জাতিসংঘে বাংলাদেশের উন্নয়ন আলাপ : ড. আতিউর রহমান

ঢাকা, ১৩ জুন, এবিনিউজ : ১৯৭১ সালে লড়াকু বাঙালির স্বপ্নের এক বিস্ফোরণ ঘটেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের একবুক স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্র্নিমাণে হাত দিয়েছিলাম। মূলত সেই স্বপ্নের ওপর ভর করেই বৈরী বিশ্বপরিবেশ, বাড়ন্ত তেলের দাম, উপর্যুপরি বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, বিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্র্নিমাণ, তীব্র খাদ্যসংকট মোকাবেলা, প্রায় ৮০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের মতো আকাশচুম্বী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র আট বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য। তবু আশা-জাগানিয়া নেতৃত্বের গুণে বঙ্গবন্ধুর সরকার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশকে। হঠাৎ নির্মম ছন্দঃপতন পঁচাত্তরে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৯৬ সালে ফের বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বে আসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। আবার গণমানুষের কল্যাণে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলে এগিয়ে চলে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নানামুখী সামাজিক উন্নয়নধর্মী দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসিক্ত সংবিধানের মৌল রাষ্ট্রনীতির আলোকে নতুন করে স্বপ্নের সিঁড়িতে তুলে আনেন। ২০০১ সালে ফের ছন্দঃপতন।

দীর্ঘ সাত বছর ধরে উল্টো দিকে চলতে থাকে বাংলাদেশ ‘অদ্ভুত এক উটের পিঠে’ চড়ে। ওই সময়ের সংকটাপন্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর বাংলাদেশের দুঃখের কাহিনি সবারই জানা। ২০০৮ সালের শেষ দিকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ২০০৯ সালের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার গঠন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। শুরু হয় নব উদ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অভিযাত্রা। আট বিলিয়ন ডলার সেই অর্থনীতির আকার এখন ২৭২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের বেশি থেকে কমে এখন ১.১ শতাংশ। জীবনের গড় আয়ু বাহাত্তরের ৪৮ বছর থেকে বেড়ে এখন ৭২ বছর।  এই হার ভারতীয়দের চেয়ে ৪ বছর এবং পাকিস্তানিদের চেয়ে ৬ বছর বেশি। নারীর ক্ষমতায়ন সূচকে বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। বলা যায় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বাংলাদেশে এখন সমৃদ্ধি উপচে পড়ছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুশলী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ ‘বুমিং’। উন্নয়নের এই সাফল্যের গল্প বলতেই কয়েক দিন আগে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলাম জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অফিসের আমন্ত্রণে। ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূমিকা’ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করলাম জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সামনে। তাঁরা সবাই বাংলাদেশের অগ্রগতির উপাখ্যান শুনে অভিভূত। জানতে চাইলেন কী করলে এই সাফল্য অন্য দেশেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আমি একই সঙ্গে একজন গবেষক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। তাই গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এর আগেও আমি একই অফিসে গভর্নর হিসেবে বক্তৃতা করেছি। এবারে বলেছি শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে। গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আমন্ত্রণে অবকাঠামো উন্নয়নে টেকসই অর্থায়ন বিষয়ে উঁচু পর্যায়ের এক ‘পলিসি রিট্রিটে’ অংশগ্রহণ করেছিলাম। তারও আগে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ নীতি মঞ্চ ‘ইকোসক’ এবং ইউএনডেসাতে বক্তৃতা করেছি। সর্বদাই বক্তৃতার বিষয় ছিল দ্রুত অগ্রসরমাণ বাংলাদেশ। তাই জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা আমার ভাবনার সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত বলা চলে। এবারের আলোচনাটিও ‘লাইভ স্ট্রিমিং’ হয়েছে। তাই সারা বিশ্বের উৎসাহী জাতিসংঘ কর্মকর্তারা অনলাইনে আমার কথা শুনেছেন। স্বদেশের অবিস্মরণীয় উন্নয়ন অভিযাত্রার সাফল্যের কথা বিশ্ববাসীকে জানানোর যে কী আনন্দ তা বলে বোঝানো যাবে না। গত দুই বছরে আমি সারা দুনিয়ায় ৩০টিরও বেশি বক্তৃতা দিয়েছি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, জাতিসংঘ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারতসহ অনেক দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প বলেছি। বিশেষ করে দূরদর্শী একজন রাষ্ট্রনায়কের দেওয়া ‘পলিসি স্পেসে’ বা নীতি ময়দানে সক্রিয় থেকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কী করে উন্নয়নমুখী তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নে কুশলী এক জনপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছিল, সেই গল্প বলতে আমি খুবই উৎসাহ বোধ করেছি। প্রথাগত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ বজায় রেখেও কী করে পুরো আর্থিক খাতকে মানবিক করা যায় এবং সাধারণের কল্যাণে রূপান্তর করা যায় সেই সব কথাই আমি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বলার চেষ্টা করেছি। এর ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল বিষয়ে বিদেশি শ্রোতাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গেছে। আমার মনে আছে, যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে ‘সেক্রেড হার্ট’ বিশ্ববিদ্যালয়ে মুদ্রানীতি বিষয়ে আমার জনবক্তৃতা শেষে একজন অধ্যাপক বলেছিলেন, ওই অধিবেশনে ফেডের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ করা উচিত ছিল। বাংলাদেশ কী করে বিশ্ব আর্থিক মন্দা মোকাবেলা করেছে সেই অভিজ্ঞতা তাদের জানা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই রকম মন্তব্য শুনেছিলাম জাপানের টোকিওস্থ হিতুতবিশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি’ বিষয়ে বক্তৃতা করার পর। প্রফেসর ইয়োনেকো একই ধরনের অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক অব জাপানের গভর্নর এই অনুষ্ঠানে থাকলে ভালো হতো। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে জাপানের আর্থিক খাতের রেগুলেটরদের অনেক কিছুই শেখার আছে।’

