সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রাসঙ্গিকতায়  দেবী দুর্গা

  সুভাষ সিংহ রায়

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

লক্ষ লক্ষ বছর আগেকার কথা। তখন বিজ্ঞানের উন্নত প্রযুক্তি তো দূরের কথা; মনের ভাব লিখে প্রকাশ করার মতো কাগজ কলমও ছিল না। মুনি ঋষিরা মুখে মুখে তত্ত্ব আলোচনা করতেন এবং অন্যরা শুনে শুনে তা রপ্ত করতেন। কঠিন বিষয় হলে পাহাড়ে-গুহাগাত্রে ছবি এঁকে বা খোদাই করে সমাজ জীবনে চলার পথ-নির্দেশ দেওয়া হত। এরকমই একটি চিত্র ধরা যাক ‘দুর্গতিনাশিনী দুর্গাদেবী’। তিনি মামুলি দেবী প্রতিমা নয়। এ যেন তখনকার দিনের রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর একটি নকশা বা প্ল্যান। বর্তমানে যাকে আমরা সংবিধান বলি। যে সংবিধানের ধারা অনুসরণ করে দেশের মানুষ, সরকার, দপ্তর, আইন-আদালত নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে। যদি ব্যাখ্যাটা এরকম হয়- দুর্গাদেবীর এই প্ল্যান বা নকশায় মুনি-ঋষিরা কী বোঝাতে চেয়েছেন? ভাবনাটা এভাবে করলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে।

একটা দেশকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তথা সরকার পরিচালনা ও সুশাসনের জন্য মূলত ৫টি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হয়। তা হল ১) জনগণ, ২) জনগণের প্রতিনিধি, ৩) শিক্ষা ৪) অর্থ ও ৫) প্রতিরক্ষা। এই পাঁচটি বিষয়ের উপর ব্যাখ্যা দুর্গাদেবীর নকশায় নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত আছে।

প্রথম ধাপ : দুর্গার দশ হাত জনগণের প্রতীক। দশজন বলতে আমরা আম জনতাকে বোঝাই। দশ হাতে দশ অস্ত্র- অর্থাৎ জনগণ নিজেদের দেশমাতৃকাকে রক্ষাকল্পে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করবে অসুরের বিরুদ্ধে। অসুর বলতে আলাদা কোনও জাতের শক্তিশালী প্রাণী বা মানুষ নয়। এই সমাজে প্রচুর অসুর বাস করছে- যাদের মধ্যে মানবতা, বিবেক-বিবেচনা নেই। যেমন: কালোবাজারি তারা করে, মজুতদার, শোষক, তোলাবাজ, ঘুষখোর প্রমুখ; যারা জনগণের অর্থ কালো পথে লুঠ করে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি সুদূর প্রসারী করেছে বা করছে তারাই অসুর। এদের বিনাশ করার জন্য দুর্গার দশ হাতের মতো ঐক্যবদ্ধ জনজাগরণ ও লড়াই একান্ত অপরিহার্য।

দ্বিতীয় ধাপ- জনগণের প্রতিনিধি- গণদেবতা অর্থাৎ গণেশ। তাঁর মূল লক্ষ্য হল জনগণকে একসুরে আবদ্ধ রাখা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, সমাজের কল্যাণে জনগণের ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতার বিশেষ প্রয়োজন। সে কারণেই গণেশের মস্তকে একটা শুঁড় (সুর) সন্নিবেশিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের অভাব-অভিযোগ, দাবি ইত্যাদির কথা গণেশকে শুনতে হবে। আমাদের কানে এত মানুষের কথা বাজলে কান ঝালাপালা করবে, বিরক্তি ও অধৈর্য আসবে। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হলে সবার কথা ধৈর্য সহকারে শুনতে হবে। তার জন্য গণেশের কান দুটো কুুলোর  মতো বিশাল। কথা শোনার ধৈর্য না থাকলে মনের উদারতা বা প্রসারতা জন্মায় না। গণেশ জনগণের কথা এক কানে শুনে আরেক কানে বের করে দিতে পারেন না। পেটে কথা জমা রাখার ফলে তাঁর পেট বা উদর ঝুলে পড়ার উপক্রম হয়েছে-ওটা ভুঁড়ি বাড়া নয়। তাই তাঁর আরেক নাম লম্বোদর।

গণেশের কাজে সহযোগিতার জন্য তাঁর বাহন করা হয়েছে ইঁদুরকে। কাজ হল গৃহস্থের অতিরিক্ত শস্য বা ধন সংগ্রহ করা। যে জমিতে ভালো শস্য হয় সেখানেই ইঁদুর লাগে এবং কিছু ফসল কেটে মাটির নীচে জমা রাখে। একশ্রেণির গরিব মানুষ সেই গর্ত খুঁড়ে ওই ফসল নিয়ে যায়। অতিরিক্ত শস্য গরিবের কল্যাণে ব্যয়িত হল। বর্তমান রাষ্ট্র-সমাজে আয়কর বিভাগ ( জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ) এর  প্রতীক হল ইঁদুর। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আয়কর হিসাবে সরকারের কোষাগারে  জমা করা এবং সমাজের কল্যাণে ব্যয় করা দরকার আয়কর এবং অর্থ দপ্তরের মাধ্যমে।

