নব কলেবরে নরেন্দ্র মোদি

  জয়ন্ত ঘোষাল

০৩ জুন ২০১৯, ১০:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এলো। রাষ্ট্রপতি ভবনের চূড়ায় নানা রঙের আলোর ঝলকানি। এক সাধারণ ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সামনে উপবিষ্ট হয়ে দেখলাম দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের খেলা শুরু করতে আসরে নেমেছেন। মোদি শপথ নেওয়ার পর এক এক করে অন্য মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করলেন এবং তৈরি হয়ে গেল নরেন্দ্র মোদির লোকসভা।

এই মন্ত্রিসভা গঠন যা-ই হোক না কেন, একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট, সেটি হলো এটি নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা। নরেন্দ্র মোদিই হলেন সেই সর্বোচ্চ নেতা, যিনি দেশের রাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রশাসনিক অভিমুখ নির্ধারণ করেন। তিনি একাই এক শ। তাঁকে নানা দিক থেকে নানাভাবে পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা  আবিষ্কার করে চলেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি হলেন দক্ষিণপন্থী পপুলিস্ট নেতা। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তিনি যথেষ্ট উদারবাদী নেতা, বহু ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকেন, যেগুলো গরিব মানুষকে লক্ষ রেখে। সেই সামাজিক প্রকল্পগুলো একটা জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। তাই নরেন্দ্র মোদি নামক রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিত্বে আছে অনেক ধরনের শেড, অনেক ধরনের স্তর।

তাই মোদি তাঁর মন্ত্রী বাছাইয়ের জন্য কী কী বিষয় বা পূর্বশর্ত (ঢ়ত্ব পড়হফরঃরড়হ) দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন? প্রথমত তিনি কর্মক্ষম ক্ষিপ্র মন্ত্রী চেয়েছেন, যিনি ওঁর সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে দৌড়াতে পারবেন, যিনি সৎ হবেন; জনসমাজে যার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। অরুণ জেটলি স্বাস্থ্যের কারণে সরে দাঁড়ানোয় ‘বিগ ফোর’ মানে স্বরাষ্ট্র-অর্থ-বিদেশ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রকগুলোকে মোদিকে রদবদল করতে হয়েছে। সুষমা স্বরাজও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবারের নির্বাচনে লড়েননি। তাই এই দুই শূন্য পদে নির্মলা সীতারমনকে অর্থমন্ত্রী করে রাজনাথ সিংকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী করেছেন মোদি। অমিত শাহ হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর প্রাক্তন বিদেশসচিব জয়শঙ্কর হলেন বিদেশমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আর বিদেশ মন্ত্রকে এবার অগ্রাধিকার কী হবে, নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তি চয়ন থেকে সেটাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত পুলওয়ামা আক্রমণ এবং বালাকোটে পাল্টা হানার পর ভারতের বিদেশনীতি এবার দ্রুতগতিতে এগোবে। ভারত পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করলেও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। আমেরিকার সঙ্গেও দ্রুত বাণিজ্য নিয়ে যেসব মার্কিন দাবি, তা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করবে। রাশিয়া, ফ্রান্স ও অন্য ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এমনকি ধীরে ধীরে আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গেও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ রোধে কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে ইমরান খান আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। এ ধরনের জটিল কূটনীতির জন্য জয়শঙ্করের মতো বিদেশমন্ত্রীর বিশেষ প্রয়োজন ছিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

