তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ

  সাইফ চৌধুরী

২৭ এপ্রিল ২০১৯, ১২:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নগুলো এখন দৃশ্যমান। যেমন- পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, তৃতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর পায়রা, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন রূপপুরে দেশের প্রথম পরমানু বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এবং এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে, যা এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়েছে। টানা দুই বছর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশের ওপর। বৃদ্ধি পেয়ে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
দেশে এখন ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। মহাকাশে উৎক্ষেপন হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও সোনাগাজীতে অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর এবং ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা ও ত্রিশালে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে। ব্যবসা বাণিজ্যকে করেছে সহজতর। বিকশিত হতে শুরু করেছে সবুজ অর্থনীতি। উচ্চ প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে আমাদেরকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে সরকারের অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ বা অভিশাপ দুটোই হতে পারে। যে কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে সে দেশের মোট শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের ওপর। দেশের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় প্রতিবছর নতুন করে বেকার হচ্ছে আট লাখ কর্মক্ষম মানুষ। এতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির সুফল সর্বত্র নানাভাবে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে সর্বোচ্চ ধনী ও সর্বনিম্ন দরিদ্রের মধ্যে মারাত্মক আয় বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য উপাত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতিবছর ২১ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কর্মের বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রতিবছর কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে প্রায় ১৩ লাখের মতন। গত বছর প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে দেশে বেকারের ৪০ শতাংশই শিক্ষিত। আইএলও বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের প্রবণতা ২০১৮ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল যেখানে বলা হয় বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের ৯০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান মাত্র ১০ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এক ধরনের দুর্বলতা নির্দেশ করে বলে চিত্রটি সুখকর নয়। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান যে কোন দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন নির্দেশ করে। আর সে কারণেই দেশের সার্বিক উন্নয়নে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীর দশটি সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশের একটি। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪তম। বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। উন্নয়ন সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী হলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কিন্তু উল্টো দিকে ঘুরছে। অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। পরিকল্পনায় ১ কোটি ৪ লাখ কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তার বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে ৭৯ লাখ মাত্র। তেমনি পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছিল যার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।
ষষ্ঠ পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছিল সেগুলো হলো শ্রমশক্তি বৃদ্ধির সুবিধা কাজে লাগাতে নীতিতে পরিবর্তন আনা, শ্রমিকের দক্ষতার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, সেবাখাত শক্তিশালী করণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা, বাণিজ্যনীতির সংস্কার, অর্থায়নের মাধ্যমে দরিদ্রদের ক্ষমতায়ন, সম্পদের সুষম বন্টন, শেয়ার বাজার সংস্কারের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার, যোগাযোগ খাতের আমূল পরিবর্তন, জমির প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ প্রমুখ। উপরোক্ত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের ব্যর্থতা ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ।
কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন একটি সার্বিক কর্মনীতি বা কৌশল, যাতে থাকবে নীতিমালার মধ্যেম ব্যক্তিখাতকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রণোদনা দেয়া এবং সরকারি খাতে কিছু কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মনে রাখতে হবে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড় চ্যালেঞ্জ।
তরুণদের যথেষ্ট কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে তা রাজনৈতিক অস্থিরতা সহ সামাজিক নানা ব্যাধি সৃষ্টি করবে। সমষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী করার বিষয়েও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে দেশে কাজের চাহিদা আছে কিন্তু দক্ষ লোক নেই। তাঁরা মনে করেন বেকারদের শিক্ষা আছে কিন্তু শিক্ষার মান খারাপ, দক্ষতাও খুব বেশি নেই। ফলে দেশের কর্মক্ষম শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কাজের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন যে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা রাষ্ট্রায়ত্ত খাতচালিত।
