২৩ মে বোঝা যাবে ভারতবর্ষ কোন পথে এবং কোন দিকে

  সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

০৪ মে ২০১৯, ১৩:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

আর মাত্র ২০-২১ দিন বাকি। তারপরই বিশ^ব্যাপী জানতে পারবে আগামী পাঁচ বছর ভারত কোন দিকে। সাত-দফার মধ্যে ইতোমধ্যে চার-দফা ভোট হয়ে গেছে। ভোটারদের রায় এখন ইভিএম বন্ধী। গত তিন মাস ধরে প্রচারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুরুতে বিজেপি’র হয়ে ভোট চাইছিলেন। গত তিন-চার সপ্তাহ ধরে সারাদেশে ভোট প্রচারে চষে বেড়িয়ে সর্বত্র বলছেন- আপনারা মোদিকে ভোট দিন। মোদি, মোদি, মোদি- ছাড়া দেশের কোনো বিকল্প নেই। মোদি একমাত্র ব্যক্তি যিনি হিন্দু, হিন্দু ও হিন্দুত্ববাদ কায়েম করতে পারেন। বালাকোট কাণ্ডের পর তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সন্ত্রাসবাদীরা আর কাশ্মীর সীমান্তে বিশেষ কিছু বড় ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারছে না। মোদির এই আত্মপ্রচার দেখে ভারতের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মোদিকে জার্মানির নাৎসী নায়ক হিটলারের সঙ্গে তুলনা করছেন। মোদির এই আত্মপ্রচার দেখে নাম বলতে অনিচ্ছুক একাধিক বিজেপির প্রবীণ নেতারা বলছেন- মনোনয়নের সময়ও তিনি বিজেপির জন্মদাতা লালকৃষ্ণ আদভানী ও ড. মুরালী মনোহর যোশীকে মনোনয়ন না দিয়ে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে এখন একনায়কতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছেন। মোদির এখন আসল উদ্দেশ্য হলো- যেনতেন প্রকারের চাই নির্বাচন কমিশন, চাই কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়ে ২৪৪টি আসন লাভ করতে। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর এবং তার সহযোগী বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ্ এ পর্যন্ত তাদের বক্তব্যে ৭৫৬ বার নির্বাচনবিধি ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে- ৪৪২টি অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে জমা পড়েছে। ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরার কাছে গিয়ে ২১টি বিরোধী দল বারবার অভিযোগ করেছে- মোদি, অমিত শাহ্দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
কমিশন সূত্রে বলা হয়, তারা মোদি ও অমিত শাহ্কে নির্বাচনবিধি ভঙ্গের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। কমিশন এ-কথাও বলেছে, নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর নাম ব্যবহার করা চলবে না। মোদি তাতে গুরুত্ব দিতে নারাজ। মোদির গোয়েবলস্রা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে চিৎকার করে বলছেন- মোদি, অমিত শাহ্ আইনের ঊর্ধ্বে। গোয়েবলস্দের দাবির উত্তরে কংগ্রেসের মুখপাত্র অভিষেক মনুসিংভী, যিনি ভারতের শীর্ষ আদালতের একজন প্রথমসারির আইনজীবী- অভিযোগ করেছেন, ১৯৫১ সালে ভারতের নির্বাচনবিধি অনুযায়ী এবং ভারতের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার, তারও পরে না মোদি না অমিত শাহ্। বিষয়টি এখানেই থেমে নেই। সোমবার (৩০ এপ্রিল) ভারতের শীর্ষ আদালতে মোদি ও অমিত শাহ্র বিরুদ্ধে আইনভঙ্গের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন।
বিংশ শতাব্দী তো বটেই, একবিংশ শতাব্দীতেও যেসব ভোট হয়ে গেছে, এবারের মতো এত নিকৃষ্টমানের প্রচার আর কখনও দেখা যায়নি। যেমন- জাত-পাত। ভারতের কোনো মানুষ জানতে চাননি তিনি অর্থাৎ মোদি কোন জাতের। কিন্তু মোদি নিজেই বললেন, তিনি OBC অর্থাৎ পিছলে পড়া জাত। আবার কখনও বললেন তিনি দলিত আবার কখনও বললেন তিনি ঠাকুর। বিরোধীরা তাকে চেপে ধরে বলেছেন, আপনার কাছে কেউ তো জানতে চায়নি আপনি কোন জাত? তবে কি ভোটব্যাংকের দিকে নজর রেখে নিজের জাত নিয়ে ব্যস্ত হয়েছেন? এ প্রশ্নের জবাব মোদি বা অমিত শাহ্রা দেননি। কারণ এটা তো গুজরাটী বেনেদের ব্যবসা।
