অনভ্যস্ত চোখে দেখা নিয়মে দাঁড়িয়ে যাওয়া অনিয়মগুলি

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৮, ১৩:৪১

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, ০৯ জুন, এবিনিউজ : যে কাজে আসা তা অনেকটা গুছিয়ে এনেছি। বাকী আছে একটা। ঢাকায় আই ও এম (ইন্টারন্যাশনাল অর্গেনাইজেশান অফ মাইগ্রেশন)-র সাথে আগামী ১০ জুন মিটিং। সেটি সেরেই ফিরে যাওয়া। তারপর আবার সেই নিয়মের বেড়াজাল। ঘড়ি আর নিয়ম ধরে চলা। সপ্তাহ দুয়েক আগে নিয়ম থেকে দেশে অনিয়মে এসে নিজেকে মনে হচ্ছিল ’ফিশ আউট অফ ওয়াটার’। শুনে বলতে পারেন ‘দুদিনের ভিখারী, ভাতকে বলে অন্ন’। কিন্তু মানুষ যে অভ্যেসের দাস। দীর্ঘদিনের (প্রায় ২৮ বছর) হল্যান্ডবাসী। সিস্টেমের মাঝে থাকতে থাকতে দেশে এসে যখন প্রয়োজনে–অপ্রয়োজনে এদিক–ওদিক যেতে হয়, তখন চারপাশ দেখি অনিয়মের বেড়াজাল। কাজের শ্লথগতি, কোথায়ও বা গতিহীন। আর তাই প্রথম দিকে বেশ খটকা লেগেছিল। বিরক্তিও। এ কেবল আমার একার অভিজ্ঞতা নয়, প্রবাসে দীর্ঘদিন যাদের বসবাস তাদের একই অভিজ্ঞতা। ফলে প্রবাসীদের জীবনের একটা সময়, বলা চলে শেষ সময়, দেশে ফিরে আসার যে তীব্র আকাংখা সেই তীব্রতায়ও ভাটা পড়তে থাকে। তবে দিন কয়েক যেতে না যেতে পুরোটা না হলেও অনিয়মগুলি অনেকটা সয়ে আসে। দেশে এবার আমার অবস্থান একটু দীর্ঘস্থায়ী, হপ্তা তিনেক। সময়ের বিচার্যে অনেক। আর তাই দেশে অনেকের চোখে যা স্বাভাবিক, আমার অনভ্যস্ত চোখে তা খুব অস্বাভাবিক ও বিরক্তিকর ঠেকে। ঢাকায় নেমে পরদিন নিজের প্রয়োজনে যেতে হয়েছিল মতিঝিল প্রাইম ব্যাংকের হেড অফিসে। অপেক্ষা করতে হয়েছিল কিছুক্ষণ আমার সমস্ত বিরক্তি উৎপাদন করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এমনভাবে কাজ করছিলেন, অনেকটা দায়সারা গোছের, যেন দয়া–দাক্ষিণ্য দেখাচ্ছেন। গ্রাহককে সেবা প্রদান – বিষয়টি মনে হয় অনেকের মত তারও অজানা। তার সামনে আমার স্বল্পকালীন অবস্থানকালে লক্ষ্য করি তার কাছে আসা গ্রাহকদের সাথে এমন আচরণ করছেন যেন তিনি ওই সেবা দিয়ে গ্রাহককে ধন্য করছেন। ন্যূনতম সৌজন্য হচ্ছে কেউ যদি আপনার সাথে কথা বলেন বা কোন কারণে আপনার দ্বারস্থ হন, বিশেষ করে তিনি যখন আপনার গ্রাহক, তখন তার (গ্রাহক) চোখে চোখ রেখে কথা বলা, ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি, আই কন্টাক্ট। ইউরোপে কোনো কথোপথনে এই ‘আই কন্টাক্ট’ না থাকলে তা অসুন্দর ও অসৌজন্যমূলক হিসাবে বিবেচিত হয়। দেশে এই বিষয়টা লক্ষ্য করি কেবল এই ব্যাংকেই নয়, অনেক জায়গায় লক্ষ্যণীয়ভাবে অনুপস্থিত। যে কাজটি হল্যান্ডে পাঁচ মিনিটে ঘরে বসে করতে পারতাম অন–লাইনের কল্যাণে, তা সারতে ট্রাফিক জ্যাম সহ কয়েক ঘন্টা লেগে গিয়েছিল ঢাকায়। তবে ঢাকায় প্রাইম ব্যাংকের হেড অফিসে কাটানো সময় যে বিরক্তির সৃষ্টি হয়েছিল তা উবে গেল একই ব্যাংকের চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ শাখার এক তরুণ অফিসারের কাছে এসে। পরিচয় পাবার আগ থেকেই স্মার্ট ও সুদর্শন এই তরুণ ব্যাংকার, সুদীপ চৌধুরী নিজ থেকে এগিয়ে এসে আমার কাজটা এগিয়ে নিলেন। ডেস্ক থেকে ডেস্কে যাবার কর্মটিও নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন। এরই ফাঁকে তার সাথে দেশের কথা, আমার প্রবাসে অবস্থানের কথা, শেঁকড়ে ফিরে আসা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এলো স্বল্পক্ষণের আলাপচারিতায়। নিজের বিজনেস কার্ডটি বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, কোন প্রয়োজন হলে আসবেন। এইতো চাই, এইতো হওয়া উচিত প্রত্যেক অফিসে। কর্ম ক্ষেত্রে। একেই তো বলে গ্রাহক সেবা। যে কাজটি করতে ঢাকা প্রাইম ব্যাংকের হেড অফিসে তিক্ত–বিরক্ত হয়েছিলাম, সেই একই কাজটি কম সময়ে চাটগাঁয় সারলো ভালোভাবে। কিছুটা স্বস্তি। যেন অনেক রোদ্দুর পেড়িয়ে এক পশলা বৃষ্টি।

