এরশাদ-চরিত্রের একটি মূল্যায়ন

  আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

১৬ জুলাই ২০১৯, ০৯:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯০ বছর বয়সে মৃত্যু পরিণত বয়সের মৃত্যু। কিন্তু জীবিতকালে তাঁকে যেভাবে আলোচনা করা যেত, মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে সেভাবে আলোচনা করা দুরূহ। এর কারণ তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের খারাপ দিকটা যেমন আমার জানা আছে, তেমনি কিছুটা ভালো দিকের কথাও জানি।

কেউ কেউ বলবেন, সমাজে বা রাষ্ট্রে শীর্ষ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর সমালোচনা দরকার। ইতিহাসে তাঁদের মূল্যায়ন প্রয়োজন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অংশ। তাঁর সঠিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। দীর্ঘকাল দুরারোগ্য রোগে ভুগে গত রবিবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সংবাদমাধ্যম এই খবর প্রচার করতে গিয়ে তাঁর অবৈধ ক্ষমতা দখল থেকে ছোট-বড় রাজনৈতিক অনাচারগুলোও ফলাও করে প্রচার করেছে।

তাঁর সম্পর্কে এই তথ্যগুলো অসত্য নয়। তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। অবৈধভাবে দেশ শাসন করেছেন। চট্টগ্রামে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল তাঁর পুলিশ। সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে তিনি চাকরিতে পদোন্নতি দিয়েছেন। তাঁর শাসনামলে নূর হোসেনকে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে তাদের হত্যার চেষ্টা করা হয়।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নজিরবিহীন নারীপ্রীতি ও দুর্নীতির বিবরণ শুধু দেশের নয়, বিদেশের কাগজেও ফলাও করে প্রচার করা হয়। তিনি আইয়ুব ও জিয়াউর রহমানের মতো সামরিক শাসকদের একই কায়দায় ক্যান্টনমেন্টে তাঁর রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তাঁকে একজন সামরিক শাসকই বলা চলে; কিন্তু জিয়াউর রহমানের মতো নিষ্ঠুরতা ও হত্যার নেশা তাঁর ছিল না। তথাপি জিয়া ও মঞ্জুর হত্যার জন্য তিনি দায়ী বলে মনে করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর ভূমিকাও বিতর্কমূলক। যুদ্ধের গোটা সময়টাই তিনি পাকিস্তানে কাটান। একবার বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন বলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে জিয়াউর রহমানের মতো তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে কেউ মনে করে না। তিনি তখন ভারতে সামরিক ট্রেনিং সেন্টারে ছিলেন। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই জেনারেল জিয়াই তাঁকে ভারত থেকে ডেকে এনে লেফটেন্যান্ট জেনারেল বানিয়ে সেনাপ্রধান করেন। মুজিব হত্যায় ঢাকার রাস্তায় জনবিক্ষোভ যেন না হয় সে জন্য জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একই মিলিটারি জিপে দাঁড়িয়ে টহল দেন। সেই ছবি দেশের সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশ করা হয়।

ক্ষমতায় বসে তিনি জাতির জনক ও জাতীয় নেতাদের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করেননি, বিচারের ব্যবস্থা করেননি। বরং মূল ঘাতকদের একজন কর্নেল (অব.) ফারুককে (একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) দেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেন। রাজাকার মাওলানা মান্নানকে তাঁর মন্ত্রী করেন। তাঁর ইনকিলাব কাগজকে অবাধ মিথ্যা প্রচারের সুযোগ দেন। মাদরাসাছাত্রদের মধ্যে হিংস্র মৌলবাদ প্রচারে সাহায্য জোগান। সন্ত্রাসীদের ছাত্র পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ঢোকান, তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন। তাঁর আমলেই ছাত্ররাজনীতিতে ব্যাপকভাবে সন্ত্রাস শুরু।

