রক্তাক্ত যিশু

  আবদুল মান্নান

২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্ম প্রবর্তককে ডাকেন যিশু বলে, আর মুসলমানদের কাছে তিনি হজরত ঈসা (আ.)। ধর্মের ইতিহাসে তিনটি ধর্মের আদি প্রবর্তক হিসেবে বা শেকড় হিসেবে যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তিনি হচ্ছেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে এসেছেন হজরত মুসা (আ.), যিনি প্রবর্তন করেছেন ‘জুডাইজিম’ (ইহুদিরা মনে করে এটি তাদের আদি র্ধম)। হজরত ইব্রাহিমের (আ.) মতো হজরত মুসা (আ.) এক সৃষ্টিকর্তার ধারণা নিয়ে তার ধর্ম প্রচার করেছিলেন মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য। কিন্তু মানুষ অন্ধকার হতে আলোতে আসতে অস্বীকার করে, যা তাদের সেই সময়কার কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত। তারপর সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সত্য আর ন্যায়ের পথে আনার জন্য হজরত ঈসাকে (আ.) তাঁর সত্য আর ন্যায়পরায়ণতার বাণী প্রচার করার জন্য মর্ত্যে প্রেরণ করেন। কোনও কোনও গবেষকের মতে হজরত মুসা (আ.) আর হজরত ঈসার (আ.) জন্মের মাঝখানে দেড় হাজার বছরের ব্যবধান ছিল। হজরত ঈসাও মানুষকে সৃষ্টিকর্তার প্রত্যাশিত পথে আনতে পারেননি। হজরত ঈসার পর পৃথিবীতে আবির্ভাব ঘটে সৃষ্টিকর্তার সর্বশেষ দূত বা পয়গম্বর বা নবী হজরত মুহাম্মদের (স.)। তিনি ছিলেন মর্ত্যে আল্লাহর বাণী নিয়ে আসা সর্বশেষ আল্লাহর দূত। লক্ষ্য একটাই, মানুষকে সৃষ্টিকর্তার দেখনো পথে আনা, যেমনটি তারই পূর্বে চেষ্টা করেছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.), হজরত মুসা (আ.) আর হজরত ঈসা (আ.)। আল্লাহর এই নবীরা সবাই এক এবং অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রচার করেছিলেন এবং তাদের মৌলিক শিক্ষার মধ্যেও কোনও পার্থক্য নেই যদিও পরবর্তী সময়ে তাদের অনুসারী দাবিদাররা অনেক ক্ষেত্রে তাদের কল্পনাপ্রসূত ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের ধর্মকে বিতর্কিত করেছিলেন, আর ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশে দেশে, মানুষে মানুষে বিভেদ আর হানাহানি সৃষ্টি করেছেন।

মুসলমানদের কাছে সব নবীই অত্যন্ত সম্মানের ও পবিত্র। পবিত্র কোরআন শরিফে হজরত ঈসার (আ.) নাম পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে কমপক্ষে ১৮৭ বার উল্লেখ করা হয়েছে, আর হজরত মুসার (আ.) নাম ১৩৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইসলামের নবীর নাম উল্লেখ আছে পাঁচবার। পবিত্র কোরআন যেহেতু হজরত মুহাম্মদের (স.) ওপর নাজিল হয়েছিল সেহেতু সেখানে তার নাম কম উল্লেখ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আল্লাহর সব প্রেরিত নবী মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, যুগে যুগে যে ধর্ম মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রবর্তন হয়েছিল এবং শান্তির বাণী নিয়ে এসেছিল সেই ধর্মকে ব্যবহার করে সব সময় ধর্মান্ধরা মানুষকে বিভাজিত করেছে এবং মর্ত্যে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলিরা প্যালেস্টাইনের আদি বাসিন্দা মুসলমান ও খ্রিস্টানদের ওপর অন্যায় অবিচার করছে ও তাদের নিয়মিত হত্যা করছে। হিটলার ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করতে ষাট লাখ ইহুদি হত্যা করেছে। মিয়ানমারের থেরাবাদী বৌদ্ধরা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা পরিচালনা করছে। পাকিস্তানে খ্রিস্টান ও হিন্দুরা সেই দেশের ধর্মান্ধদের দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছে। ভারতে হিন্দুত্ববাদীর নামে এক শ্রেণির ধর্মান্ধের হাতে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা নিগৃহীত হচ্ছেন। বাংলাদেশেও এক শ্রেণির উন্মাদের হাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত হচ্ছেন। এসবই হচ্ছে কিন্তু ধর্মের নামে। অথচ কোনও ধর্মই হিংসা হানাহানি উৎসাহিত বা অনুমোদন করে না।

