ঈদ উৎসব

  সুপান্থ মল্লিক

০৩ জুন ২০১৯, ২০:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

পাশ্চাত্যে বড়দিন আসে যেমন সবার জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে, এক আনন্দমুখর  উৎসব রূপে। ঈদ কিন্তু তেমনই নিছক কোন উৎসব নয়। ঈদে ব্যক্তিগত আনন্দ বা স্ফুর্তির যে আমেজ, তার চেয়ে বেশী সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে সামগ্রিক সন্তুষ্টি। ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে ঈদের আনন্দে রয়েছে সামষ্টিক সন্তুষ্টির আবহ। তাই ‘ঈদ’ সর্বজনীন উৎসব। ঈদ বিশ্বজনীন মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক মহা আনন্দ উৎসবের দিন।

যখন মুহাম্মাদ(সাঃ) মদীনায় হিজরত করেন তখন তিনি দেখলেন যে, সেখানকার জনসাধারণ নাইরোজ (নওরোজ) ও মেহেরজান নামে দু’টি আনন্দ উৎসব পালন করে। এ সময় সাহাবাগণ মুহাম্মাদ এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কী কোন উৎসবে অংশগ্রহণ করবো?

মুহাম্মাদ (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ঠ দিবস দান করেছেন। একটা ঈদুল ফিতরের দিন, আরেকটি ঈদুল আযহার দিন’। আরবি ক্যালেন্ডারের রমজান মাসে, এক মাস সিয়াম বা রোজার রাখার পরই ঈদুল ফিতরের দিন। ‘সুশৃঙ্খল আচার-আচরণ’র শিক্ষা নিয়ে ‘ঈদ’ আসে। আসে আত্মশুদ্ধির সীমানা পেরিয়ে। সামষ্টিক কল্যাণ-চেতনার বিস্তৃত মোহনায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে।

এক কথায়, ব্যক্তির আনন্দকে ছাপিয়ে সমষ্টির আনন্দ ধারণ করে, এমনকিই নির্দিষ্ট সমাজে সংকীর্ণ গন্ডী ছাড়িয়ে যে সমগ্র মানব সমাজ বা উম্মাহ্ তার সুখ-শান্তির সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ঈদ আসে। তাই ঈদের আনন্দে নেই ব্যক্তিগত উচ্ছাস। নেই কোন বাঁধনছাড়া গতি। নেই অসংলগ্ন কোন ছন্দ। ঈদ একদিকে যেমন আনন্দঘন এক উৎসব, তেমনি সবাইকে সাথে নিয়ে আনন্দমুখর এক অনুষ্ঠানও।

উৎসবে বেদনার কোন ছাপ থাকে না থাকে না কর্তব্যেরও কোন গুরুভার। অনুষ্ঠানে দুই-ই থাকে। ঈদের খুশিকে এই আলোকেই দেখা হয়। দেখা হয় ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির মূহূর্ত রূপে। দেখা হয় ব্যক্তির সাথে সাথে সমষ্টির আনন্দঘন প্রিয় সময় রূপে। দেখা যায় পরম করুণাময়ের  প্রতি কৃতজ্ঞতা ভরা সন্তুষ্টি হিসেবেও! আর এ জন্য ঈদের আবেদন এত গভীর!

বাংলাদেশে এবারের ঈদ এসেছে অনেকটা মেঘেঢাকা ম্লান চাঁদের আলোর মত। আলো বটে, কিন্তু কুণ্ঠায় আচ্ছন্ন যেন! অনিশ্চয়তার অবগুণ্ঠণে ঢাকা। উদার আকাশে ভীরু চাঁদও কম্পমান আলোর মত! কেন এমন হলো? এর রয়েছে অনেক কারণ। সত্যি বটে, ঈদ হল আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার এক মহা আনন্দের উৎসব। ধনী-দরিদ্র সবার জন্য আনন্দঘন দিনটি। পল্লী এবং শহরাঞ্চলের সবাই এই অনুষ্ঠানে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। উচ্ছাসিত হয়ে ওঠেন শিক্ষিত এবং নিরক্ষরদের সবাই।