আবার অমিত শাহ, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট কাশ্মীরি জঙ্গি বা বিদেশি সন্ত্রাসবাদীদের নির্মূল করে দেওয়ার জন্য সংকল্প নিয়েছেন মোদি-অমিত শাহ। মোদি আর অমিত শাহর মধ্যে এক গুরু-শিষ্য সম্পর্ক আছে। কাশ্মীর অমিত শাহর জন্য এক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবেই। নেহরুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বল্লভ ভাই পটেল। বাজপেয়ির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন লালকৃষ্ণ আদভানি। নর্থব্লকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পটেলের এক বিশাল সাদাকালো ছবি আছে। এই বিশাল ছবিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ আজ। কারণ আদভানি জিততেন গাধীনগর থেকে, অমিত শাহও এলেন সেই আসন থেকে আদভানির রেকর্ড ভেঙে আরো বেশি ভোটে। অমিত শাহর মতো আদভানিও একদিন দলের সভাপতি ছিলেন। ভয়ংকর পরিশ্রমী অমিত শাহ। আমি নিজে দেখেছি ওর হাই সুগার। চপারে বসে ইনসুলিন ইনজেকশন নিয়ে দৌড়াচ্ছেন ভোটের প্রচারে। তাই অমিত শাহ হলেন ম্যান অব অ্যাকশন। তাঁর লক্ষ্য হবে ৩৭০ ধারা আর ৩৫-বি নিয়ে আশু আলাপ-আলোচনা শুরু করা। রাজ্যসভায় বিজেপির আসনসংখ্যা এখনো বেশ কম। বিজেপি রাজ্যসভায় এখনো সংখ্যালঘু। তাই ৩৭০ ধারা নিয়ে বিল এলেও এখনই পাস করাতে পারবেন না। তাই বিজেপি নেতা অমিত শাহ অপেক্ষা করবেন রাজ্যসভায় কত দ্রুত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা যায় তার জন্য। কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের চরিত্রও অনেকটা বদলে গেছে। হুরিয়ত নেতারা আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক নন। তবে জায়গায়-জায়গায় উপত্যকার কোণে কোণে অনেক যুবক জঙ্গি নেতা তৈরি হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার চেষ্টাও করেছিলেন রাজনাথ সিংহ। তখন মেহবুবা মুফতির সঙ্গে বিজেপির যৌথ সম্পর্ক ছিল। সমঝোতা আজ আর নেই। অমিত শাহর প্রাথমিক কৌশল হবে আগে ডাণ্ডা মেরে এই জঙ্গিদের ঠাণ্ডা করা। চাপে পড়লে তবেই ওই যুবকরা আলাপ-আলোচনার পথে আসতে পারে। সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান দীনেশ্বর শর্মাকে রাজনাথ সিংহ মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই দীনেশ্বর শর্মার সঙ্গে অমিত শাহ কথা বলবেন, যাতে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতাভিত্তিক রিপোর্টটি বুঝতে পারেন। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, পুলিশের আধুনিকীকরণ, বে-আইনি অনুপ্রবেশ, জাল ভিসা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো, পাকিস্তান ও চীনের তৎপরতা এসব বিষয় অমিত শাহ বিচার-বিশ্লেষণ করবেন। তা ছাড়া গোয়েন্দা বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় গঠন করাও হবে অমিত শাহর অন্যতম লক্ষ্য। আইএএস, আইপিএস এদের বদলি ও নিয়োগ  নীতিতে সংস্কার প্রয়োজন।

তাই জয়শঙ্কর ও অমিত শাহ এই দুই মন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয় মোদির জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয়। একজন কট্টরবাদী রাষ্ট্রবাদের পথে যাবেন, অমিত শাহ, আর অন্যজন বসুধৈব কুটুম্বাকো বলে বিশ্বভ্রাতৃত্বের কথা বলবেন, তিনি জয়শঙ্কর। আর দুজনে আসলে নরেন্দ্র মোদির জন্য কাজ করবেন। এর পাশাপাশি মোদি তাঁর পুরনো টিমকে রেল, পরিবহন, তথ্য-প্রচার, পেট্রোলিয়াম, তথ্য-প্রযুক্তি এসব মন্ত্রকেই রেখেছেন। ফলে পীযূষ গোয়েল, রবিশঙ্কর, নীতীন গড়কড়ি, প্রকাশ জাভড়েকর, ধর্মেন্দ্র প্রধান সবাই আছেন। যাঁদের মন্ত্রীর পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁরা বিদ্রোহ করেছেন—এমন কোনো নজির দেখা যায়নি। অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে সিকন্দর বখতকে বিদেশমন্ত্রী করেছিলেন এবং কেন তাঁকে অর্থমন্ত্রী করা হবে না, সেই গোসসায় তিনি সাউথ ব্লকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে আসেননি প্রথম দু-তিন দিন। মোদি জমানায় এ রকম দৃশ্য অকল্পনীয়। যশবন্ত সিনহা, অরুণ শৌরি, আর শত্রুঘ্ন সিনহা বিদ্রোহ করতে গিয়ে দল ছাড়া হয়েছেন।

অনেকে বলেন, মোদি আসলে স্বৈরতন্ত্রী। এ এক অঘোষিত জরুরি অবস্থা, তাই বিবিধ কণ্ঠস্বর নেই। কিন্তু আমার মনে হয়, যাঁরা এটা বলেছেন তাঁরা ঠিক কথা বলছেন না। আসলে দেশের কোটি কোটি মানুষ এখনো মোদির প্রতি অগাধ আস্থা রাখে। তাঁকে বিপুলভাবে ভোট দেয়, আর সেই মানুষের ভোটে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বলেই তাঁর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব এত মজবুত। মানুষের বিপুল সমর্থনে তিনি ‘মোদি’, আর তাই কতিপয় মানুষ যদি নিজেদের স্বার্থে ঘা লাগায় মোদি বিরোধিতা করতে যান, তবে তাঁরাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। মানুষ তাঁদেরই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবেন। আর তাই এ হলো মোদি সরকারের এক নতুন অধ্যায়। নব কলেবরে নরেন্দ্র মোদি।

লেখক:সাংবাদিক, কলাম লেখক

এই বিভাগের আরো সংবাদ