বিএনপির আম ও ছালা দুটিই কি গেল?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ জুন ২০১৮, ১৪:১৪

আবদুল মান্নান, ২০ জুন, এবিনিউজ : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পর মুহূর্তে এ দেশের পাকিস্তানি দোসররা হয় দেশ ছেড়েছিল অথবা গলা কাটা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। অনেকে মওলানা ভাসানীর ন্যাপের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল। পরবর্তীকালে জাসদের জন্ম হলে অনেকে জাসদে যোগদান করে। তখন থেকেই দেশে আওয়ামী লীগবিরোধী একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্ম হয়। বঙ্গবন্ধু তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত। অনাবৃষ্টি, বন্যা আর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দিলে আওয়ামী লীগবিরোধীরা দেয়ালে চিকা মারে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম জয় বাংলার অপর নাম’। আওয়ামী লীগবিরোধীদের একটি বড় অংশ তখন থেকেই তাদের রাজনীতির প্রধান উপজীব্য করে ফেলে ভারত বিরোধিতা। বলে, ভারত যদি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে সহায়তা না করত, তাহলে তাদের সাধের পাকিস্তান ভাঙত না, আর তাদের এই কষ্টের মধ্যে পড়তে হতো না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে এসব আওয়ামী লীগবিরোধীদের কাছে টেনে নেন এবং তাঁদের নিয়েই পরবর্তীকালে বিএনপি গঠন করেন। বিএনপি শুরু থেকেই একটি পাকিস্তানি ভাবধারার দল হিসেবে গড়ে ওঠে। অনেকটা বংলাদেশের মুসলিম লীগ। শুরু করে সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে পাকিস্তানি ভাবধারাকে তুলে ধরার সংশোধনীগুলো এনে। সে থেকেই বিএনপির প্রধান মূলধন পাকিস্তানপ্রীতি আর ভারত বিরোধিতা। জিয়া থেকে শুরু করে এরশাদ—সবাই সেই ভাবধারাকে উত্তরোত্তর ওপরের দিকে নিয়ে গেছেন এবং দলটির অনেক নেতার বিশ্বাস, এমন চিন্তাধারা বাদ দিলে তাঁদের রাজনীতির তো আর কিছুই থাকে না। এই বিশ্বাসে পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে একাধিক প্রজন্মও বেড়ে ওঠে এবং যেহেতু তারা একাত্তরের ভয়াবহতা দেখেনি, সেহেতু বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুসহ যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতৃত্বের গুরুত্ব তেমন একটা অনুধাবন করতে পারেনি। বিএনপি বা জিয়ার অনুসারীদের এই কাজটি করতে আরো বেশি সুবিধা হয়। কারণ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর দীর্ঘদিন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগবিরোধীদের সামনে রোল মডেল হয়ে ওঠে সাফারি স্যুট আর সানগ্লাস পরিহিত জেনারেল জিয়া, আর ফ্যাশন সচেতন তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া।

এই প্রেক্ষাপটেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু-পরবর্তীকালে বাংলাদেশে ফিরে আসে পাকিস্তানি সংস্কৃতি আর বাংলাদেশ হয়ে উঠে পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের চারণভূমি। আইএসআই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনকে অর্থ ও অস্ত্র জোগান দিয়ে সহায়তা করতে শুরু করে। আইএসআইয়ের জন্য ১৯৯১ সালের বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। সেই নির্বাচনে যেকোনো উপায়ে বিএনপিকে জিতিয়ে আনতেই হবে। পাকিস্তান বিপুল পরিমাণ অর্থ সেই সময় বিএনপির পেছনে ব্যয় করে, যা সেই সময়কালের আইএসআইপ্রধান জেনারেল আসাদ দুররানি ২০১২ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া এক জবাবন্দিতে স্বীকার করেন। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির বিজয় লাভ ছিল পাকিস্তান তথা আইএসআইয়ের জন্য একটি বিরাট পাওয়া। বাংলাদেশে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তারা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিএনপির ভারত বিরোধিতা আরো বেড়ে যায় এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক আরো বৈরী হয়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস চরম আকার ধারণ করে। এর খেসারত দিতে হয় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কারণে। আইএসআইয়ের বেপরোয়া তত্পরতার কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো হয়ে ওঠে অশান্ত। একই সঙ্গে রক্ত ঝরতে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে।