এবারে জাতিসংঘে যে উপস্থাপনাটি করেছি তার মূল কথাগুলো আগে বলে নিই। শুরুতেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নানা দিক নিয়ে আলাপ করা যাক। সবার জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন আসলে আর্থিক গণতন্ত্রায়ণেরই আরেক নাম। এর ফলে মানুষের অধিকারের পরিসর বাড়ে। বাড়ে তার ভালোভাবে বাঁচার জন্য বাছাই করার সক্ষমতা। বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক বিশ্ব আর্থিক মন্দা মোকাবেলার কৌশল হিসেবেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই নীতি গ্রহণ করেছিল। এর সুফলও বাংলাদেশ পেয়েছে। বিশ্বমন্দার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের মানুষ মোটেও অনুভব করেনি। বরং প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতি ছিল খুবই স্থিতিশীল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিবছর বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এই হার সাড়ে সাত শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে আমরা ৮ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করব বলে আশা করছি। এ বছর আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ভারতের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু সম্প্রতি ‘হোয়াই ইজ বাংলাদেশ বুমিং?’ প্রবন্ধে লিখেছেন। আর পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় এক দশক ধরে আড়াই থেকে ৩ শতাংশ বেশি হারে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলেছে। ২০০৭-০৮ সালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশেরও বেশি। ২০১৬-১৭ সালে তা ৫.৩৫ শতাংশে নেমে আসে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ছিল এক হাজার ৬০২ ডলার। এ সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে দ্বিগুণের মতো। রিজার্ভ বেড়েছে পাঁচ গুণের মতো। ভোগ ও বিনিয়োগও বেড়েছে নিয়মিত।

ম্যাক্রো অর্থনীতির এই বিস্ময়কর রূপান্তরের প্রভাব গিয়ে পড়েছে দারিদ্র্য নিরসনের ওপর। ২০০৭ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৬.৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা ২২.৩ শতাংশে নেমেছে। অতিদারিদ্র্যের হারও এই সময়ে ২২.৬ শতাংশ থেকে কমে ১২ শতাংশের মতো হয়েছে। আমরা এখন কর্মরত : শূন্য দারিদ্র্য হার অর্জনের সংগ্রামে লিপ্ত।

এসব সাফল্যের পেছনে আর্থিক খাতের উন্নয়নমুখী ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকার তার বাজেটের মাধ্যমে কৃষি ও রপ্তানি খাতে ভর্তুকি ছাড়াও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। আর বিনিয়োগ বাড়িয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে। হালে শ্রমিক ও সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজেও সরকারি খরচ বাড়ছে। সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলের উৎকর্ষ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বক্ষণ উন্নয়ন ও শাসনকর্ম অবলোকন করতে পারছেন।

সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলকে আরো বেগবান করার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা প্রদানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করেছে। তা ছাড়া সুদ ভর্তুকি চালু করে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মাঝে উদ্ভাবনীমূলক পুনরর্থায়ন প্রক্রিয়া চালু করে। এর ফলে অসংখ্য নয়া উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই কৌশল সরাসরি দারিদ্র্য নিরসন করে মানুষকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বর্তমান ও আগামী দিনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তাদের সক্ষম করতে সাহায্য করে চলেছে। পরোক্ষভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতেও সাহায্য করছে। চর, হাওর, উপকূলসহ দূর-দূরান্তের মানুষ আগে আর্থিক সেবা পেত না। এক কোটির মতো কৃষককে বিনা খরচে দশ টাকার হিসাব খুলে সব ধরনের লেনদেনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুযোগ পেলেই কৃষকবান্ধব এই উদ্যোগের প্রশংসা করে থাকেন। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলোকে গ্রামে শাখা খুলতে বাধ্য করেছে, গ্রামেও এটিএম ব্যবহৃত হচ্ছে, মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে কোটি কোটি মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। এজেন্টরা সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। তাঁরা দু-তিনজনকে চাকরি দিচ্ছেন। সব মিলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আর্থিক লেনদেনের এক নয়া হাওয়া বইছে। তাই  নয়া উদ্যোক্তারা নানা উদ্ভাবনীমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করছেন। নানামুখী আর্থিক সেবা দিয়ে গ্রামবাংলায় যে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে তা অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও মানবিক উন্নয়নে গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গরিবদের সামনে নয়া সুযোগ সৃষ্টি করছে এসব উদ্যোগ। একজন ভিখারিও এখন নিয়মিত মোবাইল ব্যাংকিং করেন এবং প্রতিদিন তাঁর পরিবারের সদস্যকে অর্থ পাঠাতে পারেন। রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টকর্মী, ছোটখাটো ব্যবসায়ী নিয়মিত মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতিময়তা বাড়িয়ে চলেছেন। প্রতিদিন ঢাকা শহর থেকে এক হাজার কোটি টাকা গ্রামে যাচ্ছে এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। সরকার নিজেও ‘মায়ের হাসি’ কর্মসূচির মাধ্যমে কোটিখানেক মাকে সামাজিক নিরাপত্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি অন্যান্য সামাজিক ভাতা মোবাইল ব্যাংকে পাঠানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে সরকার। এ সব কিছুই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সহায়ক। কৌশিক বসু তাই লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার নানা ধরনের তৃণমূলের উদ্যোগকে সহায়তা দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে এ বিষয়টি জানা যাচ্ছে। ২০১৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে ২৭.৮ শতাংশ বয়স্ক মানুষ ডিজিটাল লেনদেন করেছে। আর বাংলাদেশে এই হার ছিল ৩৪.১ শতাংশ। একইভাবে ওই সালে বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবের মাত্র ১০.৪ শতাংশ স্থবির ছিল। ভারতে এই হার ছিল ৪৮ শতাংশ।’ একই প্রবন্ধে অধ্যাপক বসু বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে গার্মেন্ট খাতের উন্নয়নে তাদের অবদান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি সরকারি বাজেট, সমাজে ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা নিবারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় ভূমিকার কারণে কাঙ্ক্ষিত সামাজিক উন্নয়নের কথাও বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।

সাদা চোখেও বাংলাদেশের সামাজিক পিরামিডের নিচের দিকের মানুষগুলোর দ্রুত সক্ষমতা অর্জনের চিত্র চোখে পড়ে। আর এই সক্ষমতা তৈরিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালের পর থেকেই বেশ কিছু যুগান্তকারী সংস্কারের নীতি গ্রহণ করে। সেগুলোর মধ্যে ছিল কৃষি, এসএমই, টেকসই অর্থায়ন ও সিএসআর, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নামের নতুন নতুন ডিপার্টমেন্ট চালু করা; গ্রামে শাখা না খুললে বাইরে শাখা খোলার অনুমতি না দেওয়া; ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে কৃষিঋণ বিতরণে ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া; রেমিট্যান্স বিতরণেও ব্যাংক ও এনজিওর মধ্যে অংশীদারি গড়ে তোলা, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনুরূপ অশীদারি গড়ে তোলা; স্কুল ব্যাংকিং চালু করা; গরিব-দুঃখী মানুষের সন্তানদের শিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদান; নারী উদ্যোক্তাকে ঋণ ও সিএসআর সমর্থন দেওয়া; আর্থিক লেনদেন গতিময় করার জন্য ব্যাপক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার; ই-কমার্স ও ই-পেমেন্ট প্রসারিত করা; আংশিক পে-পল চালু করা; আউটসোর্সিং ব্যবসার সুযোগ বাড়ানো; গ্রাহকদের স্বার্থ দেখার জন্য হটলাইন চালু করা; আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ভালো করলে ব্যাংকগুলোর তত্ত্বাবধায়ন রেটিংয়ে বেশি নম্বর দেওয়া; সবুজ পুনরর্থায়নের জন্য নয়া তহবিল সৃষ্টি করা; বর্গাচাষিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বছরে ৬০০ কোটি টাকার পুনরর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা; মসলা ও গাভি চাষে সুদ-ভর্তুকি চালু করা; যাঁরা ব্যাংকে যেতে পারেন না তাঁদের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করাসহ নানামুখী অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ড প্রসারিত করতে ব্যাংকগুলোকে ‘মোটিভেট’ করা। এসবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর পড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের মানবিক উন্নয়নে আরো উৎসাহী করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, জেন্ডার সংবেদনশীলতা নীতিমালা গ্রহণ, ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনসহ নানামুখী নীতিমালা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্ভাবনীমূলক এসব কর্মসূচি থেকে সরে আসবে না। কেননা সারা বিশ্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্ভাবনীমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে থাকে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক এসব নীতিমালা চালু করার ফলে বাংলাদেশে মানব উন্নয়নে ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। এমডিজি পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য ছিল উল্লেখ করার মতো। সেই ধারা এসডিজি পূরণেও যেন বজায় থাকে, সে জন্য বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ব্যক্তি খাত, এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠানসহ সবাইকেই এসডিজি বাস্তবায়ন ও মনিটরিংকাজে সংযুক্ত করার দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। কাউকে পেছনে না ফেলে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এই নীতিগত আমাদের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী সর্বদাই একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এর প্রভাব প্রশাসন ও সমাজে সর্বত্রই পড়েছে। কেন্দ্র ও মাঠ পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়ন কর্মকাণ্ড সমন্বয়েরও নানা উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

