ডিজিটাল যুগে প্রাণ জাগানিয়া

  স্বদেশ রায়

১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:০১ | অনলাইন সংস্করণ

আমাদের পহেলা বৈশাখ বা বাঙালির নববর্ষ যা এখন আমরা পালন করি তা সৃষ্টি হয়েছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্রোতধারায়। তখন আমাদের বাঙালি হয়ে ওঠার আকুতি থেকে জন্ম নেয় এই পহেলা বৈশাখ। আমরা আমাদের আপন ঘরের ভিত্তির ওপর বসে আধুনিক জাতীয়তাবাদ বা পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের জারক রসে তৈরি একটি উপাদান। এ উপাদান প্রতিদিন পুষ্ট করবে আমাদের জাতীয়তাবাদকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন এতে যোগ করতে হবে নিজের ঘরের ভিত্তি খুঁড়ে নানান উপাদান। যেমনটি যোগ হচ্ছে পহেলা বৈশাখ পালনের সঙ্গে প্রতিদিন। আজ হয়তো অনেকে বলছেন, ওই যে ওরা মুখোশে পেঁচা আনছে এটা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। যারা বাঙালিত্বে বিশ্বাস করে না, তারা নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকের মতো বলছে, এটা হিন্দুয়ানি। আর যারা ছদ্মবেশী সাম্প্রদায়িক তারা বলছে, এটা ঠিক আমাদের সমাজের সঙ্গে যায় না। এই দুই-ই কাছাকাছি। তবে এ নিয়ে যারা আমাদের এই উৎসবের সঙ্গে নানান উপাদান যোগ করছে সেই তরুণদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ, পেঁচা আমাদের বাংলাদেশেরই একটি পাখি। দোয়েলের মতো সেও আমার পাশে থাকে। সে শুধু হিন্দুর পাশে থাকে না। বাংলাদেশের সব মানুষের বাড়ির গাছে গাছে তার অবস্থান। তাই আরও শতবর্ষ পরে এ সমাজে একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কি না পেঁচা নিয়ে আপত্তি করবে। পেঁচাকে একটি প্রতীক অর্থেই বলছি, পহেলা বৈশাখের অনেক আনন্দের উপাদান নিয়ে এখনও এ সমাজে আপত্তি ওঠে। কেন ওঠে তাও অত্যন্ত সোজা চোখে বোঝা যায়। মূলত এখনও এ সমাজের অনেক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের জারক রসে জারিত। এমনকি অবচেতনভাবেও অনেকে পাকিস্তানের জারক রস ধারণ করে চলছে। তাই এসব আপত্তি। আর এ কারণেই এখনও পুলিশ বেষ্টনীতে আমাদের পহেলা বৈশাখ পালিত হচ্ছে।
তবে উৎসবকে কখনই পুলিশ বেষ্টনীতে রাখা যায় না। উৎসব তার আপন শক্তিতে বের হয়ে আসবে আপন আঙিনায়। আর শুধু পহেলা বৈশাখ নয়, আমাদের এখন আরও অনেক বেশি বেশি এমন উৎসব প্রয়োজন। এ মুহূর্তে আমরা যে সময়টাতে বাস করছি এ সময়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, নিজের প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বড় বেশি প্রয়োজন উৎসবের। কারণ, সময় ও পৃথিবীর প্রয়োজনে আমরা ডিজিটাল যুগে প্রবেশ শুধু করিনি, শতভাগ এক ডিজিটাল যুগে বাস করছি। এই ডিজিটাল যুগের শতভাগ সুবিধা আমরা পাচ্ছি। আজ পৃথিবী হাতের মুঠোয়। ইনফরমেশন হাতের মুঠোয়। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্ট মানুষকে সর্বোচ্চ সুবিধাজনক এক যুগে নিয়ে এসেছে ও নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যক্তি জীবনে কী পরিবর্তন আনছে এই ডিজিটাল সময়টা তাও ভেবে দেখতে হবে? আজ পৃথিবীর অনেক মানুষ ডিজিটাল আসক্তিতে ভুগছে। এই আসক্তিতে ভোগা অন্য কোনও নেশার থেকে কোনও অংশে কম নয়, বরং বেশি। এই যারা ডিজিটাল আসক্তিতে ভুগছে, তাদেরকে যদি বলা হয় তোমরা এই আসক্তি কমিয়ে দাও। তারা সেটা ইচ্ছে করলে কমিয়ে দিতে পারবে না। যেমন মাদক ইচ্ছে করলেই ছাড়া যায় না। আবার ডিজিটাল পৃথিবী থেকে আমার সরে আসারও কোনও পথ নেই। ডিজিটাল পৃথিবীতে কম প্রবেশ করো, এ কথা বলারও সুযোগ কম। বরং সুযোগ নেই এটাই বলতে হবে। তাদেরকে শুধু বলা অতিরিক্ত প্রবেশ নয়, এডিকশন নয়। কিন্তু যে একবার আসক্তিতে বা নেশায় পড়ে যায় তাকে তো কোনোমতেই মুখের কথা দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে আনা যাবে না। তাকে সরিয়ে আনার একমাত্র পথ, উৎসবে টেনে আনা। উৎসবের অন্তরে এমন একটি শক্তি আছে যা মানুষের প্রাণকে জাগিয়ে দেয়, মানুষের প্রাণ যখন জেগে ওঠে তখন যে কোনও আসক্তি ছিন্ন করার শক্তি আপন থেকে ওই প্রাণে জন্ম নেয়।