১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া বলে বেড়াতে শুরু করলেন আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করলে বাংলাদেশের সব মসজিদে আজানের বদলে উলুধ্বনি শোনা যাবে। তৎকালীন বিএনপি নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী টিভির এক অনুষ্ঠানে এক হাতে গীতা আর অন্য হাতে কোরআন নিয়ে বললেন, বাংলাদেশের মানুষকে ঠিক করতে হবে তারা কি গীতার (ভারত) নাকি কোরআনের পক্ষে (বিএনপি) থাকবে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় লাভ ও শেখ হাসিনার সরকার গঠন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট। সে সময় থেকে বাংলাদেশ আবার একাত্তরের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি আর পার্বত্য শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, এই চুক্তি স্বাক্ষর হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে খুব দ্রুতগতিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আবার অবনতি হতে থাকে। এই সময় বাংলাদেশ হয়ে উঠে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীদের কাছে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুট এবং এতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পায় অস্ত্র চোরাচালানি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। ভারতে চোরাচালানের সময় ২০০২ সালে বগুড়ার কাহালুতে কয়েক হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। চট্টগ্রামে ধরা পড়ে দশ ট্রাক অত্যাধুনিক অস্ত্র। শুধু উপমহাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এই ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গোচরে আনলে তিনি তাঁদের এ বিষয়ে মাথা ঘামাতে নিষেধ করেন। বলেন, এই সম্পর্কে তিনি অবহিত। সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোকে নৈতিক সহায়তা দেওয়া বাংলাদেশের কর্তব্য, যেমন করে ভারত একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের সহায়তা করেছিল। তিনি মুক্তিযোদ্ধা আর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এক কাতারে নিয়ে এসেছিলেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এলে খালেদা জিয়া তাঁর সঙ্গে এক পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎকার বাতিল করেন। কারণ ওই দিন তাঁদের মিত্র জামায়াত ঢাকায় হরতাল ডেকেছিল। এটি ছিল চরম শিষ্টাচারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত। এই সময় শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায়। বিএনপি-জামায়াত জোট তখন তথাকথিত অসাংবিধানিক দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে দেশে ভয়াবহ পেট্রলবোমা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল।

বিএনপির জন্মটা যেহেতু সঠিক অর্থে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক দলের আদলে হয়নি, তারা কখনো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিজের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দ্বারস্থ হয়েছে বেশির ভাগ সময় পাকিস্তানের আইএসআইয়ের ওপর, আর কখনো বা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএর ওপর। বিএনপির জন্মই হয়েছে জিয়া সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময়। বঙ্গবন্ধু হত্যা, জিয়ার ক্ষমতা দখল, জিয়া-পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আরোহণ—সব কিছুতেই এই দুটি সংস্থার নিবিড় সহায়তা স্পষ্ট। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দুর্বৃত্তপনার কারণে বিএনপির সঙ্গে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেকটা শীতল। তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ। পাকিস্তানের আইএসআই এই মুহূর্তে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির চেয়ারম্যান ও এককালের ক্রিকেট তারকা ইমরান খানকে আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে জিতিয়ে এনে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বানাতে ব্যস্ত। এ কাজটি করার জন্য পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, আর সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের নাগিরকত্ব বাতিল করা হয়েছে। ইমরান খান এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নতুন মুরগি। পূর্বের ধারাবাহিকতায় ইমরান সেনাবাহিনীর হাতে কখন জবাই হবেন, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে খালেদা জিয়া তাঁর সর্বশেষ লন্ডন সফরের সময় আইএসআইয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন, যা এর আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তারেক রহমানের সঙ্গে এই কর্মকর্তাদের সম্পর্ক সব সময় ঘনিষ্ঠ। এটি এখন বাস্তব যে বর্তমানে বিএনপি অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। খালেদা জিয়া কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আদালতে দণ্ডিত হয়ে আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না করাটা ছিল তাদের আত্মঘাতী ভুল। সামনের সংসদ নির্বাচন তাদের জন্য শেষ সুযোগ বলে ধরে নেওয়া যায়। তারপর মুসলিম লীগের ভাগ্য বরণ করতে হবে। যেকোনো কারণেই হোক তাদের ধারণা হয়েছে, ভারত তাদের সহায়তা করলে তাদের পক্ষে আবার ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হবে।

