নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবারের বাজেট

  ড. আতিউর রহমান

১৮ জুন ২০১৯, ১২:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

নানা বিচারেই এবারের বাজেট দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাপ্রসূত দূরদর্শী একটি আর্থিক প্রস্তাবনা। মূলত ক্ষমতাসীন দলের ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামের ‘নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮’-এর অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখেই এবারের বাজেট প্রণীত হয়েছে। অতীতের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামী দিনের আশাজাগানিয়া সবার জন্য সমৃদ্ধির ভিত্তিভূমি স্থাপনের এক কৌশলী দলিল হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় এবারের বাজেটকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে যথার্থই বলেছেন, এটি জনকল্যাণধর্মী বাজেট প্রস্তাবনা। যেহেতু তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে এবারের বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাই অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন এ নিয়ে খুব বেশি আলাপ-আলোচনার সুযোগ নেই। চূড়ান্ত কথা তো সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেই ফেলেছেন। আসলে ব্যাপারটি কিন্তু তা নয়। সেদিন তিনি অর্থমন্ত্রীর জবানিতে কথা বলেছেন। বাজেট পাসের আগ দিয়ে চূড়ান্ত মতামত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ফের দেবেন। তাই সংসদে ও সংসদের বাইরে বাজেট প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে ঢের পর্যালোচনা ও সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখেই জনবান্ধব যেসব প্রস্তাব বাজেটে পেশ করা হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি নিয়ে এই নিবন্ধে আলাপ-আলোচনা করতে চাইছি। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যান্য অনেক বিষয় ছাড়াও শিক্ষা, তারুণ্য, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তার মতো তরুণ ও গরিব-হিতৈষী অনেক সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব বিষয়ে বরাদ্দসহ বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলাপ করা হয়েছে। সেই প্রস্তাবগুলো বাস্তবতার আলোকে কতটা লাগসই হয়েছে, না হলে আরো কী ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা সম্ভব সেসব কথাই আজ এই নিবন্ধে বলতে চাইছি।

শিক্ষা, তারুণ্য ও কর্মসংস্থান : প্রশংসনীয় বরাদ্দ সত্ত্বেও সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ

শিক্ষা খাতে প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ ১৫.২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে শিক্ষা খাতকে বাজেট বরাদ্দের বিচারে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে এবারের বাজেটেও। এমন বরাদ্দ প্রশংসনীয় হলেও মনে রাখা দরকার, শিক্ষা খাতে আমাদের বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশে। আন্তর্জাতিক মান বিচারে এ অনুপাত ৪ শতাংশ হওয়া দরকার। এবারের বাজেট প্রস্তাবে তা ৩ শতাংশের কাছাকাছি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা খুবই ইতিবাচক ধারার সূচনা বলা চলে। তবে প্রযুক্তি ব্যয় মিলিয়ে তা করা হয়েছে। শিক্ষা খাত আলাদাভাবেই আরো বেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করতে পারে। কারণ এই বিনিয়োগ আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তবে মাধ্যমিক স্কুলের এমপিওভুক্তিসহ শিক্ষালয়ের উন্নয়নের জন্য বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধিই নয়, মনোযোগ দিতে হবে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির দিকেও। এরই মধ্যে এ জন্য বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেট প্রস্তাবে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে শিক্ষক নিয়ে আসার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এ ক্ষেত্রে বিদেশে শিক্ষকতা কিংবা গবেষণারত বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে এনে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করতে পারলে অধিকতর সুফল পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা যায়। এসব বিশেষজ্ঞকে পূর্ণকালীন নিয়োগ দেওয়ারও দরকার নেই। তাঁদের খণ্ডকালীন নিয়োগ দেওয়া এবং দেশের শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের অনলাইন যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে খরচ বাঁচানো যেতে পারে। প্রবাসী পণ্ডিতজনেরা স্বদেশকে ভালোবাসার অংশ হিসেবেই এমন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে খুবই আগ্রহী। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ প্রকল্পও এডিপিতে যুক্ত করা যেতে পারে। বাজারের চাহিদা অনুসারে আমাদের তরুণদের শিক্ষিত করে তোলার দিকেও মনোযোগ দেওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, দেশের ১০ লাখ গ্র্যাজুয়েট বেকার থাকা অবস্থায়ও আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ জনশক্তির অভাবে ভোগে। ফলস্বরূপ প্রায় চার লাখ বিদেশি নাগরিককে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়ে বছরে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে। সে জন্য কারিগরি শিক্ষার দিকে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা বহুদিন ধরে স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন করে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির কথা বলে আসছি। এবারের বাজেটেই প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য ১০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্যাপক মাত্রায় বেগবান করবে। আর পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এর পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তারা কোন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং সেগুলোতে কিভাবে সফল হবে, তা নিয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ইনোভেশন ল্যাব’ এবং ‘এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ গঠন করে সেখানে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতও সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে পারে। তারা সামাজিক দায়বদ্ধ তহবিল নিয়ে এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ভারতসহ পুরো উন্নয়নশীল এবং উন্নত বিশ্বেই শিক্ষার উন্নয়নে এমন মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ : জনগণের ওপর চাপ কমানো দরকার