প্রাইভেট ব্যাংকে এই যদি হয় দশা তাহলে সরকারী ব্যাংকে কী হতে পারে সে সহজে অনুমেয়। গতকাল গিয়েছিলাম ইলেকশন কমিশন অফিসে, ন্যাশনাল আই ডি কার্ডের জন্যে। অফিস ভবনে ঢুকতেই চোখে পড়ে সাইনবোর্ড। তাতে লেখা এই অফিস দুর্নীতিমুক্ত। সাথে ছিলেন সাংবাদিক বন্ধু। তিনি বলেন, লেখা আছে বটে তবে টাকা ছাড়া কোন কাজ হয়না এই বিল্ডিংয়ে। ‘কোন বিল্ডিংয়ে হয়’ , জানতে চাই বন্ধুর কাছে। বন্ধু নির্বিকার। গতকাল দুপুরে আগ্রাবাদ এক ব্যবসায়ী বন্ধুর অফিসে আড্ডা মারছিলাম। তার সি এন্ড এফ (ক্লিয়ারিং এন্‌ ফরওয়ার্ডিং) ফার্ম । দশ/বার জন স্টাফ রয়েছে। সে জানালো, কিছুদিন আগে তার একটা শিপমেন্ট এসেছে। কাস্টমসের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কালেক্টর চেয়ে বসলেন দেড় লক্ষ টাকা, কেবল তার একটা সইয়ের জন্যে। না দিলে সে শিপমেন্টটা ক্লিয়ার করতে পারছে না এবং পার্টিকে তার জন্যে ডেমারেজ দিতে হবে। হতাশার সুরে আমার এই ব্যবসায়ী বন্ধু জানালেন, ‘ভাই, এখানে টাকার খেলা। দেশের প্রতিটি জায়গায় ’ফেল কড়ি মাখো তেল’ দশা। না হলে আপনার কাজ, আপনার ব্যবসা কোন ‘গতি’ পাবে না অর্থাৎ কোন স্পীড পাবে না। দেশে যারা আছেন অনুমান করি তারা সবাই এই ‘স্পীড মানীর’ সাথে পরিচিত। আমি জেনেছি মাত্র বছর কয়েক আগে, যখন হল্যান্ড থেকে কয়েক হাজার ইউরো পাঠিয়েছিলাম আমার ঢাকা অফিসের ব্যাংক একাউন্টে। ঢাকা অফিস থেকে বলা হলো বাংলাদেশ ব্যাংকে ফাইল আটকে আছে, ‘স্পিড মানি’ না দিলে ওই ফাইল তার ‘গতি’ পাবে না। ভাগ্যক্রমে তৎকালীন গভর্নর, ড. আতিয়ার রহমানের সাথে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। তাকে দু–লাইনের একটা ই–মেইল পাঠালাম। ঠিক পরদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জেনারেল ম্যানেজার ফোন করে জানতে চাইলেন কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী ফাইলটি আটকে রেখেছে। বললাম, তার আর প্রয়োজন হবেনা, কেননা টাকা ইতিমধ্যে রিলিজড হয়ে গেছে। জেনারেল ম্যানেজারকে বলি, যদি তার নাম বলি তার চাকরী যাবে। উৎকণ্ঠিত ম্যানেজার উৎকণ্ঠা নিয়ে বলেন, ‘না বললে আমার চাকরী যাবে’। এই ভেবে বলিনি, যদি বলি ওই কর্মচারী সমস্যায় পড়বেন। আর বলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। কেননা এই সমস্ত বিষয় অলিখিত নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। এই (অ)নিয়ম ভেঙে কোন কাজ করতে গেলে দেখা যাবে কাজ থেমে আছে। তার চেয়ে নিজেকে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ভাসিয়ে দিতে পারিনি আমি, অন্যের ওপর দায়িত্ব দিয়ে সটকে পড়েছি, মনে বিরক্তি নিয়ে।

গোটা দেশ জুড়ে এই দশা। প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ক্ষেত্রে। অনিয়ম আর দুর্নীতি। গত কয়েক দিন থেকে ঈদকে ঘিরে ট্রেনের টিকেট বিক্রী শুরু হয়েছে। পত্রিকান্তরে জেনেছি কাউন্টারে টিকেট নেই, সে টিকেট মেলে কালোবাজারে। নতুন কোন কাহিনী নয়। ফি বছর শুনি এই অভিযোগ। দিন যত এগিয়ে ততই পরিস্থিতি মন্দের দিকে চলেছে। সবাই কেমন যেন অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় নেমেছে ’কুইক মানী’ অর্জনের লক্ষ্যে। এ যেন সেই ’তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই’। সুখের বিষয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দুর্নীতি–বিরোধী অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঘোষিত এই ‘যুদ্ধে’ কোন দুর্নীতিবাজ যেন পার না পায় এবং কোনভাবে যেন মাদক–বিরোধী অভিযানের মত এক পর্যায়ে বিতর্কিত হয়ে না পড়ে সে দিকে সরকার সজাগ থাকবেন এই প্রত্যাশা করি।

লেখক: প্রবাসী
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