বিএনপি ও তাদের সহযোগী ‘সুশীল’ গোষ্ঠীর জানা থাকা উচিত, ভারত অথবা যেকোনো দেশের একটি নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি থাকে এবং সেই পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য থাকে নিজ দেশের জাতীয় নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক স্বার্থ। আর কোনো দেশ অন্য আরেকটি দেশের কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ষাটের দশকের শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ আর সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই কাজটি করত। বর্তমানের বিশ্বায়নের কালে এটি তেমন একটা সম্ভব নয়। একটি দলকে ক্ষমতায় আসতে হলে নিজের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে আর জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন যোগ্য নেতৃত্বের। যেটি এই মুহূর্তে বিএনপির নেই। যদিও ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির রাজনৈতিক পুঁজি ছিল ভারত বিরোধিতা, তারা এখন দিল্লির দ্বারস্থ হয়েছে সামনের নির্বাচনে তাদের পক্ষে রাখার জন্য। প্রয়োজনে ভারত যা চাইবে তা-ই তারা দিতে প্রস্তুত। এই মিশন নিয়ে গত ৭ জুন বিএনপির তিন নেতা দিল্লি তীর্থে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল আওয়াল মিন্টু, আমির খসরু চৌধুরী আর লন্ডন থেকে উড়ে আসা তারেক রহমানের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির। তাঁদের মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। দলের নাম ভাঙিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করেছেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এই আশায়, তিনি ঢাকার মেয়র হবেন। কয়েক মাস আগে বিশ্ব-কাঁপানো পানামা পেপারসে তাঁর ও পরিবারের নাম এসেছে এবং বলা হয়েছে, তাঁরা নাকি বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণের অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। এই তিনজন তারেক রহমানের নির্দেশে দিল্লি সফরে গিয়েছেন ভারতের বিজেপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বোঝাতে, তাঁদের এবার সুযোগ দিলে তাঁরা প্রমাণ করে ছাড়বেন তাঁরা ভারতের কত বড় মিত্র, আর ভারত যা চাইবে তা-ই তাঁরা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তাঁদের দুর্ভাগ্য, দিল্লিতে তাঁরা তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি। দেখা পাননি শীর্ষ পর্যায়ের কোনো বিজেপি নেতার। কথা ছিল বিজেপির সভাপতি অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠক হবে। কিন্তু তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে দেখা না করলে তাঁর একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা অনির্বাণ গাঙ্গুলির সঙ্গে তিন নেতাকে কথা বলে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তাঁদের সঙ্গে আরো দু-একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়। সবাই এক সুরে বলেন, আগে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ুন, তারপর দেখা যাবে কী হয়। অনেকটা বিফল হয়ে প্রথম দুই নেতা দেশে ফিরেন আর হুমায়ূন কবির লন্ডন ফিরে যান।

প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিএনপি জন্মলগ্ন থেকে ভারত বিরোধিতাকে পুঁজি করে তাদের রাজনীতি করেছে, যে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি হয় এমন সব কাজে মদদ দিয়েছে, তাদের কেন ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দল, বিজেপি হোক বা কংগ্রেস ক্ষমতায় যেতে সহায়তা করবে? শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের সব বিচ্ছিন্নতাবাদীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। উলফার শীর্ষ নেতা অনুপ চেটিয়া আর অরবিন্দ রাজখোওয়াকে আটক করে ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে। তাঁরা বিএনপির সময়কালে বাংলাদেশে আশ্রয় পেয়েছিলেন। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মালামাল পরিবহনের জন্য সেই দেশকে যথেষ্ট সহায়তা দিয়ে থাকে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক উন্নত।

রমজানের আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফরে গেলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিজভী আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁদের নিত্যদিনের বৈঠকি আড্ডায় এই সফরের তুমুল সমালোচনা করেছিলেন। বিএনপির এই তিন নেতার দিল্লি তীর্থ নিয়ে এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এটি নিশ্চিত যে বিএনপি নেতাকর্মীরা যাঁরা উঠতে-বসতে আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল বলে গালাগাল করেন, বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ ভারতের করদরাজ্য হয়, এখন তাঁরা কী বলবেন সেই উত্তর তাঁদের জানা নেই। আর দলের একমাত্র পুঁজি যে ভারত বিরোধিতা, সেটি যখন তারেক রহমানের নির্দেশে দিল্লিতে দলের তিন নেতা খুইয়ে এসেছেন, তাঁরা আগামী দিনে কী নিয়ে আর রাজনীতি করবেন? কী দুঃখে ভারত আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপির মতো একটি চরম হঠকারী আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মদদদাতা দলকে বাংলাদেশে ক্ষমতায় দেখতে চাইবে। প্রশ্ন, বিএনপি আম আর ছালা দুটিই কি হারাল? (কালের কণ্ঠ থেকে সংগৃহীত)

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