সৌদিতে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ হোক : আহমদ রফিক

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জুন ২০১৮, ১৪:৩৮

ঢাকা, ২১ জুন, এবিনিউজ : বাঙালি নারীর ওপর বিদেশে যৌন নির্যাতনের নতুন তরিকা। বিষয়টি নিয়ে তীক্ষ ভাষায় একাধিক রচনার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি কী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মহলে, কী ধীমান কলাম লেখকদের মধ্যে কিংবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে। এর কারণ কী? এরা দরিদ্র, গ্রাম্য, আধা শহুরে নিম্নবর্গীয় নাগরিক বলে? এ ঘটনা এমন এক বিষয়, যা নিয়ে সমাজ-সচেতনতার দাবিদার রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনে নামা উচিত ছিল। কারণ ঘটনা জাতীয় পর্যায়ে লজ্জা ও অবমাননার। তা ছাড়া এটি ন্যক্কারজনক সামাজিক সমস্যা, যার নেপথ্যে অর্থনৈতিক কারণ প্রকট। দ্বিতীয়ত, এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর, বেসরকারি এজেন্ট তথা দালালচক্র। একগুচ্ছ নারী ও তাদের পরিবারে কল্যাণের নামে সংকট তৈরির দায়-দায়িত্ব তারা এড়াতে পারে না। অথচ একদিকে পরিহাসের বিষয় যে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবে অদক্ষ নারী কর্মী পাঠিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বহু প্রচারিত গর্ব ও আত্মতৃপ্তির নেপথ্যে রয়েছে বহুসংখ্যক নারীর জীবন যন্ত্রণার মর্মান্তিক ইতিবৃত্ত।

বিষয়টি আজকের নয়, অনেক দিনের। প্রচারে আকৃষ্ট মূলত দরিদ্র গ্রামীণ পরিবার, অংশত ছোটখাটো শহুরে পরিবার তাদের আর্থিক দুর্দশা দূর করতে তাদের কুমারী বা তরুণী গৃহবধূদের নানা লোভে প্ররোচিত করে মধ্যপ্রাচ্যে, প্রধানত সৌদি আরবে পাঠাতে শুরু করে। এর পেছনে কোনো অসৎ ইচ্ছা ছিল না। অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত গ্রামীণ পরিবার কারোরই জানা ছিল না এর অন্তর্নিহিত ভয়াবহতা। জানলে কে স্বেচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দেয়?

কিন্তু ওরা ঝাঁপ দিয়েছে আগুনে নয়, আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্নের হ্রদে। ওদের এবং পরিবারপ্রধানদের ভাবনা বছর কয় ‘সৌদিতে কাজের’ সুবাদে ঘরেফিরে সংসারের চাকা মন্থন ও সচল করে তোলা। জানা ছিল না নেপথ্যে কী হিংস্র জানোয়ার ওত পেতে বসে আছে ওই সব গৃহকর্মীকে তাদের লোভ-লালসা পরিতৃপ্তির কাজে ব্যবহার করতে। ঘটনা যেহেতু এক দিনের নয় বা শুধু আজকের নয়, তাই এ বিষয় নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠে আসছে, যেগুলোর জবাব দেওয়ার দায় কারো আছে বলে মনে হয় না। একমাত্র গণমাধ্যমে মাঝেমধ্যে কিছু ভয়ংকর সংবাদ প্রকাশ ছাড়া এই হতভাগ্য নারীদের পাশে কেউ নেই।

দুই.

আমার বিবেচনায় এটি জাতীয় সমস্যা। কারণ বিদেশে নারী-পুরুষ শ্রমিক-কর্মী পাঠানোর বিষয়টি নীতিগত, পদ্ধতিগত ইত্যাদি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন, যদিও ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাও সে ক্ষেত্রে মূল বিষয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ‘রেমিট্যান্স’ নামের জাদুর কুহকটি সরকারসৃষ্ট প্রচারণার অংশ, তাতে প্রলুব্ধ মৌমাছি। কাজেই বিদেশে পাঠানো নাগরিকদের ভালো-মন্দ দেখভালের দায়িত্ব এবং অনাচার-অঘটনের দায় প্রধানত মন্ত্রণালয়ের, সরকারি নীতিমালার।

ইউরোপের যেকোনো রাষ্ট্রকে দেখা যায় বিদেশে তাদের নাগরিকদের ভালো-মন্দ সম্পর্কে সজাগ সচেতন থাকতে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সবার সেরা। তাদের প্রদত্ত গ্রিনকার্ডধারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় তারা সদা তৎপর। আর এশীয় দেশগুলোর মধ্যে চীন, জাপান অনেকটা সচেতন। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ সম্ভবত উদাসীনতার পর্যায়ে পড়ে। যেমন প্রেরক কর্তৃপক্ষের, তেমনি কর্মস্থলের দূতাবাসের।

