মাদকের ব্যবহার বাড়ছে নিরাময়ের সুযোগ বাড়েনি

  কামরুল হাসান বাদল

২৭ জুন ২০১৯, ১১:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের নাগরিকরা ধূমপানে অভ্যস্ত হয় সাধারণত কলেজ জীবনে এসে। স্কুল জীবনের কঠোর নিয়ম থেকে এক প্রকার মুক্তি পায় কলেজ জীবনে এসে। অধিকাংশ কলেজে স্কুলের মতো কঠোর অনুশাসন থাকে না। থাকে না ক্লাসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাদকতাও। জীবনে প্রথম মুক্তির আযাদের সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ তরুণের যে জিনিসটির সাথে সখ্য গড়ে ওঠে তা হলো ধূমপান বা সিগারেট। ধূমপায়ীদের অধিকাংশই ধূমপানে আসক্ত হয়েছে কলেজ জীবনে এসে। অনেকে অবশ্য স্কুলের নবম-দশম শ্রেণি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীনও ধূমপানে আসক্ত হয়।
শিক্ষাজীবনে অনার্সের পর বা জীবনের ২০-২২ বছরের পর নতুন করে তেমন কেউ আর ধূমপানে জড়িয়ে পড়ে না। বয়স্ক বা প্রৌঢ় কেউ হঠাৎ ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তেমন শোনা যায় না। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যেও ধূমপানের প্রবণতা কম। নিম্নবিত্ত, শ্রমিকের কাজ করে এমন নারীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা দেখা যায়। বর্তমানে উঠতি বয়েসী মেয়েদের মধ্যে বিশেষ করে উচ্চবিত্ত শ্রেণিদের ধূমপানের প্রবণতা দেখা যায়।
মাদকের সমস্যাটি হচ্ছে এটি যে কোনো সময়, যে কোনো বয়সের এবং পেশার মানুষ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া, ঘরের গৃহিনী, বিভিন্ন পেশার মানুষ যেমন, চিকিৎসক থেকে গাড়ির চালক, লেখক-শিল্পী বিভিন্ন বয়সে, বিভিন্ন কারণে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সময়ের সাথে সাথে মাদক পাল্টেছে। কয়েক বছর আগেও ফেন্সিডিলের ব্যবহার ছিল মাত্রাতিরিক্ত। বর্তমানে তার চাহিদা কিছুটা কমেছে। তার স্থান দখল করেছে ইয়াবা। শুধুমাত্র পরিবহন সুবিধার কারণে ইয়াবা বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন মাদক। এই মাদক কারবার অধিক লাভজনক হওয়ায় এতে জড়িয়ে যাচ্ছে সমাজের প্রায় সব পেশার মানুষ। মসজিদের ইমাম থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অধিক লাভের আশায় জড়িয়ে যাচ্ছে ইয়াবা পাচারে।
ইয়াবা নিয়ে নতুন করে তথ্য দেওয়ার কিছু নেই। দুটি জিনিস আমাদের সমাজে বেশ অবারিত। আমাদের উঠতি বয়েসী সন্তানদের বড় প্রলোভন দিয়ে ডাকে। এর একটি হচ্ছে মাদক অন্যটি হচ্ছে জঙ্গিবাদ। এই দুই মৃত্যুর পথ থেকে আগলে রেখে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি তথা মানবসেবা ও মানবতার পক্ষে সন্তানদের ধরে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানকে ভালো রাখার উদ্দেশ্যে, ধর্ম-কর্ম করতে উদ্বুদ্ধ করে তাকে মসজিদে পাঠাচ্ছেন কিন্তু সেখানে ওঁৎ পেতে আছে এক শ্রেণির ভয়ানক মানুষ যারা আপনার কোমলমতি সন্তানকে বেহেস্তের হুরের লোভ দেখিয়ে ঠেলে দেবে জঙ্গিবাদে। সন্তানকে স্বাধীনতা দিয়ে মিশতে দিলেন সমাজের আর দশটা ছেলেমেয়ের সাথে। যেখানে আছে মাদকের হাতছানি। হাত বাড়ালেই তা পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বাবা-মায়েরা এখন সত্যিই অসহায়। এমন পরিস্থিতি সামলাবার কোনো পন্থা জানা নেই আমাদের। দেশে যে কোনো সময় যে কোনো জিনিসের অভাব দেখা দিতে পারে। কিন্তু ইয়াবার অভাব হবে না। গভীর রাতেও যে কোনো মাদকাসক্ত চাইলে তার বাসায় পৌঁছে যাবে ইয়াবা।