প্রচারে বৃহত্তর দল হিসেবে কংগ্রেস নেতা-নেত্রীরা বলছেন, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ন্যায়’ নামক যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, ক্ষমতায় এলে তারা তা বাস্তবায়িত করবে। ন্যায়ের মধ্যে পড়ছে বিজলী, সড়ক, পানি, রোটি, কাপড়া ও মকান- এই ছয়-দফা ছাড়াও তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বেকার সমস্যা দূর করা। গরিব পরিবারগুলোকে মাসে ৬ হাজার ও বছরে ৭২ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
প্রথম চার-দফার নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে; কিন্তু সারা ভারতে কোনো রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের মতো বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, গুলি, বোমা, লাঠি আর কোনো রাজ্যে হয়নি। এমনকি চতুর্থ দফা ভোটে সোমবার দিন দেখা গেল রাঢ় বাংলার ৮টি কেন্দ্রেই বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে গুলি, বোমা, পিস্তল, লাঠি কি নেই, নির্বাচন কমিশন একাধিক জায়গায় নির্বাচন স্থগিত রেখে পুনরায় নির্বাচনের নির্দেশও দিয়েছেন। কেন মমতার রাজত্বে কোনো নির্বাচনই শান্তিপূর্ণভাবে হয় না? এ-ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমপ্রকাশ মিশ্র সরাসরিভাবে বলেন, আসলে দিদি ভয় পেয়ে গেছেন। দিদি বঙ্গেশ্বরী অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে থেকেই নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা বারবার প্রকাশ করেছেন। দিদি সাম্প্রদায়িক প্রচারের জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দুই অভিনেতাকে নিয়ে এসেছিলেন। তারা উত্তরবঙ্গের সংখ্যালঘু অঞ্চলে বেশ কয়েকদিন প্রচারও করেছেন। ঢাকা ও দিল্লির হস্তক্ষেপের পর ঐ দুই অভিনেতাকে ঢাকা ফেরত পাঠানো হয়। শুধু চলচিত্র জগতের লোকই নয়, বাংলাদেশে গত বছর ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে মমতার আশ্রয় আশ্রিত কয়েক হাজার জামাতকে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। দুদেশের গোয়েন্দারা জামাতদের আটকে দিয়েছে। বিদেশিদের এনে ভোটের প্রচারের কাজে কেন দিদি লাগাতে গেলেন? এ-ব্যাপারে দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাবেক সহযোগী সম্পাদক তরুণ গাঙ্গুলি বলেন, আসলে যে বিজেপি’কে হাত ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গে এনেছিলেন সেই বিজেপি’কেই তিনি ভয় পেয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন কংগ্রেস ও বামপন্থি দলকে নিশ্চিহ্ন করে তিনি বিজেপির বাড়-বাড়ন্ত ঘটাবেন। তরুণ বাবু আরও বলেন, কথায় বলে খাল কেটে কুমির আনা মমতা যে ঐতিহাসিক ভুল করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতে হবে। হঠাৎ করে বঙ্গেশ্বরী ব্যক্তিগত আক্রমণ করে প্রচারে বলে ফেললেন- মোদি ও তার স্ত্রী যশোদা বেনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। মোদি আলাদা থাকেন, বিজেপিও ছাড়ার পাত্র নয়। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি দিলীপ ঘোষ ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মমতার একদা ঘনিষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত আইএস অফিসার দীপক ঘোষ তার বইতে লিখেছেন- মমতা বিবাহিত এবং তার একটি পুত্রসন্তান আছে। তার স্বামীর নাম রণব্রত ঘোষ। ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন আগে তিনি মারা গেছেন। দিলীপবাবু মমতার মতোই কুৎসিত ভাষায় কথা বলতে খুবই পটু। তাই তিনি বলেন, মমতা এখন বিধবা।

যাই হোক সব প্রচার, অপপ্রচার, নিন্দা, কুৎসা- সব কিছুর অবসান হবে ২৩ মে। সেদিনই বোঝা যাবে ভারতবর্ষ কোন পথে এবং কোন দিকে।

লেখক : সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত, কলকাতা

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food