এত কিছু সম্ভব হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের কারণে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের যে ৩০টি দেশ বছরে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে তার একটির নাম বাংলাদেশ। আর এই প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীলতার বিচারে বাংলাদেশ ছিল এই ৩০টি দেশের মধ্যে তৃতীয়। ভারত ও চীনের চেয়েও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল বেশি স্থিতিশীল। রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের সূচকেও এই ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম পাঁচটির মধ্যে। চীন, কম্বোডিয়ার পরই বাংলাদেশের অবস্থান (মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প পণ্য)। ভারত ও ভিয়েতনাম এ সূচকে অনেকটাই পেছনে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৯.৫ শতাংশ। চীনে ছিল ১৩ শতাংশ আর ভারতে ১৮.৫ শতাংশ। আর এই তরুণ সংখ্যা বাংলাদেশে এখনো বাড়ছে, অন্যান্য দেশে কমছে। তাই এদের যদি উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা দিয়ে উপযুক্ত মানবপুঁজিতে পরিণত করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের জনসংখ্যা থেকে লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ রয়েই যাবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের রয়েছে ‘ডেনসিটি ডিভিডেন্ড’। এত অল্প জায়গায় এত মানুষের বাস। ফলে মানুষে মানুষে যোগাযোগ খুবই গভীর। উপযুক্ত অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে পারলে পুরো দেশটাই একযোগে উন্নততর হয়ে উঠবে। আমরা এখন বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়নে হাত দিয়েছি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। এখন প্রয়োজন বাড়তি অর্থের। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে আমরা যদি আমাদের উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ এই শতাব্দীর এক বিস্ময়কর উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। তবে একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে পারলে এবং বড় বড় প্রকল্পের ব্যয় গুণমানের করতে পারলে আমাদের এই উন্নয়ন অভিযাত্রা নিশ্চয় টেকসই করা সম্ভব হবে। এত প্রতিকূলতা কাটিয়ে এত দ্রুত বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে যে তা সত্যি বিশ্বের বিস্ময়। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে সমাজের ভেতরে ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা কিছুতেই দানা বাঁধতে দেওয়া যাবে না, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে এবং স্বচ্ছ ও ন্যায্য শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।

আমাদের সুদৃঢ় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, একাত্তরের লড়াকু মন এবং উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভরসা রেখে এগোতে পারলে নিশ্চয়ই ২০৪১ সাল নাগাদ আমরা উন্নত বাংলাদেশ অর্জন করতে পারব। এবারে জাতিসংঘ ছাড়াও নিউ ইয়র্কে আরো দুটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছি। স্বদেশের উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে কথা বলার সময় রবীন্দ্রনাথের আশাবাদী কথাগুলো বারবার উচ্চারণ করেছি। তিনি লিখেছেন, ‘আশা করিবার ক্ষেত্র বড়ো হইলেই মানুষের শক্তিও বড়ো হইয়া বাড়িয়া ওঠে। শক্তি তখন স্পষ্ট করিয়া পথ দেখিতে পায় এবং জোর করিয়া পা ফেলিয়া চলে। কোনো সমাজের সকলের চেয়ে বড়ো জিনিস যাহা মানুষকে দিতে পারে, তাহা সকলের চেয়ে বড়ো আশা।’ (রবীন্দ্রনাথ, ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’, রবীন্দ্ররচনাবলী, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ. ৬৯৯)।

এই আশা করার বিষয়টিই একটি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় কথা। আসুন, আমরা সেই বড় আশায় বুক বেঁধে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করি। (কালের কণ্ঠ)

লেখক : অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]