আগে ফেন্সিডিল আসতো ভারত থেকে। প্রতিদিন প্রচুর ফেন্সিডিল ধরা পড়তো পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। ফেন্সিডিল বোতলজাত সিরাপ বলে এক সাথে অনেক বেশি ফেন্সিডিল পরিবহনে সমস্যা ছিল। ছোট ছোট ট্যাবলেট হওয়ার কারণে ইয়াবার সে অসুবিধা নেই। একসাথে অনেক ইয়াবা পরিবহন করা যায় যার কারণে এর ব্যাপকতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেন্সিডিল ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হলো বাংলাদেশের অনুরোধে ভারতীয় সরকার সীমান্তের কাছাকাছি গড়ে ওঠা ফেন্সিডিল কারখানাগুলো দৃশ্যত বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভব্য সরকার যে দেশে ইয়াবা উৎপাদিত হয় এবং তা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পাচার হয় এমন অভিযোগ আমলই করে না। যে কারণে ইয়াবার আগ্রাসন বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এদেশে ফেন্সিডিল ও ইয়াবার মতো মাদকের সহজলভ্যতা আছে।
২০১৮ সালের ৪ মে “চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ শিরোনামে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে পুলিশ ও র‌্যাব। এরপর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৩৮৯ জন মাদক কারবারী। পুলিশের তৎপরতার মুখে আত্মসমর্পণ করেছে ১০২ জন মাদক কারবারী। এরমধ্যে মামলা হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৭৮টি। এসব ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩২৩ জন। ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮টি। এই হিসাব ২০১৮ সালের। দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ ৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা মাদকাসক্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার ৩৫ জন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে একজন মাদকসেবী একাধিক মাদক গ্রহণ করে থাকে। ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইন ছাড়াও মাদকাসক্তরা দেশি-বিদেশি মদ, রেক্টিফাইড স্পিরিট ও স্লিপিং গ্লু সেবন করে থাকে।
কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিন এখনো দেশের কোথাও না কোথাও মাদক তথা ইয়াবা কারবারী নিহত হচ্ছে বন্দুক যুদ্ধে। প্রতিদিন ইয়াবার চালানও ধরা হচ্ছে। চলতি মাসেই শুধু বিজিবি ১৭ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্সের পরও পরিস্থিতির সন্তোষজনক উন্নতি ঘটেনি। এখনো শহরে গ্রামে হাত বাড়ালেই ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমানে কতজন মাদকাসক্ত আছে বা দেশের কত শতাংশ লোক মাদকাসক্ত তেমন কোনো সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে পরিস্থিতি যে অত্যন্ত হতাশাজনক সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সরকারের একটি সিদ্ধান্তে বিষয়টি প্রকাশও পেয়েছে।সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা মাদকাসক্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। চাকরিতে প্রবেশের সময় কোনো ব্যক্তির রক্তে যদি মাদক পাওয়া যায় তাহলে তার আবেদন বাতিল হবে বা গ্রহণ করা হবে না। এ সময় মন্ত্রী বলেন, মাদকবিরোধী জনমত তৈরি করা হচ্ছে। মসজিদে জুমার নামাজের বয়ানে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। এছাড়া মাদকবিরোধী পোস্টার, লিফলেট বিতরণ, টক শো করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা মাদক ব্যবহার বন্ধে তিনটি কর্মকৌশল নিয়েছি, এগুলো হচ্ছে চাহিদা, সরবরাহ ও ক্ষতি হ্রাস।
অর্থনীতির সূত্র বলে, চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ যুক্ত। চাহিদা থাকলে সরবরাহ বাড়বে। অন্যদিকে সরবরাহ থাকলে চাহিদাও বাড়বে। হাতের কাছে ইয়াবা পাওয়া গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল কী? সম্প্রতি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কারারক্ষীকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জেলের অভ্যন্তরে ইয়াবা সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকদিন আগে ইয়াবাসহ এক নারী দর্শনার্থীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কারাগারে বর্তমানে ৭০ শতাংশই মাদক মামলার আসামী। তারা প্রায় সবাই মাদকসেবী। কারাগারের ভেতরে থেকেই তারা বাইরের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কারাগারের থেকেই তারা নিয়মিত মাদক গ্রহণ করে যার অধিকাংশই ইয়াবা। এই কারাগারের একজন জেলার সোহেল রানা নগদ টাকা ও ফেন্সিডিলসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন পুলিশের হাতে। কারাগার এবং কারাগারের রক্ষী ও কর্মকর্তারাই যদি মাদক সরবরাহ করে থাকেন তাহলে সমগ্র দেশের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