গত বেশ কয়েকটি অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এবারের বাজেটেও মোট বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (৪.৯ শতাংশ) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ এবং কর্মসূচি বা প্রকল্পের বিচারে যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, তা জনগণকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করছে। তবে এ ক্ষেত্রে স্মরণ করে দেওয়া যেতে পারে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের শতাংশের বিচারে পুরো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশের তুলনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি (বরাদ্দ দিচ্ছি জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ)। এ বরাদ্দের অনুপাত দ্বিগুণ করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, এখনো জনগণকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে নিজেদের পকেট থেকেই। এ কারণে দারিদ্র্যরেখার নিচে পাওয়া যাচ্ছে অনেক মানুষ। এ দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে বলে আমরা আশা করি।

কৃষি বরাদ্দে সাম্প্রতিক সংকটের প্রতিফলন ঘটেছে

বিভিন্ন মহল থেকে অনেক দিন ধরেই কৃষি খাতে শস্য বীমা চালু করার আহ্বান জানানো হচ্ছিল। এবারের বাজেটে সেই শস্য বীমা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার প্রস্তাব এসেছে। সাম্প্রতিককালে বাম্পার ফলনের ফলে কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, কিংবা কয়েক বছর আগেই আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ফসলের ক্ষতির অভিজ্ঞতা থেকেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, সাম্প্রতিক অতীতেও এ দেশে শস্য বীমা নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ওগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের শস্য বীমার পাইলট প্রকল্প সাজানো হলে তা অধিকতর কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে শস্য বীমাও এক ধরনের আর্থিক সেবা। কাজেই প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শস্য বীমার ক্ষেত্রেও আমাদের ‘মার্কেট লেড সলিউশন’ অর্থাৎ বাজারভিত্তিক সমাধানের দিকে যেতে হবে। সরকার শুধু পথ দেখাবে এবং পরবর্তী সময়ে সে পথে বিভিন্ন আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কৃষকদের শস্য বীমা সেবা দেবে। হয়তো পুরো দেশে এটার প্রসার ঘটবে না। বিপর্যস্ত এলাকার কৃষকই এর সুবিধা বেশি করে পাবে।

এ ছাড়া কৃষিতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বেড়েছে, কৃষির যান্ত্রিকীকরণে বরাদ্দের ইতিবাচক ধারাও অব্যাহত রাখা হয়েছে। এসবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এসবের পাশাপাশি আগামী দিনে ভারতের মতো কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন’ গঠন করার কথা ভাবা যেতে পারে। এই কমিশনে কৃষি বিশেষজ্ঞ, বাজার বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা থাকবেন। ফসলের উৎপাদনের আগাম প্রক্ষেপণ, মজুদ ও চাহিদা নিরূপণ করে ফসল ওঠার আগেই এই কমিশন ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করবে। সেই আলোকেই কৃষি ভর্তুকিও বিতরণ করা হবে। সরকারের গুদাম ব্যবস্থাপনারও সমন্বয় ঘটানো হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা : পরিবর্তনশীল বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে এগোতে হবে