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন হজরত ঈসাকে (আ.) রোমানরা (বলা হয় ইহুদিরা) ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার পর তাকে কবর দেওয়ার তিন দিনের মাথায় সৃষ্টিকর্তা তাকে তার কাছে ডেকে নেন। রোমানরা দেখেন হজরত ঈসা বা যিশুর কবর খালি পড়ে আছে। এই দিনটি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা পুনরুত্থান বা Resurrection Day/Easter Sunday হিসেবে পালন করে থাকেন। এটি তাদের জন্য একটি অত্যন্ত পবিত্র দিন। এর আগের চল্লিশ দিন অনেকে উপোস করেন এবং দিনটির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এদিন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা গির্জায় সমবেত প্রার্থনায় শামিল হন। অনেকের কাছে দিনটি বড়দিন বা ক্রিস্টমাসের চেয়েও পবিত্র দিন।

বিশ্বের সব দেশের মতো দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টানরাও এদিন সকালে গির্জায় জড়ো হয়েছিলেন প্রার্থনা করতে। শ্রীলঙ্কা একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রধান দেশ। দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ খ্রিস্টান, ১৩ ভাগ হিন্দু, আর ১০ ভাগ মুসলমান। এই ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের দিনটিতে সবকিছু তছনছ হয়ে গেলো এক ভয়াবহ জঙ্গি হামলার কারণে। জঙ্গিরা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানী কলম্বো ও সংলগ্ন বাত্তিকালোয়া শহরের তিনটি গির্জা, তারকাখচিত চারটি হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলা করে। একটি বোমা বিমানবন্দরের কাছে অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া যায়। একটি বাড়িতেও বোমা হামলা করা হয়। এই হামলায় কমপক্ষে ৩১০ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়, যার মধ্যে ৩০ জন বিদেশি ছিলেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। গুরুতর আহত হন প্রায় ৪৫০ জন। আক্রান্তদের রক্তে রক্তাত্ব হয়েছে গির্জার ভেতরে স্থাপিত যিশুর মূর্তি। আহতদের মধ্যে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর ফুফাত ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মেয়ের জামাইও আছেন। তাদের আট বছরের সন্তান জায়ান এই ঘটনায় নিহত হয়েছে। জায়ান প্রধানমন্ত্রীর খুব আদরের নাতি ছিল, দাদু বলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তো। ব্রুনাই সফররত প্রধানমন্ত্রী এই সংবাদে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। ইতোপূর্বে শ্রীলঙ্কায় প্রায় তিন দশক ধরে গৃহযুদ্ধ চলেছে। উত্তরের তামিল অধ্যুষিত এলাকার তামিলরা তামিল টাইগারদের নেতৃত্বে পৃথক রাষ্ট্র দাবি করছিল এবং তার জন্য তারা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছিল। সেই গৃহযুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে সেই গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হয়। গৃহযুদ্ধ চলাকালে এমন ধরনের বোমা বিস্ফোরণ নিয়মিত ঘটনা ছিল। ২০০৪ সালের পর তা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

রবিবারের ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল তা পরিষ্কার নয়। তবে লন্ডনভিত্তিক ডেইলি মিরর পত্রিকা রয়টার্সের বরাত দিয়ে বলছে, সন্দেহের তীর আইএসের শ্রীলঙ্কার শাখা জামায়াত আল তৌহিদ আল-ওয়াতানিয়া নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের দিকে। এর আগে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী জড়িতরা সব শ্রীলঙ্কার অধিবাসী। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ এই ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটাতে হলে অভ্যন্তরীণ মানুষের সহায়তা লাগবে। বাইরে থেকে কেউ এসে এমন অপারেশন চালাবে তা অসম্ভব। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এই পর্যন্ত ২৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এমন কোনও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই ধরনের হামলা হতে পারে তার আগাম সতর্কবার্তা ভারতের একটি গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধানকে বেশ আগেই দিয়েছিলেন বলে। তা যদি হয়ে থাকে তাহলে এটি শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে। সোমবার মধ্যরাত হতে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

রবিবার কলম্বো ও বাত্তিকালোয়ার গির্জায় যেসব মানুষ প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন তারা শান্তি ও মানুষের কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন। জঙ্গিদের বোমার আঘাতে তারা গির্জার ভেতরে প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন। সেই রাতে আবার একটি মসিজদ ও একটি দোকানে কে বা কারা পেট্রোলবোমা হামলা করেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এটি নিশ্চিত এগুলো ধর্মান্ধদের কাজ। রবিবারের ঘটনা যারা ঘটিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্য কী জানা যায়নি। হয়তো তারা তাদের আবির্ভাব ও অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য গির্জা ও হোটেলের মতো হাইপ্রোফাইল অথবা সফট টার্গেট বেছে নিয়েছে। তবে বিশ্বের সব শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে এই অপকর্মের সঙ্গে যারাই জড়িত তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং তাদের প্রাপ্য উপযুক্ত দণ্ডে তারা দণ্ডিত হবে। রবিবারের ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও আত্মার শান্তিসহ পরিবারের স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষেক 

এই বিভাগের আরো সংবাদ