প্রতিদিন মাদক কারবারী নিহত হচ্ছে, মাদক আটক হচ্ছে কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন করে প্রচুর সংখ্যক মানুষ এই মরণ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাদকাসক্তের সংখ্যা বর্তমানে কত তার কোনো পরিসংখ্যাণই নেই এবং ওদের নিরাময় বা মাদকাসক্তি থেকে পরিত্রাণের ব্যাপক কোনো পরিকল্পনাও সরকারের নেই। দেশে যে নিরাময়কেন্দ্রগুলো আছে তার বেশির ভাগই বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং তার মধ্যে অধিকাংশের মান ভালো নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা এটাকে স্রেফ টাকা উপার্জনের কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। এখানে রোগীদের ওপর ভীষণ শারীরিক মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। নিয়মিত খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করা হয় না। এ ধরনের নিরাময়কেন্দ্রে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ করে তোলা হয়। মাদকাসক্তের পরিবারের অবস্থা হয় বড় করুণ। এরা এ ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদও করতে পারেন না। তাদের সন্তান মাদকাসক্ত এই তথ্য সবার কাছে পৌঁছে যাওয়ার ভয়ে ও লজ্জায় তারা বিষয়টি গোপন করেন। সারাদেশে লাখ লাখ মাদকাসক্ত থাকলেও তার চিকিৎসার জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান দেশে গড়ে ওঠেনি। রাজধানীতে দুয়েকটি থাকলেও দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এমনকি কোনো পরামর্শ প্রতিষ্ঠানও নেই। নেই কোনো কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থাও ।
মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারকে এদিকটাও ভাবতে হবে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও এ বিষয়ে পরামর্শদানের জন্য কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালেও যেন এ বিষয়ে পরামর্শকেন্দ্র রাখে সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। একটি মাদকাসক্ত সন্তানের পিতা-মাতা বা অভিভাবককে অত্যন্ত মানসিক চাপে থাকতে হয়। তারা লোকলজ্জার ভয়ে এই সমস্যা নিয়ে অন্য কারো সাথে অভিজ্ঞতাও বিনিময় করতে পারেন না। তারা লোকলজ্জা ও মানসম্মানের কথা ভেবে বিষয়টি গোপন রাখতে চান। এতে দিনদিন সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক পিতা-মাতা মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে নিয়মিত নিগৃহীত হন, লজ্জায় তারা তা প্রকাশও করে না। কাজেই এমন পরিবার যেন খুব সহজেই একজন চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন, পরামর্শ নিতে পারেন সে ব্যবস্থা সরকারকে করে দিতে হবে। অনেক মাদকাসক্ত নিজেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু কীভাবে, কোথায় গেলে নিভ্র্রযোগ্য লোক বা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে তা সে জানে না। এই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদকাসক্তদের মনে অভয় তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে প্রযুক্তির মাধ্যমে যেন পরামর্শ গ্রহণ করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেক মেধাবী সন্তান মাদকের অন্ধকার জগতে হারিয়ে গেছে। এখন থেকে লাগাম না টানলে সামনে বড় বিপর্যয় ঘটবে। বিপদটা আমরা এখনো অনুধাবন করতে পারিনি। অধিক জনসংখ্যার দেশ বলে ভেতরে ভেতরে যে বিশাল একটি জনশক্তি যে ক্ষয় হয়ে গেছে তা হয়ত বুঝতে পারছি না।  (দৈনিক আজাদী থেকে সংগৃহীত)
Email:[email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