ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ

  মো. নুরুল আনোয়ার

০২ জুন ২০১৯, ১১:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

বিশ্ব মুসলিমদের সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলমানরাও এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনার শেষে মহা আনন্দের সঙ্গে ঈদুল ফিতর উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গ্রামবাংলায় ছেড়ে আসা স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হতে তারা ছুটে যায় গ্রাম, মফস্বল বা অন্য নগরীর পানে। অনুমান করা হয়, একমাত্র ঢাকা ও এর আশপাশ থেকেই দেড় কোটি মানুষ বহির্মুখী হয়। অন্য শহরগুলো থেকেও একইভাবে মানুষ ছুটে নিজ বাস্তুভিটায়। ঘরমুখো মানুষ ছুটে সড়কে, ট্রেনে, জলপথে এবং বায়ুপথে। অনেকের জন্য যাত্রাটি চরম আনন্দের হলেও কিছু মানুষ ও পরিবারের জন্য হয়ে দাঁড়ায় চির অন্ধকারের, চরম বেদনার—যা কখনো ঘোচার নয়। অভিজ্ঞতা বলে, ঈদ যাত্রা এবং ফেরতযাত্রায় আমাদের কিছু আপনজন না-ফেরার দেশে চলে যান।

২০১৮ সালে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ছয় হাজার ৪৮টি, নিহতের সংখ্যা সাত হাজার ২২১ জন, আহতের সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি। আহতের প্রকৃত সংখ্যা কখনো জানা যায় না। কারণ আহতরা নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা নিতে চলে যায়, পুলিশে রিপোর্ট করার জন্য অপেক্ষা করে না কেউই।

অন্যদিকে ২০১৮ সালে জলপথে সংঘটিত দুর্ঘটনায় মৃত ১২৬ জন, আহত ২৩৪, নিখোঁজ ৩৮৭ জন।

রেলপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩৭০টি। এর মধ্যে নিহত ৩৯৪, আহত ২৪৮ জন। উল্লেখ্য যে দুর্ঘটনার সংখ্যার মধ্যে প্রকৃত রেল দুর্ঘটনা ৩১টি (যেমন—লাইনচ্যুত হওয়া) অবশিষ্ট রেলে কাটা পড়া, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া বা ফেলে দেওয়া এবং হত্যা করে লাশ রেললাইনে ফেলে রাখা। বায়ুপথে পাঁচটি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, মৃতের সংখ্যা ৩৩ জন। সেটা নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে।

উল্লিখিত তথ্যগুলো National committee to protcet Shipping, Roads and Railways (NCPSRR) কর্তৃক সংগৃহীত এবং প্রকাশিত। তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সড়ক ও মহাসড়কগুলো বিভীষিকাপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে রেলপথের প্রকৃত দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বিমান মাঝেমধ্যে বিভ্রাট করলেও নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ঘটনা ছাড়া নিহতের ঘটনা নেই। জলপথে লঞ্চ বা জলযানডুবির ঘটনাও তুলনামূলকভাবে কম।

NCPSRR সড়ক দুর্ঘটনার ওপর গবেষণামূলক একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক অশীষ কুমার দে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী প্রধান কারণগুলোকে এভাবে চিহ্নিত করেছেন—১. অতি দ্রুতবেগে চালানোর প্রবণতা ২. পাল্লা দিয়ে চালানো, ৩. দৈনিক চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো, ৪. বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানো, ৫. ত্রুটিযুক্ত ব্রেক, ৬. সড়ক-মহাসড়কে আনফিট গাড়ি নামানো, ৭. ওভারলোড, ৮. ওভারটেকিং, ৯. ট্রাফিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা, ১০. মহাসড়কে তিন চাকা ও স্থানীয়ভাবে তৈরি মোটরযান চলাচল, ১১. পথচারীদের উদাসীনতা, ১২. চলন্ত অবস্থায় চালক এবং পথ চলাকালে পথচারীদের মোবাইলে কথা বলা,  ১৩. চালকদের ক্লান্তি বা অসুস্থতা, ১৪. মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালানো, ১৫. সংশ্লিষ্টদের ধর্ষণ প্রবণতা। উল্লিখিত কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য মূলত দায়ী যানচালক, সঙ্গে পরোক্ষভাবে মালিকরা। ৬০ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে অদক্ষ এবং অযোগ্য চালকদের জন্য, ২০ শতাংশ মালিকদের জন্য, ১০ শতাংশ পুলিশ, বিআরটিএ এবং কর্তৃপক্ষের জন্য, ৫ শতাংশ পথচারী এবং ৫ শতাংশ ভবিতব্য। চালকদের বিষয়টি পরিষ্কার। মালিকদের দায় তিনটি কারণে, যেমন—অদক্ষ চালক নিয়োগ, চালককে দৈনিক চুক্তিতে গাড়ি দেওয়া, সড়কে চলাচলের জন্য যানটি ত্রুটিমুক্ত না রাখা।