সবাই এই দিনে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে পেতে চান। ঈদের আনন্দে কাটাতে চান আপনজনের সাথে। সন্তানরা দূর থেকে ছুটে যায় মা-বাবর নিকট। স্বামী ছুটে আসে প্রিয়তমা স্ত্রীর নিকট। বাবা হাজারো প্রতিবন্ধকতা জয় করে ছুটে আসেন সন্তানদের কাছাকাছি। সবাই ভাগাভাগি করে নিতে চায় ঈদের আনন্দকে।

ঈদের জামায়াতে ছোট-বড় এক সাথে কৃতজ্ঞতা জানায় সৃষ্টিকর্তার নিকট। বাবা ছোট্ট শিশুটির হাত ধরে যোগ দেন ঈদের জামায়াতে। নামাজ শেষ হলে সবাই কোলাকুলি করে আপন করে নিতে চায় সবাইকে।  মুরুব্বীদের সালাম জানিয়ে তাঁর দোয়া কামনা করে। সুখ-দুঃখের আলাপচারিতায় সবাই সব জ্বালা-যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে আনন্দ অনুভব করেন এক বেহেশতি সুখ। সমগ্র সমাজব্যাপী ঈদের আনন্দ গড়িয়ে পড়ে আহ্লাদ-প্রেম প্রীতির অঝোর ধারায়। প্লাবিত করে সমাজ জীবনের চারদিক।

শুধু কি তাই! ঈদ উপলক্ষে সবাই প্রিয়জনের হাতে কিছু না কিছু তুলে দিয়ে তৃপ্ত হতে চায়। মা-বাবার জন্য নতুন কাপড়-চোপড়, ছেলেমেয়ের জন্য নতুন জামা-কাপড়, আত্মীয়-পরিজনদের হাতে কিছু উপহার সামগ্রী তুলে দেয়া একটা রেওয়াজ চলমান। ঈদের দিন ভাল খাবার তৈরি তো আছেই। সবাই এদিন, সবার সাথে খাবার-দাবার ভাগ করে খেতে চায়, আপন-পর ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে শত্রুও এ দিন মিত্র হয়ে ওঠে !

এই দিন সবাই ছোঁটেন প্রিয় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ-খবর করতে। দরিদ্র ভিখারীও ঈদের দিনে ফিতরা লাভ করে, তাদের ভাঙ্গাঘরকে আনন্দমুখর করতে প্রস্তুত হয়! দেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও আদরে আপ্যায়িত হন। সব ভেদাভেদ যেন এদিন মুছে যায়। সবাই এক কাতারে এসে ঈদের আনন্দে ভাগ বসায়।

কিন্তু ঐ যে বলেছি, এবারের ঈদের চাঁদ যেন ম্রিয়মাণ। চাঁদের আলো নেই প্রত্যাশিত ঔজ্জ্বল্য। ঈদের জামায়াতে  যাওয়ার সময়ও এক ধরনের সন্দেহ, দ্বিধা সবার মনকে দ্বিধাগ্রস্থ করছে! দেশে গত বেশ ক’বছর  থেকে ধর্মের নামে মৌলবাদী গোষ্ঠী ও বিপদগামীরা শান্তি এবং সাম্যের ধর্ম ইসলামের লেবাস পরে জঙ্গীবাদের ঘৃণ্য প্রচারে ব্যস্ত। ইসলাম যা আদৌ সমর্থন করে না, মূলত যা ঘৃণা করে তাই করছে এই মৌলবাদী ও জঙ্গী গোষ্ঠীরা!

অসাধু ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায়, কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতায়, দ্রব্যমূল্যে যে উর্ধ্বগতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সমগ্র নিু ও নিু মধ্যবিত্ত সমাজে সৃষ্টি করেছে তীব্র অসন্তোষ! অনেক ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। কিন্তু ঈদের সময় প্রত্যেকে কিছু না কিছু কিনতেই হয় প্রিয়জনের মুখে আনন্দের হাসির জন্য; অত্যন্ত উঁচু দাম হলেও যার যা সামর্থ!

