পূর্বে সুসন্ধি পশ্চিমে দুন্দুভি

  ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০১ জুলাই ২০১৯, ১৪:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

কূটনীতির জগতে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা কূটনীতিকে কূটভাবে দেখেন তারা এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করেন, ‘বিভাজন এবং শাসন’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতিসাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সম্ভবত এ দুটো প্রবাদ উল্লেখ করা যায়। এই মুহূর্তে গোটা বিশ্ব যখন ইরান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন উত্তর কোরিয়া প্রশ্নে সুসন্ধির সুবাতাস পাওয়া যাচ্ছে। কে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প মোটা মাথার মানুষ? তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধ এবং শান্তির বারতা দিচ্ছেন সারা পৃথিবীতে। কী সুন্দর তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে গলাগলি করে উত্তর কোরিয়ার মাটি পাড়িয়েও আসলেন!

এশিয়ার পশ্চিম অংশে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকমহল যে কোনো সময়ে দুন্দুভি অর্থাত্ যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার আশঙ্কা করছেন। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন শক্ত পদক্ষেপের সর্বশেষ নমুনা হিসেবে পারস্য উপসাগরের দ্বারপ্রান্তে মার্কিন ষষ্ঠ নৌবহর মোতায়েন করা হয়। কয়েকদিন আগে ইরান একটি মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন গুলি করে নামানোর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেন। অবশ্য তিনি পরে তা বাতিল করেন। ট্রাম্প কেন গোঁফ নামালেন, তা অবশ্য ভিন্ন বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে।

এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে অবনতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এটি হচ্ছে কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি চরম ও অপমানজনক পদক্ষেপ। শীর্ষ ধর্মীয় নেতা সম্পর্কে ইরানি জনগণের সংবেদনশীলতা সম্পর্কে সারাবিশ্ব অবহিত। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য মিয়ানমারের নেতা অং সাং সুচির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ কূটনীতির সমস্ত নিয়ম-কানুন, রীতি রেওয়াজ অস্বীকার করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা বলছেন, ইরানকে উত্তেজিত করার কৌশল হিসেবে হয়তো ব্যবস্থাটি নেওয়া হয়ে থাকবে। এ ঘোষণার কঠোর প্রতিবাদ করে ইরান বলেছে, ‘কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধের শেষ হওয়ার সুযোগের অবসান ঘটেছে’। দুপক্ষের এসব ঘোষণার পর সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠেছে। এই যখন মধ্যপ্রাচ্য তথা পারস্য উপসাগরে মার্কিন ব্যবস্থা, বিরোধের আর একটি ক্ষেত্র কোরীয় উপদ্বীপে ভিন্নতর অবস্থান তৈরি করেছে মার্কিন নেতৃত্ব।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব একক বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ‘নিউওয়ার্ল্ড অর্ডারের’ মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। তখন পেন্টাগন তাদের চার শত্রু চিহ্নিত করেছিল। চীনা ঢঙে এদেরকে বলা হতো-‘গ্যাং অব ফোর’ বা চার কুচক্রি। এরা ছিল: ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফি, ইরানের ইসলামী নেতৃত্ব ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের পূর্ব উত্তরাধিকারী। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ‘বিপজ্জনক রাসায়নিক অস্ত্র’ রাখার মিথ্যা অজুহাতে উত্খাত করা হয়। লিবিয়ার গাদ্দাফিকে তথাকথিত আরব বসন্তের ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়। এখন বাকি রয়েছে—ইরান ও উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প আস্ফাালন করেছিলেন। এখন ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে চরম ও গরম কথা বলছেন। কিন্তু অনেক নরম কথা বলছেন উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব সম্পর্কে। উভয় উষ্ণপত্র বিনিময় করছেন। সে যেন রীতিমতো প্রেমপত্র। অবশ্য তাদের এ নরম গরম পত্র বিনিময় নতুন নয়। কখনো উষ্ণতা আবার কখনো তিক্ততা। গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল এই দুজন সম্পর্কে নানা ধরনের কটুকাটব্য করছেন। তার মধ্যে সহনীয় শব্দ হচ্ছে ‘অপ্রকৃতিস্থ’। দুজনের স্বভাব-চরিত্র ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হবে যে তারা ‘জাতে মাতাল তালে ঠিক’ আছেন। তারা উভয়ই তাদের স্ব স্ব দেশের জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে বেশ সচেতন। ট্রাম্প নিশ্চয়ই ইরান যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখেন। আর এ দিকে কোরীয় উপদ্বীপে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে তা বৃদ্ধি পেতে থাকলে এই অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এখানে কোরিয়ার পর মার্কিন স্বার্থের প্রতিবন্ধক হচ্ছে চীন। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুধু বাণিজ্য যুদ্ধ নয় বরং প্রভাব বলয়ের যুদ্ধও বিরাজমান। পীতসাগরে চীনারা যে কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়েছে তা চ্যালেঞ্জ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বেশ কয়েক মাস আগে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি স্বার্থের সংঘাত ঘটছে না। বিপুল সম্পদসমৃদ্ধ পীতসাগরের মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে সকল প্রতিবেশীর বিরোধ রয়েছে।

ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান সকলেই এখানে চীনের প্রতিপক্ষ। প্রবল প্রতাপান্বিত চীনের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য তাদের মার্কিন সমর্থন প্রয়োজন। এসব কারণে এশিয়ার পূর্বাংশে এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্ভাবনা কম নয়। প্রয়াত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এস পি হাণ্টিংটন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থে পীতসাগরকে সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যত্ যাই হোক না কেন, সংঘাত এখন পীতসাগরে নয়, আরব সাগরে। সেখানে কথিত চার কুচক্রির সবচেয়ে শক্তিশালী ইরানকে শায়েস্তা করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে আরব সাগর এবং পীতসাগর তথা কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক মহড়া অথবা সামরিক শক্তি প্রদর্শনী সম্ভব নয় বা যৌক্তিক নয়। সে কারণেই কী কিম জং উনকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেমপত্র?

৩০ জুন উন ও ট্রাম্পের একটি আকস্মিক ও তাত্পর্যপূর্ণ সাক্ষাত্ ঘটে গেল। জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাপান সফর শেষে দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছেন। এ সময়ে উভয় কোরিয়ার মাঝামাঝি স্থানে বেসামরিক অঞ্চলের একটি স্থানে ট্রাম্প-উন যে আন্তরিক করমর্দন করলেন, ট্রাম্প উনের আহ্বানে উত্তর সীমান্ত পার হয়ে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখলেন। বিশ্ববাসী একে ‘ঐতিহাসিক’ বলে দেখছেন। ইতিপূর্বে এ ধরনের সাক্ষাত্ উভয় কোরিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রমপানমুনজামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ট্রাম্প সীমান্তে গিয়ে উনের সঙ্গে বৈঠকে বেশ আগ্রহী বলে বার্তা সংস্থার খবরে আগেই বলা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন তখনও অনুরূপ আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে সে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। ইতিপূর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন এবং উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট গত বছর তাদের ঐতিহাসিক প্রথম বৈঠক একইভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে উত্তর কোরিয়ার বিষয়টি তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা বারবার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে তার শক্তিমত্তার পরীক্ষা দেন। উভয় নেতা পরস্পর বিষোদগার করতে থাকেন। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার ভীতি প্রদর্শন করেন। এই বাগযুদ্ধের মাঝে চলতে থাকে উভয় রাষ্ট্রের কূটনৈতিক যোগাযোগ। অনেকটা আকস্মিকভাবেই ট্রাম্প-কিম প্রথম ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় গত বছরে জুন মাসে সিঙ্গাপুরে। এ সময় তারা নতুন সম্পর্ক বিন্যাসের ঘোষণা দেন। সমগ্র কোরীয় উপদ্বীপ পারমাণবিক অস্ত্র মুক্ত করার অঙ্গীকার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ভিয়েতনামে ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু বৈঠকটি ব্যর্থ হয়। উত্তর কোরিয়া সকল অবরোধ থেকে মুক্তি চায়। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সকল পারমাণবিক অস্ত্র এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের শর্ত জুড়ে দেয়। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর আবার উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। দূরপাল্লা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাও শুরু হয়। দক্ষিণ কোরিয়া এবং মার্কিন যৌথ সামরিক কার্যক্রম কোরীয় উপদ্বীপে শক্তির প্রদর্শনী শান্তির প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু এবারের কূটনীতি কোথায় যায় সেটা দেখবার বিষয়।

এ বছরের জুন মাসের ১১ তারিখ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান তিনি উত্তর কোরীয় নেতার একটি উষ্ণ এবং সুন্দর চিঠি পেয়েছেন। তিনি আশা করছেন যে ইতিবাচক কিছু ঘটবে। উত্তর কোরীয় বার্তা সংস্থা জানায় যে প্রেসিডেন্ট কিম ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প থেকে ‘উত্তম বিষয় সম্বলিত’ চিঠি পেয়েছেন।

চিঠি চালাচালির পর উভয় নেতা সুশান্তির প্রত্যাশায় মিলিত হলেন। উত্তর কোরিয়া স্বাভাবিকভাবেই তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইবে। অপরিহার্যভাবেই উত্থাপিত হওয়ার কথা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরমাণুমুক্ত কোরীয় উপদ্বীপ ও তার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি চাইবেন নিঃসন্দেহে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা উভয় পক্ষের দাবিই যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক। সে যাই হোক, বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আশা করে নেতৃদ্বয়ের বোধোদয় হোক। মানুষ আরো আশা করে যে পূর্বের সুসন্ধির সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমের দুন্দুভির অবসান ঘটবে। পৃথিবীতে বিরাজ করবে-শান্তি, অবারিত শান্তি।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