তৃতীয় ধাপ- শিক্ষা। রাষ্ট্র পরিচালনায় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের সমস্ত লোকের আদর্শ শিক্ষার প্রয়োজন আছে বইকি। অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে বিকশিত করেন বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী শিক্ষার আলো না থাকলে জনগণ ভালো মন্দ, সত্য মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বুঝবে কী করে। এখনকার শিক্ষাদপ্তর, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সূচির, শিক্ষক সমাজ সরস্বতীর ভূমিকায় আছেন। পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে সংগীত-কলা যাবতীয় শিক্ষায় প্রয়োজন। সেই কারণে সরস্বতীর মূর্তি ‘বীণা পুস্তক রঞ্জিত হস্ত’ সমন্বিত। আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত হলে মানুষ সরল, শান্ত, সৌমাকান্তি বিশিষ্ট হবে। সমস্ত মানুষ সদগুণ বিশিষ্ট হলে দেশে অন্যায়কারী অসৎ লোক থাকবে না। সরস্বতীর শ্বেতবর্ণ তারই প্রতীক। জ্ঞানী ব্যক্তি যত্রতত্র ভ্রমণ করলেও তাঁর অন্তরে বাহিরে নিন্দা-কুৎসা-অপবাদ ইত্যাদির মতো কলঙ্কের কোনও ছাপ পড়ে না। তিনি যেমন  ছিলেন তেমনই থাকেন। ঠিক যেন শ্বেতবর্ণ রাজহংস। হাঁস সারাদিন যতই কাদা ঘাঁটুক বার কয়েক ঠোঁট দিয়ে পালকের উপর ঘর্ষণ করলে তার স্বাভাবিক চেহারা ফিরে পায়। আদর্শ জ্ঞানী-গুণী মানুষ এরকমই হওয়া উচিত।

চতুর্থ ধাপ- অর্থ বা ধন। দুর্গার সঙ্গে আছেন অর্থ বা ধনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী । দেশের কাজ পরিচালনায় প্রতি পদক্ষেপে অর্থের প্রয়োজন আছে। দেশের উন্নয়ন, কর্মচারীদের বেতন, প্রভৃতি খাতে বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। সারাবছরের  আয় ব্যয় হিসাব করে অর্থের জোগান দেয় অর্থদপ্তর। অর্থ সচিব ও অর্থমন্ত্রী। তাঁদের প্রতীক লক্ষ্মী। লক্ষ্মীর বাহন করা হয়েছে পেঁচাকে। পেঁচার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি অন্ধকারেও শিকার ধরতে সহায়ক। কালোবাজারি, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অন্ধকারের মতো কালো পথে কুকর্মগুলি করে থাকে। এসব কাজে কড়া নজরদারি করার জন্য পেঁচার দক্ষ নজরদারির ভূমিকায় আছে অডিটর জেনারেল। অর্থ দপ্তরের বরাদ্দকৃত ঠিকঠাক সদব্যবহার হয় কি না তা দেখার দায়িত্ব তাঁদের।

পঞ্চম ধাপ- প্রতিরক্ষা। দুর্গাকে সহযোগিতা করার জন্য দেব সেনাপতি কার্তিক পাশে আছেন। বাইরের শত্রুর হাত থেকে দুর্গাকে অর্থাৎ দেশমাতাকে রক্ষার জন্য সেনাধ্যক্ষ হিসেবে অস্ত্রশস্ত্র সহ সর্বদা প্রস্তুত। তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশকে রক্ষা করার নিমিত্তে পুলিশ মিলিটারি, নৌ সেনা, বায়ু সেনা ইত্যাদির মতো বাহিনীর দরকার হয়েছে এসবগুলির প্রতীক হলেন কার্তিক। কার্তিকের বাহন ময়ূর। ময়ূরহল সর্বভুক। মারাত্মক মারাত্মক বিষ হজম ক্ষমতা আছে তার। সেরকমই প্রতিরক্ষায় যাঁদের ভূমিকা পালন করতে হয়। তাঁদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ঝুঁকিপূর্ণ। দুঃখ-বেদনা, শোক-তাপ, ভয়-মৃত্যু ইত্যাদিকে জয় করে নিতে হয়, যাতে এসবের মতো মারাত্মক বিষ শরীরে বা মনে প্রবেশ করে নিজেকে দুর্বল না হতে হয়।

দুর্গাদেবীর সঙ্গে যেমন লক্ষ্মী, সরস্বতী , গণেশ ও কার্তিক নিজে নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে দেশ মাতৃকাকে সহযোগিতা করেছেন। তেমনি বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় সকলে সঠিক ভূমিকা পালন করলে দেশে মহিষাসুরের মতো অসুরবিনাশ সম্ভব হবে। তবেই সার্বিক মঙ্গল, সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