কঠিন কথাগুলো বলতে হচ্ছে এ কারণে যে বেশ বছর কয়েক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবে কর্মরত নারী শ্রমিক-গৃহকর্মীদের নরকযন্ত্রণা স্বল্পসংখ্যায় প্রকাশিত হলেও এ বিষয়ে তদন্ত করা, ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে তৎপরতার কোনো আলামত আমাদের চোখে পড়েনি। বরং সাম্প্রতিক নীতিমালায় অদক্ষ নারী কর্মীদের বিদেশ যেতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

এ কেমনতরো রাষ্ট্র, যার রাষ্ট্রযন্ত্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবিত নয়, বিশেষ করে অসহায় নারীদের। সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রধান অর্থ তাদের যৌন নিগ্রহ থেকে রক্ষা করা। ভাবতে পারছি না, সৌদি আরবে নারী কর্মীদের এত লাঞ্ছনা-যন্ত্রণার পরও তাদের সেখানে পাঠানোর নীতি গ্রহণ করা হয় কিভাবে এবং কেন? এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?

এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে একটি ভয়ংকর খবর। তাদের ভাষায় নির্যাতিত নারীদের দেশে ফেরার চেষ্টায় ‘সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে এমন নারী গৃহকর্মীদের ঢল নেমেছে। নির্যাতিতদের জন্য দূতাবাসে অন্তত চার বছর আগেই খোলা হয়েছে ‘সেফ হোম’। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থায় সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা।

একসময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি নারী শ্রমিকদের তথা গৃহকর্মীদের ঢল নেমেছিল সৌদি আরবে কর্মসংস্থানে, বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের। লক্ষ করার বিষয় যে সৌদি প্রশাসনের পক্ষে আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছিল বাংলাদেশ থেকে তরুণী বা যুবতী নারী শ্রমিক বা গৃহকর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে। এ আগ্রহের তাৎপর্য হতভাগিনীরা বা তাদের পরিবার না বুঝলেও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের না বোঝার কথা নয়।

তা সত্ত্বেও তারা কিভাবে তাদের নারী কর্মীদের সৌদি আরবে যাওয়ার বা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে? শুরুতে না হোক অন্তত চার বছর আগেই তো সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত ছিল সরকারের, যদি ধরে নেওয়া যায় পূর্বোক্ত প্রতিবেদন সঠিক। যদি তা নাও হয়, গত কয়েক বছরে গণমাধ্যমে সৌদি আরবে কর্মরত নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে পূর্বোক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু সরকার তা করেনি। বরং দুই বছর আগে থেকেই সৌদি আরবে বেশি করে নারী কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর অর্থ কি তাহলে এমনই দাঁড়ায় যে বৈদেশিক মুদ্রা তথা পেট্রো-ডলার অর্জনের জন্য আমাদের নারীদের ইজ্জত নষ্ট হতে দিতেও দ্বিধাবোধ করি না। আবারও প্রশ্ন এসব নারীর দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রণার ক্ষতিপূরণ কিভাবে হবে, কে বা কারা সে ক্ষতিপূরণ দেবে। সর্বোপরি এর কি আদৌ কোনো ক্ষতিপূরণ হয়? অর্থে বা অন্য কোনোভাবে। না, হয় না।

বড় লজ্জার কথা, বড় দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের কথা, সর্বোপরি সৌদি আরব সম্পর্কে আমাদের মনোভারে দীনতা ও হীনম্মন্যতার কথা যে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলো, সুধীসমাজ বা নাগরিক ফোরামের মতো সংগঠনগুলো এসব ঘটনায় প্রতিবাদে গর্জে ওঠেনি, দাবি জানায়নি সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করতে।

এই যে এখন সৌদি আরবে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের ঢল নামছে দূতাবাসে দেশে ফেরার আকুল আর্তিতে, এ অবস্থার প্রতিকার আমাদের বিদেশ মন্ত্রণালয় কি কোনো প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে সৌদি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগে? ঘৃণ্য, এজাতীয় যৌন অপরাধের জন্য তদন্ত দাবি করেছে? কিংবা সৌদি আরবস্থ বাঙলাদেশ দূতাবাস এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সৌদি দপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছে? আমরা জানি না। তবে আমাদের দাবি—না করা হয়ে থাকলে বাঙালি নারীর নিরাপত্তা দাবি করে অবিলম্বে সে আলোচনা শুরু করা দরকার।

এটা খুবই জরুরি। কারণ যৌন নিগ্রহের শিকার তরুণী বা যুবতীরা খুবই বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। এমনও খবর মিলছে যে নিয়মিত যৌন নির্যাতনের ফলে অনেক কুমারী নারী কর্মী অন্তঃসত্ত্বা, কী হবে তাদের ভবিষ্যৎ? পরিবার কিভাবে তাদের গ্রহণ করবে, আদৌ করবে কি না? না করলে তাদের দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