তাঁর মৃত্যুর পরও এই সত্যগুলো ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। মিডিয়া তা ঢেকে রাখেনি, বরং তাঁর সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য প্রচার করেছে। আমার লেখায় তাঁর পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। বরং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চরিত্রের অন্য একটা দিক তুলে ধরতে চাই। তাঁর চরিত্রে গুরুতর কন্ট্রাডিকশন ছিল। তিনি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। মুসলিম লীগ ও বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব, যেমন—বৈশাখী নববর্ষ, নবান্ন, শারদোৎসব ইত্যাদি হিন্দুয়ানি এবং মুসলমানরা পালন করতে পারে না।

জেনারেল এরশাদ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রে তিনি বিএনপির বেশি কাছাকাছি।

অর্থাৎ আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু ক্ষমতায় বসে তিনি বৈশাখী উৎসব পালন, বাংলা কবিতা উৎসব পালন ইত্যাদিতে উৎসাহ দিতেন। নিজে কবিতা লিখতেন (যদিও তিনি নিজে কবিতা লিখতেন কি না এ সম্পর্কে বাজারে বিতর্ক আছে)। এশীয় কবিতা উৎসবে তিনি আলাউদ্দীন আল আজাদ, ফজল শাহাবুদ্দীনের মতো আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক কবিদের কাছে টেনে নিয়েছিলেন।

তাঁর চরিত্রে আরো কন্ট্রাডিকশন ছিল। তিনি পাকিস্তানের কাছ থেকে তাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘নিশানে পাকিস্তান’ গ্রহণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও তা ব্যবহার করতেন। তিনি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মৈত্রী বাড়িয়েছিলেন; কিন্তু ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে। বাংলাদেশের উড়ির চরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের সময় রাজীব গান্ধীই সর্বপ্রথম এরশাদ সরকারের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এবং বিধ্বস্ত উড়ির চর পরিদর্শনে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জয়াবর্ধনেকে নিয়ে ছুটে আসেন।

জেনারেল এরশাদ ব্যক্তিগতভাবে সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মতোই দেশে সাম্প্রদায়িকতা এবং উগ্র মৌলবাদকে শিকড় গাড়ার সুযোগ দিয়েছেন নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে। দুজনই স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল ভিত্তি সেক্যুলারিজমকে ধ্বংস করেছেন। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধান যুক্ত করেন। সংবিধানের অবমাননা এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান দ্বারা যে আদর্শের প্রতিষ্ঠা, তা ধ্বংস করা ছিল সর্বোচ্চ দেশদ্রোহ। এ জন্য জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবিতকালেই বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লোভ ও ভীরুতার জন্য তা হয়নি।

জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ দুজনই রাজনীতি করেছেন। কিন্তু দুজনই ছিলেন স্বৈরাচারী সামরিক শাসক। এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের আমলনামায় কোনো ভালো কাজের সন্ধান পাওয়া যায় না; কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলনামায় কিছু ভালো কাজের সন্ধান পাওয়া যায়, যদিও এগুলোও তিনি করেছিলেন নিজের ক্ষমতার স্বার্থে।

ক্ষমতায় এসে জেনারেল এরশাদ তাঁর পূর্বসূরি জেনারেলের মতো রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, পুতুল পার্লামেন্টের অস্তিত্ব রেখেছিলেন, তার নির্বাচনেও লাগামহীন কারসাজি করেছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মতো দেশ থেকে আওয়ামী লীগের এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নামগন্ধ মুছে ফেলার চেষ্টা করেননি।

বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বে গঠিত, জিয়া হত্যা-পরবর্তী বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের ওপর এমন ভয়াবহ দমন নীতি শুরু করেছিল যে দলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দুরূহ হয়ে উঠেছিল। যেমন পরবর্তীকালে এক-এগারোর সরকার বিতর্কিত পন্থায় ক্ষমতায় আসার ফলেই দেশ ভয়াবহ রক্তপাত এড়িয়েছিল। আওয়ামী লীগ পরে নির্যাতিত হলেও প্রথম দিকে শ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছিল।

