বলে ধরে নেওয়া হত। সাক্ষ্যপ্রমাণের অন্য রূপগুলিকে বাতিল করা না হলেও তাদের মূল্য কমে গিয়েছিল। পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, যুক্তিপ্রয়োগ বা এমনকি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে যা ফল পাওয়া গেল তার সঙ্গে আরসিটি পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত না মিললেই মনে করা হত— আরসিটি যা বলছে সেটাই ঠিক। একমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণ না হলেও, আরসিটি একমাত্র ‘পাকাপোক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ’ হিসেবে স্বীকৃত হল।

সাক্ষ্যপ্রমাণ বলতে কী বোঝায় সে বিষয়ে বেশির ভাগ অর্থশাস্ত্রীই ইদানীং অনেকটা বড় করে ভাবেন। আরসিটির ব্যবহার এবং অপব্যবহার সম্পর্কে আমাদের ধারণাও অনেক পরিষ্কার হয়েছে। অ্যাঙ্গাস ডিটন এবং ন্যান্সি কার্টরাইট যেটা বুঝিয়েছেন তা হল, সাক্ষ্যপ্রমাণ নয়, সমস্যাকে বোঝাটাই আসল কথা। এবং, নানা ভাবে সেই বোধের বিকাশ ঘটতে পারে। সেই বিকাশের পথে সাক্ষ্যপ্রমাণের নিশ্চয়ই অবদান থাকে, কিন্তু অবদান থাকে অন্য অনেক ব্যাপারেরও। যেমন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বা জনপরিসরে বিতর্ক। এমনকি সাহিত্যপাঠও আমাদের বাস্তবকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।


সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে নীতির সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে ভাবা দরকার। বাস্তবে কী আছে বা ঘটছে, সাক্ষ্যপ্রমাণ হল তার ব্যাপার, আর নীতি কী হবে সেটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সাক্ষ্যপ্রমাণের ‘ভিত্তি’তে নীতি রচনা করতে হবে, এর মানে কী?

এ ক্ষেত্রে একটা চরম অভিমত হতে পারে এই যে, আরসিটি, বা সাধারণ ভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ সরকারি নীতির গুণাগুণ বিচারের এক নিরপেক্ষ মানদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমন, অর্থনীতিবিদ ড্যানি রডরিক বলেছেন, ‘যাতে কাজ হয়, সেটা করা চাই।’ একটু ভাবলেই বোঝা যায়, কথাটা আক্ষরিক অর্থে মেনে নেওয়া যায় না। কোনও কিছু যদি কাজ করেও, আর একটা কিছু আরও ভাল কাজ করতে পারে। এবং, কী করা উচিত বা উচিত নয়, সেটা অনেক সময়েই আদর্শের প্রশ্ন, কোনও আরসিটি বা সাক্ষ্যপ্রমাণ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বস্তুত, আমার মনে হয় না আরসিটি তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তারা এতটা চরম অভিমত পোষণ করেন।

সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে নীতিতে পৌঁছনোর পথটা দীর্ঘ, সেটা ভুলে গেলে চলে না। এই প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দু’একটা ভাবনার কথা বলতে পারি। প্রথম কথা, আগেই বলেছি, উপদেশ দিতে গেলে আগে মূল্যবোধ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর ভাবে ভাবা দরকার। স্কুলের খাবারে ডিম দিলে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার বাড়বে কি না কিংবা তাদের পুষ্টি ভাল হবে কি না, সেটা আরসিটি পদ্ধতিতে পরীক্ষা করার জন্য কোনও আদর্শগত ভালমন্দ বিচারের দরকার হয় না। কিন্তু স্কুলের খাবারে ডিম থাকবে কি থাকবে না, বাস্তবে সেই প্রশ্নটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা নৈতিক মূল্যবোধ বা আচারবিচারের মোকাবিলার প্রশ্ন। যেমন, উচ্চবর্ণের নিরামিষাশীদের সংগঠিত বিরোধিতার মহড়া নিতে হবে, পশুপাখির অধিকার নিয়ে যাঁরা আন্দোলন করেন তাঁরা ডিম নিয়ে আপত্তি করতে পারেন, এ ছাড়া আছে অর্থ মন্ত্রক, শিক্ষা দফতর, শিক্ষকদের সংগঠন, পোলট্রি ব্যবসায়ীরা। সহজেই এ বিষয়ে তর্কাতর্কি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এই উত্তেজিত আবহাওয়ায় যে কোনও ‘উপদেশ’-এরই বড় রকমের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, তা ভাল হোক বা মন্দ। এমনও হতে পারে যে পরামর্শে হয়তো উল্টো ফল হল। এই সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং মতানৈক্য শুধুমাত্র ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ’ দিয়ে মেটানো যায় না।