এখানেই শেষ নয়। সমস্যা নির্যাতিত তরুণী বা যুবতী গৃহবধূদের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের সমাজ, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজ এখনো যথেষ্ট রক্ষণশীল। তাই এমন সম্ভাবনা খারিজ করে দেওয়া যায় না যে নির্যাতিত গৃহবধূকে তার স্বামী বা পরিবার যথাযথ মর্যাদায় গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক। সে ক্ষেত্রে কোথায় দাঁড়াবে ওই গৃহবধূর বা নারীর ভবিষ্যৎ জীবন।

এসব সামাজিক সমস্যার সমাধান কে করবে হাজারে হাজারে ফিরে আসা নারীদের। সরকারের জন্য এ অবস্থা হবে এক ভয়াল সমস্যা, অনেকটা গোদের বিষফোড়ার মতো। অবস্থা যে কী ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তার পরিচয় মিলবে একটি দৈনিকের সম্পাদকীয় কলামের তথ্যে।

সেখানে বলা হয়েছে ‘সৌদি আরব থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরে আসছে। তাদের সবার অভিজ্ঞতা কমবেশি একই রকম। সৌদি পুরুষদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা। নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে অনেকে। তাই তারা উন্মাদের মতো দেশে ফেরার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছে।

অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, নির্যাতন অসহনীয় হওয়ায় প্রাপ্য পারিশ্রমিক ছাড়াই ওই সব নারী দেশে ফেরার সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সবাই যে সফল হয়েছে তাও নয়। বরং হয়রানিমূলক মামলার শিকার হয়ে অনেকে সে দেশে কারাবন্দিও হয়েছে। হত্যার শিকার বা বাধ্য হয়ে আত্মহত্যাও করেছে কেউ কেউ। এসব ঘটনার সামান্যই গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।

বিস্তারিত বিবরণে না গিয়েও নির্যাতনের যে চিত্রটি বিভিন্নজনের (নিগৃহীতার) ভাষ্যে ফুটে উঠেছে, তাতে তো মনে হয় সৌদি সমাজ ভয়াবহ শ্বাপদসংকুল একটি নৈরাজ্যিক জংলার মতো, বিদেশিদের জন্য, বিশেষত বাংলাদেশি নারীদের জন্য।

নির্যাতিতরা মিথ্যা বলার কথা নয়, বিশেষ করে যাতে রয়েছে তাদের মান-মর্যাদা, ইজ্জত লুণ্ঠনের মতো ঘটনা। তাদের যাওয়া তো স্বপ্নতাড়িত হয়ে, ধর্মীয় ভূখণ্ডে। কী সোনালি ধারণা ছিল সেখানকার মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে। সেসব ধারণা ধুলায় মিশে গেছে। তাদের দুর্ভাবনা, বাকি জীবনটা কিভাবে কাটবে। 

দু-একটি পত্রিকায় যে বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে তা এত ভয়াবহ ও জঘন্য যে আমরা সেসব উদ্ধৃতি করতে চাই না। একটির শিরোনাম ‘মধ্যপ্রাচ্যফেরত নির্যাতিত নারীদের করুণ আর্তি’। মন্ত্রণালয় নির্বিকার। আগেই বলেছি, দুর্বোধ্য কারণে এ নির্যাতন নিয়ে সংবাদপত্রে খবর পরিবেশন ও লেখালেখি অপেক্ষাকৃত কম। পূর্বোক্ত সম্পাদকীয়টির শিরোনাম ‘সৌদিতে নারী কর্মী নির্যাতন’/‘সরকারের তৎপরতা জরুরি’।

এই স্বল্পতার বা নমনীয়তার কারণ কি দেশটি সৌদি আরব বলে? যেখানে চুরির শাস্তি হাত কেটে ফেলা, প্রেমের শাস্তি শিরশ্ছেদ, হোন না তিনি রাজকুমারী তথা শাহজাদি, সেই দেশেই কি না শত শত অনাচারী পুরুষ বিদেশি গৃহকর্মীর ওপর দিনের পর দিন যৌন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, সমাজ ফিরে দেখছে না, প্রশাসন খবরও রাখে না।

অবস্থাদৃষ্টে আমাদের দাবি, এমন দেশে আমাদের সরল, অসহায় গ্রামীণ নারীদের কর্মী হিসেবে পাঠানো বন্ধ হোক। এমন আইন করা হোক, যাতে কোনো নারী কর্মী না জেনে-শুনেও সেখানে যেতে না পারে। একই সঙ্গে যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা তদন্ত দাবি করা হোক সৌদি সরকারের কাছে, যাতে অপরাধী সৌদি পুরুষ চরম শাস্তি পায়। (কালের কণ্ঠ)

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

এই বিভাগের আরো সংবাদ