আশির দশকে বিএনপির সাত্তার সরকারকে অবৈধভাবে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এলেও বিএনপি সরকারের চরম নির্যাতন থেকে মুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একটু দম ফেলার সুযোগ পেয়েছিল। শেখ হাসিনা তখন সদ্য দেশে ফিরেছেন। আওয়ামী লীগ ছিল একেবারেই অসংগঠিত।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অবশ্য নিজের স্বার্থেই আওয়ামী লীগের প্রতি প্রথমে নরম নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সদ্য বিএনপিকে তাড়িয়ে ক্ষমতা দখল করেছেন। বিএনপি জিয়া হত্যার দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে তাঁর কল্লা চাইছে। তিনিও নিজেকে বাঁচাতে বিএনপিবিরোধী আওয়ামী লীগের সাহায্য পাবেন আশা করছিলেন। আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে তাঁর বিরোধিতা না করুক, তাঁর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেয়নি। নিলে তা এরশাদের জন্য বিপজ্জনক হতো। তাঁর সরকার ১৯৮৬ সালে জালিয়াতির নির্বাচন করেছে। সেটা মেনে নিয়েও শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। জেনারেল এরশাদ নিজের অজ্ঞাতসারেই দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য জুগিয়েছিলেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অবশ্যই বারবার ভোল পাল্টানোর জন্য বিখ্যাত। তিনি বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। তথাপি ক্ষমতা হারানোর পর একবার বিএনপির জোটে যোগদানের পর মৃত্যুকাল পর্যন্ত আওয়ামী মহাজোটে রয়েছেন। সংসদে বিরোধী দল গঠন করেও আওয়ামী লীগ সরকারে অংশ নিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হয়েছেন। হতে পারে, নিজেকে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। কিন্তু বিএনপি, জামায়াত ও সুধীসমাজের সংঘবদ্ধ বিরোধিতার মুখে আওয়ামী লীগকে তাঁর জাতীয় পার্টির সমর্থন একেবারেই গুরুত্বহীন ছিল না। ক্ষমতা দখলের জন্য গণতন্ত্র হত্যা করলেও পরবর্তীকালে গণতন্ত্রকে দুর্দিনে সহায়তাদানে তাঁর ভূমিকা একেবারে গুরুত্বহীন নয়।

যে সামরিক শাসক তাঁর বহুরূপী চরিত্রের জন্য শিল্পী কামরুলের হাতে ‘বিশ্ববেহায়া’ রূপে চিত্রিত হয়েছেন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ছয় বছর জেল খেটেছেন, তাঁর তো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশ ছেড়ে পালানোর কথা ছিল। এর বদলে তিনি জেলে বসেই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে পাঁচ আসনে জয়ী হয়েছেন, এটা ঐতিহাসিকভাবে বিস্ময়কর।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ভবিষ্যতে ইতিহাস আরেকটি কৃতিত্ব দেবে। বিএনপি দল ও সরকারের ভারতের সঙ্গে শত্রুতার নীতি বাংলাদেশকে বিপজ্জনক অবস্থানে নিয়ে এসেছিল। এরশাদ এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটান। তিনি ভারতের সঙ্গে বিরোধিতার নীতি থেকে সরে আসতে সক্ষম হন এবং ভারতের সঙ্গে শত্রুতার অবসান ঘটান। পরে ক্ষমতায় এসে হাসিনা সরকার ভারতের সঙ্গে উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর মৈত্রী ও সহযোগিতার দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলেন।

সে জন্যই বলা চলে জেনারেল এরশাদ সফল রাজনীতিক না হলেও আর দশজন সামরিক শাসকের মতো ছিলেন না। ফলে অন্যান্য সামরিক শাসকের যে শোচনীয়ভাবে পতন হয়েছে, তা তাঁর হয়নি। তিনি জনস্নেহ একেবারে হারাননি। তাঁর মৃত্যুতে অনেক মানুষ তাই কাঁদছে। ইতিহাসেও তিনি একেবারে বিস্মৃত হবেন না।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