অনেক সময়েই ভুল নীতি নেওয়া হয় তথ্যপ্রমাণের অভাবে নয়, অগ্রাধিকার নির্বাচনে ভুল থাকে বলে। যেমন, ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার ২০০৬ সালে দরিদ্র মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য মাথাপিছু ২০০ টাকা পেনশন চালু করেছিল, এখনও সেই ২০০ টাকাই দিচ্ছে। অথচ এর মধ্যে সরকারি কর্মীদের বেতন ও পেনশন প্রচুর বেড়েছে। আমার ধারণা, বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদই বলবেন, ওই ২০০ টাকাটা বাড়ানো উচিত। বস্তুত, ২০১৭ আর ২০১৮ সালে বহু অর্থনীতিবিদ অর্থমন্ত্রীর কাছে সেই আবেদন জানিয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী কর্ণপাত করেননি। পেনশন প্রকল্প নিয়ে আরও সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করলে হয়তো এ বিষয়ে সরকারকে আরও চাপ দিতে সুবিধে হয়, কিন্তু মূল প্রশ্নটা এখানে নৈতিক এবং রাজনৈতিক।

দ্বিতীয়ত, কোনও একটা বিষয়ে কী পরামর্শ দেওয়া হবে, সেটা সাধারণত নির্ভর করে কাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। সরকারি বণ্টন ব্যবস্থায় সরাসরি খাবার দেওয়া ভাল না মানুষের হাতে নগদ টাকা তুলে দেওয়া ভাল, তা নিয়ে ভারতে জোরদার তর্ক চালু আছে। ভেবে নেওয়াই যায় যে এই প্রশ্নে এক জন অর্থনীতিবিদ সরকারকে এ রকম উপদেশ দিচ্ছেন: আমাদের আরসিটি পদ্ধতিতে করা গবেষণা দেখাচ্ছে যে, মানুষকে খাবার দিলেও তারা তার মধ্যে একটা নগদ হস্তান্তরই নিহিত আছে বলে গণ্য করবে। অথচ খাবার বণ্টনের ব্যবস্থা চালানোর আনুষঙ্গিক খরচ বিস্তর, ফলে নগদ হস্তান্তরই শ্রেয়। যে হেতু অনেক এলাকাতেই ব্যাঙ্কব্যবস্থা এখনও দুর্বল, তাই প্রথমে শহরে এবং অগ্রসর জেলাগুলিতে এটা চালু করা যায়। দেখতে হবে, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগদের অঙ্কটা যেন ঠিক ঠিক বাড়ে।

কিন্তু একই গবেষণার ভিত্তিতে সরকারের বদলে দরিদ্র মানুষকে পরামর্শ দিতে হলে অর্থনীতিবিদ হয়তো একেবারে অন্য কথা বলবেন। তখন তাঁর বক্তব্য হতে পারে এই রকম: সরকার ভাবছে খাবার দেওয়ার বদলে নগদ টাকা দেবে। আপনাদের উচিত এই চেষ্টায় সর্বতো ভাবে বাধা দেওয়া। আমাদের সমীক্ষা দেখাচ্ছে, ব্যাঙ্কব্যবস্থার পরিকাঠামো এখনও প্রস্তুত নয়। খাবারের বদলে টাকা দেওয়া হলে সে টাকা নিতে আপনাদের অনেক দূর যেতে হবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে। এই কথাটা সরকার ভাবছে না। আর, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য দেওয়া পেনশনের অভিজ্ঞতা থেকে আপনারা জানেন, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে টাকাটা বাড়ানোর দিকে সরকারের কোনও আগ্রহই থাকে না, এমনকি তারা সময়মতো টাকাটা দেবে, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। আপনাদের অনেকের কাছেই সস্তায় খাবার পাওয়াটা একটা জীবনমরণের ব্যাপার। যত ক্ষণ সরকার তার চেয়ে ভাল কোনও ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা করছে, এটা ছাড়বেন না।

প্রথম ক্ষেত্রে গবেষক নিজেকে সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দেখছেন, নগদ হস্তান্তরের কৃৎকৌশল কী হবে সে বিষয়ে তাঁর পরামর্শের একটা প্রভাব আছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি একই প্রশ্নকে বিচার করছেন সাধারণ দরিদ্র মানুষের জায়গা থেকে, সরকারি নীতি ও ব্যবস্থার ওপর যাঁর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সাক্ষ্যপ্রমাণ একই, কিন্তু কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে, কী পরামর্শ দেওয়া হবে।

তৃতীয়ত, সরকারি নীতি নিয়ে পরামর্শ দিতে গেলে পদ্ধতিগত, আইনি, নৈতিক এবং অন্য নানা ধরনের বিষয় এসে পড়ে, অর্থনীতিবিদরা যে বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না-ই হতে পারেন। অথচ, এগুলোর ওপর একটা উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করতে পারে। তাঁর ‘দি ইকনমিস্ট অ্যাজ় প্লাম্বার’ প্রবন্ধে এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন দুফলো, যেখানে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রকল্পের খুঁটিনাটির ওপর। তিনি বলেছেন, প্রকল্পের কার্যকর নকশা তৈরি করাটা ভাল প্লাম্বারের কাজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

এই বিভাগের আরো সংবাদ