কোটা : প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও মুক্তিযোদ্ধার সম্মান

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ মে ২০১৮, ১৭:৪৫

তপন চক্রবর্তী, ০৮ মে, এবিনিউজ : আমার বয়স ৭৭। বাংলাদেশের গড় আয়ু হিসাবে আমি অতিরিক্ত ছয় বছর পরমায়ু পেয়েছি। সুস্থ দেহে আমার জীবনের ইতি ঘটুক আমি চেয়েছিলাম। আমি পূর্বে লেখালেখির জন্য আলাওল সাহিত্য পুরস্কার সহ আরো বেশ কয়টি পুরস্কার অর্জন করেছিলাম। বেশিদিন বাঁচাতে জীবন–সায়াহ্নে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার সহ বহু পুরস্কার লাভের আনন্দ উপভোগ করতে পেরেছি। সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিশাল সমুদ্রে লেখনীর মাধ্যমে আরো দু ’এক ফোঁটা জল মিশাতে পেরেছি। নিসর্গবিদ প্রয়াত দ্বিজেন শর্মা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আশি বছরেরও অধিক বেঁচেছিলেন বলে তিনি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হতে পেরেছিলেন।

আমি এই দেশের সামাজিক–অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্থান–পতন দেখেছি। তাতে কোনো সময় বিষাদে মন ভরে ওঠেছে, আবার কখনো মন আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেছে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শন ও কোটা বিষয়ক বাস্তবানুগ ঘোষণা আমার দেখা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে এক অনন্য ও বিরল ঘটনা বলে মনে হয়েছে। মৃত্যু হলে আমি এই অপূর্ব, বিজ্ঞ, সাহসী ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেখে যেতে পারতাম না।

আমার এই অপরিপক্ব রচনা ও বক্তব্য কারো মনে যদি আঘাতের কারণ হয়, আমি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি।

১৯৭১ সালে, এদেশের জনগণের নয়নের মণি, স্বাধীনতার কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এবারের সংগ্রাম ‘মুক্তির সংগ্রাম’ ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণার পর পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের আক্রমণ, নির্যাতনের মুখে প্রায় এক কোটি লোককে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তাঁরা অবর্ণনীয় কষ্ট সয়েছেন। অনেকে স্বজনহারা হয়েছেন। বিশাল মানববোঝা ভারতের ঘাড়ে পড়ায় ভারত বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন এবং বিশ্বের বহু দেশের সক্রিয় সমর্থন আদায়ে সমর্থ হয়েছিলেন। এই বিবেচনায় এই এক কোটি মানুষও পরোক্ষ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নিজেদের দাবি করতে পারেন।

এরপর এদেশের সংগ্রামী জনতা ও আমাদের অকুতোভয় সূর্যসন্তানদের জীবন বাজি রেখে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইতিহাস তো আপনাদের সকলের জানা। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ , দেশের বাইরে ও ভিতরে সংগ্রাম করেছিলেন, তখন তাঁদের মনে কি জাগতিক লাভালাভের কোনো প্রত্যাশা ছিল? না, আমার তা মনে হয় না।

ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যাঁরা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেছিলেন, কারাবরণ করেছিলেন, তাঁরা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত বা পাকিস্তানে কোথাও কিছু প্রাপ্তির জন্য বা চাকরিতে কোটার জন্য আন্দোলন করেছিলেন? ভারতের সংবিধানের অন্যতম বৃহৎ স্তম্ভ বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর, সংবিধানে পিছিয়ে থাকা মানুষ, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী প্রমুখের জন্য কোটা পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য নয়। ভারত সরকার স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্বীকৃতি, ভাতা প্রদান, অসুস্থতায় সাহায্যদান ও অন্যান্য নানাবিধ সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। এখনো তা অব্যাহত রেখেছেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারাও যৌক্তিক কারণে বাংলাদেশের সংবিধানেও মুক্তিযোদ্ধা বা অন্যদের জন্য কোটার সংস্থান রাখেননি।

মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অনন্য সম্পদ। তাঁরা আমাদের মাথার মুকুট। দেশের বিবেকবান মানুষ ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও স্বার্থরক্ষায় সোচ্চার হবেন । জীবিত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা প্রশংসাপত্র প্রাপ্তদের সন্তান–সন্ততিকে কোটা সংরক্ষণের জন্য রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে ও মানববন্ধন রচনা করতে হবে কেনো! এটি কি তাঁদের জন্য শোভন ও সম্মানজনক!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে, যুক্তির আলোকে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। তিনি অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা, পিছিয়ে থাকা মানুষ ও অশক্ত মানুষদের জন্য ব্যবস্থা করবেন। তিনি রাজধর্ম পালনের স্বার্থেই তা করবেন বলে প্রত্যাশা।

এবার আমি নিচে আমার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশংসাপত্র নেওয়া–না নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধি একজন বড় মাপের বামপন্থী নেতার মুক্তিযোদ্ধার সম্মান প্রাপ্তি এবং দুজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও সুবিধাবাদীর দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আমি আমার বৃদ্ধ মা–বাবা ও আত্মীয়–স্বজন নিয়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হই। বাবা–মা‘র শরীরের অবস্থা ক্যাম্পে থাকার উপযুক্ত নয়। আমরা যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেই অঞ্চল রেশনিং এরিয়ার বাইরে। অগত্যা সকলের গ্রাসাচ্ছনের জন্য আমাকে চাকরি খুঁজতে হয়।