আমাদের পহেলা বৈশাখের উৎসবের প্রস্তুতির ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ আরও অনেক অনুষঙ্গ এর সঙ্গে জুড়ে পালনের প্রস্তুতি যদি পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় এমনকি ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে শুরু হয় - তাহলে চিত্র বদলে যাবে। দেখা যাবে ওই ডিজিটাল আসক্তি ছেড়ে মাসব্যাপী তরুণ-তরুণী উৎসবকে বাক্সময় করার জন্যে মেতে উঠেছে। যোগ শুরু হয়ে যাবে তখন পাশের ফ্ল্যাটের, পাশের বাড়ির তার সমবয়সীর সঙ্গে, বন্ধুত্ব দৃঢ় হবে ক্লাসের আরো অনেকের সঙ্গে। কারণ, ডিজিটাল এজ আমাদের এক ধরনের নিঃসঙ্গ করে ফেলছে। বন্ধুত্ব এখন সব থেকে বেশি ইন্টারনেটের সঙ্গে, সোশ্যাল ফোরামে। বাস্তবে মনে হয় আমি হয়তো অনেক কিছুর সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে কাটাচ্ছি। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা তা নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো একটি চরম নিঃসঙ্গতায় পার হয়ে যাচ্ছে সময়। এই নিঃসঙ্গতা কোনও মতেই হিরন্ময় নয়, বরং এই নিঃসঙ্গতা একটি মানুষের মনোজগৎকে পঙ্গু করে ফেলে। তারা কল্পনা, তারা মনোজাগতিক বিস্তার কমিয়ে দেয়। কমিয়ে দেয় তার সৃষ্টিশীলতা। এই নিঃসঙ্গতা থেকে আজকের তরুণ বা কিশোরদের বের করে আনতে হলে পহেলা বৈশাখের মতো উৎসব অনেক বেশি প্রয়োজন। চীনসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ যেমন তাদের নববর্ষ বেশ কয়েক দিন ধরে পালন করে, ইরানের নওরোজ যেমন কয়েক দিন ধরে পালিত হয়, আমাদের পহেলা বৈশাখকে নিয়ে আমাদের এমনটি এখন ভাবার সময় এসেছে। কারণ এখন আর পহেলা বৈশাখ শুধু আমাদের জাতীয়তাবাদ জাগানোর একটি দিন বা উপাদান নয়। বরং পহেলা বৈশাখ আমার প্রাণ জাগানোর উৎসব। যে উৎসব আমাদেরকে এই সময়ে নিঃসঙ্গতা থেকে টেনে নিয়ে আসবে সবার মাঝে। আমরা ডিজিটাল যোজনী ছেড়ে মানুষের হাত ধরবো, বন্ধুর হাত ধরবো এই উৎসবের মাধ্যমে।
মানুষের হাত না ধরা, বন্ধুর হাত না ধরা এই মুহূর্তে শুধু ডিজিটাল যোজনীতে ভর করে আমরা কিন্তু অস্বীকার করতে চলেছি, এরিস্টটলের সেই সত্য চিন্তাকে, ‘মানুষ প্রাকৃতিকভাবে একটি সামাজিক জীব’। তাই এই সামাজিক জীব যদি সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে একা একা ঘরের ভেতর উঠে যায় এমনকি লোকাল বাস বা ট্রেনেও সে যদি স্মার্ট ফোনের ওপর ভর করে একা হয়ে যায়- তাহলে সে তার নিজস্ব প্রকৃতিকেই অস্বীকার করবে। আর মানুষ যখন আর সত্যি অর্থে সামজিক জীব থাকবে না, সে যখন একা হয়ে যাবে তখন শুধু মানুষের মনোজগতে নয়, সামগ্রিকভাবে মানব সমাজে একটি বড় বিপর্যয় আসবে। এ কারণেই আজ যখনই আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছি তখনই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মানুষকে সামাজিক জীব হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ, আর যাই হোক সামাজিক উন্নয়ন ছাড়া মানুষের কোনও উন্নয়নই শেষ অবধি স্থায়ী হয় না। যাবতীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন তখনই স্থায়িত্ব লাভ করে যখন মানুষ সামাজিকভাবে উন্নত হয়। এই সামাজিক উন্নয়নের জন্যেই, মানুষকে বেশি বেশি সামাজিক করে তোলার জন্যে মানুষের জীবনে অনেক বেশি উৎসবের প্রয়োজন হয়। পহেলা বৈশাখ আজ আমাদের এই প্রয়োজনীয়তা মেটানোর উপাদান হিসেবে দেখা দিয়েছে। একদিন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রয়োজনে যে পহেলা বৈশাখ সৃষ্টি হয়েছিলো আজ তা আর শুধু জাতীয়তাবাদ জাগানোর ভেতর সীমাবদ্ধ নেই, সমাজকে জাগিয়ে, উৎসবে প্রাণ রাঙিয়ে দেওয়ার প্রাণ হিসেবে দেখা দিয়েছে পহেলা বৈশাখ। তাই পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণ জাগানিয়া এক উৎসব। মিলনের এক মহাক্ষেত্র।

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

এই বিভাগের আরো সংবাদ