তারপরও এ দেশে বাঙালির ঘরে আজ ঈদ এসেছে। যাদের অর্থ আছে, নিরাপত্তা আছে তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু এ দেশের নব্বই ভাগ মানুষের সেই অর্থ-বিত্ত নেই, নেই সে নিরাপত্তাও। তবে, ‘ঈদ উৎসব’ কিন্তু তারা করবেনই; হোক না তারা বেকার অথবা আধা-বেকার অথবা বঞ্চিত।

দূর-দূরান্ত থেকে তারা আত্মীয়-পরিজনদের কাছে পৌঁছবেন, চড়া দামে লন্স,ট্রেন-বাসের টিকিট কিনে অথবা ছাদে কোন রকমে ঠাঁই করে নিয়ে ঠাসাঠাসি করে হলেও। তাদের জানা নেই, দেশের বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির চড়াই-উৎরাই এ - কিভাবে এ দেশের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হয়! মূল্যবৃুদ্ধির বিষয়টি সাময়িক-কর্তাব্যক্তিদের এমনি সান্ত¡না সূচক কথার কোন মূল্য নেই তাদের নিকট। কি ভাবে বাংলাদেশ দূর্নীতির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান অধিকার করছে- সে সম্পর্কেও তারা অজ্ঞ অথবা উদাসীন। প্রতিটি মূহূর্তে যাদের নিকট বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত থাকার মুহূর্ত, তারা চান এসব কিছু ভূলে গিয়ে ঈদের দিনে আত্মীয় স্বজনের মুখে একটু আনন্দের হাসি দেখে খুশি হতে!  

ভূলতে চান প্রতিদিনের জীবনযন্ত্রনা। নিজেদের সাধ্যমত সাজাতে চান নিজেদের সংসারটাকে, মাত্র ক’টা দিনের জন্য। ঈদের দিনে নিজেরা ভাল খেতে চান। খাওয়াতে চান আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবদের। কিন্তু, আফসোস ! তপ্ত বাজারের উত্তাপে তাদের সব আশা শুকিয়ে যায়। কর্পুরের মত বাতাসে উড়ে যেতে চায় এক লহমায়!

তারপরও তাদের ঘরে ঈদ এসেছে। ঈদ এসেছে ঈদের দিনের সহাস্য সম্ভাষণ এবং উষ্ণ কোলাকুলির ডালা সাজিয়ে। পিতার হাতে কোমল ছোট্ট আঙুলগুলো গালিয়ে ছোট্ট শিশুটিরও ঈদের জামায়াতে যোগদানের দাওয়াত নিয়ে ঈদ এসেছে।

প্রিয়জনের কল-কোলাহলে ছোট্ট ঘরটি মুখরিত করার অঙ্গীকার নিয়ে ঈদ এসেছে। আল্লাহ্র কাছে আমাদের ঐকান্তিক কামনা, সবার জন্য আসুক ঈদের আনন্দ। সবার মুখে হাসি ফুটুক এদিনে। সব জ্বালা-যন্ত্রণা ভুলে, সব ব্যাথা-বেদনা শিকেয় তুলে রেখে, সবাই সবার বুকে বুক মিলাক। আনন্দের বন্যায় ভেসে যাক দৈন্য-দুঃখের আবর্জনা।

স্বজন-প্রিয়জন-পরিজনের কলকাকলিতে ভরে উঠুক সবার ঘর-সংসার। ঈদের আনন্দে বিভোর হোক এ দেশের সবাই। সবার ঘরে ঘরে ‘নতুন ঈদ’ আসুক। বিনম্র পদভারে আসুক, অনাবিল খুশির আনন্দের ডালা সাজিয়ে, সকলের আরও কল্যাণ হোক; প্রিয় পাঠক, সকলকে ঈদ শুভেচ্ছা।

প্রেরক: সুপান্থ মল্লিক
লেখক:  প্রাবন্ধিক ও সংগঠক
ই-মেইল: [email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