আমি চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যাপক ছিলাম মর্মে চট্টগ্রামের মাননীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত আখতারুজ্জামান বাবুর কাছ থেকে প্রমাণপত্র যোগাড় করে পশ্চিমবঙ্গের এক কলেজের সাময়িক চাকরিতে যোগ দেই। এরপর যখন যেখানে সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালাই। মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ফিরি। কিন্তু আমি মুক্তিযোদ্ধা প্রশংসাপত্র নেইনি, কারণ, আমি তো যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম না। প্রশংসাপত্র নিলে কলেজে ও বাংলা একাডেমির চাকরিতে দুই বছরের জ্যেষ্ঠতা ও দুটি বর্ধিত বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি, প্রমোশন ইত্যাদি ভোগ করতে পারতাম। মুক্তিযোদ্ধা–ভাতা পেতাম এবং অন্যান্য সুযোগ–সুবিধা আদায় করতে পারতাম। কিন্তু আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশংসাপত্র নেওয়াকে অনৈতিক কাজ বিবেচনা করেছি। আমি আজো আমার সিদ্ধান্ত সঠিক মনে করি।

ভাবতে আমার বড় কষ্ট হয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের পর এক শ্রেণির বামপন্থী মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলেছিলেন এবং পরোক্ষ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। তাঁদেরই এক বড় মাপের নেতাকে বিএনপি সরকার, নেতার মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছিল। তিনি আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মানুষ। তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। মৃত ব্যক্তি তো জানতে পারেননি যে, তাঁকে নিয়ে প্রহসন করা হচ্ছে। কিন্তু এতে তাঁর পরমাত্মীয়দের গর্ব ও সন্তুষ্টি দেখে আমি বিস্ময়–বিপন্ন বোধ করেছি।

আমারই এক নিকট আত্মীয় ভারতে যাননি, দেশের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। দেশ স্বাধীন হলে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশংসাপত্র যোগাড় করেন। মুক্তিযুদ্ধের কোটায় তাঁর সন্তান–সন্ততির চাকরির সংস্থান করেন এবং নিজে মুক্তিযোদ্ধা–ভাতা ভোগ করেন। তিনি প্রয়াত। এখন তাঁর স্ত্রী মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে ভাতা ভোগ করছেন।

আমার রক্তের সম্পর্কের এক পরমাত্মীয়া সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর, নানাভাবে মিথ্যার জাল পেতে নিজেকে বীরাঙ্গনা প্রমাণ করে সরকারি অনুদান লাভের জন্য হন্যে হয়ে ওঠে। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে এই বিষয়ে জানতে চাইলে আমি তাঁকে জানাই যে, এটি বানোয়াট ও নির্জলা মিথ্যা ঘটনা। তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন,“ আপনি কি আপনার ও আপনার পরিবারের সম্মানের প্রশ্নে বিষয়টিকে অস্বীকার করছেন?” আমার উত্তর ছিল, নিশ্চিতভাবেই না। বরং আমার পরমাত্মীয় যদি সত্যিই বীরাঙ্গনা হত তার জন্য গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠতো।” আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও বিষয়টির প্রতি নজর রাখার জন্য মৌখিক অনুরোধ জানিয়েছিলাম। জানি না, এরপরও আত্মীয়া তার এই অপকর্মে কামিয়াব হয়েছে কি না। আমি তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি।

বলা বাহুল্য যে, সঠিকভাবে খুঁজতে গেলে এরকম অসংখ্য উদাহরণ পাবেন বলে আমার বিশ্বাস। বাংলা একাডেমি বিশ শতকের আটের দশক থেকে মুক্তি যুদ্ধকালীন নানা জনের উপর নানা অত্যাচার, নির্যাতন ও মৃত্যু ইত্যাদি নিয়ে খণ্ডে খণ্ডে বই প্রকাশ করেছে। সম্পাদনা করেছিলেন সহকর্মী, বন্ধু, একুশে পদক–প্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক জনাব রশীদ হায়দার। আমি তাঁকে বলেছিলাম এ সকল কাহিনীর সত্যাসত্য যাচাই আবশ্যক। আমার জানামতে তা করা হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবজ্ঞা বা অমনোযোগিতা কখনো প্রদর্শন করেননি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি সমস্ত বিষয় আমলে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযোগ্য সম্মান, আর্থিক অনুদান ও অন্যান্য সুযোগ–সুবিধা প্রদানের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সেই সঙ্গে সমাজের অনগ্রসর মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের সমস্যা ও সংকট নিরসনে উত্তরোত্তর যত্নবান হবেন।

পরিশেষে, মুক্তিযোদ্ধা ভাই– বোন ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সকলের কাছে আমার সবিনয় নিবেদন, আপনারা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সক্রিয় অংশ নিয়ে সমাজে নিজেদের জন্য যে সুমহান অবস্থান অর্জন করেছেন, একে অবমূল্যায়িত করার সুয়োগ দেবেন না, জাগতিক লাভের জন্য কাঙালপনা দেখিয়ে আপনাদের আদর্শ, ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সমৃদ্ধ অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না এবং আমার বিশ্বাস, আপনারা অশুভ শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তির ছলনা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সদা সজাগ থাকবেন। আপনারা আমাদের আকাশের ধ্রুব তারা। আপনারা আমাদের সমুদ্রের বাতিঘর। আপনারা দেশকে সুপথে চলার দিশা দিয়েছেন। আশা করি এই প্রয়াস অব্যাহত রাখবেন। আমরা সকলে এই দেশের প্রতি ঋণী। মা ও মাটির ঋণ শোধ করা যায় না। শোধ করার প্রয়াসও ধৃষ্টতা। আসুন, আমরা সবাই যার যার অবস্থানে থেকে, আমাদের শ্রম ও মেধা দিয়ে আমাদের এই দেশকে বিশ্বের দরবারে আরো মাথা উঁচু করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করি।

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