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রবৃদ্ধি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অনেক সাহায্য করছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কর্মসংস্থান মূলত নির্মাণ কাজে। এখাতে জনবল দরকার যেমন কম তেমনি কর্মসংস্থানও মূলত অস্থায়ী। এখাতে প্রযুক্তি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় জনবলের প্রয়োজনও কমে আসছে। বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি জিডিপির অনুপাতে স্থবির হয়ে আছে। অথচ বেসরকারি খাতেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ বেশি। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প এবং তৎসংলগ্ন খাত এর উন্নয়নের জন্য সরকার যে প্রণোদনা দিয়ে থাকেন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অন্যান্য শিল্প যেমন ইলেকট্রনিঙ, জুতা, আসবাবপত্র, থাই অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট, ওষুধ, জ্বালানি তেল প্রভৃতি সেক্টর ও ব্যাপক আকারে প্রণোদনা সৃষ্টির মাধ্যমে একদিকে যেমন শিল্পের প্রসার ঘটানো সম্ভব অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে রপ্তানির গতিকে তরান্বিত করা সম্ভবপর।
সামষ্টিক ও খাত ভিত্তিক নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হবে শ্রম কাজের লক্ষ্য করে বিশেষ প্যাকেজ কর্মসূচি। সেখানে থাকতে হবে বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা, বাজারমুখী দক্ষতা সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগকর্তা ও চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে চাকরি পেতে সহায়তা করা। এ ধরনের কর্মসূচিগুলোই তরুণদের বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে শ্রমঘন শিল্পে অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এখন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে সেখানে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেখানেও সুষম কর্মসংস্থান নিশ্চিতের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গড়ে তুলতে হবে সুষমভাবে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের উপযোগী কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন মানব সম্পদের ও যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই কাজের বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও সংগতিপূর্ণ করা দরকার। প্রয়োজনে কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকতর নজর দেয়া উচিত। সময়ের পরিবর্তনের ধারায় আজকের এ যুগে এসে মানুষ চাকরিকেই সর্বাধিক ঝুঁকিবিহীন ও নিরাপদ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যদিও প্রগতিশীলদের অনেকেই এর সঙ্গে বংশ পরম্পরায় মানসিকতার ছায়া রয়েছেন বলে মনে করেন। তবে যে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতেই হোক না কেন চাকরির মতো পেশায় মানুষের ভেতরকার উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্যগুলো অনেকাংশে সংকুচিত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও অনুদ্যামী মানুষ সংখ্যা যারা সমাজের সিংহ ভাগ, চাকরিকেই জীবনের পরম আরাধ্য বলে গণ্য করেন। তবে আজকের এ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এসে শিক্ষিত তরুণদেরকে নিজেদের মেধা ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনার যথার্থ প্রয়োগ ঘটাতে চাইলে উদ্যোক্তা বৃত্তি ছাড়া কোন বিকল্প নেই। কিন্তু শিক্ষিত তরুণরা চাকরি না খুঁজে কেন এবং কিভাবে উদ্যোক্তা হবেন তার কিছু প্রস্তাব সংযুক্তকরণ করা হইল। প্রথমত কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা এবং সরকারিভাবে প্রতিটি উপজেলায় ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত প্রশিক্ষণ শেষে সহজ শর্তে সহজ কিস্তিতে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত সর্বাগ্রে প্রয়োজন হবে উদ্যোক্তা অনুকূল একটি বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করা যেটি একজন শিক্ষিত তরুণকে চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা বৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করবে। চতুর্থত বাজার চাহিদা ও সম্ভাব্য উদ্যোক্তার নিজস্ব যোগ্যতা ও সামর্থ্যের আলোকে কোথায় বিনিয়োগ অধিকতর লাভজনক এবং নিরাপদ হতে পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও তথ্য নির্দেশনা লাভের সুযোগ আগ্রহী সম্ভাব্য উদ্যোক্তার জন্য নিশ্চিত করা। পঞ্চমত প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে আগ্রহী উদ্যোক্তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে কোন কাজই যে ছোট নয় এ বিষয়ে দেশের তরুণ সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য শিক্ষার কারিকুলাম পরিবর্তন করা জরুরি এবং কর্মমুখী শিক্ষা পদ্ধতির উপর জোর দিতে হবে।
পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি আনতে হবে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। ষষ্ঠত নতুন উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য সুশাসন এবং দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। সর্বোপরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করতে হবে। সরকার দেশের উন্নয়ন চায়। সরকারের এ উন্নয়নকে টেকসই ও স্থায়ী রূপ দিতে হলে অবশ্যই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন কর্মপরিবেশের উপযোগী একটি শ্রমশক্তি নীতিমালাও প্রণয়ন করতে হবে এবং স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের আওতায় সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমই গ্রহণ করেননি বরং কৃষিঋণ, এসএমই ঋণ, মোবাইল ব্যাংকিং ও পরিবেশ বান্ধব বিনিয়োগে অর্থায়ন বাড়িয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সফল বাস্তবায়ন, তবেই সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে। (দৈনিক আজাদী থেকে নেয়া)

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতি সংগঠক

এই বিভাগের আরো সংবাদ