সব দিক বিবেচনায় দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার মূল কুশীলব চালকরা। বিআরটিএর তথ্য মোতাবেক দেশে নথিভুক্ত যানবাহনের সংখ্যা তিন লাখ ৫০ হাজার এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা দুই লাখ ৬০ হাজার। ৯০ হাজার লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের ঘাটতি আছে। অর্থাৎ লাইসেন্স ছাড়াই ৯০ হাজার চালক গাড়ি চালাচ্ছে। এ অবস্থা কর্তৃপক্ষের এবং সংশ্লিষ্টদের গোচরে থাকলেও উত্তরণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। পেশাদার চালকের প্রয়োজন প্রতিদিনই বাড়ছে। কিন্তু অর্থনীতি সচল রাখার জন্য মোটরযান চালক এবং মেকানিক তৈরির তেমন কোনো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেই। বিআরটিসি স্বল্প পরিসরে চালক প্রশিক্ষণের কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। বেসরকারি কয়েকটি ড্রাইভিং স্কুল আছে, যা একদিকে মানসম্মত নয়, আবার যথেষ্টও নয়। ঢাকায় একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সরকারি ড্রাইভিং ও মেকানিক প্রশিক্ষণ স্কুল, বিভাগীয় শহরগুলোতে একটি করে একই রূপ স্কুল চালু করা কি যায় না? বাস্তব সিলেবাসসম্মত ছয় মাস মেয়াদের কোর্স শেষে এই স্কুলই পরীক্ষা পরিচালনা করে লাইসেন্স দিতে পারে। যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, লাইসেন্স দেওয়া, দুর্ঘটনাকবলিত ঘটনাস্থলে গমন এবং গাড়ি পরিদর্শন ইত্যাদি বিআরটিএর দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না এবং দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশও নেই।

গত বছর ঢাকার আলোড়নকারী সেই সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রভাবশালীদের চাপে বিপুলসংখ্যক আনফিট বাস এবং অন্যান্য যানকে ফিটনেস সনদ দিতে হয়েছিল ঈদের আগেই। পত্রিকার সংবাদ মোতাবেক প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে ফিটনেস সনদ দিতে হয়। অথচ এ সময় উন্নত বিশ্বে গাড়ির ফিটনেস যান্ত্রিকভাবে হয়। মেডিক্যাল রিপোর্টে সময় লাগে ৩০ মিনিট, আমাদের বাসগুলো ম্যানুয়াল পরীক্ষায় কমপক্ষে এক ঘণ্টা প্রয়োজন। সেভাবে পরীক্ষা নিয়ে সনদ দেওয়ার সময় ও সুযোগ কোথায়? চোখে দেখারও তো পরিবেশ নেই। চালিয়ে পরীক্ষা করবে কখন ও কোথায়? এবার আসি চালকদের লাইসেন্স ইস্যুর আগে ড্রাইভিং টেস্ট কিভাবে করবে? একেকজন প্রার্থীর একেক ধরনের লাইসেন্স দরকার, যেমন—মোটরসাইকেল, কার, জিপ, পিক-আপ, ৩ থেকে ৩০ টনি লরি, কনটেইনার লরি, পে-লোডার ক্রেন-এসব পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বিআরটিএ যানবাহন কোথায় পাবে। এটা কি আমরা ভেবে দেখেছি?

এবার দৃষ্টি দিই আসন্ন ঈদ যাত্রার দিকে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে মেঘনা ও গোমতী সেতু ছিল আতঙ্কের নাম। দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতুর নির্মাণ শেষ হয়েছে এরই মধ্যে। সেতু দুটি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে—এটি বড় সুখবর। অন্যদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল হয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ ২৬টি জেলার ৯০টি রুটের অগণিত যান চলাচল করে। এই পথের ৭০ কিলোমিটার পুল, ব্রিজ, উড়াল সেতু নির্মাণাধীন থাকায় বিগত ঈদগুলোতে অবর্ণনীয় যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। উত্তরবঙ্গবাসীর জন্য সুখবর হচ্ছে, গাজীপুরের কোনাবাড়ী এবং চন্দ্রা ত্রিমোড়ের উড়াল সেতু ও আন্ডারপাস যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। কিছুটা স্বস্তি আসবে সড়কে। মনে রাখতে হবে, মেঘনা-গোমতী ব্রিজের টোল প্লাজাকে গতিশীল করতে না পারলে সুফল প্রত্যাশা মোতাবেক পাওয়া যাবে না। সঙ্গে একটা বিষয় সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে, ঢাকা শহরের অর্ধসচল বাসগুলোর মুখে ফেস পাউডার মেখে যেন ঈদের যাত্রী পরিবহন না করে। কারণ এগুলো সড়কে অচল হয়ে গেলে পথে কারবালা নেমে আসবে। শেষ কথা হচ্ছে, ঈদ যাত্রা এবং ফেরতযাত্রায় আমরা প্রাণহানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার সব উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নেব।

লেখক : সাবেক আইজিপি

এই বিভাগের আরো সংবাদ