বাজেটের ১৪ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ দেওয়াটা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। দারিদ্র্য নিরসনসহ অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এ বরাদ্দ সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই ভাতা বাড়ানো হয়েছে। এসব করতে গিয়ে ভাতার পরিমাণ এতটা বাড়ানো হয়নি যে তারা এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটা হবে তাদের সম্পূরক আয়। বাকি আয় তারা করবে তাদের নিজেদের যোগ্যতা বলে। এর ফলে ত্রাণনির্ভর মানসিকতার অবসান হতে পারে। আগের বাজেট প্রস্তাবেও এমনটি করা হয়েছিল। তখন অনেকে এ উদ্যোগকে নির্বাচন-পূর্ববর্তী জনতুষ্টিবাদী কৌশল বলেছিলেন। জাতীয় নির্বাচনের পরের বাজেটেও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দের ধারা অব্যাহত রাখায় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে হয়। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী যথাযথভাবে নির্বাচন করা এবং তাদের কাছে ঠিকঠাক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গত এক দশকে আমরা অনেক এগিয়ে গেলেও এখনো এখানে অনেক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আরো কার্যকর প্রয়োগ ও প্রসার সহায়ক হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রকে (স্মার্ট কার্ড) যত বেশি মাত্রায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে, ততই এসব কর্মসূচি আরো দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যাবে বলে মনে হয় (এ প্রসঙ্গে ভারতের আধার কার্ডের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখতে পারি)।

সামাজিক নিরাপত্তার আরো দুটি দিক বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। প্রথমটি হলো, নগরাঞ্চলের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রসঙ্গ। শুধু নগর-দরিদ্রদের সেবা দেওয়ার জন্য অল্পসংখ্যক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও মোট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা নগণ্যই বলতে হবে। বরাদ্দও একই রকম। কিন্তু আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক গতিপথ বলছে যে আগামী দিনে নগরায়ণের গতি আরো বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের ফলে আরো বেশিসংখ্যক মানুষ নগরে বসবাস করবে। পরিসংখ্যান বলছে, দারিদ্র্যের শতকরা হার যদি বর্তমান সময়ের অর্ধেকেও নামিয়ে আনা যায়, তবু ২০২৫ সালে নগরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে বেশি হতে পারে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে আগামী দিনে নগরাঞ্চলের জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ রাখা দরকার। এরই মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যেসব নগরাঞ্চলের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে, সেগুলো থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা আগামী দিনের কর্মসূচি তৈরি ও বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতকে কী করে নগরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষার কাজে যুক্ত করা যায়, তা ভেবে দেখা দরকার। সরকার এককভাবে নগর-দারিদ্র্য সমস্যা মোকাবেলা করতে গেলে চাপে পড়বে।

অন্যদিকে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ব্যক্তি খাতেরও এ ক্ষেত্রে কার্যকর অংশগ্রহণ থাকা দরকার। মনে রাখতে হবে, নগর-দরিদ্ররা আমাদের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ। কাজেই তাদের কল্যাণের সঙ্গে বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে গার্মেন্টকর্মীদের জন্য বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সামাজিক সুরক্ষার যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। তা ছাড়া গার্মেন্ট শিল্পাঞ্চলে বিশেষ বিশেষ সময়ে ১০ টাকায় চাল বিক্রির ওএমএস কর্মসূচি চালু রেখে মজুদ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষা একই সঙ্গে সম্পন্ন করা যেতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তার অন্য যে দিকটিতে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে, সেটি হলো সর্বজনীন পেনশন। আমরা বহুদিন ধরেই একটি সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করার আহ্বান জানিয়ে আসছি। এবারের বাজেট বক্তৃতায় ‘ইউনিভার্সাল পেনশন স্কিম’ চালু করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অবশ্যই খুবই সময়োচিত প্রস্তাব। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরেদের বাইরে খুব বেশি মানুষ বাংলাদেশে পেনশনের সুবিধা পায় না। ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ চালু করা গেলে জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিচারে বাংলাদেশ অনেকখানি এগিয়ে যাবে এবং একটি মধ্যম আয়ের দেশে এমনটি হওয়াই প্রত্যাশিত। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু হলে অনেক পরিবার অবসর পরবর্তীকালে নিরাপদ আয়ের জন্য বর্তমানে যে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল আছে, তা কমে আসবে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। সে জন্য একটি রেগুলেটরি সংস্থা চালু করার প্রয়োজন রয়েছে। শুরুতে গার্মেন্ট ও চামড়াশিল্পের শ্রমিকদের এই স্কিমে যুক্ত করা যেতে পারে। পরে অনানুষ্ঠানিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, গৃহকর্মীসহ পর্যায়ক্রমে সবাইকে এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। বেসরকারি নিয়োগকর্তাদেরও এখানে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে কর্মীদের প্রিমিয়ামের সমান অংশ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা যুক্ত করা গেলে এই পেনশন লেনদেন স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে। এই পেনশন তহবিল দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থ জোগান দিতে সক্ষম হবে। তা ছাড়া কর্মীদের স্বাস্থ্য, পরিবহন, শিশুসেবাসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দিকেও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

[email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